Saturday, November 13, 2010

অনুভবে

 


টনি, রুম্পা, জনি আজ ঠিক করেছে সারাদিন কাটাবে ওদের ট্রি হাউজে। বাড়ির পিছনে বিশাল বাগান জুড়ে অনেক গাছ গাছালীর সমাহার। ওখানেই ওদের তিন ভাইবোনের জন্য বানানো হয়েছে ট্রি-হাউজ। প্রায় দোতলার সমান উচ্চতা হবে। সেই উঁচুতে ১০ ফুট বাই ৮ ফুট একটি ঘর। ঘরটির জানালা দিয়ে বাইরে তাকালেই শহরের নামকরা একটি চিড়িয়াখানা। আসলে চিড়িয়াখানার পাশেই বাড়ি বানাবার জন্য প্লটটি  পেয়েছিলেন ওদের বাবা সেই কবে। বাড়ি বানিয়ে কিছুটা খালি জমি রেখেছিলেন পেছনে। ছোট্ট একটা লন। কিছু গাছপালা। নির্জন নিরিবিলি কোলাহলমুক্ত এ জায়গায় প্রতি সন্ধ্যায় বসে চা খেতে আর বাচ্চাদের খেলা দেখতে দেখতে বাবা মায়ের সময় কেটে যায় ভীষণ আনন্দে। বাচ্চাদের আবদারে তাদের জন্য ছোট্ট ট্রি হাউজ গড়ে দিয়েছেন তারা। 

সপ্তাহের ছুটির সারাটা দিন, পারলে সারা রাতও তারা খেলতে খেলতে পার করে দেয় ট্রি-হাউজে। অন্যদিন সকালে ঘুম না ভাঙ্গলেও ছুটির দিনে ঐ ট্রি-হাউজে খেলার নেশায় খুব ভোরে ওদের ঘুম ভেঙ্গে যায়। একটুও ইচ্ছে করে না বেলা পর্যন্ত ঘুমুতে। সকাল হলেই দে ছুট। 

আজও তাই করলো ওরা। সপ্তাহের এই ছুটির দিনটা সবচেয়ে বেশী আকাংখিত। তাই  সকাল হতেই তিনজন ওখানে। ওদের সব খেলনাগুলো ট্রিহাউজেই রাখা থাকে। তিনজনের মধ্যে টনি ১০, রুম্পা ৮, জনি ৫ বছর। বড় হয়ে টনির এখন অনেক দায়িত্ব। নিজে খেলা করলেও ছোট ভাইবোনকেও দেখাও তার কর্তব্য। ওদের খেয়াল রাখা আবার নিজের খেলা দুটোই তাকে করতে হয়। 

বলা নেই কওয়া নেই হঠাতই চোখে পড়লো রুম্পা একটু ঝুঁকে জানালার বাইরে কি যেন দেখছে। টনি কাছে এগিয়ে এসে পাশে দাঁড়াতেই দেখলো মনোরম এক দৃশ্য। ওদের ট্রি হাউজের ঘরটি যেন আকৃতিতে বিশাল হয়ে মিশে গেছে ওই দূরের একটি ঝর্ণার সাথে। তাই একটুও দ্বিধা না করে ওরা এক পা দু’পা করে এগিয়ে গেল সেই ঝর্ণার দিকে। ঝর্ণার পাশে চোখ জুড়ানো ফুলের বাগান আর  তার মাঝে অনেকগুলো প্রজাপতি খেলা করছে। এ যেন একদম রূপকথার স্বপ্নপুরী। আরেকটু সামনে এগুলো। বাহ কি সুন্দর! সামনে সবুজ ঘাসে আবৃত বিশাল মাঠ আর তারই প্রান্তে ঢালু রাস্তা মিশেছে ঐ দূরের ছোট্ট একটি গ্রামে। মাঠটা পার হয়ে দুজনে দৌড়ে চলে এলো রাস্তায়। তারপর ওই রাস্তা বেয়ে আরো সামনে ঐ ছোট্ট গ্রামে। ওখানে যে আরো বিস্ময় ! তাদেরই মতন অনেক ছোট ছোট ছেলেমেয়ে খেলা করছে। টনি আর রুম্পার তর সইলো না। এক দৌড়ে ওদের কাছে যেয়ে হাজির। বললো, ‘আমাদের খেলতে নেবে তোমাদের সাথে?’

শিশুগুলো ভীষণ মিশুক। তাই এক কথায় ওদেরকে বন্ধু করে নিল। 

প্রথমেই ওরা জিজ্ঞেস করলো রুম্পা আর টনিকে, ‘তোমরাও কি আমাদের মতন এখানে এসেছ?’ 

আমাদের মতন মানে? 

ওরা কিছুই বুঝে উঠতে না পারায় বাচ্চাগুলো হাসতে হাসতে দে ছুট। ওরাও সাথে সাথে।  তাদের সঙ্গে অনেক খেলাধূলোয় আর অনেক মজায় মেতে উঠলো। কিন্তু এত খেলেও যেন বিকেল গড়িয়ে আর সন্ধ্যে নামছে না। বাবা মা বাসায় যাবার জন্য আর ডাকছে না ভেবে টনি  আর রুম্পার বেশ ভাল লাগলো। এমনটাই তো ওরা চেয়েছিল এতদিন। কিন্তু কখনই তা হয়নি। আর আজ যেন যা চাওয়া তাই সাথে সাথে পেয়ে যাওয়া। বাবা মায়ের শাসন নেই। সময়ের বালাই নেই। স্কুলে যাবার তাড়া নেই। খেলা আর খেলা। 

ওদের নতুন বন্ধুদের নামগুলো বেশ মজার। সংখ্যা দিয়ে। যেমন ডি-ওয়ান, ডি-টু, ডি-থ্রি,  ডি১১. আর এভাবেই ওই নতুন ১১ জন বন্ধু ওদের কাছে নিজেরদের পরিচয় দিল। টনিকে নতুন নাম না দিয়ে বললো, ‘থাক, তোমাদের নাম আপাতত টনি আর রুম্পাই থাক।’ 

সাথে সাথে দু’ ভাইবোনের প্রতিবাদ। ‘কেন? আমাদের নাম  যদি তোমাদের নামের মতো সংখ্যা দিয়ে হয় তাহলে মন্দ কি,আমাদের নামও তোমাদের মতন করে দাও।’ কিন্তু টনির কথায় ওরা রাজী হলো না। বলল, ‘এখন নয়। পরে।’ 

রুম্পা বলল, ‘কেন এখন সম্ভব নয়? আমরা তো তোমাদের বন্ধু, তাইনা?’ 

