Tuesday, April 7, 2026

দীপার প্রেম

 তারিখঃ ৪ঠা এপ্রিল ২০০২

স্থানঃ লেকচার হল, দ্বিতীয়তলা 

ডিউটি করবে দীপা আর সুমন 

সময়ঃ রাত আটটা থেকে ১২টা পর্যন্ত 

অর্থাৎ এই চার ঘন্টায় লেকচার থিয়েটারের সকল আসবাবপত্র ঝকঝকে, তকতকে করে, বিশাল বড় বড় কার্পেটের ধুলা ঝেড়ে পরের দিনের অফিস মিটিং এর জন্য লেকচার থিয়েটার উপযুক্ত করে রেখে যেতে হবে। 

দীপার জন্মসংখ্যা ১৩, তাই ৪ সংখ্যাটি তারিখ হিসেবে  আসলেই তার কেমন যেন ছটফট লাগে। আতঙ্ক ঠিক না। কিন্তু একটা অন্যরকম উৎকণ্ঠা। নিজেকে সান্ত্বনা দেয়, এই ভেবে, খারাপ কিছু নিশ্চয়ই হবে না। কারণ ৪ সংখ্যাটি যে তারi জন্মসংখ্যা । 

কিন্তু আজ যে একটু বেশি ধরণের অন্যরকম লাগছে। 

কিন্তু কেন?

শুধু দিনটির  সংখ্যা ৪ নয়, দিনটি বছরের চতুর্থ মাসের চতুর্থ দিন। মানে এপ্রিলের ৪ তারিখ। আর ২০০২ সালের সংখ্যগুলো যোগ করলেও তো সেই দুই যোগ দুই-  চার। 

দীপার ভিতরটা কেমন যেন লাগছে। নিজেকে ঠিক মানাতে পারছে না।  আজকে নিজেকে কোনভাবেই শান্ত করতে পারছে না। মন বলছে আজ যেন কিছু একটা অপেক্ষা করে আছে ওর জন্য। এসব ভাবতে ভাবতেই লেকচার- হলে প্রবেশ করল দীপা। হলের এ প্রান্ত থেকে ওই প্রান্ত যেন দেখা যায় না। কম করে হলেও ৪০ বা তারও বেশি ছাত্রের আসন বসানো হয়েছে এই থিয়েটারটি। লেকচার থিয়েটারের ঝাড়ামোছার কাজ করছে আজ প্রায় পাঁচ বছর হলো। সাথে সহকর্মী হিসেবে প্রায়শই থাকে সুমন। আজ কেন যে সুমন আসতে এত দেরি করছে। এত বড় লেকচার থিয়েটারের নির্জনতা দীপার কেমন যেন গা ছমছমে ভাবের উদয় করে। এত বছর যাবৎ নাইট ডিউটি করছে, তারপরও লেকচার থিয়েটারের বিশালতা আর নির্জনতার সাথে কেন জানি একাত্ম হতে পারেনি সে।  সুমন না আসা পর্যন্ত কি বাইরে অপেক্ষা করবে নাকি ভেতরে যেয়ে কাজ শুরু করে দেবে? আর কতই বা অপেক্ষা করা যায়, এসব সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতেই কানের কাছে মৃদু শিসের শব্দ। ঘাড় ফিরে তাকালো দীপা। সুমন এসেছে অতঃপর। সেই দুষ্টু ভরা হাসি। দীপার প্রশ্ন সরাসরি, 'দেরি হলো কেন? তুমি জানো না একা এত বড় লেকচার হলের নাইট ডিউটিতে আমার ভীষণ ভয় লাগে একা একা?'

সুমনের আবারও হাসি। আর চকিত উত্তর, 'যদি একেবারেই আর না আসি? একা একা যদি কাজ করতে হয় সারাটা জীবন?' 

দীপা হকচকিয়ে যায়। 

কি যে বলে সুমন, সে বুঝে উঠতে পারে না। অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে শুধু ওর দিকে। সুমন আজ কেমন যেন করে কথা বলছে। কাজ করার কোন মুড যেন তার নেই। হঠাৎ এর মাঝেই সুমন ওর হাতটা ধরে থিয়েটারের একেবারে কোণার দিকে টেনে নিয়ে, কোমর জড়িয়ে ধরে,  ওর মুখটা কাছে এনে বলল, 'তোর জন্য একটা চকলেট এনেছি।' 

'কোনটা?' দীপার বিস্ময়! 

:এই দেখ। 

ক্যাডবারির মুখটা খুলে চকলেট - বারটা দীপাকে না দিয়ে নিজের মুখে আধেক টুপ্ করে পুরে দিল। তারপর দীপার কাছে মুখটা এনে বলল, 'নাও। খাও।' 

দীপার পক্ষে এই দুষ্টমি  কি বোঝা সম্ভব? কিভাবে খাবে ওর মুখ থেকে? দীপাকে আরো কাছে টেনে নিয়ে বুকের মাঝে চেপে ধরলো এবার সুমন। তারপর বলল, 'আমার মুখ থেকে নিয়েই খাও না।' চক-বারটি তার মুখে আবার পুরে দিয়ে, মুখটা এগিয়ে নিয়ে এলো একদম নাক বরাবর দীপার সামনে।  

এমনভাবে জাপটে ধরে আছে কেন সুমন? কখনো তো এমন সে করেনি। কি হয়েছে আজ তার? দীপা না পারছে নিজেকে সুমনের হাত থেকে ছাড়াতে,  না পারছে ওর হাত দুটো নাড়াতে। ও খুব শক্ত করে জাপটে ধরেছে দীপাকে। অতএব দীপা এখন বাধ্য। সুমনের আদেশ তাকে পালন করতেই হবে। এছাড়া উপায় নেই ওর বন্ধন থেকে মুক্ত হবার। দীপা মুখটা এগিয়ে চকবারের কাছে নিজের মুখটা স্পর্শ করতেই, সুমনের নাকের সাথে নাক আর কপোলের সাথে কপোলের স্পর্শ কেমন যেন এক শিহরণ জাগালো। আজ প্রথম সুমনের এত ঘনিষ্ঠ হয়েছে সে। এত বছর দু'জন কাজ করেছে, সপ্তাহে প্রায় দুইদিন একসাথে ডিউটি থাকতো তাদের, কিন্তু  কখনো দীপা এমন ঘনিষ্ঠতার কথা চিন্তা করেনি। সুমন তার খুব ভালো বন্ধু। কিন্তু আজ যেন সুমন একদম অন্যরকম। দীপাকে তার বুকের মাঝে যেন আগলে রেখে দিতে চাইছে। এমন চাপ দিয়ে ধরে রাখলে আর কিছুক্ষণ পর  দম বন্ধ হয়ে দীপা বুঝি চ্যাপ্টা হয়ে যাবে। একটু নিজেকে ছাড়াবার জন্য, হাতটা সরাতে চাইলেও সুমন আরো কাছে নিয়ে যেন ওকে বেঁধে ফেলছে। 

দীপা প্রশ্ন করবে কিভাবে? কন্ঠ যেন জড়িয়ে আসছে। তারপরও বলল, 'কি হয়েছে আজ তোমার সুমন? কত কাজ বাকি, জানো? পুরো হলঘর পরিষ্কার করতে হবে। কাল কনফারেন্স আছে তো, মনে নেই?'

