১
ব্রায়ান বেশ
কিছুদিন ধরেই অনুসরন করছে জেমীকে। কারণ তেমন কিছুই না। অনেকদিন পর বাল্যবন্ধুকে ফিরে
পাওয়ার আনন্দ। সেই ছেলেবেলায় জেমীর সাথে তার কতনা মজার দিনগুলো কেটেছে। সময় যদি
হিসেব করে, তাহলে এখন হতে ৮০০০ পরের কথা। ক্যালেন্ডার অনুযায়ী সালটা হবে ১০,০১০. ব্রায়ান
আর জেমী তখন অ্যান্ড্রামিডা গ্যালাক্সীতে হেসে খেলে কাটিয়ে দিচ্ছে তাদের ছেলেবেলা।
ড্রইং খাতায় আঁকাআঁকি করছে অসংখ্য সব জ্যামিতিক চিত্র। কখনো চতুর্ভুজ, কখনো বৃত্ত
অলংকৃত জটিল জ্যামিতিক নকশা। আর এখন? ছেলেবেলা অনেক পেছনে। কর্মক্ষেত্রে ছিটকে পড়েছে
যে যার দিকে। এখন ব্রায়ান একজন গ্যালাক্সী রোমার। একজন টাইম ট্র্যাভেলার। জেমী একজন
বিজ্ঞানী। তাই গ্যালাক্সী ভ্রমণের ফাঁকে ফাঁকে হঠাতই ব্রায়ানের মিল্কিওয়ের সন্ধান
পাওয়া। তারই ধার ঘেঁষে যাবার সময় সৌরজগতের নীলসবুজে ছাওয়া পৃথিবী নামক গ্রহকে এক
ঝলকে ভাল লেগে যাওয়া।
তারপর?
বর্তমান ১০০১০
সাল থেকে ৮০০০ বছর পেছনে এসে ২০১০ সালের টাইম পোর্টাল দিয়ে এই টাইম স্পেসে আগমন। পৃথিবীর
থ্রিডি স্পেসের বৈশিষ্ট্যমন্ডিত জীবজগত দেখে ব্রায়ান মুগ্ধ। অবস্থাগত দিক দিয়ে সে
আংশিক পদার্থ এবং আংশিক শক্তিরূপে থাকতে বেশী স্বাচ্ছ্যন্দ বোধ করে, যা কিনা একটু অন্যরকম
হলেও পৃথিবীতে তার ভালই লাগছে। তবুও সে কি জানতো তার জন্য অপেক্ষা করছে কি অসম্ভব এক
চমক? পৃথিবী ভ্রমণে হঠাতই তার ফ্রিকোয়েন্সি ডিটেকটর সনাক্ত করে ফেললো তার ছেলেবেলার
অ্যান্ড্রামিডান বন্ধু জেমীকে।
জেমী এখানে? এই
থ্রি-ডি স্পেসে? এই সময়ে?
ব্রায়ানের উপস্থিতি
কি সে টের পাবে? দুঃসাধ্য ব্যপার হবে ওর জন্য । প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে এ সময়কার সবকিছু
এত পেছানো যে তার মাঝে জেমীর বাস্তবতা তার ৮০০০ বছর পরের স্মৃতিকে ধারণ করতে পারবে
বলে মনে হয়না। জেমী বড়জোর তার বোধ বা অন্তর্দৃষ্টির দিক দিয়ে অন্যদের তুলনায় অনেক
বেশী আগানো থাকতে পারে, যার নাগাল হয়তোবা কেউই পায় না এপৃথিবীতে। শুধু ব্রায়ান বা
তাদের মতো অতি আধুনিক মানুষগুলোই তা টের পায়। তাই জেমীকে জেমীকে চিনতে পেরেছে সে এক
নিমেষে। মনে পড়ে গেছে তার ছেলেবেলাকে।
এই তিন মাত্রা
হতে আরো ৩০ মাত্রা বেশী এমন এক জগত থেকে ব্রায়ান এসেছে বলে তার পক্ষে এত নিম্ন মাত্রার
বৈশিষ্ট্য ধারণ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। পার্থিব রূপ যে এত কঠিন জানা ছিল
না ব্রায়ানের! তবুও ব্রায়ান জানাতে চায় তার উপস্থিতি জেমীকে।
ঘড়ির সময় অনুসারে
এখন রাত ১২ টা ।
তারিখ ০৮.০৮.২০১০
টরন্টোর রাস্তায়
জেমী তার সাদা গাড়ীটা নিয়ে এদিক সেদিক ঘুরে বেড়াচ্ছে। ব্রায়ানের বড্ড ইচ্ছে করছে
ওর কাছে যেতে। অনুসরণ শুরু করলো একটা কালো গাড়ী নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ। মিনিট দশেক তো
হবেই। সাবধানী দূরত্ব বজাই রাখছে সতত। কিন্তু জেমী কি টের পেয়েছে তাকে এ অনুসরণের?