শিশুরা খলখল করে হেসে উঠলো। শুরু হল হুড়োহুড়ি, ছুটোছুটি। বরফ পানি, হাইড অ্যান্ড সিক, আরো কত খেলা। 

খেলা শেষে পিপাসার্ত হয়ে এলো ঝর্ণার ধারে। পানির স্বাদ এত অন্যরকম যেন পানি তো নয় এ এক প্রশান্তির আবেশ। সব ক্লান্তি এক নিমেষে উধাও । তারপর আবার খেলা।   

আশপাশের ফুলের গাছগুলোতে অনেক ফুল ফুটে আছে। নানা রঙের প্রজাপতি উড়ছে কিন্তু ফুলগুলোর নাম না জানা। পাখিরা ডালে ডালে খেলা করছে। রুম্পা ভাবলো এই বাগানটার ছবি আঁকলে কেমন হয়। রাস্তার ধারে বসে মাটিতে আঁচড় কেটে নিজের কল্পনা মিশিয়ে এঁকে ফেললো ছোট্ট একটি হরিণ ছানারও ছবি। ওর এত্ত সুন্দর ছবি আঁকা দেখে সবাই জানতে চাইলো এটা কি? রুম্পা বললো, ‘আমদের বাড়ির পাশে মস্তবড় একটা চিড়িয়াখানা আছে। সেখানে খাঁচায় খাঁচায় বন্দী থাকে অনেক পশু পাখি। তারমাঝে ওর সবচেয়ে প্রিয় হলো চিত্রা হরিণ। এটা তারই ছবি।’ ওর কথা শুনে ওর বন্ধুরা বেশ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো, ‘তোমাদের পৃথিবী এত্ত সুন্দর?’

এমন প্রশ্ন শুনে টনি বেশ অবাক হয়েই বললো, ‘পৃথিবীটা কি আমাদের একার, তোমাদের না?’ ওরা সব্বাই একসঙ্গে বলে উঠলো, ‘না তো! পৃথিবী থেকে তো তোমরা দুজনেই চলে এসেছো বেশ কিছুক্ষণ আগে।’ টনি আর রুম্পা ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না পৃথিবী থেকে ওরা কোথাই বা চলে  এসেছে? খুব উতসুক হয়ে জানতে চাইলে ওরা বুঝিয়ে বললো এখন তাদের অন্য এক মাত্রার জগতে আগমন ঘটেছে। এ জগতটি হলো পৃথিবী থেকে আবার পরের জন্মে ফিরে যাবার বিরতিস্থান। হতে পারে সেই পরের জন্ম হবে পৃথিবীতে বা সেই গ্রহ ছেড়ে অন্য কোন গ্রহে। কিন্তু যেখানেই হোক না কেন প্রতিটি শিশুদের পৃথিবীর জীবন শেষ করে নতুন জীবনচক্র শুরু করবার অন্তর্বর্তীকালীন সময়টুকু এ জগতেই কাটাতে হয়। আর সেখানেই টনি আর রুম্পার অনুপ্রবেশ ঘটেছে তাদের অজান্তেই। পৃথিবী ছেড়ে তারা চলে এসেছে অনেক আগেই। কিন্তু কিভাবে এলো  এ প্রশ্ন করতেই ডি-ওয়ান বললো,

--তোমরা যখন ট্রি হাউজে খেলা করছিলে, তখন কি দেখেছিলে সুন্দর একটি বাগানের দৃশ্য? রুম্পা আর টনি সাথে সাথে বলে উঠলো, ‘নিশ্চয়ই। আর তা দেখেই তো আমরা হাঁটতে হাঁটতে প্রবেশ করলাম ঐ সুন্দর বাগানে।’ সবচেয়ে ফুটফুটে বন্ধুটি তখন বললো, ‘তারপর কি হলো জানো? যেইনা তোমারা ওই বাগানে প্রবেশ করলে সেই সময় তোমাদের ছোট ভাইটি দেখল তোমরা দু’জন ট্রি হাউজের জানালা দিয়ে নীচে ধপ্পাস। বাড়ির সকলে এসে দেখলো তোমাদের নিথর দেহ মাটিতে পড়ে আছে। তোমরা আর  বেঁচে নেই।’      

--তার মানে ? আমরা কি ওখানে মারা গিয়েছি।

-- মারা যাওনি। ডাইমেনশানের একটু পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু অতসত কি পৃথিবীর মানুষেরা বোঝে? একদমই না । কেঁদেকেটে বুক ভাসিয়ে সারাটা জীবন নষ্ট করে দেয়। ভেবে নেয় প্রাণহীন হয়ে যাওয়া মানে অজানায় হারিয়ে যাওয়া। তারাও তোমাদের নিয়ে এমনটিই  ভাবছেন এখন। তারা জানতেও পারছেন না যে তোমরা এই সুন্দর বাগানে খেলা করছো।’  

টনি আর রুম্পা বেশ অবাক স্বরেই বললো, ‘আমাদের এই সুন্দর বাগানে আসবার কথা কি বাবা মাকে জানানো যায়না?’ 

ডি-ওয়ান বললো, ‘মনে হয় না । কারণ তারা আছে মাত্র ত্রি-মাত্রিক জগতে আর আমরা যে তার থেকেও অনেক বেশী মাত্রায় আছি।  তারা আমাদের দেখতেও পাবে না, শুনতেও পাবে না, বুঝতেও পারবে না।’ 

রুম্পার  সাথে সাথে প্রশ্ন, ‘তাহলে আমরা এখন কত ডাইমেনশানে আছি?’ 

সব নতুন বন্ধুরা নিজেকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখিয়ে বললো, ‘ডাইমেনশন-১৩ তে। আর তাই ১৩ এর নীচে যতগুলো মাত্রার জগত আছে সব আমরা দেখতে পাই, অনুভব করতে পাই, কিন্তু তারা তা পারেনা। তোমরা যেমন ত্রি- মাত্রার ঘনক, দ্বি-মাত্রার তল আর একক মাত্রার বিন্দুর সংজ্ঞা জানো আমরাও তেমনি আরো বহুমাত্রিক  জ্যামিতিক আকারের সংজ্ঞা জানি যা অত ক্ষুদ্র পরিসীমায় তোমাদের ঐ পৃথিবী থেকে জানা সম্ভবই নয়।’

টনি বেশ অবাক হয়েই জানতে চাইলো, ‘আর  ১৩ ডাইমেনশানের চেয়ে  বেশী মাত্রা  যদি হয় তা কি তোমরা দেখতে পাও?’ 

ডি-ওয়ান বললো, ‘এই অন্তর্বর্তীকালীন জগতটির মাত্রা ১৩ বলেই এর বেশী মাত্রা আমাদের  জন্য অনুভবের উর্ধ্বে।পরবর্তীতে অন্য কোন গ্রহে অন্য কোন অবস্থায় কত মাত্রায় নতুন জীবনচক্র লাভ করবো তাও আমরা জানি না। কিন্তু এইটুকু নিশ্চিত যে আমাদের থেকে বেশী ডাইমেনশান সম্পন্ন সৃষ্টি এই মহাজগতেই আছে। তারা আমাদের ইন্দ্রিয়গোচর না হলেও আমরা তাদের পর্যবেক্ষণ ও তত্ত্বাবধানে সব সময়ই আছি।’

টনি আর রুম্পা আজ যেন অনেক কিছু ভাবতে পারছে নতুন করে। তারা নিমেষেই বুঝে ফেলেছে উচ্চ মাত্রার সৃষ্টি কিভাবে নিম্ন মাত্রাদের ওপর নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। কিন্তু সর্বোচ্চ কত মাত্রায় এই মহাজগত সৃষ্ট বলতে গিয়ে ডি-ওয়ান একটু থমকে গেল। ভেবে বললো, ‘হয়তো বা অসীম মাত্রার।’

টনি বললো, ‘অসীম কেন হবে, একটা সংখ্যা তো হবে।’ 

ডি-সেভেন বেশ উতসাহের সাথে এগিয়ে এলো। বেশ সবজান্তার ভঙ্গীতে বললো, 

--সংখ্যার হিসেবও তো এক এক মাত্রার জগতে এক এক রকম । পৃথিবীর মানুষদের হিসেব ০ থেকে ৯ পর্যন্ত। বাইনারি হিসেব ০ থেকে ১ পর্যন্ত। সুতরাং এ সংখ্যাতত্ত্বের কি শেষ আছে? এখানেও হিসেব অন্যরকম। কিন্তু তোমরা তো সদ্য এসেছো পৃথিবী থেকে তাই বোঝার সুবিধার্থে আমাদের নামগুলো ১ থেকে ১১ পর্যন্ত রেখেছি কারণ আমরা যে ১১ জন।

--কিন্তু তোমাদের কোন নাম থাকবে না সে জন্য?

