Showing posts with label মোহনা. Show all posts
Showing posts with label মোহনা. Show all posts

Friday, June 11, 2010

মোহনা

 

১

জুলাই ৭, ২০০৬

আজ সকালেই এরিক এসে পৌঁছেছে। তার আগমন ২২ লক্ষ আলোকবর্ষ দূর থেকে। দৈহিক গঠণের দিক দিয়ে এই পৃথিবী নামক গ্রহের হোমো স্যাপিয়েন্স নামক প্রজাতির সাথে মিল রেখেই সে এখানে পদচারণা করবে। এতে সবার সাথে মিশে যেতেও সুবিধা হবে। এ সবের তার প্রয়োজন ছিলনা। তার মিশন সাক্সেসফুল করার জন্য কিছুরই প্রয়োজন ছিলনা। তারপরও ভাবলো... মন্দ কি! যদি কিছুক্ষণ এদের মতন হয়ে থাকা যায় , নাহয় থাকলামই। আর মোহনাও তেমন ভয় পাবেনা। আতঙ্কিত হবে না। মোহনার সাথে কথাবার্তা বলার জন্যও অন্তত এই অবয়বেরর প্রয়োজন আছে। তাই এত আয়োজন।

মোহনা বেশ কিছুদিন ধরেই অসুস্থ। ওর শরীরের রক্তকণিকাগুলো ভেঙে ভেঙে একাকার হয়ে যাচ্ছে। বুঝি তার শেষ সময় উপস্থিত। খুব বাঁচতে ইচ্ছে ছিল তার। কিন্তু অসুখটা এত দেরীতে ধরা পড়েছে যে আর কোন চিকিতসাই সম্ভব নয়। তারপরও দু’ দু’বার কেমোথেরাপি দেয়া হয়েছে। আরো বাকী চারটি। ছয়টি কেমোথেরাপির ধকল সইতে পারবে বলে অন্তত সে মনে করে না। পরিবারের সকলেই এখন বলছে  দেশের বাইরে  কোথাও নিয়ে যেতে। কিন্তু অসুস্থতা বাড়ার সাথে সাথে শরীরটা বেশ দুর্বল হয়ে পড়েছে। ভাল মত বসে থাকারও শক্তি যেন দিন দিন লোপ পাচ্ছে। ওর ইচ্ছে করে না আর চোখ মেলে তাকাতে, তার চির চেনা পরিচিত আশপাশ দেখতে। খুব যেন ক্লান্তি। সারা রাজ্যের ক্লান্তি যেন এক হয়ে জড়ো হয়েছে আজ। 

জুলাইয়ের ৭ তারিখ আজ। তারিখটা বেশ মজার। সাত সাত। সালটাও ২০০৭ হলে আরো ভাল হতো। কিন্তু ২০০৭ এর সাত সাতের সমারোহ মোহনার আর বুঝি  দেখা হবে না। সামনের বছরের এইদিন তো দূরে থাক সামনের মাসের ৭ তারিখ, ও পার করতে পারবে কিনা সন্দেহ। তারপরও সংখ্যার খেলা তাকে পুলকিত করে। এত ক্লান্ত শরীরে চিন্তার যেন কোন কমতি নেই। মনটা যেন ছুটে বেড়ায় দেশ থেকে দেশান্তরে। আপন মনের ভাবনাগুলো খুব দ্রুত গতিতে এগোয় কিন্তু শরীরটা আর মানছে না। ধীর পদক্ষেপে যে ক্ষয়ের শুরু হয়েছে আজ হতে পাঁচ বছর আগে তার পরিণতি শুধুমাত্র শেষ হয়ে যাওয়া। হায়রে জীবন! মোহনা তন্দ্রার ঘোরেই যেন হেসে ফেলে।

-মোহনা।

কে ডাকে? চোখ খুলবার সাধ্যি নেই।

খুব কষ্ট করে চোখ মেলে চাইলো। সুন্দর সুপুরুষ একজন ডক্টর সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। আগে তাকে কখনো দেখেনি। আজ নতুন এলো কি? খুব কষ্ট  করে অস্ফুট স্বরে শুধু একটি শব্দই উচ্চারণ করতে পারলো,

-জ্বী?