 সুমনের কোন হুঁশই নেই যেন। ওর চোখের মাঝে সে ডুবে আছে। 

দীপার চোখ পিঙ্গল বর্ণের। সাধারণ বাঙালি ধাঁচের নয়। চুলগুলো লালচে, কিন্তু বাঁ পাশের একখানা চুল একদম সোনালী। আর সুমনের চোখগুলো একদম সবুজাভ নীল। সারা দক্ষিণ অঞ্চলের কোন মানুষের চোখ এমন নীলাভ সবুজ হয় না। লম্বা সুঠাম দেহের অধিকারী সুমন, তার চেহারার জোরে আরো ভালো কোন কাজ যোগাড় করতে পারতো। কেন যে এখানে ধোয়া মোছার কাজ নিয়েছে সে, দীপা বুঝতে পারে না। কখনো জিজ্ঞেস করেনি যদিও। জীবনের প্রয়োজনে, জীবিকার তাগিদে  একটা কাজ যে জুটেছে সেটাই বড় কথা। তাও আবার এত বড় একটা প্রতিষ্ঠানে, এইতো বেশি। হতে পারে ছোটখাট দায়িত্বের মধ্যে পড়ে এই কাজ, কিন্তু তারপরও চাকরির এই দুর্মূল্যের বাজারে দু'জনের জন্য খুবই জরুরি এই কাজটা। কিন্তু কাজ বাদ দিয়ে চকলেট -বার দেবার উছিলায় দীপাকে এভাবে বুকের মাঝে ধরে রাখার কি  কারণ? এটা কি ভালো দেখায়? 

সহকর্মী থেকে বন্ধু । কিন্তু  প্রেমিক তো নয়। আর আজ সুমনেরই অন্তরঙ্গতায়, প্রথম যেন দীপা নিজেকে অনুভব করল একটু অন্যভাবে। প্রতি রোমকূপে আজ তার অন্যরকম শিহরণ। ইচ্ছে করছে হারিয়ে যেতে সুমনের সাথে দূরে কোথাও। অনেক দূরে। অজানার উদ্দেশে। 

সুমন খুব বুঝে দীপাকে। দূরে কোথাও অনেক দূরে চলে যাওয়ার কথা ভাবনায় আসাতেই সুমন প্রশ্ন করে বসলো,

:কি ভাবছিস রে? 

:না কিছু না।

: কিছু না মানে কি?

:কিছু না মানে কিছু না। ছাড়ো এবার। যাব আমি।

 সুমনের প্রশ্ন, 'কোথায় যাবে?' দীপার উত্তর, 'কাজে।' 

সুমনের আবার প্রশ্ন, 'কিসের কাজ?' 

:ওমা কাজ আছে না?  কালকে কনফারেন্স। তার জন্য থিয়েটার রেডি করতে হবে না? 

সুমন অবাক হয়ে বলল, 'সেই সময় যদি না পাই?' 

দীপার অবাক প্রশ্ন, 'কেন সময় পাবো না?' 

সুমনের  কন্ঠস্বরটা যেন একটু দৃঢ় হয়ে গেছে। এবার একটা চাপে যেন মিশিয়ে ফেলবে দীপাকে তার সাথে। মুখটা আবার  কানের কাছে এনে বলল, 'সময় নেই দীপা। যেতে হবে আমাকে।' দীপার অবাক চোখে প্রশ্ন, 'কোথায়?' সুমনের ওম্ পেয়ে দীপা যেন  গলতে গলতে একদম একাকার। সুমনের বুকের ভিতর মিলে মিশে সে শিহরিত। সুমন খুব ধীরে ধীরে বলল, 'দীপা আমাকে আজ যেতে হবে আমার বাড়িতে। যেখান থেকে আমি এসেছি।'

 দীপার মনে হলো, আজ এতদিন একসঙ্গে সুমনের সাথে কাজ করেছে, অথচ জানাই হয় নাই, সুমনের আদি বাড়ির ঠিকানা। আসলে সুমন তাকে যদি এমন ঘোরের মাঝে না ফেলতো, দীপা হয়তোবা এতো গভীরভাবে ওকে নিয়ে কখনোই ভাবতো না। আজ তার এই গভীর আলিঙ্গন, প্রথম স্পর্শ আর বুকের  ওম্ নতুন ভবানা জাগাতো না। কিন্তু এমন  তো কখনো আগে হয়নি। আজ হঠাৎ কেন? কি হলো সুমনের? 

আজকের দিনটা চতুর্থ মাসের চতুর্থ দিন।  দীপার জন্মসংখ্যার দিন।  ওর কাছে যেন ঝাপসা ঠেকছে সবকিছু। এমন হচ্ছে কেন? 

দীপা আবার ছাড়াতে চাইছে নিজেকে, সুমনের বাহুডোর থেকে। না সে উপায় নেই । সুমনের শক্ত বাহুর আগল থেকে, দীপার ছুটে বেরিয়ে পড়া একেবারেই অসম্ভব। তাই তার শেষ চেষ্টা, শেষ প্রশ্ন, ‘কতদূর তোর বাড়ি? আজ হঠাৎ যাবার সিদ্ধান্ত কেন? ক'দিন পরে ফিরবি?' 

সুমন শুধু তাকিয়ে আছে দীপার চোখের দিকে। অনেকটা ক্ষণ পার হলে সুমন বলল, 'আমার ঠিকানা তো এই গ্রহে নয়। আমি এসেছি ভেনাস থেকে। তোদের পৃথিবীর প্রেমের দেবী ভেনাস যে গ্রহের অধিকর্তা, সেখান থেকে। এখানে থাকার সময় আমার শেষ। আমাকে যেতে হবে। 

দীপা বিহবল এসব শুনে। সুমন কি তাহলে ভীনগ্রহী এক্সট্রা -টেরেস্ট্রিয়াল  (ET) নাকি? ET-রা তো এত রক্ত মাংসের মানুষ হয় না। হতে পারে না। তারা যে অন্য গ্রহের অন্যরকম এন্টিটি, অন্য ধরণের সত্তা। সেই সত্তা তার বুকের চাপে,  তার সর্বাঙ্গ দিয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে দীপাকে অনুভব করিয়েছে  তার হৃদস্পন্দন, তার প্রতিটি ধমণীতে বয়ে যাওয়া শিহরণ। ওর সবটুকু দীপা অনুভব করছে তাকে আগলে রাখার মাঝে। কিভাবে তাহলে বিশ্বাস করবে যে সুমন মানুষ নয়। সে ভীনগ্রহের বাসিন্দা। সুমন যদি নিমেষে চলে যেতে পারে তার গ্রহে, নিমিষে কি আবার আসতে পারে না সেই ভেনাস থেকে পৃথিবীতে? 