--নামতো একটা বিশেষ্য। আমাদেরকে কি বিশেষভাবে বিশেষায়িত করার প্রয়োজন আছে?

--তাহলে কি আমাদের কোন বৈশিষ্ট্যও থাকবে না?

--প্রয়োজন কি আছে? আমরা যে পৃথিবীর মানুষদের দেয়া সকল বিশেষণের উর্ধ্বে।

--বাহ তাহলে তো সংগাই পালটে যাবে জীবনের।

--জীবনের নয়, অবস্থার। তোমরা দুজনেই এখন ট্রানজিশান অবস্থায় আছ। নতুন জীবন বাছাইয়ের সময় প্যারামিটারগুলো  আবার নির্ধারণ করে নেবে।    

-- তাহলে এবার যদি এ জগত থেকে আবার পৃথিবীতে ফিরে যেতে চাই, পারবো কি? 

-- না। কারণ এই সকাল থেকে যতক্ষণ পর্যন্ত এখানে খেলা করছো ইতিমধ্যে পৃথিবীতে তোমাদের অন্তেষ্ট্যিক্রিয়া সম্পন্ন হয়ে দুই যুগ পার হয়ে গিয়েছে। তোমাদেরকে ধারণকারী দেহ, মাটির সাথে মিশে বিলীন হয়ে গেছে। ওখানে তোমাদের পার্থিব কোন অস্তিত্ব অবশিষ্ট নেই। 

এই সময়টুকুতে দুই যুগ পার হয়ে গেছে ভেবে টনি আর রুম্পা হেসে ফেললো। কিন্তু ওদের কেন বয়স বাড়ছে না এ জগতে ? সময় কেন এগুচ্ছে না আর, কেন থেমে আছে? নিশ্চয়ই পৃথিবীর থ্রি-ডি স্পেসের দেহে আর আবদ্ধ নেই বলেই হয়তো বা। তাই বুড়ো হবার ও বালাই নেই। টনি বললো, ‘তাহলে আমরা এখন কি?’

--তোমরা এখন সত্তা। দেহবিহীন। এটাই তোমাদের পরিচয়। যদি তোমরা অন্য কোন গ্রহে যেয়ে মানুষের দেহ ধারণ কর তাহলে মানুষ হবে। অথবা অন্য কিছু, যা তোমার মন চাইবে। রুম্পা সাথে সাথে বললো, ‘আমি পৃথিবীতে গেলে ডলফিন হব আর সারাদিন জলের ভেতর খেলা করবো।’ শুনে ডি-১১  বললো, ‘জানো আমি তিনজন্ম আগে ডলফিন ছিলাম। তারপর ঘাস ফড়িং তারপর খরগোশ। সবগুলোই পৃথিবীর থ্রি-ডি স্পেসে।’   

টনির ইচ্ছে হচ্ছে একটু পৃথিবী থেকে ঘুরে আসতে। সাথে রুম্পাও প্রস্তুত। যেই ভাবা সেই কাজ। প্রথমেই হাজির হলো ওদের প্রিয় ট্রি-হাউজে। মনে হল যেন বহুদিন এখানে কেউ আসেনি। খেলনাগুলো ধুলোর পুরু আস্তরণে ঢাকা। জানালার পাশ দিয়ে চিড়িয়াখানাটা আর নেই। ওখানে হাউজিং সোসাইটির বিশাল অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিং গড়ে উঠেছে। সেই সকালেই না ওরা বেরুলো ওই ঝর্ণা দেখতে আর তারই মাঝে এত্ত পরিবর্তন। তর সইলো না ওদের বাবা মাকে দেখার। বাড়ির ভেতর প্রবেশ করতেই দেখলো লিভিং রুমে বসে রয়েছে একজন বৃদ্ধ আর একজন বৃদ্ধা। নিশ্চুপ তারা। কারা এরা? 

রুম্পা টনি কাছে যেয়ে দাঁড়ালেও টের পেলেন না তারা। ওরা চিনতে পেরেছে। ওনারা তাদেরই বাবা মা। সত্যিই সময়  বয়ে গেছে দুই যুগ। তাদের বার্ধক্যের ছাপ এবার তারই নিশ্চিত প্রমাণ। কাছে যেয়ে তাদের ডাকলেও তারা শুনতে পেলেন না। দেখতেও পেলেন না। কি করা যায় ভাবছে টনি। আর তখনই নীরবতা ভেঙে বৃদ্ধা তার স্বামীকে বললেন,

--আজ যেন ছেলেমেয়ে দুটোর কথা খুব বেশী বেশী মনে পড়ছে। মনে হচ্ছে ওরা যেন আমার খুব কাছেই আছে। 

রুম্পা টনি তো হেসেই সারা। ওরা তো ওদের মায়ের সামনেই দাঁড়ানো। কেন যে মা দেখতে পাচ্ছে না। আসলে ডাইমেনশান পরিবর্তনের এই এক ঝামেলা। একবার যদি পরিবর্তন ঘটে তাহলেই তাকে বলা হয় অন্তর্ধান। রুম্পা টনিরও এখন এই ডাইমেনশান থেকে অন্তর্ধান ঘটেছে। তাই তারা দৃষ্টিগোচর হচ্ছে না। যতই কাছ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকুক আর মা কে জড়িয়ে বসে থাকুকনা কেন কিছুই তাদের দৃষ্টিগোচর হবে না। 

বৃদ্ধা আবারো বলে উঠলেন, ‘জানো, বাচ্চা দুটো যেন আমার খুব আছে এসে বসেছে।’ বৃদ্ধ ভদ্রলোক এবার ধীর গলায় বললেন, ‘একটা অদ্ভুত ব্যপার কি জানো, তুমি যখন এমনটি ভাবছিলে, আমার মনেও ঠিক এমন চিন্তা এসেছে। আমরা যেন একই সময়ে একই কথা ভেবে চলছি নিজেদেরই অজান্তে।’ 

টনি একটু হতাশ। কিছুতেই বোঝাতে পারছে না যে সে তাদের বড্ড কাছে। রুম্পা এবার টনিকে সান্ত্বনা দিয়ে বললো, ‘আমরা অন্য জগতে, অন্য মাত্রায় আছি তো কি হয়েছে, আমাদের দেখতে না পেলেই বা কি।  দেখা বা শোনা তো চোখ আর কানের কাজ। তারা তো ঠিকই আমাদের অস্তিত্ব টের পেয়েছেন। পাননি?’ 

টনি মাথা নেড়ে সায় দিলেও চোখে তার প্রশ্ন, কিন্তু কিভাবে? 

