Thursday, August 31, 2006

সুমনার কথা

 

সুমনা চিন্তিত। একটু নয়, বেশ খানিকটা। কি ভাবে বলবে  কথাটা ও সৌমেনকে ঠিক  বুঝে উঠতে পারছে না। সৌমেন ওর এত দিনের চেনা এত কাছের। গত ছ’বছর ধরে দু’জনে দু’জনার। এর মাঝে কেন সুমনা সত্যিটুকু আড়াল করে রেখেছিল? বুঝাতে পারবে না ও সৌমেনকে। সুমনা বুঝাতে পারবে না যে এই ছয়টি বছর ওর কাছে ছ’ সেকেন্ড ও নয়। সুমনার অবস্থাটা সৌমেনের তুলনায় যে একটু আলাদা। ওর আগমন যে অন্য এক জগৎ থেকে। মহাবিশ্ব ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ করেই পৃথিবী নামক গ্রহে এসে পড়েছিল সুমনা  পৃথিবীর সময়ের ২০০০ সালে। মহাবিশ্ব পরিভ্রমণের প্রাক্কালে মানব রূপে নয় বরং আলোকজ্জ্বল শক্তিরূপে সে ধাবিত হচ্ছে। মানব দেহের আবদ্ধ খোলস ফেলে ও যখন ভ্রমণ শুরু করে, এই বন্ধনহীন ভ্রমণ আর প্রচন্ড গতিতে চলাচল ওর জন্য কোন বাধাই সৃষ্টি করে না। স্বাধীন, মুক্ত ভাবে ও ঘুরে বেড়াতে পারে। কিন্তু গতি বেশী থাকায়  সময়ের তেমন হিসেব সে আর খুঁজে পায় না। ও টাইম ডায়ালেশনের শিকার। অতি কষ্টে যদি এক এক করে তার ছয় সেকেন্ড ও পার হয়, তাও যেন তার কাছে অনন্ত কাল মনে হয়। কিন্তু পৃথিবী ঘুরে দেখবার জন্য তো এত্ত সময়ের দরকার নেই। এবার তাই সুমনার গন্তব্য অন্য কোন গ্যালাক্সীর কোন এক সৌরজগতের কোন একটি গ্রহে।

সৌমেন সুমনার তুলনায় অপেক্ষাকৃত ধীর গতি সম্পন্ন। তাই টাইম ডায়ালেশন -এর  বালাই নেই ওর কাছে। প্রতিটি মুহূর্ত  দিয়েই ওর সময়ের কাল গড়া, ও  ধাবিত হচ্ছে শুধুমাত্র ভবিষ্যতের দিকে। উলটৌ দিকে নয়। অর্থাৎ  সৌমেন যে পৃথিবী নামক গ্রহের বাসিন্দা সে স্থানে সময়ের পিঠে চড়ে ওরা শুধু ভবিষ্যতের দিকেই এগোয়। ফিরে যেতে পারেনা তাদের অতীতে। তাই অতীত তাদের কাছে শুধুই ফেলে আসা। প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতার কারণেই সৌমেনদের এরকমটি অবস্থা। সুমনারা অমন নয়। সময়ের দিক থেকে তথা প্রযুক্তির দিক থেকে সৌমেনদের থেকে প্রায় দশ হাজার বছর এগিয়ে আছে সুমনাদের জগতের মানুষেরা। ওরা এতটাই উন্নত যে  শুধু পদার্থগত রূপে নয়, শক্তিরূপেও তারা নিজেদের উপস্থাপনায় সক্ষম। সময়ের বাহনে চড়ে ওরা ঘুরে বেড়াতে পারে অতীতে, বর্তমানে, ভবিষ্যতে। এমনকি একই মুহূর্তে অবস্থান করতে পারে তিন কালে। সুমনারা খেলার ছলে ঘুরে বেড়াতে পারে তাদের বাল্যকালে, কৈশোরে, বার্ধক্যে। তাই  তো ওদের মহাপ্রয়াণ বলে কিছু যেন নেই। পৃথিবীর মানুষগুলোর আছে। ঘটনাটিকে ওরা মৃত্যু বলে অভিহিত করে। মনে করে মৃত্যু মানে সমাপ্তি। জীবনের সমাপ্তি। মানুষটি যে বস্তুরূপ হতে শক্তিরূপ লাভ করলো, তা এ পৃথিবীর মানুষ বুঝতে বড়ই নারাজ। বলেও লাভ নেই।  সুমনা জানে, দেহ হতে আত্মার বন্ধনহীন মুক্তিই এনে দিতে পারে মহাবিশ্ব পরিভ্রমণের অপার স্বাধীনতা। কিন্তু এই বন্ধনহীন মুক্তি সৌমেনেদের কাছে যেহেতু ’মৃত্যু’ নামে পরিচিত তাই যখনই কোন শক্তির বিশাল ধাক্কায় দেহ হতে আত্মার মুক্তি ঘটে অমনি সৌমেনরা কেঁদে কেঁটে অস্থির হয়ে পড়ে। ব্যাখ্যা  করে, সচল হৃদপিন্ডের অচলতায় মানুষটির মৃত্যু হয়েছে। উনি ইহলোক ত্যাগ করেছেন, আর ফিরে আসবেন না ওদের কাছে। যদিই বা আসেন তবে তাকে ভূত বলে গণ্য করা হবে। এসব কারণেই সেই  তথাকথিত মৃত ব্যক্তিটি  ইচ্ছে থাকলেও আর ফিরে আসতে পারেন না এই ধরণীতে তার আপনজনের মাঝে। ঘুরে বেড়ান, ওদের মাঝেই অদৃশ্য হয়ে। সুমনা তাই শুধু অবলোকন করে কিছু বলে না। আবারো পুরোনো কথায় ফিরে যেতে হয়, সৌমেনদের সময়টায় ওরা জ্ঞানে বিজ্ঞানে একেবারেই  প্রারম্ভিক পর্যায়ে।  