দীপার সাথে সপ্তাহে দুবার ডিউটি পড়তো তার। লেকচার থিয়েটারে রাত আটটা থেকে বারো টা পর্যন্ত। এবার ওর শিফটে অন্য কেউ হয়তোবা আসবে। কিন্তু সুমন এই পৃথিবীতেই থাকবে না? 

তার কি মনে পড়বে পৃথিবীর কথা?  পৃথিবীর মানুষগুলোর কথা? নিজের বুকের মাঝে পিষে ফেলে দীপাকে যতক্ষণ ধরে রেখেছিল, সেই সময়টুকুর কথা? ওদের গ্রহে কি সময় বলে কিছু আছে? দীপা কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না। সুমন যদি ভীনগ্রহী  হয়, তাহলে দীপাকে পছন্দ করার দরকার কি ছিল?

 আজ থেকে দীপা যে ভীষণ  একা ।

০৭/০৪/২০২৬

Friday, March 6, 2026

মধ্যরাতের যাত্রী


আজ সুমনার কাজ একটু দেরী করেই শেষ হয়েছে। নার্সিং হোমের এই কাজে আছে প্রায় এক দশক ধরে। কাজ শেষ করতে প্রতিদিনই বেশ রাত হয়ে যায়। বৃদ্ধ রোগীদের দেখাশোনা করে তাদের সারাদিনের আর্জি আব্দার মিটিয়ে বাড়ি ফেরার যখন সময় হয়,তখন শুরু হয় আরেকটি নাটকের অধ্যায়। হোমের সকল বোর্ডারদের ভারাক্রান্ত মুখ। সুমনা চলে যাবে? কেউ তাকে ছাড়তে চায় না।ও এলে নার্সিং হোমে যেন প্রাণ আসে। আর চলে যাওয়ার সময়টা এলেই সবার মুখ কালো। তারপরও সুমনাকে তো বাড়ি ফিরতেই হবে। সেই সকাল থেকে শুরু করে রাত অব্দি কাজ। ওর খুব ভাল লাগে। তাই প্রাণ দিয়ে নিবেদিত সুমনা আরেকটু দেরী সয়ে নিতে পারে প্রয়োজনে।

কিন্তু আজকের বিকেলটা যেন অন্যরকম। কাজ শেষ করতে ওর কেন জানি মন চাইছে না। আর একটু যদি বেশী কাজ আজ থাকতো ভাবতে ভাবতেই হোমের সবচেয়ে বর্ষীয়ান মহিলা হঠাতই যেন অসুস্থ বোধ করা শুরু করলেন। সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত তাকে সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রাখতে গিয়ে সুমনার আজ বেশ দেরী হয়ে গেল। যেমন সে চাইছিলো। কিন্তু মধ্যরাত পেরুলেই বাড়ি ফেরার বাস সিডিউলের একটু পরিবর্তন হয়ে যায়। তখন বাসগুলো আসে বেশ দেরীতে। আর শীতের রাতে মাঝরাতও বেশ গভীর রাত মনে হয়। নিস্তব্ধ চারিদিকের মাঝে বাস স্টপেজে দাঁড়িয়ে বাসের জন্য প্রতীক্ষা এক অন্যরকম অনুভূতি। গ্রীষ্মকালে এরকমটা একেবারেই না।

গভীর রাতে তাই নার্সিং হোমের উল্টোদিকের রাস্তায় বাসের জন্য অপেক্ষারত সুমনা চেয়ে থাকে প্রিয় কর্মক্ষেত্রের আলোয় ঘেরা চত্বরের দিকে। রাস্তার এদিকে আলো না থাকলেও নার্সিং হোমের আলোটুকুর আলতো স্পর্শ বাস স্টপেজকে আলোকিত করে রাখে কিছুটা হলেও। আধো আলো আধো অন্ধকারের মাঝে এ অপেক্ষাও তার ভাল লাগে। তবে ধৈর্য্য পেরুবার আগেই বাস চলে আসে। দু’এক জন যাত্রী এ স্টপেজে এসে মাঝে মাঝে দাঁড়ায়। কিন্তু এ মধ্যরাতে কেউ নেই আজ। সুমনা একাই অপেক্ষারত বাসের পথ বরাবর চেয়ে। এলাকাটা রেসিডেন্সিয়াল বলে এখানে যাত্রী চলাচল কম। তারপরও সুমনা খেয়াল করলো দূর থেকে কে যেন হেঁটে আসছে স্টপেজের দিকে। ধবধবে সাদা শার্ট পরিহিত ভদ্রলোকটির হাত দুটো পকেটে ভরা। শান্ত, ধীর পদক্ষেপ বেশ স্পষ্ট প্রতীয়মান। বাস ধরার তাড়া যেন খুব একটা নেই তার অথচ গন্তব্য মনে হচ্ছে এই স্টপেজ। আরেকটু কাছে যখন তিনি এলেন তার ব্যক্তিত্ব ও হাঁটার ভংগীমা দেখে সুমনার কেন জানি মনে হলো সে তাকে চিনে! এবং সত্যিই তাই। সুমনা চিনে ফেলেছে। এ তো তিনিই,তার খুব প্রিয় সেই মানুষটি যাকে দেখেই ভাল লাগতো সেই বহু আগের দিনগুলোতে। কিন্তু তিনি তো এ শহরে থাকেন না,আজ এলেনই বা কি জেনে,যে সুমনা এই স্টপেজে থেকে বাসে উঠবে? আর আজকের দিনটিও তো অন্যরকম। তার গতানুগতিক দিনের মত ঠিক রাত ১০ টায় তো কাজ শেষ হয়নি!