অনুভবে। 

রুম্পার ছোট্ট একটি উত্তর যেন এবার নতুন বোধের জন্ম দিল।

অনুভবে। 

ঠিক তাই। 

অনুভবে। 

সত্তার অনুভবে।

সত্তা সবসময় অপরিবর্তনশীল  – তা যে কোন অবস্থায় হোক বা যে কোন মাত্রায়। 

তাই বাস্তব বিবর্জিত বলে মানব মস্তিষ্ক যখন প্রাকৃতিক ঘটনাবলীকে তুচ্ছ বিবেচনা করে, মানব মন তখনও তার সত্তার মাঝে সে সত্যকে অনুভব করে।          

Monday, August 16, 2010

নিকষ কালো


মারফির ঘুমটা ভেঙে গেল প্রচন্ড এক বিস্ফোরণের শব্দে। টেবিল ক্লকে সময়টা দেখবার চেষ্টা করলো। রাত ১ টা বেজে ৪৫ মিনিট। জানালার পর্দা সরিয়ে বাইরে চোখ রাখলো। ইচ্ছে করছে বাইরে যাবার, কিন্তু সে উপায়ও নেই। ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহ। প্রচন্ড শীতে আবৃত হয়ে আছে টরন্টোর কাছে মিসিসাগা শহরটি। কিন্তু বাইরে কি হলো ভেবে আর ইচ্ছে করছে না ঘরে বসে থাকতে। বাইরে বেরুতেই হবে। শীতের জ্যাকেটটা গায়ে দিয়ে মারফি বেরিয়ে এলো ওর অ্যাপার্টমেন্ট থেকে। দূরের নিকষ কালো আকাশে রক্তিম আভা। দু’ব্লক পরেই রয়েছে একটা নির্মানাধীন বাড়ি। সেখানেই কি কিছু হলো? এই শীতে তুষার পাড়িয়ে মারফি হাজির হলো ৪১০ নম্বর ব্র্যাম্পটন হাইওয়ের কাছে। বিধ্বস্ত হয়েছে পুরো বাড়ীটা। নির্মানাধীন বলে লোকজন কেউই ছিল না এতরাতে। তাই হতাহতের সংখ্যা শূন্য। কিন্তু ১ মিলিয়ন ডলারের ক্ষয়ক্ষতির কারণ নির্ধারণে যদি পুলিশরা সফল না হয়  তাহলে এরকম অগ্নিকান্ডের শঙ্কা দিন দিন বৃদ্ধিই পাবে।

তারিখ ২২শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৯

একটি ডকুমান্ট ওপেন করলেন সার্জেন্ট ক্রিস হ্যারি।সময় রাত ২ টা বেজে ৩৫ মিনিট। ফাইলটির প্রথম লাইনে লিখলেন দুটি শব্দ।

‘সন্দেহজনক অগ্নিকান্ড’

দ্বিতীয় লাইনে, ‘স্থান ৪১০ নম্বর ব্র্যাম্পটন’

তৃতীয় লাইনে কিছুই পেলেন না লেখার মত। কারণ কোন তথ্যই তার দল উদ্ধার করতে পারেনি এ যাবত। কিছুক্ষণ ভেবে উইন্ডোজ বন্ধ করতে গিয়ে দেখলেন আরেকটি ফোল্ডার।  নাম ‘উইপিপেগ।’ এ ফোল্ডারটিও শূন্য। কোন তথ্যই এ পর্যন্ত জোগাড় হয়নি। উইনিপেগের ১৪০০ বাসিন্দা ২০০৯ এর গোড়ার দিকে তাদের রাতের আকাশে সিগার আকৃতির শব্দবিহীন একটি স্পেসক্রাফট উড়ে যেতে দেখেছিল। শুধু মানুষের চোখে নয়, র্যা ডারেও এর অস্তিত্ব ধরা পড়েছিল। কিন্তু তদন্তের ফলাফল শূন্য। খানিকটা আনমনা হয়েই সার্জেন্ট হ্যারি উইন্ডোটি বন্ধ করে দিলেন। পাশে রাখা ব্রিফকেসটি তুলে নিয়ে কাঁচের দরোজা ঠেলে বেরিয়ে এলেন অফিস থেকে। আজ আন্ডার গ্রাউন্ড ট্রেনে বাড়ি ফিরবেন। গাড়ীতে ড্রাইভ করে বাড়ি ফিরতে সময় লাগে দু’ঘন্টা আর ট্রেনে যেতে বিশ মিনিট। 

শহরের শেষ প্রান্তে তার বাড়ী। এই মিনিট বিশেক দূরন্ত ট্রেনে বসে থাকতে গিয়ে মাঝে মাঝে হাঁপিয়ে উঠেন তিনি। তখন পত্রিকা বা বই হয় তার সঙ্গী। কিন্তু আজ কিছুতেই মন বসছে না বইতে। একটার পর একটা আনসলভড মিস্ট্রি আর ভাল লাগছে না। মাথায় হাত রেখে জানালার কাছে হেলান দিয়ে বসে এসব কথা  ভাবতে ভাবতে হঠাতই জানালার কাঁচ দিয়ে বাইরে তাকালেন। মাটির নীচের সুড়ঙ্গ ধরে নিকষ কালো অন্ধকারে পাতাল রেল ছুটে চলছে এক অসম্ভব গতিতে। আজ যেন ট্রেনের গতিটা একটু বেশি মাত্রায় অস্বাভাবিক ঠেকছে।

ট্রেন চালক জন স্টুয়ার্ট স্থির মনোনিবেশে ট্রেনের গতি নিয়ন্ত্রণ করছেন। নাইট শিফটে তিনি এ কাজের সাথে যুক্ত আছে দীর্ঘ ২১ বছর ধরে। প্রতিদিন একই রুটিন । শহরের একপ্রান্ত থেকে যাত্রী অপর প্রান্তে পৌঁছে দেয়া। ঘড়িতে সময় দেখলেন রাত ২ টা বেজে ২০ মিনিট। সামনে তাকালেন আবার। কিন্তু কেমন যেন মনে হল, যেন সামনের অন্ধকারটুকু আর তার কাছে প্রতীয়মান হচ্ছে না। এ যেন আরো অনেক বেশী কালোয় ছেয়ে যাওয়া এক অচেনা অন্ধকার।  এত নিকষ কালো আধাঁর তিনি আগে কখনো দেখেন নি। সুড়ঙ্গ পথের বাতিগুলো কি সব নিভে গেল নাকি? কিন্তু কেন তা হবে? পাওয়ার ফেইলিওর এর তো প্রশ্নই আসেনা। তাহলে তো ট্রেন চলাই থেমে যেত। জানালা খুলে আশপাশ বুঝার চেষ্টা করলেন। খুব হালকা মনে হচ্ছে নিজেকে। অনেকটা যেন ওজনহীন। চলার পথে লোহার পাতের সাথে চাকার সংঘর্ষে যে বিকট শব্দ সৃষ্টি হয় তাও যেন শোনা যাচ্ছে না। অথচ ট্রেন তো  চলছে অবিরাম গতিতে। আর মাত্র তিন মিনিট। তারপরই যাত্রী নামিয়ে ফিরতি পথে রওনা হবেন জন। আর বাড়ির পথে পা বাড়াবেন সার্জেন্ট হ্যারি। এত রাতে উনি ছাড়া কোন যাত্রীও নেই এই ট্রেনে। 