কন্ঠস্বর অপরিচিত। ব্যক্তিটিও অপরিচিত। কে উনি? মোহনা জানে না । হাসপাতালে কত ডক্টরই তো আছেন। তাদের একজন কেউ হবে। সাদা অ্যাপ্রনে ভীষণ সুন্দর দেখাচ্ছে ওনাকে। যেন সাক্ষাত দেবদূত। কি সুন্দর চেহারা, স্নেহ মাখানো কন্ঠস্বর। চোখ দুটো অসম্ভব নীল, ভীষণ স্বচ্ছ। কি তীক্ষ্ণ সে চোখের দৃষ্টি। ডক্টর মাথা ঝুঁকিয়ে বললেন, 

-কেমন আছো তুমি? আজ কেমন আছো? 

মোহনার বড্ড ক্লান্তি। শব্দ দিয়ে কথা তৈরী করতে পারলেও তা বোঝাবার মতো শক্তি কোথায়? শুধু একটা শব্দই খুব অস্পষ্ট করে বলে ফেললো, 

-কষ্ট। খুব কষ্ট।

আবারো সেই স্নেহ মাখানো কন্ঠ। 

-আমি এরিক। এরিক স্টিফেনসন। আজই এসেছি। আজ জুলাইয়ের ৭ তারিখ। তোমায় সুস্থ করে দিতে। তুমি সুস্থ হয়ে যাবে খুব শিগগিরি।

কথাগুলো শুনে মোহনা হেসে ফেললো কিঞ্চিত। এত চেষ্টার পরও চিকিতসা যখন সফল হচ্ছে না তখন এসকল কথার কোন অর্থ হয় না। কিছু বলতে ইচ্ছে করলো না। কিছু ভাবতেও ইচ্ছে করলো না এ বিষয়ে। কিন্তু আবারো সেই কন্ঠস্বর।

-মোহনা, একবার তাকাও। দেখ আমাকে। আমি এরিক। তোমাদের পৃথিবীর  সময়কাল অনুযায়ী আজ ভোর পাঁচটায় আমি এসেছি। সাল ২০০৬, তারিখ ৭ই জুলাই। তোমায় সুস্থ করবার জন্যই আমার আগমন। এখন বাজে সকাল ১১ টা।এই পাঁচ ঘন্টার গল্প শুনবে? কত কাজই যে করলাম।

মোহনার কেমন জানি লাগছে। কেউ কথা বললে বা পাশে এসে দাঁড়ালে তার খুব ভাল লাগে কিন্তু সে যে আর আগের মতো প্রানোচ্ছ্বল হয়ে কথা বলে উঠতে পারেনা, হাসতে পারে না, অবাকও হতে পারেনা। বেশির ভাগ সময়ই কেটে যায় শরীরের সকল সঞ্চিত শক্তি একসাথ করতে। তারপরও কথা আসে না মুখে। মনে যে কতকিছু জমে আছে বলার জন্য। ডক্টর আবারো বলে উঠলেন,

-জানো  মোহনা, আজ সকালে তোমাদের সময় ভোর পাঁচটায় আমি আসলাম, তোমাদের মতন হলাম। তোমার ইউনিটে আসবার জন্য চলে যেতে হলো ৩০ বছর পিছনে, যখন  এই হাসপাতালে চিকিতসক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেয়া হচ্ছিল। সে সময় তো আর আমি এখানে ছিলাম না যে তখন নিয়োগপ্রাপ্ত হয়ে ত্রিশ বছর চাকুরী জীবন অতিবাহিত করে এই পদে অধিষ্ঠিত হবো এবং তোমার তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্ব পালন করবো। তাই এই ঘন্টা পাঁচেকের মধ্যেই সবকিছু সেরে ফেলতে হলো। যেমন ধরো, সেই ত্রিশ বছর আগের সময় প্রবাহে প্রবেশ করা, চিকিতসক হিসেবে যোগদান ও নিয়োগপত্র পাওয়া এবং এই হাসপাতালের সাথে  যুক্ত হওয়া। কাজটা শেষ হতেই সময়কে আমি ২০০৬-এ এগিয়ে নিয়ে এসেছি। সবাই এখন জানে আমি এ হাসপাতালের একজন বর্ষীয়ান চিকিতসক। আমি যেন গত ত্রিশ বছর ধরেই ওদের সাথে আছি। অথচ এই ত্রিশ বছরের ঘটনা প্রবাহে আমার নিজেকে অন্তর্ভুক্ত করতে সময় লেগেছে মাত্র পাঁচ ঘন্টা আগে, সময়ের মেট্রিক্সকে সংকুচিত করেই কাজটি করতে হয়েছে। কিন্তু যে কাউকে জিজ্ঞেস করো, হাসপাতালের সবাই বলবে আমি এখানকার সবচেয়ে পুরানা ডক্টর। ঐ যে দেখ, নার্সরা আসছেন। ওনারা তোমায় কেমোথেরাপি দিবেন। এবার আমি তাদেরে আজ একটু বাধা দেব। বলবো আমায় একটু সময় দিতে। কেমোথেরাপি চললে চলুক। কিন্তু তোমায় বিশেষভাবে পর্যবেক্ষনের জন্য আমি আজ এখানেই উপস্থিত থাকবো। তোমায় সুস্থ করতে আমার জন্য কিছুক্ষণ সময়ই যথেষ্ট।