উনি এবার স্টপেজে এসে পৌঁছেছেন। মনে হচ্ছে যেন সুমনার কথা জেনেই তিনি এখানে এসেছেন। সুমনার দিকে তাকিয়ে আছেন, তাকে দেখছেন। খুব সলজ্জ এক অস্বস্তিতে পড়ে গেল ও। এত কাছে তিনি দাঁড়িয়েছেন। দেখছেন খুব সরাসরি। এই মধ্যরাতের বাস প্রায়ই খালি আসে আর পাশের শহরে সুমনাকে পৌঁছে দেয়া অব্দি তেমন কোন স্টপেজও নেই যে নতুন যাত্রীর আগমন ঘটে। কিন্তু আজ সুমনা একা নয় উনিও যাবেন এই বাসে। সুমনার সংগী হয়ে। কিন্তু একে কি সঙ্গী বলা চলে? জীবনের পথচলায় যাকে কখনো পাশে পায়নি,আজ একঘন্টার বাস ট্রিপে তিনি পাশে উপবিষ্ট থাকলেই কি সঙ্গী হয়ে যেতে পারেন? কল্পনায় পেয়ে নিয়েছে তাকে বহুবার কিন্তু বাস্তবে আজ তার এই হঠাত উপস্থিতি তাকে বিস্মিত করে চলছে নিরন্তর। তার প্রচন্ড ভাল লাগার ধাক্কা যেন বিস্ময়েও সমাপ্তি টানতে পারছে না। নিস্তব্ধ,একাগ্র,তীক্ষ্ণ, প্রক্ষিপ্ত দৃষ্টি দেখে মনে হচ্ছে উনি আজ তারই জন্য এসেছেন। তার সাথে যাবেন।কিন্তু তার স্টপেজেই কি নামবেন? যদি তাই হয় সুমনা কি তাকে বলতে পারবে তার বাড়িতে আসবার জন্য। তা কি করে হয়? এত চেনা হওয়া সত্ত্বেও কখনো তো কথা হয়নি ওনার সাথে। কি সব এলোমেলো চিন্তা মনে আসছে। আজ সবকিছু সত্যিই ব্যতিক্রম।

বাস আসবার পথের দিকটায় দাঁড়িয়েছেন তিনি। কিন্তু এবার বুঝি অপেক্ষার পালা শেষ হতে যাচ্ছে। ওনার পেছনে ঝলসানো হেডলাইটের আলো চোখে পড়ছে সুমনার। একটা বাঁক ঘুরে এপথে মোড় নিয়েছে বাসটি। এগিয়ে এসে নিঃশব্দে দাঁড়িয়েছে তাদের সামনে। এখান থেকে শুরু করে সামনের দিকে এগুলে এ শহর শেষ হয়ে শুরু হয় ঘন বনে ঘেরা সরু রাস্তা, বহুদূর পর্যন্ত যেটি বিস্তৃত হয়ে শেষ হয় পাশের শহরে এসে। এই নির্জন পথটুকু চলতে খুব ভাল লাগে সুমনার। গতি তার পছন্দ কিন্তু তার সাথে যদি থাকে নির্জনতা তা তার একাকীত্বের সাথে যেন বেশী করে মানিয়ে নেয়। কিন্তু আজ যে সে একা নয়। ঠিক মুখোমুখি বসেছেন উনি। সুমনার মুখোমুখি। সুমনাকে দেখছেন বিভোর হয়ে। কিন্তু কি-ই বা আছে দেখার? ফেলে আসার পেছনের সেই সময়গুলোর সুমনা আর আজকের সুমনা অনেকটাই যে অন্যরকম। কাজ ছাড়া যার আর কাজ নেই জীবনে,ভাললাগা যার কল্পনা, ভালবাসা যার স্বপ্ন,প্রেমহীন,সংগীবিহীন জীবনে মনের মানুষের উপস্থিতি যেখানে অলীক,সেখানে সুমনার একাকী বসবাস,তার কেটে যাওয়া প্রতিটি নিঃসঙ্গ দিনের নিস্তরঙ্গ মুহূর্তের হিসেব যেন পাই পাই করে নিচ্ছেন তিনি। দেখছেন অপলক। তীক্ষ্ণ,প্রখর সেই চিরচেনা দৃষ্টি। বাসে ওরা আজ দুজন যাত্রী।

ও খুব অস্বস্তিতে পড়েছে। বার বার দেখছে ড্রাইভারের সামনের বিশাল কাঁচের জানালা ভেদ করে ছুটে চলা সরু রাস্তা। বার বার চোখ পড়ে যাচ্ছে ওনার দিকে। চারপাশে জনবসতি নেই বলে রাস্তার আলোও নেই। বাসের হেড লাইটের ক্ষীণ আলোয় রাস্তাটি যতটুকু আলোকিত হয়,তারই সাথে পাশের গাঢ় অন্ধকারের মিশেল পুরো পথকে করে তুলেছে রহস্যময়। বাড়ি ফেরার সময়ের এই ভ্রমণ খুব ভাল লাগে সুমনার। তাই এত দূরে কাজ নিতে আসাও তার একটি কারণ। ফিরতি পথে দু চারজন যাত্রী সবসময় থাকলেও আজই ব্যতিক্রম। আসলে আজ সব কিছুই বেশ আকস্মিক ও অস্বাভাবিক। এসব ভাবতে ভাবতেই ঘড়ির দিকে চোখ পড়লো সুমনার। ড্রাইভার নিশ্চিন্তে চালিয়ে যাচ্ছেন তার বাস, সামনের পথটুকু পিছনে পড়ে এগিয়ে যাচ্ছে বাস দ্রুত গতিতে। অথচ এতক্ষণ পরেও রাস্তা যেন আজ শেষ হতে চাইছে না। সময় দেখতে গিয়ে বেশ অবাক হলো ও এবার। বাসটি সেই ১২ টায় স্টপেজে এসে দাঁড়িয়েছিল আর এখনো সেই সময়ই দেখাচ্ছে?

সময় কি তাহলে থেমে আছে? সুমনার অবাক হওয়া দেখে এবার উনি মৃদু হেসে ফেললেন,যেন ঠিক ঠিক বুঝতে পারছেন সুমনার ঘড়ি বন্ধ হয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা।সুমনার খুব রাগ হচ্ছে। কিছুই বুঝতে পারছে না। এভাবে বহুবার সময় দেখতো সে ওনার আসবার অপেক্ষায় থেকে। আজ তিনি তো সত্যিই এসেছেন,আর তাই কি সময় দেখার প্রয়োজন যে ফুরিয়ে এসেছে তা জানিয়ে দিতে চাইছে সময় তার নিজ থেকে? এত দীর্ঘভ্রমণের পরও আজ পথ কেন জানি শেষ হতে চাইছে না। ড্রাইভারও বেশ নিশ্চিন্ত মনে স্টিয়ারিং ধরে আছেন, যেন তিনিও ভেবে নিয়েছেন আজকের এযাত্রা শেষ হবার নয়। রাস্তার উল্টোদিক থেকে আজ একটি গাড়িও এ পথ অতিক্রম করেনি। এ পথে বুঝি আজ তারা দুজনাই শুধু যাত্রী,অসীম,অনন্ত সময় ধরে।

পরদিন সকাল দশটা পেরিয়ে একঘন্টা অতিক্রান্ত। নার্সিং হোমের সদস্যরা আবারো একটি নতুন দিনের আশায় তাদের সকাল শুরু করেছেন। প্রতিদিন চোখ মেলেই যাদের প্রথম ভাবনা হয়,আমি বেঁচে আছি,তাদের জন্য একটি সকাল আসা যেন একটি আশীর্বাদের মতো। অপেক্ষাও করছেন সুমনার আগমনের। এত দেরী সে কখনোই করে না। কাল অনেক রাত অব্দি কাজ করেছিল বলেই হয়তোবা আজ হতে পারে এই দেরী।