হঠাত আচমকা জেমী ডান দিকে মোড় নিল। নিরুদ্দেশ হয়ে গেল সাথে সাথে। জেমীর এই সূক্ষ্ম
‘হঠাত’
এর হিসেব ব্রায়ান ধরতে পারেনি। তাই হারিয়ে ফেলল জেমীকে। পরাজয়ের আনন্দ মেনে নিল
ব্রায়ান আজ রাতের জন্য। কিন্তু কাল সকালে ও আবারো জেমীকে অনুসরণ করবে। ওকে জানানোর
জন্য আরো কিছু করবে। মন চাইছে ছেলেবেলার ছবিগুলো এঁকে ওর সামনে হাজির করতে। পারবে কি
জেমী ওসব ছবির কথা মনে করতে। নিশ্চয়ই না। কিন্তু ব্রায়ান রেখে যাবে ওর আঁকা চিহ্ন
ওর বন্ধুর জন্য এ পৃথিবীর বুকে। পরদিন সকাল পেরিয়ে বিকেল। ব্রায়ান লক্ষ্য করলো জেমীর
গাড়ি পার্ক করা আছে ড্যানফোর্থ এভিনিউর গ্রোসারী স্টোরের সামনে। কাছে গেল। কিছু একটা
লিখে দেবে কি? কিন্তু ওর লেখা অক্ষরগুলো কি জেমী চিনতে পারবে? আজ হতে ৮০০০ বছর পর জেমী
যে ভাষায় কথা বলে ভাব বিনিময় করতো তা এখন ভাবাও যে জেমীর কাছে কল্পনাতীত কল্পনা।
ব্রায়ান গাড়ীর কাছে যেয়ে তার উইন্ডশীল্ডে আঁকলো ছোট্ট একটা আয়তক্ষেত্র। আর ঐ জায়গাটুকুকে
প্রকট করার জন্য বসিয়ে দিল ধূলোর পুরু আস্তর। ঠিক মাপ মতন ধূলোর প্রলেপ একটি নিখুঁত
আয়তাকার অঞ্চল জুড়ে জেমীর দৃষ্টি এড়ায় নি। ছোট্ট আয়তাকার ধূলোর ছাপ দেখে সে বেশ
অবাকই হয়েছে। সারা গাড়ীতে কোথাও যেখানে ধূলোর উপস্থিতি নেই যেখানে সেখানে মাপ মতন
নিখুঁত ধূলোর আস্তর এলো কিভাবে? জেমী জানতেও পারলো না এ যে তারই ভবিষ্যতের ছেলেবেলার
বন্ধুর রেখে যাওয়া চিহ্ন।
২
আজ সময় ২৯শে
জুলাই, ২০১০
জাপানী তেল বহনকারী জাহাজ ‘এম স্টার’ আরব আমীরাতের ফুজাইরাহ বন্দরে নোঙর করেছে। মাত্র সকাল এখন। ব্রায়ান বেশ কিছুক্ষণ ধরে লক্ষ্য করছে জাহাজটিকে। ইচ্ছে করছে জাহাজে একটা আঁচড় কেটে দিতে। বেশী গভীরে প্রোথিত এমন নয় তাহলে জাহাজের ফাটলে ওদের ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। তাই হালকা একটা কিছু । না হয় জ্যামিতিক কোন চিহ্ন। ব্রায়ান জাহাজের পেছনে নীচের দিকে এঁকে ফেললো বিশাল এক চতুর্ভুজ। দেখে মনে হচ্ছে যেন জাহাজের উপরিতল কোন চারকোনা কঠিন বস্তুর আঘাতে বা চাপে টোপ খেয়ে বেশ ভেতর ঢুকে আছে।