কর্মক্লান্ত বেলা পেরিয়ে এই বাড়ি ফেরার মুহূর্তটি ভীষণ ভাবে উপভোগ করেন সার্জেন্ট। মাত্র তো আর তিনটি মিনিট। আবারো ঘড়ি দেখলেন তিনি। সময়টা পেরুতে চাইছে না কেন? এমন মনে হচ্ছে কেন, যেন সময় আজ মান করে তার চলা থামিয়ে ঠাঁয় বসে আছে। আজ যেন সে কিছুতেই এগুবে না। ঘড়ির দিকে আবারো চাইলেন তিনি। কাঁটা যেন হঠতাই থেমে গেছে। বেশ খানিক্ষণ আগে দেখলেন রাত ২ টা বেজে ২০ মিনিট। এখনও তাই? ভুল দেখেননি তো? কিন্তু তা কি করে হয়? বিশ মিনিটেই বাড়ি পৌঁছে যান তিনি। আর সে সময় তো এতক্ষণে পারও হয়ে গেছে। তাহলে ঘড়ি কি সময়ের হিসেব আর করতে পারছে না, নাকি তার হিসেবে ভুল হচ্ছে? বড্ড যেন দীর্ঘ মনে হচ্ছে আজকের এ যাত্রা। কোন ভাবেই যেন পথ আর শেষ হতে চাইছে না। নিজেকে অসম্ভব হালকা ঠেকছে নিজের কাছে। জানালার কাঁচ দিয়ে বাইরে তাকালেন আবার। ট্রেনটা যেন উন্মত্ত গতিতে ছুটে চলছে। কিন্তু কোথায়, কোন গন্তব্যে? তার বাড়ীর স্টপেজই তো শেষ স্টপেজ। এই স্টপেজ ছাড়িয়ে ট্রেন তো আর এগুবে না। ফেরত আসবে মিসিসাগা শহরে। বিরামহীন এ ছুটে চলা তাহলে কেন?  কোন উদ্দেশে ? এমারজেন্সী বাটনে চাপ দিলেন ট্রেন থামানোর সংকেত দিয়ে। সময় আরো কিছুক্ষণ পার হলো কিন্তু থামার নাম নেই। সংকেত দেখে গতি কমানোর চেষ্টা করলেন ট্রেন চালক। সামনে তাকালেন। নিকষ কালো আধাঁরে অসংখ্য ঘন কালো বুদবুদ ভেসে বেড়াচ্ছে তার চারিদিকে। অদৃশ্য এক শক্তি যেন টেনে নিয়ে যাচ্ছে মোহনীয় আকর্ষণে আরো গহীনে তার নিজের ভেতরে সীমাহীন ঘন অন্ধকারে। যতই সামনে এগুচ্ছে ততই যেন ট্রেনের গতি বেড়ে চলছে। অথচ পথ যে শেষ হচ্ছে না। চালক জন স্টুয়ার্ট  চমকে উঠলেন ব্যপারটা খেয়াল করে। তিনি তার ট্রেন সহ কি মিশে গেছেন অন্য কোন জগতে নাকি প্রবেশ করেছেন ব্ল্যাকহোলের অজানা সুড়ঙ্গপথে? এর কেন্দ্রের সীমাহীন আকর্ষণে এ যাত্রার গতিরোধ তো তাহলে অসম্ভব ব্যপার। কিন্তু কি ভাবে এমন হল?  কার ইশারায়? হায় ইশ্বর!

মোবাইলে কল করলেন একমাত্র যাত্রী সার্জেন্ট হ্যারিকে। কিন্তু কি আশ্চর্য, বৈদ্যুতিক তরঙ্গগুলো যেন তাদের অবস্থান থেকে নড়তে চাইছে না। ফোনটা বাজছে না। অথচ ট্রেন থামাবার সংকেত তো ঠিকই জ্বলে উঠেছে। উপায় না দেখে জন পেছনের দরজা দিয়ে যাত্রী কক্ষে প্রবেশ করলেন। কক্ষটি বেশ প্রশস্ত হওয়া সত্ত্বেও আজ কেন জানি একে আকারে লম্বাটে আর সরু দেখাচ্ছে। সার্জেন্টকে দেখে একটু অবাকই হলেন তিনি। আজ তাকে এতটাই লম্বা দেখাচ্ছে যেন মনে হচ্ছে তার দীর্ঘ অবয়ব ট্রেনের ছাদ ছুঁয়ে ফেলবে। ব্ল্যাকহোলের তীব্র মহাকর্ষীয় বলের চাপে বস্তু তার আকৃতিও হারাবে এমন কথা তিনি কোথায় যেন পড়েছিলেন। শুধু আকৃতি হারানোই নয়, বস্তু প্রচন্ড চাপে পিষ্ট অবশেষে বিলীন হয়ে যাবে অসীমতায়। কিন্তু এগুলো তো বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব যা শুধু বইয়ের মাঝে গাণিতিক সমীকরণে সীমাবদ্ধ থাকে। বাস্তবে কি হয়? বস্তু আসলেই কি আকার পরিবর্তন করতে করতে চিপসে যেতে পারে? এ প্রশ্ন ট্রেনের একমাত্র যাত্রী সার্জেন্ট হ্যারির মনেও উদয় হল ঠিক একই সময় যখন কিনা ট্রেন চালক জন স্টুয়ার্ট তা সামনে এসে দাঁড়ালেন। এই মাঝারী গড়নের গোলগাল  লোকটি কেমন যেন চিপসেটে হয়ে তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু এমন মনে হবেই বা কেন। নির্ঘাত দৃষ্টিভ্রম। দুজনেরই দৃষ্টিভ্রমে দেখতে পাওয়া দুজনের প্রায় বিলীন অবস্থা আজ বাস্তব হয়ে যে তাদের সামনে ঠাঁয় দাঁড়িয়েছে তা তারা ভাববার দুঃসাহসও করলেন না। অথচ দুজনের অস্তিত্ব , অনুভূতি এখনই যে হারাবার দ্বারপ্রান্তে। এ উপলব্ধির আগেই কৃষ্ণগহবরে নিপতিত তাদের ট্রেনটি পাতলা কাগজের মতন এক সমতল বস্তুতে পরিণত হলো এবং আরো সংকুচিত হয়ে কুঁকড়ে বিন্দুসম আকৃতি ধারণ করে কৃষ্ণগহবরের রাহুগ্রাসে নিপতিত হলো। শহরের সকলে পরেরদিন আরেকটি খবরে বিস্মিত হলো। আর তা হলো-গতকালের রহস্যময় অগ্নিকান্ডের পর তদন্তকারী পুলশ অফিসার নিরুদ্দেশ । শুধু তাই নয়। নাইট শিফটের ট্রেন চালক জন স্টুয়ার্ট ও তার  যাত্রীগামী পাতাল রেলেরও হদিস পাওয়া যাচ্ছে না।