লিভিং রুমে এসে বসেছে সকলে প্রতিদিনের মতো। একটু হালকা নাস্তার পর চা খেতে খেতে খবরকাগজ পড়া, টুকটাক গল্প করা। তেমন কোন খবর থাকলে তা নিয়ে আলাপ করা। যদিও আজ তেমন কোন খবর নেই, শুধু শেষের পাতার ডান দিকের কলাম একটি খবর ছাপিয়েছে একটু বিস্ময়কর। নার্সিং হোম থেকে দশ কিলোমিটার দূরে গতকাল রাতে একটি বাস পথচ্যুত হয়ে পাশের গভীর খাদে পড়ে যায় কোন কারণ ছাড়াই। বাসের ড্রাইভারের সাথে কন্ট্রোল রুমের সার্বক্ষণিক যোগাযোগ থাকা সত্ত্বেও কেন বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারালো তা এখনো কারো বোধগম্য নয়। বাসে ড্রাইভার ছাড়া দুজনের বেশী যাত্রী না থাকলেও অগ্নি নির্বাপক কর্মীরা জানিয়েছে, যাত্রী যে দুজন মৃত্যুবরণ করেছে তাদের দেহ কোন ভাবেই সনাক্ত করবার উপায় নেই।

...............

২০১৭

Saturday, January 31, 2026

এখনি সময়


 তোমাকে যেতে হবে।

 এখনই।

চমকে তাকালো ঊর্জা সামনের দিকে। গভীর মনোযোগ দিয়ে কম্পিউটারের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ছিল। গুরু গম্ভীর এ আদেশ যেন তার সকল মনোযোগ ছিন্ন করে দিয়েছে এক নিমিষে। 

কিন্তু কাউকে তো দেখতে পাচ্ছে না আশেপাশে। 

কার কন্ঠ? 

ঘর ভর্তি মানুষ। বিশাল ড্রইং  রুমে প্রচুর অতিথির সমাগম। তারই কোণায় টেবিল পাতা। খাবার সামগ্রী সাজানো থরে থরে। টেবিলের একপাশে ছোট্ট চেয়ারে বসে মাথা ঝুঁকে কাজ করছে ঊর্জা। কেইটরিং –এর কাজ নিয়েছে ।মাসখানেক হলো। আজ এই বাড়িতে অতিথি আপ্যায়নের দায়িত্ব। তার এই কাজ পেতে বেশ কষ্ট হলেও এই কয়েক মাসে বেশ সুনাম অর্জন করে ফেলেছে। ব্যবসা  সুনাম অর্জনের সাথে সাথে বেশ ভালোই চলছে। হিসাব নিকাশের কাজগুলো আরেকবার দেখছিল সে স্ক্রিনে চোখ রেখে। এমন সময় এরকম ভাবে কেউ বলছে, ‘যেতে হবে।‘ বেশ আদেশের সুর যেন কন্ঠে। কিন্তু কে কথা বলছে? আর কোথায় বা তাকে যেতে হবে ? 

স্ক্রিন থেকে মাথা তুলতেই অতিথিবৃন্দের মাঝে অরুণাভকে চোখে পড়লো।  অনেকদিনের চেনা অরুণাভ, তার বন্ধু ঠিক বলা যায় না, আবার পরিচয়ের যে গভীরতা, তাতে দূরের বলে, পর মনে করে, ‘অবন্ধু’ ভাবনাটাও মেনে নেওয়া যায় না। আসলে অরুণাভ যে তার কি, সে জানে না। বন্ধুও নয়, প্রিয়তম তো নয়ই - কোন অধিকারে তা বলবে? ভালো লাগে যদিও তাকে খুব । কিন্তু সেও তো বসে আছে বেশ দূরে । কাছাকাছি  কেউ বসেনি তার চারপাশে। 

কার কন্ঠ এটি তাহলে? 

কথাটা শোনার সাথে সাথেই শিরদাঁড়া  বেয়ে যেমন বিদ্যুৎ খেলে যায়, তেমনি গ্রীবা  আর স্কন্ধের মাঝ দিয়ে একটা বিদ্যুতের চমক অনুভব করল ঊর্জা। তাই ঘাড় তুলে তাকালো সামনে। কেউ নেই কোথাও। 

কে বলল অমন করে? 

ভাবতে ভাবতেই দেখলো, সামনে দাঁড়িয়ে আছেন সৌম্য, শান্তরূপে একজন অতি দীর্ঘকায়া সুপুরুষ। দেখেই মনে হয় যেন কোন শান্তির দেবদূত। যেন সেইন্ট  জার্মেইন। কে ইনি? হালকা হালকা ধোঁয়ার  ভেতর দিয়ে দেখা যায়, কি যায় না। অস্পষ্ট কুয়াশা কুয়াশা ভাব। কিন্তু জানালা বন্ধ এই ঘরে এই সন্ধ্যার সময় কুয়াশা আসবে কোথা থেকে?

 ঊর্জা একটু সচেতন হলো এবার। কিছু বলতে চেয়েও বলতে পারছে না। তাকিয়ে আছে স্থির। আর দূর থেকে অরুণাভ দেখছে, ঊর্জা যেন কারো সাথে কথা বলছে আপন মনে। 

যাবে নাকি ঊর্জার কাছে আজ?  কখনো তো কথা বলেনি। দেখা হয়েছে কতবার। আজ কি দুর্বলতার পাশ কেটে ঊর্জার সামনে যেয়ে দাঁড়াবে?  জিজ্ঞাসা করবে, কেমন আছো তুমি ?

 ভাবতেই জানি কেমন স্থির হয়ে আসে অরুণভের কন্ঠ। শরীর স্থির হয়ে আসে।  আর ভাবতে পারে না কিছু। নিজেকে সচল করে রাখতে গিয়ে ঊর্জার কথা ভাবলেই তার কেন যে এমন হয়, সে বুঝে না। অথচ এই নিমন্ত্রণে এসে ঊর্জার দেখা পাবে, তা তার সাত কল্পনার বাইরে ছিল। ঊর্জা এখানে কেইটারার হিসেবে অনুষ্ঠান  তদারকির কাজ করছে – ঠিক তার সামনে। ভাবতেই জানি কেমন লাগছে অরুণাভের। প্রাণ ভরে দেখছে অরুণাভ তাকে। আশেপাশে আরো অনেক অতিথিরা এসেছেন। বসে গল্প শুরু করছেন। কিন্তু কোনদিকে অরুণাভের খেয়াল নেই। খেয়াল নেই তা ঠিক না, আসলে আশপাশ  তার আর আগ্রহের বিষয় মনে হচ্ছে না। সামনে যে ঊর্জা রয়েছে, তাকে দেখেই তার সবটুকু সময় যেন কেটে যাচ্ছে।