এ যেন এক দক্ষ
কারিগরের হাতে তৈরী খুব হিসেবী কায়দায় আঁকা সুণিপুন একটি চতুর্ভুজ সম ভেতর বসে যাওয়া
অঞ্চল বিশেষ, যার ধাক্কায় জাহাজের ভেতরের দেয়ালের সকল জিনিসপত্র ছিটকে এদিক সেদিকে
পড়ে গেছে সমস্ত ঘরময়। সকল আসবাবপত্রকে স্থানচ্যুত হয়েছে এক নিমেষে। এই শব্দহীন সংঘর্ষের
কারণ যদিও অজানা, কখন বা কিভাবে এমন হলো তারও প্রমাণ নেই, তাই জাহাজ কর্তৃপক্ষ সঠিক
কোন বিশ্লেষণ দিতে অপারগতা প্রকাশ করলেন মিডিয়ার সামনে। খবরটি ইয়াহু'র প্রথম খবর
হয়েছে আজ। ব্রায়ান হাসছে আর ভাবছে জেমী দেখবে জাহাজের গায়ে প্রোথিত জ্যামিতিক চিত্রটি
কিন্তু মেলাতে কি পারবে এবারের আঁকা এই চতুর্ভুজটিকে তার গাড়ীর উইন্ডশিল্ডের ওপরে
আঁকা ছোট্ট সেই চতুর্ভুজের সাথে? এই বিশালাকৃতিটির সাথে সেটার তুলনা চলে না। কিন্তু
এ যে ব্রায়ানেরই আঁকা আরেকটি জ্যামিতিক ছবি, তার এঁকে রাখা চিহ্ন।
৩
তখন সময় ১লা
জুন ২০১০
গুয়েতেমালা শহরের
কেন্দ্রে ৬৬ ফুট ব্যাসার্ধের একটি বৃত্ত আঁকলো ব্রায়ান। প্রায় ১০০ ফুট গভীর করে সুনিপুণ
হাতে তার কম্পাস দিয়ে এঁকে ফেললো এই গোলাকার চিত্র। মাটি ক্ষয়ে সৃষ্টি হলো সিঙ্ক
হোলের। পৃথিবীর বাসিন্দারা অবাক হয়ে দেখলো প্রকৃতির খাম খেয়ালীপনা, যা তাদের বোধগম্যেরও
উর্ধ্বে। তবুও বিশ্লেষকরা মতামত দিলেন এই বলে, যে মৌসুমী ঝড় আগাথা-র নিয়ে আসা অঝোর
বৃষ্টিই শহরের মাটি ধুয়ে এই সিংক হোলে সৃষ্টি করেছে।
কারন হিসেবে তারা
যে ব্যাখ্যাই দেকনা কেন ব্রায়ান বেশ আনন্দিত। ভাবলো তার ছেলেবেলার বন্ধুকে দেখাবার
জন্য আরও ছবি আঁকবে সে এ পৃথিবীর বুকে। তৈরী করবে অনবদ্য ক্রপ সার্কেল ডিজাইন। তাই
যেই ভাবা সেই কাজ। চলে গেল সময়ের ২০০৯ সালের জুলাই মাসে। ও সময়ের গ্রীষ্মকালের আবহাওয়া
ব্রায়ানের এই ছবিটা আঁকবার জন্য খুব উপযোগী বলেই এ সময়টা বেছে নিয়েছে।
স্থান ইংল্যান্ডের
উইল্টশায়ার আর অক্সফোর্ডশায়ার। ক্রপ সার্কেলের জন্য জায়গা দুটির বেশ সুনাম হলেও
খামার চাষীদের জন্য মাথায় বাড়ি। প্রকৃতির খামখেয়ালী চিত্রে চিত্রিত হয়ে কার জমির