২ 

সময় ২০০০ সাল, ৩১ শে অগাস্ট। সৌমেন সদ্য কলেজে ভর্তি  হয়েছে। আজ কলেজের প্রথম দিন। আড়াই লক্ষ আলোকবর্ষ দূরের অ্যান্ড্রমিডা গ্যালাক্সী থেকে আগমন ঘটেছে সুমনার।  সাথে আরো দু’জন সঙ্গী।  বাবা, মা আর সন্তানের রূপে বসবাস শুরু করেছে সৌমেনের শহরে। সুমনা কিছুটা শান্ত, মেধাবী, অমায়িক। ওর বাবা, মা দু’জনেই আর্টিস্ট। কলেজের প্রথম দিনে আজ সুমনাই ওর বন্ধু হয়ে গেল । তারপর কলেজের দুইটি বছরের এই স্বপ্নময় দিনগুলো দ্রুতই শেষ হয়ে যায়। তারপর  ইউনিভার্সিটির চারটি বছর। দারুণ মজা, অসম্ভব সব আনন্দ। সুমনা যে সবসময়  ওরই সাথে এই ছয়টি বছর। কিন্তু প্রচন্ড গতিতে ধাবমান বলে সময় যেন সুমনার কাছে এগুতে চায় না। সময়ের অনুভবতা ধীর হয়ে পড়ে, শুরু হয় টাইম ডায়ালেশন। তাই সৌমেনের কাছে একটি  বছর যেমন ৩৬৫ দিনের ২৪ ঘন্টার ৩৬০০ সেকেন্ডের সমাহার, সুমনার  কাছে তা ধীর অনুভূত হয়ে পরিণত হয় মাত্র এক সেকেন্ডে।  পৃথিবীর সময়ের সৌমেনের ৬ টি বছর আজ  সুমনার সময়ের কাছে  হয়ে আছে ৬ টি সেকেন্ড। আর প্রচন্ড গতি সম্পন্ন বলেই এই পৃথিবী দেখবার জন্য   ৬ টি সেকেন্ড যথেষ্ট। পৃথিবীর আনাচে কানাচে ঘুরে এবার তার প্ল্যান অন্য কোন গ্যালাক্সী। গ্রীষ্মের ছুটি কাটাবার জন্য সুমনারা এমনই  গ্যালাক্সী থেকে গ্যালাক্সী ভ্রমণে বের হয়। সৌমেনেদের কাছে এ আরেক অকল্পনীয় ব্যাপার।    