 অনুষ্ঠান শুরুর সময় দেওয়া হয়েছে সন্ধ্যা সাতটা।  চলবে রাত নয়টা পর্যন্ত। সাতটা বাজতে অতিথিরা এসে পড়তে শুরু করেছেন। ঊর্জা  টেবিল সাজানো, খাবার আনা নেওয়ার তদারকির ভার নিয়েছে নিজেই। বিকেল চারটা থেকে কাজ শুরু করেছে ওরা। ব্যুফে সিস্টেমে, অতিথিদের ডাকলেই তারা এসে এসে খাবার নিয়ে যার যার মতো টেবিলে বসে যাবেন। সারাটা ঘর সাজানো হয়েছে সাদা রঙের থিম দিয়ে। এই ঘরটা যেন হালকা কুয়াশা ঘেরা লাগছে। তাই বোধহয়  সাদা থিমের প্রভাবে সামনে তাকাতেই ঊর্জা, কুয়াশার প্রলপের মাঝে কোন একজনের দর্শন যেন লাভ করলো। কিন্তু আবারো প্রশ্ন তার মনে, কে ইনি?

 এবার সেই কন্ঠস্বর। আদেশ নয়। কিন্তু ফেলে দেবার মতনও নয়। শুনতেই যেন হবে। ঊর্জা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে এবার ওনাকে। সেইন্ট জার্মেইন স্বয়ং যেন তার সামনে।

 কিন্তু আসলে কি উনি?  এরকম অ্যাঞ্জেলিক সুপুরুষদের ছবি তো আমরা হরহামেশা  দেখি ইন্টারনেটে। আসলেই কি  তারা দেখতে এত দ্যুতিময় হয়? জানেনা ঊর্জা।

কিন্তু সে বিমোহিত। মোহগ্রস্ত। তাকালো আবার। কন্ঠস্বর বলে উঠলো, ‘তোমার যাওয়ার সময় হয়েছে। তোমায় যেতে হবে।‘ 

ঊর্জা এবার একটু যেন সচেতনতা ফিরে পেয়েছে। তাই জিজ্ঞেস করল দেবদূতরূপী সেই জনাকে, ‘কোথায় যেতে হবে?’ 

কি মায়া ভরা চোখ তাঁর। কি তীক্ষ্ণ সেই দৃষ্টি। কি প্রচন্ড মমতার ছোঁয়া। বলে উঠলেন, ‘তোমার যাওয়ার সময় হয়েছে। আমি তোমায় নিতে এসেছি। এখনি যেতে হবে।‘

 এবার ঊর্জার আর বুঝতে বাকি নেই। ইনি-ই ওর গার্ডিয়ান অ্যাঞ্জেল। তার আর সময় নেই এই ডাইমেনশনে থাকার । তার যে যেতেই হবে। কিন্তু এই ঘর ভরা মানুষের মাঝে নিমন্ত্রণ চলাকালীন সময়ে? অনুষ্ঠানের কি হবে?  সবাই যখন দেখবে ঘরের সেই বিশাল খাবার টেবিলের কোণায় মাথা নিচু করে একটি মেয়ে অজ্ঞান অবস্থায় পড়ে আছে। ( অজ্ঞান এজন্যই বলা, কারণ মৃত তো বলা যায় না হুট করে।) নাহ্  এই পরিবেশ তৈরি করতে  চায় না ঊর্জা। অথচ দেবদূতের তৎক্ষণাত আদেশ পরিবর্তন করে আরেকটু সময় কি সে পাবে না ? এইখানে এই কাজটা না হোক। বাইরে কোথাও।  অন্তত অরুণাভের সামনে নয়। অরুণাভ অনেকক্ষণ ধরেই দেখছে ঊর্জা স্ক্রিনের সামনের দিকে উপরে মাথা তুলে বিড়বিড় করে কারো সাথে কথা বলেই যাচ্ছে। কি হলো ঊর্জার আজ?  

এবার অনুরোধের পালা। ঊর্জা বিনয়ের সাথে আবদার করে ফেলল সেন্ট জার্মেইনকে। 

- ‘বাইরে যাই, এই ঘর ছেড়ে?’ 

- কোথায় যাবে? 

- হাসপাতাল তো কাছাকাছি নেই। তবে রাস্তার ওপারে একটা ফার্মেসি আছে। ওখানে যাব। অনুষ্ঠানের হোস্টকে বলার সময় তো পাবো না। আমার গ্রুপকে জানিয়ে যাব, যে ফার্মেসি যাচ্ছি ওষুধ আনতে। শরীর ভালো লাগছে না, বলা মিথ্যে বলা হবে। আমি কি ফার্মেসি পর্যন্ত যেতে পারি? আর কয়েকটা মিনিট সময় দিন। আমি স্থান ত্যাগ করতে চাই। এই ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে চাই। আমি অরুণাভ-র সামনে নিশ্চুপ প্রাণহীন হয়ে পড়ে থাকতে চাই না। ও আমাকে ওভাবে দেখুক, তা আমি চাই না। 

সেইন্ট জার্মেইন কিছু বললেন না। 

ঊর্জা উঠে দাঁড়ালো। উঁচু চেয়ারগুলোর পাশ দিয়ে হেঁটে ঘর থেকে বের হওয়ার সময় পিছনে ফিরে তাকালো। অরুণাভকে আরেকবার দেখে নিল।  সেই তীক্ষ্ণ ব্যক্তিত্ব, অপরূপ মুখশ্রী, মন ভোলানো হাসি আর দুষ্টুমি ভরা কালো চোখ। আর দেখা পাবে কিনা জানে না ঊর্জা। 

এই দুনিয়া ছেড়ে  ঊর্জা কোথায় যাবে তা তার জানা নেই। গন্তব্যহীন, ঠিকানা বিহীন যাত্রা। কিন্তু তার কাছে ঠিকানা না থাকলেও সেইন্ট জার্মেইন তা জানেন। তার দায়িত্বে, তার গাইডেন্সে ঊর্জার ‘এক্সিট’ হয়ে যাবে। এখন। ঠিক এখন। 

 রাত প্রায় আটটা। শীতের সময়য় অনেক রাত। ঊর্জা হাঁটতে হাঁটতে চলে এসেছে ফার্মেসির দরজায়। দরজার সামনে আরেকজন কেউ দাঁড়িয়ে আছেন। ঊর্জা তাকে চেনে না। তিনিও দীর্ঘকায়া সুদর্শন, সুপুরুষ। ঊর্জা হেঁটে ঢুকছে ফার্মেসির দরজা দিয়ে। কুয়াশা ঘেরা মেঠো পথ যেন সামনে । দুপাশে দুজন অ্যাঞ্জেল তার সাথে হেঁটে যাচ্ছেন। তাকে যে  যেতেই হবে। এখনই সময়। আর একটুও পরে নয়। ঘন্টাখানিক আগেও নয়। 

ঊর্জা চলছে। একাকী? 

