Friday, December 25, 2009

পথচারী


ম্যাথ ক্লাব থেকে বের হতে হতে রাত প্রায় সাড়ে আট টা। শীতের সময় সন্ধ্যা নামে বিকেল চারটায়। মন্ট্রিয়লের জনাকীর্ণ রাস্তা  শশ্মান হয়ে যায় সন্ধ্যা সাতটার মাঝেই। ক্লাব থেকে রাস্তা পেরিয়ে কিছুদূর হাঁটলেই নিগারের বাসা। রাতে রাস্তার সোডিয়াম বাতিগুলো হলুদ আভা ছড়িয়ে সারা অন্ধকারকে যেন হলদেটে করে রাখে। নিগার ছন্দে ছন্দে পা ফেলে যখন এগুতে থাকে, বাতাসের ঝাপটায় তার জ্যাকেটের হুড টুপ্ করে খুলে যায়। চিলিং কোল্ড। সহনীয় নয়। আবার কাঁধের ব্যাগটা সরিয়ে জ্যাকেটের হুডটা দিয়ে মাথাটা ঢেকে ফেলে সে। মাঝে মাঝে দ্রুত হাঁটে , মাঝে মাঝে ধীরে। বাড়ী পৌঁছাতে হয়তোবা মিনিট দশেক। ঘড়িতে দেখে নিল সময়টা ভাল করে। রাত সাড়ে আট টা। ও যাচ্ছে সেইন্ট কেভিন সড়ক ধরে পূর্বদিকের ইসাবেলা রাস্তায়। এটাই তার বাড়ী ফেরার রুটিন। কারণ তথ্যটা এভাবেই নির্ধারিত করা। অর্থাৎ নিগার সেইন্ট কেভিন রাস্তা ধরে এগুবে ইসাবেলা সড়ক অভিমুখে রাত আট টা তিরিশে । জনমানবহীন রাস্তায় নিগার প্রতি পদক্ষেপ রেখে চলবে মিনিট দশেক তার গন্তব্যে পৌঁছাবার জন্যে। রাস্তার দু ধারের দৃশ্যটাও এমনি। হলদেটে আভায় জনমানবহীন পথ। নিগার হেঁটে যাবে ওর বাসার দিকে। সেসময় নিগার ছাড়া আর অন্য কিছুরই উপস্থিতি থাকবে না ও পথে।

কিন্তু কার কাছে রয়েছে এ সকল তথ্য? তার কাছে যে হয়তো বা ঘটাবে এ ঘটনাটি। তা না হলে নিগার বাড়ী ফিরবেই বা কি করে? ওর নাম ভি-ওয়ান। সকলের বাড়ী ফিরবার ঘটনা ও-ই তৈরী করে থাকে  যেমন কিনা মি. পার্কার, যিনি বাড়ী ফিরেন তার ডেলিভারি অর্ডার শেষ করে শীতের রাতে টরন্টোর নির্জন রাস্তা ধরে । তার এই মিনি ভ্যানটা চালাচ্ছেন আজ প্রায় ত্রিশ বছর। এই দীর্ঘ সময় ধরে রাস্তায় চালক হিসেবে তার রিপোর্ট একদম ক্লিন। কোন অ্যাকসিডেন্টের ঘটনা নেই, স্পিডিং এর ইতিহাস নেই। ট্র্যাফিক পুলিশের নজরদারীতেও পড়েন নি। একজন পাকা ড্রাইভার হিসেবে নিজে খুবই আত্মবিশ্বাসী। চারিদিক খেয়াল করে দায়িত্বের  সাথে গাড়ি চালনার অভিজ্ঞতা আর দক্ষতা অর্জন করেছেন দীর্ঘ দিনের চেষ্টার ফলে। এই গুণাবলী মি. পার্কারের সেই ছোটবেলা থেকেই। হাইস্কুল শেষে ডেলিভারি ম্যানের কাজটা যখন নিলেন তখন তার বয়স সবে আঠার। তারুণ্যের উদ্দীপনা থাকলেও তা তিনি গাড়ি চালনার ক্ষেত্রে প্রকাশ করেন নি কখনো। আর দেখতে দেখতে এখন ত্রিশটি বছর পার হয়ে গেছে। টরোন্টো শহর জনবহুল হয়েছে। ব্যবসা বাণিজ্য কেন্দ্র হিসাবে প্রসার লাভ করেছে। জীবন যাত্রার পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু কাজ শেষে তার