৩ 

সূর্য ঝলমল দিন। সপ্তাহ খানেক হলো গ্রীষ্মের  ছুটিতে সাইবেরিয়া থেকে বেড়াতে এসেছে ১২ টি পরিবার কৃষ্ণ সাগরের তীরে। আজ  ওদের  ছুটি কাটাবার শেষ দিন। ফিরে যাবে যার যার গন্তব্যে। ১২ টি পরিবারের ওরা ৬৫ জন এক সাথে দারুণ সময় কাটিয়েছে।  গ্রীষ্মের  এই সময়টুকুতে এত আনন্দ এত মজা আর কখনো বুঝি এ জীবনে ওদের আসবে না। ঘন্টা তিনেক পরেই ওদের ফ্লাইট। তারপর সত্যিই এ জীবন আর ওদের থাকবে না। বিদ্যুৎ চমকের তীব্র ঝলকানিতে, লক্ষ ভোল্টের আলোর ছটায় প্লেনটি ক্র্যাশ করবে। ভস্মে রূপান্তরিত দেহ গুলো থেকে আত্মার পুরোপুরি মুক্তি ঘটাতে এমন একটি বিশাল বিস্ফোরণেরই প্রয়োজন ছিল। প্রকৃতি তাই-ই ঠিক করে রেখেছে। তারপর ওরা প্রবেশ করবে অনন্তলোকের সীমাহীন সীমানার মাঝে। অনন্তলোক পরিভ্রমণের  মাঝে ফিরেও আসতে পারে ক্ষণিকের জন্য এই কৃষ্ণ সাগরের তীরে ঝিনুক হয়ে। তারপর হয়তোবা ছুটে চলে যাবে শোকাতুর পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের কাছে। কিছুদিন থাকবে ওদের কাছে। বাগানে গোলাপ হয়ে ফুটবে। গোলাপটিকে পরম যত্নে বাগান থেকে তুলে এনে ফুলদানীতে রাখবেন মা। তিনি কি জানবেন প্লেন দুর্ঘটনায় নিহত তার পুত্র এখন তারই ঘরে এসেছে। 

জীবন বড় অদ্ভুত। এরকম মন্তব্যই শুনবে সুমনা সৌমেনের কাছ থেকে যদি এই গল্পটি ও বলে বসে। একেই বলে গল্প বানানো। নয়তো কি?  দুর্ঘটনার আর কি ব্যাখ্যা থাকতে পারে? রাস্তায় চলতে চলতে কারোর কোন চলন্ত যানের সাথে সংঘর্ষ হলে তাকে  বলে সড়ক  দুর্ঘটনা যার কারণ হয়ে দাঁড়ায় ব্যক্তিটির দুর্ভাগ্য। দেহের কোষগুলো স্বাভাবিক কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করলে তাকে বলে ক্যান্সার। এর পরিণতি যদি হয় মৃত্যু তাও শেষে এসে দুর্ভাগ্য বলেই  চিহ্নিত হয়। কিন্তু  চলে যাবার জন্য তো  একটা সময় লাগে একটা ঘটনা লাগে। আজ যে সুমনারও এ পৃথিবী ছেড়ে চলে যাবার দিন। সুমনা কিভাবে বুঝাবে তা সৌমেনকে? সুমনা কিভাবে বলবেঃ সৌমেন, আজ আমি পৃথিবী ছেড়ে চলে যাবো তোমাদের সময়  ভোর ছয়টা বেজে পাঁচ মিনিটে, ৩১ শে অগাস্ট, ২০০৬, প্লিজ এতে কষ্ট পেও না , কারণ ঘটনাটি পূর্ব থেকেই নির্ধারিত।     