না।

সাথে দুজন গাইড আছেন। 

অরুণাভ আজ আসবে বলে কেইটারিং –এর কাজটা সমাপ্ত করা পর্যন্ত সে ওখানে ছিল। হয়তোবা ভাগ্যেই লেখা ছিল। কাজ যখন শেষ হলো তখন ওর  দায়িত্ব শেষ। যাবার সময় । অনুষ্ঠান থেকে নয়। এই দুনিয়াদারি থেকে। 

ফার্মেসিতে কেইটারিং –এর কোন এক কর্মী প্রবেশ করার পথেই চেতনাহীন হয়ে পড়লে অ্যাম্বুলেন্স ডেকে তাকে নেবার ব্যবস্থা করা হয়। 

অনুষ্ঠান থেকে ঊর্জা কেন চলে গেল তা দেখবার প্রয়োজন তো অভ্যাগত অতিথিদের ছিল না। শুধু অরুণাভ তার সকল মনোযোগটুকু দিয়ে ওকে ঘরের বাইরে চলে যেতে দেখেছে। তাদের কেইটারিং এর কত কাজই না থাকে, বিশেষ করে হল –ঘরের পেছনের কিচেনে। কিন্তু সামনের দিকের দরজা দিয়ে ঊর্জা বের হয়েছে। যাবার বেলায় অরুণাভকে এক ঝলক দেখেছেও। শান্ত, স্থির ভঙ্গিতে ঊর্জা হলঘর প্রস্থান করেছে। সন্ধ্যে আটটার দিকে। এখন অনুষ্ঠান প্রায় শেষ। কিন্তু ঊর্জা এখনো তার ডেস্কে ফেরেনি। অরুণাভ চলে যাবে দশটার দিকে। 

অনুষ্ঠান শেষ হলে আর কেনই-বা এই হলঘরে একা একা বসে থাকবে? কার জন্যই বা অপেক্ষা করবে ? ঊর্জা তো বাইরে গিয়েছে। সে তো এখানে নেই। আসবে কিনা জানেও না। কথা বলাই যে হয়নি কখনো, তার সাথে।

…………

৩১/০১/২০২৬

Sunday, September 15, 2019

প্যারালাল রিয়্যালিটি

শীলা গার্নার,এদোয়ার্ড রুশো,কেটি –এই তিনজন তিন জগতের বাসিন্দা যারা তাদের অজান্তেই যুক্ত হয়ে আছে একে অপরের সাথে। কিন্তু কিভাবে?

শীলা গার্নারের রিয়্যালিটিঃ

ঘটনার সবটুকু স্মৃতি ছয় বছর পর আজও  শীলার মনে উজ্জ্বল।

শব্দটা এমন বিকট হবে, ও ভাবতে পারেনি। শেলফ্‌ থেকে ছোট্ট টিনের ক্যান ধপাস করে পড়ে যাবার শব্দ যে এত অবিশ্বাস্য রকমের বিকট হতে পারে তা শীলার জানা ছিল না। হাতের তালুতে আঁটে এমনই এই ছোট্ট ক্যানটি ধরতে না ধরতেই পিছলে পড়ে গেল ঐ পাশটাতে। আর পড়ে যাওয়া মাত্রই কেউ যেন ক্যানটিকে এর ওজনের চেয়ে দশগুন ভারী করে ফেলল। কর্মরত দোকানী, যিনি বেশ খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি এমন বিকট আওয়াজ শুনে ত্রস্ত হয়েই ছুটে এলেন। কিন্তু পরিস্থিতি সামলে নিতে শীলার বেশী সময় লাগলো না। নিজে বেশ হকচকিয়ে গেলেও ধীরে সুস্থে টিনের কৌটাটি  তুলে স্তরে স্তরে সাজানো ক্যান ফুডগুলোর ওপর আবার সাজিয়ে রাখলো। কিন্তু ও বুঝতে পারছিল না, কেনই বা আঙ্গুলের মৃদু ছোঁয়ায় কৌটোটি পড়ে গেল – যা পড়ার কথা না, আর কেনই বা এতটা শব্দ হলো! এ যেন মোটেই স্বাভাবিক নয়।   

ওর হঠাৎ -ই মনে হলো মাথাটা ঝিমঝিম করছে।   

হারিয়ে যাচ্ছে যেন কোথাও।

অন্য কোন জগতে নয় তো? নাকি সে এখন খুব বিভ্রান্ত।

শীলা আজও  জানে না। তবে স্পষ্ট মনে আছে -ও বেশ হকচকিয়ে ওঠার পর ভীত হয়েই ঐ স্থানটি তৎক্ষণাৎ ত্যাগ করেছিল। পাশের আইল পেরিয়ে চলে গিয়েছিল বিশাল স্টোরটির একদম অপর প্রান্তে, স্টেশনারি জিনিসগুলো সাজিয়ে রাখা হয়েছে যেখানে। খুঁজছিল কিছু প্রয়োজনীয় কলম, কাগজ আর ফোল্ডার। সে দিকটায় কোন ক্রেতা নেই বললেই চলে। কর্মচারীদের উপস্থিতিও নেই। এই কিছুক্ষণ আগের বিকট শব্দের কথা ভুলেই মনোনিবেশ করলো স্টেশনারি জিনিসগুলোর দিকে। 

পছন্দমতো কিছু নির্বাচন করতে গেলে কেনাকাটার ক্ষেত্রে সময় বেশ দ্রুতই চলে যায়। শীলা নিজের মনে ভাবলো তাড়াতাড়ি কাজ সেরে বাড়ি ফিরবে।আর তা ভাবতেই আইলের পাশ ঘেঁষে মনে হলো যেন হাইওয়ে ধরে গাড়ি চলছে।ঠিক তখনই অনুভব করল, ও যেন দাঁড়িয়ে আছে জনাকীর্ণ  রাস্তার মাঝখানে। কোথায় দোকানের শেলফগুলো?  শীলা চারিদিকে তাকালো।

নাহ্‌ সব ঠিক আছে। দোকানের এই নির্জন জায়গাটিতে সারি সারি শেলফ্‌ ছাড়া কিছুই চোখে পড়ছে না।অথচ নিজেকে অনুভূত হচ্ছে অনেক মানুষের মাঝে কোলাহল পূর্ণ জনবহুল এক রাস্তায়।

কি আশ্চর্য!