নার্সরা ঘরে এতক্ষণে প্রবেশ করেছেন। সম্ভাষণ জানালেন ডক্টর স্টিফেনসনকে। আজ এ রোগীর তৃতীয় দফা কেমোথেরাপি প্রয়োগের দিন। গত কয়েকদিন ধরেই মোহনাকে নিয়ে সবাই একটু বেশ চিন্তিত। মেয়েটির ১৫/১৬ বছর বয়স হবে। এত তাড়াতাড়ি একটা জীবন প্রদীপ যে চোখের সামনে নিভে যাবে ভাবতে খারাপ লাগে সবারই। কিন্তু অপারগ এই চিকিতসা বিজ্ঞান। ক্যান্সারের শেষ পর্যায়ে মেয়েটি উপস্থিত। চিকিতসা বিজ্ঞান ওর ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ব্যর্থ। ওকে বাঁচানোর সাধ্যি কারোরই নেই। কোথাও নেই। মোহনার  শরীরের রক্ত কণিকাগুলো ভেঙে ভেঙে শেষ হয়ে যাচ্ছে।ও দিন দিন মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আজ তাই ডক্টর সাহেব এসেছেন মোহনাকে দেখতে। কিছু করার যদিও নেই ওনার। ছুটিতে যাবার আগে সকল রোগীদের সাথে সাক্ষাত করবার ইচ্ছে হয়েছে বলেই হয়তো বা মোহনার কাছে তার আগমন।

২

জুলাই, ৮, ২০০৬,

সময় সকাল ১১ টা  ৩০ মিনিট। সকালটা আজ যেন খুব সুন্দর। ঝলমলে রোদ বাইরে।

মোহনা চোখ  মেলেছে। খুব স্পষ্ট না হলেও এতটুকু মনে করতে পারছে যে গতকাল যেন এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা হয়েছে তার। আর তখন  থেকেই বেশ ভাল বোধ করছে সে। সমস্ত ক্লান্তি যেন এক নিমেষে উধাও। 

কেন এত ভাল লাগছে আজ, এতদিন পরে? সে জানে না। গতকাল নার্সরা চলে যাওয়ার পর ওখানকার উপস্থিত ডক্টর তকে বলছিলেন অনেক কিছু। মোহনা শুধু শুনে গিয়েছে। ২২ লক্ষ আলোকবর্ষ দূরের এক গ্রহ থেকে আগত তিনি এই পৃথিবীতে একজন টাইম  ট্র্যাভেলার। সময়ের দিক থেকে, প্রযুক্তির দিক থেকে পৃথিবীর চেয়ে তারা তিন হাজার বছর এগুনো। তাই ক্যন্সারের মত ভয়ানক অসুখও সারাতে তাদের বেশ একটা বেগ পেতে হয়না। তিনি জেনেছেন মোহনার কথা বহু দূর থেকে । এও জেনেছেন মোহনার এখন এই পৃথিবী ছেড়ে যাবার সময় হয়নি। ছুটে এসেছেন তাই মোহনাকে বাঁচাবার জন্য এই পৃথিবীতে।

মোহনার এইটুকু মনে আছে যে ওনার হাত থেকে তখন সাদা দীপ্তময় আভা বেরুচ্ছিল যখন উনি তার হাতখানি বেশ কিছুক্ষণ রেখেছিলেন মোহনার কপালে। তারপর থেকে যেন ওর অসুখটা  উধাও হয়ে গেছে। উঠে বসতে ইচ্ছে করছে। হাঁটতে ইচ্ছে করছে। স্বপ্ন নয় তো? ডক্টরকে জিজ্ঞেস করবে সুযোগ পেলেই।