কতটুকু অংশ এ গ্রীষ্মে বিনষ্ট হবে তা আগভাগে কেউই যে আঁচ করতে পারেনা। আর অংকিত চিত্র
ফুটে ওঠে রাতের গভীরে মিনিট খানেকের মাঝে। এ যে অদৃশ্য এক চিত্রশিল্পীর অপ্রতিরোধ্য
খেয়ালের তাড়নায় সৃষ্ট কিছু চিত্রকর্ম। আজ ই শুধু নয়, বহু বছর ধরেই তো এমন হয়ে
আসছে। কিন্তু কে সেই অদৃশ্য চিত্রকর? কার আঁকা এত সুনিপুণ চিত্রকর্ম? এবারের আঁকিয়ে
ব্রায়ান। কিন্তু তারা কি তা জানে? আজ অক্সফোর্ডশায়ার সে এঁকেছে ৬০০ ফুট লম্বা একটি
জেলিফিশ। ইয়েটসব্যারি, উইল্টশায়ারের শস্যক্ষেত্রে এঁকেছে ১৫০ ফুট দীর্ঘ ড্রাগন ফ্লাই।
এবারের চিত্রিত ক্রপ সার্কেলগুলো সবার কাছে ভিন্ন মাত্রার আঙ্গিক সৃষ্টি করেছে। কারণ,
বরাবরের মতো এ যে সাদামাটা গোল বা সরল রেখা বা চারকোনা ডিজাইন নয়। এ যেন জ্যামিতিক
আকারের বিচিত্র জটিল সজ্জা, গাণিতিক মাপে মাপে যার নিখুঁত বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু আবারো
সকলের মনে সেই একই প্রশ্ন কে এই অদৃশ্য আঁকিয়ে।
অ্যান্ড্রমিডা
থেকে আসা ব্রায়ানকে তারা কেউ চিনবে না। খেলার ছলে তার কত না চিহ্ন সারা পৃথিবীর বুক
জুড়ে সে রেখে
যাবে।
এখন তো ব্রায়ান
প্রৌঢ়ত্বের দ্বারপ্রান্তে। সময় চলে গেছে অনেক। বাল্যবন্ধু জেমী চলে এসেছে ৮০০০ পেছনের
ত্রিমাত্রিক জগতে। ব্রায়ান রয়ে গেছে তার অশরীরীয় ৩৩-মাত্রার জগতে। জেমীর কল্পনার
উর্ধ্বে এসব উর্ধ্বমাত্রার জগত। কিন্তু জেমী যে তার ভবিষ্যতের সেই জগত থেকেই আসা, যেখানে
আলোর একটু ঝলকানির মতো ঘটে উর্ধমাত্রার প্রাণীদের নিছিক কোন খেয়ালী কর্মকান্ড। পৃথিবীবাসী
মানুষগুলো ব্যাখ্যাতীত এসব ঘটনায় অভিভূত হয়ে যায়। ওদের অনুভূতি যে একেবারেই ভোতা
নয় তার প্রমাণ ব্রায়ান পেয়ে যায় বেশ জোরেসোরেই। যে কোন অতিপ্রাকৃত ঘটনায় তাদের
মাঝে হৈচৈ পড়ে যায়। ব্রায়ান খুব পুলকিত হয়। কিন্তু তবুও জেমী যে তার ধরা ছোঁয়ার
বহুদূরে। জেমীকে তার সময়ের কাঠামোতে আবার ফিরে পেতে হয়তোবা আরো অপেক্ষার প্রয়োজন
হতে পারে ব্রায়ানের, যখন জেমী এ সময়ের খেলা সাঙ্গ করে আবারো মিলিত হবে ব্রায়ানের
টাইম-স্পেসে কোন এক অদূর ভবিষ্যতে।
০৬/০৯/২০১০