বাড়ী ফিরবার পথটা সেই একই রকম আছে। কারণ ভি-ওয়ান এর কোন পরিবর্তন ঘটায় নি। তাই মি. পার্কার নিশ্চিন্ত মনেই বাড়ী ফিরেন প্রতি রাতে তার কাজ শেষে। নিয়ন আলোয় রাস্তাটা হাল্কা ধোয়াটে দেখায়। এই রাস্তার দুটি ক্রসিং পেরুলেই তার বাড়ী ব্র্যাডফোর্ড প্লেইসে। এখানে সব মিলিয়ে আগে ছিল পাঁচটি পরিবার। তারপর প্রতিবেশীরা এ জায়গা ছেড়ে বিস্তৃত টরোন্টোর ব্যাপৃত বাণিজ্য কেন্দ্রে  ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছেন ধীরে ধীরে। এখন ব্র্যাডফোর্ড প্লেইসে মি. পার্কার একাই বাস করেন। মাসের শেষ সপ্তাহে ভাইঝি আসে তার সাথে দেখা করতে। ও থাকে মন্ট্রিয়লে। হাইস্কুলে সবে মাত্র উঠেছে। নাম নিগার। ম্যাথে খুব ভাল। ম্যাথ ক্লাবের মেম্বারও। ব্যস্ত থাকে ভীষণ। তারপরও মাসের শেষ সপ্তাহান্তে তার এখানে আসা চাই। সাত ঘন্টার বাস জার্নি। গ্রে-হাউন্ডের বাস জার্নি যদিও খুব ভাল তবুও ক্লান্তি নেই মেয়েটার। প্রভিন্স দুটোর দূরত্ব ৩১৩ মাইলের কিছু বেশী। শনিবার দুপুরে পৌঁছাবে আবার রবিবার দুপুরে রওনা দেবে কিন্তু প্রাণপ্রিয় পার্কার আঙ্কেলকে না দেখলে তার চলবে না। আর মি. পার্কারও মনের অজান্তে যেন অপেক্ষা করে থাকেন ভাইঝির জন্য। মাসের শেষের উইকেন্ডটা তাই তার কাছে খুব আকাঙ্খিত। 

ভি-ওয়ান খুব সাবধানী একজন প্রোগ্রামার। যদিও জটিল কোন দায়িত্বে সে নিয়োজিত নয়। শুধু পৃথিবীর মানুষগুলো কিভাবে বাড়ী ফিরবে সে কাজটুকুই দেখাশুনা করে। পৃথিবীতে মানুষগুলো স্পেস-টাইম ডাইমেনশানে আবদ্ধ। তাদের দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, উচ্চতা বিশিষ্ট শরীর আছে, যা থ্রি ডাইমেনশানাল স্পেসে যথার্থ ভাবে খাপ খায়। তাই তাদের এই শরীরগুলোকে কর্মক্ষম রাখার জন্য আর স্বচ্ছন্দ্যে চলাফেরার জন্য সারা পৃথিবীতে থ্রি-ডি স্পেসের জাল বুনে দেয়া হয়েছে। ভি-ওয়ানের গুরু ট্রিসটিন এই ধারণার প্রবর্তক। তার মতে পৃথিবীর এই থ্রি -ডি স্পেসে সেই থাকতে পারবে যে তার শরীর ও আত্মার সমন্বয়ে পৃথিবীতে অবস্থান করতে পারবে। এই ধরণের অবস্থাকে পৃথিবীতে  ‘বেঁচে থাকা’ বলে। শরীর ও আত্মার সমন্বয় ঘটায় যে প্রাণশক্তি তার কিন্তু এতকিছুর প্রয়োজন হয় না। সে সময় এবং স্থানের উর্ধ্বে। কিছুতেই তার পরিবর্তন নেই। আবার ভি-ওয়ান, ট্রিসটিন এবং আরো অনেকে রয়েছে যাদের বৈশিষ্ট্য হল ওরা সর্বোচ্চ ৩৩ ডাইমেনশান পর্যন্ত বিচরণ করতে পারে অর্থাৎ  সর্বোচ্চ ৩৩ ডাইমেনশানে আবদ্ধ। পৃথিবীর মানুষরা ডাইমেনশানের দিক দিয়ে থ্রি ডাইমেনশানের বেশী নয় তাই ট্রিসটিনদের দেখতে পায়না। তাদের অস্তিত্বও অনুভব করতে পারেনা। অথচ এসকল মানুষদের ভাগ্য নির্ধারক হিসেবে ভি-ওয়ান কত খাটুনিই না করে। মাঝে মাঝে ওর ইচ্ছে করে মানুষদের সামনে এসে দাঁড়াতে । শরীর তো নেই তাই শরীরের আকার ধারণ করে কালো ছায়া হয়ে দৃশ্যমান হতে চেষ্টা করে সে,যাকে বলা যায় একদম শ্যাডো ম্যানের রূপে!