সকালের খবর পড়ে মারফির মন কিছুটা খারাপ হয়ে গেল। ৪১০ নম্বর ব্র্যাম্পটনের অগ্নিকান্ডের সূত্রপাত নির্ণয় অসম্ভব হতে পারেনা। জানার সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে কিন্তু কারণ নিশ্চয়ই আছে। আর সেই পুলিশ অফিসারের নিরেদ্দেশ হয়ে যাওয়া তদন্তের ঠিক পরপরেই-এ যেন আবছা একটা যোগসূত্র তৈরী করে ফেলেছে। যারাই অগ্নিকান্ড ঘটাক না কেন তারাই চায় না এর তদন্ত হোক। তাই পাতাল রাস্তা ধরে ছুটে চলা ট্রেনটিকে উধাও করে দিয়েই তারা যান সর্বান্তকরণে নিশ্চিত হয়েছে এ তদন্তের সীমারেখা টেনে দিতে। আর সেই পাতাল রেলের  সুড়ঙ্গপথে প্রবেশের এক অদম্য ইচ্ছা এখন মারফিকে পেয়ে বসেছে। যাবে সে ওখানে যেভাবেই হোক। না হয় প্রয়োজন হলে রেল ইঞ্জিনিয়ারের ছদ্মবেশ ধরেই প্রবেশ করবে ওই প্রবেশ নিষেধ এলাকায়। এসব আকাশ পাতাল চিন্তা করতে করতেই মারফি তার গাড়ীটার স্টার্ট অন্‌ করলো। 

গাড়ীটা স্টার্ট নিতে গিয়েই থেমে গেল। আবারো চেষ্টা করলো। সবই ঠিক ঠাক কিন্তু তারপরও গাড়ী যেন কিছুতেই স্টার্ট নিচ্ছে না। যেন আজ তার মন চাইছে না মারফিকে নিয়ে অজানা গন্তব্যের উদ্দেশ্যে যাত্রা করতে। বেশ কিছুক্ষণ চেষ্টা করে মারফি সিদ্ধান্ত নিল পায়ে হেঁটেই যাবে ঐ স্পটে যেখানে পাতাল সুড়ঙ্গ পথের সূচনা হয়েছে। গাড়ীর দরজাটা লক্‌ করে ঘুরে দাঁড়াতেই হোঁচট খেল কিসের যেন একটা হ্যাচকা টানে। ওর কোটের আস্তিনটা দরজার ভেতরে আটকে আছে। এমন কেন হচ্ছে? যেন তার প্রিয় মন্টিকার্লো- ২০০৩  তাকে আটকে রেখে আজ বারণ করছে কোথাও যেতে। মারফি হেসে ফেলল নিজ মনে। গাড়ী কি মানুষ নাকি যে বাধা দেবে, নিষেধ করবে, বারণ  না শুনলে জামার আস্তিন ধরে আটকানোর চেষ্টা করবে। নিশ্চয়ই নয় । অথচ প্রাণহীন জড় মন্টিকার্লোর দেহের অভ্যন্তরস্থ পরমাণুগুলো তো স্পন্দনহীণ নয়। সে স্পন্দনে অনুরণন আছে। সেই অনুরণনে যদি তৈরী হয় অনুভূতিসম্পন্ন বোধ তার প্রভাব কি অনস্বীকার্য? আর এ বোধ  যদি পরিচালিত হয় প্রকৃতির নির্দেশে তাহলে নির্দেশ গ্রহণ ও পালন করবার মতো ক্ষমতাও প্রতিটি বস্তুকণার রয়েছে তা সে জড়ই হোক আর জীবই হোক। তাই বুঝি মন্টিকার্লো তার অনুভূতি দিয়ে আজ ঠিকই আঁচ করতে পেরেছে কিছু একটা ঘটবার। মারফির যাত্রাপথকে রোহিত করছে তাই বারবার, বেশ কয়েকভাবেই। কিন্তু মারফি কি সেই সংকেত অনুধাবন করতে পেরেছে, যাতে ছিল মারফিকে বলা অনেকগুলো কথা । যেখানে বলা হয়েছে পাতাল রেলপথের অস্বাভাবিকতার কথা, যা কিনা সেই সুড়ঙ্গকে ঠেলে ক্ষণিকের জন্য হলেও যুক্ত করে ফেলে ছায়াপথের কেন্দ্র বরাবর ঠিকানাবিহীন অন্য কোন ডাইমেনশানে, যে কিনা নিমেষে শুষে নেয় সবকিছুর অস্তিত্ব, হরণ করে সকল অনুভব । যেখানে অচকিতে স্থানান্তর ঘটে যায় অন্য কোন জগতের সাথে, যেখানে আজই  প্রবেশ করেছেন সার্জেন্ট ক্রিস হ্যারি তার কাজের রহস্য কিনারা না করতে পেরেই। যেখানে প্রবেশ করেছেন ট্রেন চালক জন স্টুয়ার্ট কিছু না জেনেই। যে জগতে নেই আলো, শুধুই অন্ধকার। যে জগত নিকষ কালো, জীবনের ওপার। যেখান থেকে আর ফেরা যাবে না। কিন্তু তারা জানবেও না তাদের এ যাত্রা অন্তহীন, সময়ের উর্ধ্বে। আজ মারফিও যাবে সেখানে । প্রবেশ করবে সেই জগতে। প্রকৃতি বোধহয় তা চাইছে না, তাই বাধা দিয়েছে বারবার । কিন্তু মারফির তীব্র কৌতুহল তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে সেই অজানা উদ্দেশে তারই অজান্তে।

   শেষ।


Friday, June 11, 2010

মোহনা

 

জুলাই ৭, ২০০৬

আজ সকালেই এরিক এসে পৌঁছেছে। তার আগমন ২২ লক্ষ আলোকবর্ষ দূর থেকে। দৈহিক গঠণের দিক দিয়ে এই পৃথিবী নামক গ্রহের হোমো স্যাপিয়েন্স নামক প্রজাতির সাথে মিল রেখেই সে এখানে পদচারণা করবে। এতে সবার সাথে মিশে যেতেও সুবিধা হবে। এ সবের তার প্রয়োজন ছিলনা। তার মিশন সাক্সেসফুল করার জন্য কিছুরই প্রয়োজন ছিলনা। তারপরও ভাবলো... মন্দ কি! যদি কিছুক্ষণ এদের মতন হয়ে থাকা যায় , নাহয় থাকলামই। আর মোহনাও তেমন ভয় পাবেনা। আতঙ্কিত হবে না। মোহনার সাথে কথাবার্তা বলার জন্যও অন্তত এই অবয়বেরর প্রয়োজন আছে। তাই এত আয়োজন।

মোহনা বেশ কিছুদিন ধরেই অসুস্থ। ওর শরীরের রক্তকণিকাগুলো ভেঙে ভেঙে একাকার হয়ে যাচ্ছে। বুঝি তার শেষ সময় উপস্থিত। খুব বাঁচতে ইচ্ছে ছিল তার। কিন্তু অসুখটা এত দেরীতে ধরা পড়েছে যে আর কোন চিকিতসাই সম্ভব নয়। তারপরও দু’ দু’বার কেমোথেরাপি দেয়া হয়েছে। আরো বাকী চারটি। ছয়টি কেমোথেরাপির ধকল সইতে পারবে বলে অন্তত সে মনে করে না। পরিবারের সকলেই এখন বলছে  দেশের বাইরে  কোথাও নিয়ে যেতে। কিন্তু অসুস্থতা বাড়ার সাথে সাথে শরীরটা বেশ দুর্বল হয়ে পড়েছে। ভাল মত বসে থাকারও শক্তি যেন দিন দিন লোপ পাচ্ছে। ওর ইচ্ছে করে না আর চোখ মেলে তাকাতে, তার চির চেনা পরিচিত আশপাশ দেখতে। খুব যেন ক্লান্তি। সারা রাজ্যের ক্লান্তি যেন এক হয়ে জড়ো হয়েছে আজ। 