৪ 

এবারের অগাস্ট মাসটা দারুণ। খুব গরম পড়ার কথা। কিন্তু ১৫/১৬ তারিখ থেকেই ঝিরঝিরে ঠান্ডা আবেশ। মন চায় শুধু এদিক সেদিক বেড়াতে। সৌমেন ভাবছে ও এবারও সুমনার পরিবারের সাথে বেড়াতে যাবে উত্তরের পাহাড়ী জায়গাগুলো দেখতে। সেদিন কথা প্রসংগে বলেছিলও, অথচ  আশ্চর্য করে দিয়ে সুমনা বলে কিনা, সৌমেনকে এবার ওদের সাথে নেবে না। ভীষণ আঘাত পেয়েছে সৌমেন। কেমন যেন স্বার্থপরের মতন শুনাচ্ছিল সুমনার কথাগুলো। এমনতো কখোনই বলেনি ও। প্রতি গ্রীষ্মে কত জায়গায় না ওরা বেড়িয়েছে। এবার  এমন কি হলো যে সুমনা সরাসরি না বলে বসলো। কষ্ট পেয়েছে সৌমেন , কিন্তু কিছু বলেনি। গত তিন দিন ধরে ই-মেইলেও যোগাযোগ নেই সুমনার সাথে। সৌমেনও চায় না ওদের পারিবারিক গেট টুগেদারে ব্যাঘাত ঘটাতে। শুধু অপেক্ষা করছে ওর ফিরে আসার। জায়গাটি বেড়াবার জন্য সুন্দর হলেও গত দু’বছরে চার চার বার চারটি পরিবারের মৃত্যু ঘটেছে। এবার সুমনারা ওখানেই যাচ্ছে বেড়াতে। সৌমেন মানা করতে চেয়েও কিছু বলেনি। এত কুসংস্কারচ্ছন্ন হলে এই আধুনিক সমাজে সবাই হাস্যকর মনে করবে।  

সুমনাকে বিদায় দেবার সময় নিজের অজান্তেই সৌমেনের এক দীর্ঘশ্বাস এসে পড়লো। সুমনা তার অবাক সুন্দর চোখে অবাক হয়ে সৌমেনের দিকে তাকিয়ে রইলো স্থির কিছুক্ষণ। কি সুন্দর যে সেই অবাক করা দৃষ্টি।  সৌমেনের প্রাণটা ভরে উঠলো। তাহলে আর হাহাকার কেন? বেড়াতে যেতে চাচ্ছে নিজেরা, যাক। চার পাঁচ দিনই তো। এ কয়টা দিন এমন আর কি। এসব চিন্তাই করছে সৌমেন আজ  সকাল থেকে। আনমনা হয়ে চায়ের কাপ হাতে নিয়ে বসে আছে তো আছেই। জানালা দিয়ে ভোরে সূর্য উঠা দেখতে সৌমেন অপেক্ষা করে থাকে। আজ এত অন্যমনস্ক, কখন যে ভোর হয়ে সকাল হয়ে গেছে টেরও পায়নি। ঘড়িতে বাজে প্রায় সকাল ন’টা। খবর শুনবার জন্য টিভিটা অন্ করলো। প্রথম খবরটা বেশ অদ্ভুত - আজ ৩১ শে অগাস্ট। ভোর ৬ টা বেজে পাঁচ মিনিট। কাঞ্চনবাহার রিসোর্টের কেয়ার টেকার এর বক্তব্যঃ কিভাবে কি হলো বুঝলাম না।  রিসোর্টে বেড়াতে আসা পরিবারটি প্রতি ভোরেই হাঁটতে বের হন। চারিদিক ঘুরে বেড়ান। আজ সকালে প্রচন্ড বৃষ্টি। তবুও তারা বের হলেন হাতে ছাতা নিয়ে, রেইন কোট চাপিয়ে। কিছুদূর যেতে না যেতেই বজ্রপাত। লুটিয়ে পড়লো মা , বাবা আর তাদের আদরের কন্যাটি। কেন যে এই বৃষ্টিতে তারা বের হলেন বুঝলাম না। 

সৌমেনের হৃদস্পন্দন বাড়ছে। অসীম থেকে অসীমতর হচ্ছে। সৌমেন ছুটছে, কোথায় যেন ছুটছে। ধরে রাখবে, ও ধরে রাখবে সুমনাকে। ছাড়বে না কিছুতেই, যেতে দেবে না কোথাও। ও সর্বশক্তি দিয়ে নিজেকে শান্ত করতে চাইছে, বুঝাতে চাইছে সুমনার বজ্রাঘাতে মৃত্যু হয় নি। সুমনার জীবনাবসান হতে পারে না। ও চলে যাতে পারে না। অন্তত সৌমেনকে ছেড়ে ও চলে যেতে পারে না। চলে যাওয়ার জন্য তো ও আসেনি। তাহলে কেন চলে গেল? কেন নিতে চায় নি সুমনা  ওকে ওদের সাথে ওই রিসোর্টে ? সুমনা কি জানতো যে ও চলে যাবে? 


রচনাকালঃ ৩১শে অগাস্ট,২০০৬

No comments:

Post a Comment

পথচারী

 পথচারী