ছায়া মানব। তর্ক বিতর্ক করেও পৃথিবীর মানুষগুলো তখন ওদেরকে দেখে ছায়া মানবের সংগা নির্ধারণ করতে পারে না। হায়রে মানুষগুলো, জানার স্তর ওদের কত কম! ভি-ওয়ান , ট্রিসটিন এসব কান্ড দেখে মিটিমিটি হাসে। ওরা আজ এসেছে পৃথিবী ভ্রমণে। বেশ দূর হতেই খেয়াল করছে নিগারকে। নিগার বাড়ী ফিরছে তার চিরচেনা পথ ধরে। ওদিকে মি. পার্কারও বাড়ি ফিরছেন। সারাদিনের কাজ শেষে আজ তিনি ভীষণ ক্লান্ত। আর চারদিন পরেই মাসের শেষ উইকএন্ড। তখন চাচা ভাতিজির দেখা হবে টরোন্টোতে। ভি-ওয়ান হঠাৎই ভাবলো, এমন করলে কেমন হয় যদি নিগারের কো-অর্ডিনেট টা হালকা টোকায় মি. পার্কারের কাছে নিয়ে আসা যায়! দুজনের মাঝে এখন ৩১৩ মাইল দূরত্ব। কাছাকাছি ওদের কো-অর্ডিনেট দুটো এনে ফেললে মি. পার্কার বাড়ি ফেরার পথে দেখতে পাবেন যে নিগারও ফুটপাথ ধরে হেঁটে বাড়ি ফিরছে। অথচ এখন টরোন্টোতে নিগার আসবেই বা কোথা থেকে , ও তো থাকে মন্ট্রিয়লে। চোখের ভুল মনে করে আপন মনে হয়তো বা তিনি হাসবেন। কিন্তু জানবেনও না যে তার দেখাটা আসলে ভুল ছিল না। 
নিগারও দেখবে তার আংকেল পার্কারের সাদা ভ্যান গাড়িটির মত হুবুহু একটি গাড়ি তার ফুটপাথের পাশ দিয়ে চলে গেল। মনে মনে হাসবে নিগার। ভাববে তারও বুঝি চোখের ভুল। হয়তোবা তার একমাত্র প্রিয় আংকেলের কথা খুব মনে পড়ে বলেই যেখানে সেখানে আজকাল আংকেলের গাড়িটাও দেখতে শুরু করেছে।
প্ল্যানটা ভি-ওয়ান , ট্রিসটিনকে বললো। শুনে ট্রিসটিন বললো,
-চমৎকার আইডিয়া। কাজটা আমিই করবো। দুজনের কো-অর্ডিনেট একটু কাছাকাছি আনা, এই-ই তো?
-হ্যা, কিন্তু সাবধানে।
-এতে আবার কি সাবধানতা?
-দুজনকে কিন্তু পাশাপাশি রাখতে হবে। একজন যদি আরেকজনের কো-অর্ডিনেটের ওপর এসে পড়ে তাহলে কিন্তু সংঘর্ষ অনিবার্য।
-তেমন তো হয়েই থাকে। পথে যেতে যেতে কত মানুষ একে অপরের সাথে ধাক্কা খায়, না?
-সে তো ভীড় থাকলে।
-ভীড় হয় কখন? অনেকগুলো কো-অর্ডিনেট কাছাকাছি চলে এলেই তো?
- কিন্তু এখানে ব্যাপারটা জটিল।
-কেমন জটিল?
-যেমন ধর, দুজনেই তো হাঁটছে না। নিগার যাচ্ছে ফুটপাথ দিয়ে। আর মি. পার্কার যাচ্ছেন ভ্যান চালিয়ে। সামান্য ভুলে কিন্তু সংঘর্ষ বাঁধবে। আর তা থেকে কি হবে বুঝতে পারছো তো? অ্যাকসিডেন্ট।
-তা হবে না। আমি ওদের কো-অর্ডিনেট দুটো একটু কাছাকাছি করবো এই যা। এখনি করি না কেন?