জুলাইয়ের ৭ তারিখ আজ। তারিখটা বেশ মজার। সাত সাত। সালটাও ২০০৭ হলে আরো ভাল হতো। কিন্তু ২০০৭ এর সাত সাতের সমারোহ মোহনার আর বুঝি  দেখা হবে না। সামনের বছরের এইদিন তো দূরে থাক সামনের মাসের ৭ তারিখ, ও পার করতে পারবে কিনা সন্দেহ। তারপরও সংখ্যার খেলা তাকে পুলকিত করে। এত ক্লান্ত শরীরে চিন্তার যেন কোন কমতি নেই। মনটা যেন ছুটে বেড়ায় দেশ থেকে দেশান্তরে। আপন মনের ভাবনাগুলো খুব দ্রুত গতিতে এগোয় কিন্তু শরীরটা আর মানছে না। ধীর পদক্ষেপে যে ক্ষয়ের শুরু হয়েছে আজ হতে পাঁচ বছর আগে তার পরিণতি শুধুমাত্র শেষ হয়ে যাওয়া। হায়রে জীবন! মোহনা তন্দ্রার ঘোরেই যেন হেসে ফেলে।

-মোহনা।

কে ডাকে? চোখ খুলবার সাধ্যি নেই।

খুব কষ্ট করে চোখ মেলে চাইলো। সুন্দর সুপুরুষ একজন ডক্টর সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। আগে তাকে কখনো দেখেনি। আজ নতুন এলো কি? খুব কষ্ট  করে অস্ফুট স্বরে শুধু একটি শব্দই উচ্চারণ করতে পারলো,

-জ্বী?

কন্ঠস্বর অপরিচিত। ব্যক্তিটিও অপরিচিত। কে উনি? মোহনা জানে না । হাসপাতালে কত ডক্টরই তো আছেন। তাদের একজন কেউ হবে। সাদা অ্যাপ্রনে ভীষণ সুন্দর দেখাচ্ছে ওনাকে। যেন সাক্ষাত দেবদূত। কি সুন্দর চেহারা, স্নেহ মাখানো কন্ঠস্বর। চোখ দুটো অসম্ভব নীল, ভীষণ স্বচ্ছ। কি তীক্ষ্ণ সে চোখের দৃষ্টি। ডক্টর মাথা ঝুঁকিয়ে বললেন, 

-কেমন আছো তুমি? আজ কেমন আছো? 

মোহনার বড্ড ক্লান্তি। শব্দ দিয়ে কথা তৈরী করতে পারলেও তা বোঝাবার মতো শক্তি কোথায়? শুধু একটা শব্দই খুব অস্পষ্ট করে বলে ফেললো, 

-কষ্ট। খুব কষ্ট।

আবারো সেই স্নেহ মাখানো কন্ঠ। 

-আমি এরিক। এরিক স্টিফেনসন। আজই এসেছি। আজ জুলাইয়ের ৭ তারিখ। তোমায় সুস্থ করে দিতে। তুমি সুস্থ হয়ে যাবে খুব শিগগিরি।

কথাগুলো শুনে মোহনা হেসে ফেললো কিঞ্চিত। এত চেষ্টার পরও চিকিতসা যখন সফল হচ্ছে না তখন এসকল কথার কোন অর্থ হয় না। কিছু বলতে ইচ্ছে করলো না। কিছু ভাবতেও ইচ্ছে করলো না এ বিষয়ে। কিন্তু আবারো সেই কন্ঠস্বর।

-মোহনা, একবার তাকাও। দেখ আমাকে। আমি এরিক। তোমাদের পৃথিবীর  সময়কাল অনুযায়ী আজ ভোর পাঁচটায় আমি এসেছি। সাল ২০০৬, তারিখ ৭ই জুলাই। তোমায় সুস্থ করবার জন্যই আমার আগমন। এখন বাজে সকাল ১১ টা।এই পাঁচ ঘন্টার গল্প শুনবে? কত কাজই যে করলাম।

মোহনার কেমন জানি লাগছে। কেউ কথা বললে বা পাশে এসে দাঁড়ালে তার খুব ভাল লাগে কিন্তু সে যে আর আগের মতো প্রানোচ্ছ্বল হয়ে কথা বলে উঠতে পারেনা, হাসতে পারে না, অবাকও হতে পারেনা। বেশির ভাগ সময়ই কেটে যায় শরীরের সকল সঞ্চিত শক্তি একসাথ করতে। তারপরও কথা আসে না মুখে। মনে যে কতকিছু জমে আছে বলার জন্য। ডক্টর আবারো বলে উঠলেন,

-জানো  মোহনা, আজ সকালে তোমাদের সময় ভোর পাঁচটায় আমি আসলাম, তোমাদের মতন হলাম। তোমার ইউনিটে আসবার জন্য চলে যেতে হলো ৩০ বছর পিছনে, যখন  এই হাসপাতালে চিকিতসক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেয়া হচ্ছিল। সে সময় তো আর আমি এখানে ছিলাম না যে তখন নিয়োগপ্রাপ্ত হয়ে ত্রিশ বছর চাকুরী জীবন অতিবাহিত করে এই পদে অধিষ্ঠিত হবো এবং তোমার তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্ব পালন করবো। তাই এই ঘন্টা পাঁচেকের মধ্যেই সবকিছু সেরে ফেলতে হলো। যেমন ধরো, সেই ত্রিশ বছর আগের সময় প্রবাহে প্রবেশ করা, চিকিতসক হিসেবে যোগদান ও নিয়োগপত্র পাওয়া এবং এই হাসপাতালের সাথে  যুক্ত হওয়া। কাজটা শেষ হতেই সময়কে আমি ২০০৬-এ এগিয়ে নিয়ে এসেছি। সবাই এখন জানে আমি এ হাসপাতালের একজন বর্ষীয়ান চিকিতসক। আমি যেন গত ত্রিশ বছর ধরেই ওদের সাথে আছি। অথচ এই ত্রিশ বছরের ঘটনা প্রবাহে আমার নিজেকে অন্তর্ভুক্ত করতে সময় লেগেছে মাত্র পাঁচ ঘন্টা আগে, সময়ের মেট্রিক্সকে সংকুচিত করেই কাজটি করতে হয়েছে। কিন্তু যে কাউকে জিজ্ঞেস করো, হাসপাতালের সবাই বলবে আমি এখানকার সবচেয়ে পুরানা ডক্টর। ঐ যে দেখ, নার্সরা আসছেন। ওনারা তোমায় কেমোথেরাপি দিবেন। এবার আমি তাদেরে আজ একটু বাধা দেব। বলবো আমায় একটু সময় দিতে। কেমোথেরাপি চললে চলুক। কিন্তু তোমায় বিশেষভাবে পর্যবেক্ষনের জন্য আমি আজ এখানেই উপস্থিত থাকবো। তোমায় সুস্থ করতে আমার জন্য কিছুক্ষণ সময়ই যথেষ্ট।