কিন্তু মোহনাকে যে মেডিকেল টিম সার্বক্ষণিক দেখছে তারার  ব্লাড রিপোর্ট নিয়ে বেশ খানিকটা বিভ্রান্ত আজ। এ যেন অবিশ্বাস্য! মোহনার রিপোর্টে ক্যান্সারের চিহ্নমাত্র নেই। কিন্তু কিভাবে তা সম্ভব? আর তাই যদি হয় তাহলে এতদিন ধরে কিসের ভিত্তিতে তারা ক্যন্সারের চিকিতসা চালালেন? নাহ্‌ এ হতে পারে না। পূর্বের রিপোর্টগুলো আবার দেখতে হবে। মোহনার ফাইলটি নিয়ে একে একে সবগুলো  পাতা উল্টালেন টিমের সকলেই। রক্ত কণিকা গুলো ভেঙে যাবার লক্ষণ এতে সুস্পষ্ট। তাহলে সবকিছু   হঠাতই পালটে গেল কিভাবে? মোহনার যে আর কোন চিকিতসারই প্রয়োজন নেই। ও যে অসুস্থ ছিল তার কোন ছাপই নেই তার রিপোর্টে।  এ সত্যিই  ব্যাখ্যাতীত। ডক্টর স্টিফেনসনকে দেখাতে হবে।  কিন্তু উনি তো গতকালই চলে গেছেন ছুটিতে। 

মোহনা চলে যাবে কাল সকালে, কিন্তু যাবার আগে ডক্টরের সাথে দেখা করতে মন চাইছে ওর। ভবিষ্যতের সময় থেকে আগত ওই দূর নক্ষত্রের বাসিন্দা বলে যে কল্প কাহিনীর বর্ণনা করেছিলেন আর মোহনার কপালে হাত রেখে সারা ঘরময় তীব্র সাদা আলোর বিকিরণে নিমিষেই যিনি সকল রোগ থেকে তাকে মুক্ত করে দিইয়েছিলেন তা কি স্বপ্ন ছিল নাকি সত্যি ছিল?  

৩

জুলাই ১০, ২০০৬

সকাল হতেই টিপ টিপ বৃষ্টি পড়ছে।  কাল হাসপাতাল থেকে চলে আসার সময় থেকেই দিনটা মেঘলা। চারদিকে কেমন যেন গুমোট ভাব। প্রকৃতি যেন কারো চলে যাওয়ার বেদনায় ভারাক্রান্ত। একটু ঢালু পথ পেরিয়ে হাসপাতাল চত্বর থেকে মিনিট দশেক হেঁটে গেলাই ডক্টরস বাংলো। মোহনা এসে দাঁড়িয়েছে বাংলোর সামনে। গেইটের দারোয়ান সদর দরজা খুলে দিলে মোহনা বললো, ডক্টর এরিক স্টিফেন্সনের সাথে দেখা করতে চায় সে।  দারোয়ান নিস্পলক, ভাবলেশহীন, নিরুত্তর। মোহনা ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। এতগুলো কথা বলার পরও লোকটি যেন তার জায়গা থেকে নড়ছে না। কিন্তু সঠিক ভাবে উত্তরও দিচ্ছে না যে ডাক্তার সাহেবের সাথে দেখা করা যাবে কি না। ধৈর্য্যহারা মোহনা দারোয়ানকে পাশ কাটিয়ে ভিতরে প্রবেশ করলো। উঠোন পেরিয়ে টানা বারান্দা। কিছু চেয়ার পাতা ওখানে। চারিদিকে কি প্রচন্ড নীরবতা। বাড়িতে কি আর কেউ নেই? মোহনা জিজ্ঞেস করতেই পেছন থেকে দারোয়ানের কন্ঠস্বর শুনতে পেল। চকিতে ফিরে তাকালো। এ, কি শুনছে সে? গতকাল থেকে ডাক্তার সাহেবের ছুটিতে যাবার কথা। তার আগের রাতে ডিউটি সেরে যথারীতি রাত দশটায় বাড়ী ফিরবেন বলে ফোনে জানালেও ডক্টর  স্টিফেনসন এখন অবধি বাড়ি ফিরেন নি। কেউ জানে না ওনার কেন এই হঠাত নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়া।       

................

দীপার প্রেম

 তারিখঃ ৪ঠা এপ্রিল ২০০২ স্থানঃ লেকচার হল, দ্বিতীয়তলা  ডিউটি করবে দীপা আর সুমন  সময়ঃ রাত আটটা থেকে ১২টা পর্যন্ত  অর্থাৎ এই চার ঘন্টায় লেকচ...