-এখন কেন? পরেও করা যাবে। এখন চল ঘুরে বেড়াই। দেখি এই পৃথিবীর ছোট্ট ছোট্ট মানুষগুলো কে কোথায় কি করছে। ঢাকায় একট জায়গা আছে নাম শনির আখড়া। প্রায়ই বাস ট্রাক আর মিনিবাসে অ্যাকসিডেন্ট হয়। চলো ঘুরে আসি।
যে কথা সে কাজ। ওরা চলে এলো ঢাকায় । লক্ষ্য করলো জায়গাটার পরিবর্তন। একটা ডিভাইডার দেয়া হয়েছে অ্যাকসিডেন্ট প্রতিরোধের জন্য। কিন্তু ট্রিসটিনের প্রশ্ন
-এতে কি কাজ হবে? অ্যাকসিডেন্ট কি প্রতিহত হবে? ওরা  কি মূল কারণটা জানে না?
-না জানে না। আর জানলেও ওদের কিছু করার নেই।
-কেন বলতো?
- প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে মানব প্রজাতি এখনো বেশ পিছনে পড়ে আছে। গাণিতিক সমীকরণগুলোও সবসময় সমাধানে পারদর্শী নয়। মাত্র তারা ভাবতে শুরু করেছে তাদের জগত ছাড়া অন্য জগতের অস্তিত্ব থাকতে পারে। অথচ পুরো বিশ্লেষণ এখনো করতে পারেনি। তাই এখনো জানে না যে শনির আখড়া জায়গাটা সেই জায়গা যেখানে অন্য একটি সাত-ডাইমেনশান জগতের সংমিশ্রণ ঘটে গেছে। তাই যে কোন গতিশীল বস্তুই যখন এ পথ দিয়ে ধাবিত হয় তখন ঐ সেভেন-ডি জগতের সাথে ধাক্কা খায়, আর সাথে সাথে হয়ে পড়ে নিয়ন্ত্রণহীন । সুতরাং ওখানে অ্যাকসিডেন্ট ঘটবার মাত্রা এত বেশী। তাছাড়া মানুষ প্রজাতি থ্রি-ডির বেশী ডাইমেনশান  দেখতেও পায় না , অনুভবও করতে পারেনা। তাই এসব ব্যাপারে ওদের ধারণা ও জ্ঞান খুব সীমিত।
-তাহলে? এর কি কোন সমাধান নেই?
-আছে।
-কি সেটা?
-সমাধান দুটো। একটি আমাদের হাতে । আমরা সেভেন-ডি কে একটু সরিয়ে দিলেই দুজগতের ছেদবিন্দু হিসেবে পরিচিত ঐ শনির আখড়া শনি মুক্ত হবে। আরেকটা  উপায় হলো আরো ৫০ বছর অপেক্ষা করা। অর্থাৎ ২০৬০ সালের দিকে পৃথিবীর মানুষগুলো গাণিতিক হিসাব নিকাষে আরেকটু এগিয়ে যাবে। প্রকৌশল বিদ্যায় ও উন্নতি লাভ করবে। নিজেদের ডাইমেনশান নিজেরাই নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। ওদের আশপাশের জগতগুলোর সাথে কোন সংঘাত ছাড়াই সহ অবস্থানে সক্ষম হবে। উদ্দেশ্য ভাল রেখে এগুলে পৃথিবী থেকে বেশীরভাগ দুর্ঘটনা প্রতিহত করতে পারবে। আমাদেরকে আর রাত দিন খাটা খাটনি করতে হবে না তাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি ক্ষণ নির্ধারিত করে দেয়ার জন্য। ওদের ভাগ্য নিয়ন্ত্রক ওরা নিজেরাই হতে পারবে।

কথাগুলো শুনতে শুনতে অন্যমনস্ক হয়ে ট্রিসটিন এক টোকায় নিগারের কো-অর্ডিনেট টা মি. পার্কেরের খুব কাছে এনে ফেললো। কিন্তু ওর জানা ছিল না যে নিগারের পথচলা মি. পার্কারের গতিপথের সমন্তরাল নয়। ও জানবেই বা কিভাবে। এসব কাজ তো আসলে ভি-ওয়ানের । ভি-ওয়ান উপস্থিত থাকলে এ ভুলটা হয়তো বা হতো না। কিন্তুই যা হবার তা তো হয়েই গেল। নিগার ম্যাথ ক্লাব থেকে বাড়ি ফিরবার পথ ঠিকই ধরেছিল। রাস্তা পেরুতে যাবে