নার্সরা ঘরে এতক্ষণে প্রবেশ করেছেন। সম্ভাষণ জানালেন ডক্টর স্টিফেনসনকে। আজ এ রোগীর তৃতীয় দফা কেমোথেরাপি প্রয়োগের দিন। গত কয়েকদিন ধরেই মোহনাকে নিয়ে সবাই একটু বেশ চিন্তিত। মেয়েটির ১৫/১৬ বছর বয়স হবে। এত তাড়াতাড়ি একটা জীবন প্রদীপ যে চোখের সামনে নিভে যাবে ভাবতে খারাপ লাগে সবারই। কিন্তু অপারগ এই চিকিতসা বিজ্ঞান। ক্যান্সারের শেষ পর্যায়ে মেয়েটি উপস্থিত। চিকিতসা বিজ্ঞান ওর ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ব্যর্থ। ওকে বাঁচানোর সাধ্যি কারোরই নেই। কোথাও নেই। মোহনার  শরীরের রক্ত কণিকাগুলো ভেঙে ভেঙে শেষ হয়ে যাচ্ছে।ও দিন দিন মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আজ তাই ডক্টর সাহেব এসেছেন মোহনাকে দেখতে। কিছু করার যদিও নেই ওনার। ছুটিতে যাবার আগে সকল রোগীদের সাথে সাক্ষাত করবার ইচ্ছে হয়েছে বলেই হয়তো বা মোহনার কাছে তার আগমন।

জুলাই, ৮, ২০০৬,

সময় সকাল ১১ টা  ৩০ মিনিট। সকালটা আজ যেন খুব সুন্দর। ঝলমলে রোদ বাইরে।

মোহনা চোখ  মেলেছে। খুব স্পষ্ট না হলেও এতটুকু মনে করতে পারছে যে গতকাল যেন এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা হয়েছে তার। আর তখন  থেকেই বেশ ভাল বোধ করছে সে। সমস্ত ক্লান্তি যেন এক নিমেষে উধাও। 

কেন এত ভাল লাগছে আজ, এতদিন পরে? সে জানে না। গতকাল নার্সরা চলে যাওয়ার পর ওখানকার উপস্থিত ডক্টর তকে বলছিলেন অনেক কিছু। মোহনা শুধু শুনে গিয়েছে। ২২ লক্ষ আলোকবর্ষ দূরের এক গ্রহ থেকে আগত তিনি এই পৃথিবীতে একজন টাইম  ট্র্যাভেলার। সময়ের দিক থেকে, প্রযুক্তির দিক থেকে পৃথিবীর চেয়ে তারা তিন হাজার বছর এগুনো। তাই ক্যন্সারের মত ভয়ানক অসুখও সারাতে তাদের বেশ একটা বেগ পেতে হয়না। তিনি জেনেছেন মোহনার কথা বহু দূর থেকে । এও জেনেছেন মোহনার এখন এই পৃথিবী ছেড়ে যাবার সময় হয়নি। ছুটে এসেছেন তাই মোহনাকে বাঁচাবার জন্য এই পৃথিবীতে।

মোহনার এইটুকু মনে আছে যে ওনার হাত থেকে তখন সাদা দীপ্তময় আভা বেরুচ্ছিল যখন উনি তার হাতখানি বেশ কিছুক্ষণ রেখেছিলেন মোহনার কপালে। তারপর থেকে যেন ওর অসুখটা  উধাও হয়ে গেছে। উঠে বসতে ইচ্ছে করছে। হাঁটতে ইচ্ছে করছে। স্বপ্ন নয় তো? ডক্টরকে জিজ্ঞেস করবে সুযোগ পেলেই।

কিন্তু মোহনাকে যে মেডিকেল টিম সার্বক্ষণিক দেখছে তারার  ব্লাড রিপোর্ট নিয়ে বেশ খানিকটা বিভ্রান্ত আজ। এ যেন অবিশ্বাস্য! মোহনার রিপোর্টে ক্যান্সারের চিহ্নমাত্র নেই। কিন্তু কিভাবে তা সম্ভব? আর তাই যদি হয় তাহলে এতদিন ধরে কিসের ভিত্তিতে তারা ক্যন্সারের চিকিতসা চালালেন? নাহ্‌ এ হতে পারে না। পূর্বের রিপোর্টগুলো আবার দেখতে হবে। মোহনার ফাইলটি নিয়ে একে একে সবগুলো  পাতা উল্টালেন টিমের সকলেই। রক্ত কণিকা গুলো ভেঙে যাবার লক্ষণ এতে সুস্পষ্ট। তাহলে সবকিছু   হঠাতই পালটে গেল কিভাবে? মোহনার যে আর কোন চিকিতসারই প্রয়োজন নেই। ও যে অসুস্থ ছিল তার কোন ছাপই নেই তার রিপোর্টে।  এ সত্যিই  ব্যাখ্যাতীত। ডক্টর স্টিফেনসনকে দেখাতে হবে।  কিন্তু উনি তো গতকালই চলে গেছেন ছুটিতে। 

মোহনা চলে যাবে কাল সকালে, কিন্তু যাবার আগে ডক্টরের সাথে দেখা করতে মন চাইছে ওর। ভবিষ্যতের সময় থেকে আগত ওই দূর নক্ষত্রের বাসিন্দা বলে যে কল্প কাহিনীর বর্ণনা করেছিলেন আর মোহনার কপালে হাত রেখে সারা ঘরময় তীব্র সাদা আলোর বিকিরণে নিমিষেই যিনি সকল রোগ থেকে তাকে মুক্ত করে দিইয়েছিলেন তা কি স্বপ্ন ছিল নাকি সত্যি ছিল?  

জুলাই ১০, ২০০৬

সকাল হতেই টিপ টিপ বৃষ্টি পড়ছে।  কাল হাসপাতাল থেকে চলে আসার সময় থেকেই দিনটা মেঘলা। চারদিকে কেমন যেন গুমোট ভাব। প্রকৃতি যেন কারো চলে যাওয়ার বেদনায় ভারাক্রান্ত। একটু ঢালু পথ পেরিয়ে হাসপাতাল চত্বর থেকে মিনিট দশেক হেঁটে গেলাই ডক্টরস বাংলো। মোহনা এসে দাঁড়িয়েছে বাংলোর সামনে। গেইটের দারোয়ান সদর দরজা খুলে দিলে মোহনা বললো, ডক্টর এরিক স্টিফেন্সনের সাথে দেখা করতে চায় সে।  দারোয়ান নিস্পলক, ভাবলেশহীন, নিরুত্তর। মোহনা ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। এতগুলো কথা বলার পরও লোকটি যেন তার জায়গা থেকে নড়ছে না। কিন্তু সঠিক ভাবে উত্তরও দিচ্ছে না যে ডাক্তার সাহেবের সাথে দেখা করা যাবে কি না। ধৈর্য্যহারা মোহনা দারোয়ানকে পাশ কাটিয়ে ভিতরে প্রবেশ করলো। উঠোন পেরিয়ে টানা বারান্দা। কিছু চেয়ার পাতা ওখানে। চারিদিকে কি প্রচন্ড নীরবতা। বাড়িতে কি আর কেউ নেই? মোহনা জিজ্ঞেস করতেই পেছন থেকে দারোয়ানের কন্ঠস্বর শুনতে পেল। চকিতে ফিরে তাকালো। এ, কি শুনছে সে? গতকাল থেকে ডাক্তার সাহেবের ছুটিতে যাবার কথা। তার আগের রাতে ডিউটি সেরে যথারীতি রাত দশটায় বাড়ী ফিরবেন বলে ফোনে জানালেও ডক্টর  স্টিফেনসন এখন অবধি বাড়ি ফিরেন নি। কেউ জানে না ওনার কেন এই হঠাত নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়া।       

................

পথচারী

 পথচারী