যখন এমন সময় দেখে চোখের সামনে বিশাল ভ্যান গাড়ি। কোন সাড়া নেই শব্দ নেই, হঠাৎই যেন গাড়িটার উদয়। কোথা হতে এলো, কেনই বা এলো। এই নির্জন রাস্তা ধরে কোথায় যাবে সে? কোন শব্দই তো পেল না। বিশাল গাড়িটার স্টিয়ারিং হুইলে বসা চালকের চোখ দুটোও বিস্ফারিত। একি! এমন খালি একটা রাস্তায় ছোট্ট একটা মেয়ে এলো কোথা হতে? ব্র্যাডফোর্ড প্লেইসে তো সে ছাড়া আজকাল আর কেউই থাকে না। প্রতিবেশীরাও নেই যে তাদের ছেলেমেয়েদের আনাগোনা থাকবে। তাহলে এই মেয়েটি কে যে কিনা এত নিশ্চিন্ত মনে রাস্তা পার হচ্ছে দিক বিদিক খেয়াল না করেই। রাস্তার লাল বাতিটাও তো খেয়াল করছে না। না কি ও দেখতেই পায় নি। হঠাৎই তাই জোরে ব্রেক কষে ভ্যান থামানোর চেষ্টা করলেন মি. পার্কার। ভ্যানের ধাক্কায় পথচারী মেয়েটি ছিটকে পড়েছে একটু দূরে। মি. পার্কার ড্রাইভিং সিট থেকে নামলেন। ভয়ে কাঁপছে তার শরীর। ত্রিশ বছরের চালক হিসেবে একটি ভুলও করেন নি তিনি একবারের জন্য। কিন্তু আজ কি হলো? কিভাবে হলো এ ভুল? তার পারদর্শীতার সকল গর্ব এক নিমেষেই যেন শেষ হয়ে গেল। পুলিশও চলে এসেছে এর মাঝে। মি. পার্কার এগিয়ে গেলেন শায়িত পথচারীর নিথর দেহটির কাছে। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছেন না। এ যে দেখতে হুবুহু তার ভাতিঝি নিগারের মত। নাকি নিগারকেই দেখছেন। কিন্তু ও এখানে আসবে কি করে? ও থাকে সুদূর মন্ট্রিয়লে। মাসের শেষের উইকেন্ডের আরো দিন চারেক বাকী। তারপর ও আসবে। তাহলে এ নিশ্চয়ই চোখের ভুল। আসলে নিগারকে খুব বেশী ভালবাসেন বলেই হয়তো বা সবার মাঝেই মি. পার্কার তাকে  খুঁজে পান। আতঙ্কে বুঝি তাই পথচারী মেয়েটিকেও তার একমাত্র ভাইঝি ভেবে ভুল হচ্ছে। প্রচন্ড শকে তিনি নির্বাক। কিছুই ভাবতে পারছেন না। মাথাটা বড্ড ঘুরছে। দাঁড়াতেও পারছেন না। আশপাশের শব্দগুলো খুব ক্ষীণ হয়ে আসছে। পুলিশের লোকগুলো বলছে ওনাকে ধরো। অজ্ঞান হয়ে গেছে। নিয়ে চল ঐ কাছের ক্লিনিকে।

অনাকাংখিত এই ঘটনায় মি. পার্কার এর পর হতে দীর্ঘকাল যাবত মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত। কথা বলেন না। নির্বাক চেয়ে থাকেন। ডাক্তার তাকে দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা দিয়েছেন।  বহুদিনের সহকর্মীরা আসেন ওনাকে দেখতে। সবার মাঝে উনি তার প্রিয় মুখটিকে খুঁজে বেড়ান। অপেক্ষা করেন তার আদরের ভাইঝি আসবে বলে। কিন্তু নিগার তো আসে না। তার প্রাণপ্রিয় ভাইঝি তো তাকে আসে না দেখতে । নিশ্চয়ই মাসের শেষের উইকেন্ডের এখনো কিছু দেরী। আর কিছুদিন পরেই হয়তো বা নিগার আসবে।
...........

দীপার প্রেম

 তারিখঃ ৪ঠা এপ্রিল ২০০২ স্থানঃ লেকচার হল, দ্বিতীয়তলা  ডিউটি করবে দীপা আর সুমন  সময়ঃ রাত আটটা থেকে ১২টা পর্যন্ত  অর্থাৎ এই চার ঘন্টায় লেকচ...