কাঁধের পাশ দিয়ে দু’জনের সাথে ধাক্কা লাগলো যেন। মনে হচ্ছে কোন এক রাস্তার মাঝে ও দাঁড়িয়ে যেখানে শোঁ শোঁ শব্দ করে দ্রুত বেগে গাড়িগুলো চলে যাচ্ছে।

এই স্টোরের আন্ডারগ্রাউন্ড বেসমেন্টে –এর নীচে কোন রাস্তা নেই তো?

না হলে এমন মনে হচ্ছে কেন? গাড়িগুলো যেন এখন পায়ের নীচে দিয়ে যাচ্ছে।নাকি এই স্থানেই দুটো আলাদা ডাইমেনশানের সম্মিলন ঘটেছে? একই সঙ্গে স্টোরের সুনশান  নীরবতা আর কোলাহলে ভরা গাড়ির শব্দ মিলে মিশে যেন একাকার হয়ে যাচ্ছে।

 

এদোয়ার্ড রুশোর রিয়্যালিটিঃ

নিউইয়র্কের বেশ জনাকীর্ণ রাস্তা টাইম স্কয়্যার।কোন বিশেষ কারণে লোক সমাগম না হলেও ভীড় যেন লেগেই আছে এখানে। রুশো বেশ কিছুদিন হলো এসেছে এ শহরে।এত জনবহুল স্থান সে আগে কখনোই দেখেনি। মফঃস্বল থেকে মাত্র এসে খুব বড় শহরের ধাক্কা সামলাতে বেশ কিছু সময় লেগে গিয়েছে। খুব মনে পড়ে তার সেই ফেলে আসা খোলা প্রান্তর, উঠোনওয়ালা বাংলোয় গাছপালায় ঘেরা সবুজ বনানী। শহুরে জীবনে এসব পাওয়া দুষ্কর।তার বহুতল ভবনের অপর দিকে রয়েছে ছোট্ট একটি দোকান।রুটি, মাখন আর জ্যাম কিনবার জন্য রুশো ওখানেই চলে যায় যখন তখন।আজও  হালকা জ্যাকেটটা গায়ে চাপিয়ে এলিভেটর ধরে নেমে এলো নীচের তলায়। বিল্ডিং থেকে বেরিয়ে সামনের খোলা এত্তটুকুন জায়গায় যে বিশাল ক্রেইন বসানো হয়েছে তারই কাজ চলছে রাস্তার ওপাশে। মেরামত কাজের জন্য এসেছে ভারী ভারী যন্ত্রপাতি বহনকারী গাড়ি। এত শব্দ রাস্তায় অথচ ঘর থেকে কিছু টেরই পাওয়য যায় না ।বুঝতে পারা যায় না কত শব্দ যন্ত্রণার রাজ্যে তার বসবাস। এসবের ভীড় ঠেলে এগুতে না এগুতেই হঠাৎ তার মনে হলো আশপাশের গাড়িগুলো যেন উধাও।

সুনশান এক নীরবতা।

ও যেন দাঁড়িয়ে আছে কোন বিশাল এক দোকানের সারি সারি শেলফের মাঝখানে।(ঠিক শীলার মতন।)হেসে ফেলল মনে মনে। দোকানেই তো যাচ্ছে রুশো। কিন্তু পৌঁছানোর আগেই যেন পৌঁছে গেল!

আসলে আনমনা হলে এমনি হয়। যেমনটি এখন হলো। দু’জন পথচারী এক্কেবারে গায়ের ওপর এসে পড়েছে যেন।দোষ রুশোরই। অন্যকিছু ভাবছিল বলেই হয়তোবা খেয়াল করেনি ওদের। তাই অতর্কিতে এই ধাক্কা। তারপরও তো জনস্রোত থেমে নেই।সবাই যে কাজ সেরে যযার যার মতন বাড়ি ফিরছে এই সন্ধ্যায়।

জনাকীর্ণ এ রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে রুশো। ঠায়।

কেন?

ওর মনে হচ্ছে এত ভীড় যেন হঠাতই উধাও । খুব অসংযুক্ত এক অনুভূতি। চারপাশ থেকে নিজের অসংযুক্তি।তাই নিজেকে হারিয়ে ফেলা। সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া  তার চারপাশ থেকে, ক্ষণিকের জন্য। আর ঠিক এমন সময়ই সেই অবিশ্বাস্য রকমের বিকট এক শব্দ। এক বিশাল পাথরখন্ড ক্রেইন থেকে এসে পড়লো সামনের ডাম্পিং গ্রাউন্ডে।বিকট শব্দে রুশো যেন সম্বিৎ ফিরে পেল।

কোথায় ছিল ও এতক্ষণ? ক্ষণিকের জন্য যেন চারপাশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে অন্য এক বাস্তবতায় ঠাঁই নেওয়া, তারপর আবার ফিরে আসা এই টাইম স্কয়্যারেই।  

অথবা অন্য কোন ‘সময়ে’ চলে গিয়ে সব ভুলে যাওয়া।তারপর এলোমেলো হয়ে আবার ফিরে আসা।

কোথায় ছিল সে?

কোথায় যেন ছিল, কোন এক বিশাল স্টেশনারি দোকানের মাঝে। বিকট শব্দে নিজেকে আবার আবিষ্কার করলো সেই ক্রেইনটির কাছে, তার বিল্ডিং –এর উল্টোদিকে  ছোট্ট দোকানটির সামনে।

কেটির রিয়্যালিটি

কেটি সানফ্রান্সিস্কো শহরে এসেছে বেশ কয়েক বছর হলো।এখানকার মিউজিয়ামে কাজ পেয়েই তার এই শহরে আগমন।।নয়নাভিরাম এ শহরে ট্যুরিস্টের আনাগোনা সবসময় লেগেই থাকে। আর এই মিউজিয়ামটি ঝকঝকে তকতকে রাখার দায়িত্ব যে তারই।অবসর মেলে না একটুও । মিউজিয়ামের সামনের দিকে অতিথিদের আগমনের পথে বেশ বড় একটা পোট্রেইট আছে, যার পাঁশে পাথর খোদিত একটি মূর্তি ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে একটি বেদীর ওপর। পাশেই টেবিলে রাখা গেস্টবুকে অতিথিরা সই করেন।

আজকের দিনটা একটূ অন্যরকম কেন যেন। কাজের ফাঁকে বিকট শব্দে! কেটি হকচকিয়ে উঠলো। বেদীর উপর বসানো পাথরের মূর্তিটা হঠাৎ-ই যেন কোন কিছুর বিশাল ধাক্কায় পাশের টেবিল ঘেঁষে মাটিতে পড়ে গেছে।

কিন্তু কেন এমন হলো?

পোট্রেইটের ফ্রেম পরিষ্কার করার কাজে ও এমন ব্যস্ত ছিল যে খেয়াল  করেনি তেমন একটা। আর তখনই এক বিকট আওয়াজ। পিছনে ফিরে তাকালো কেটি। যেন অনেক মানুষের কোলাহল। কিন্তু ঘড়িতে তাকিয়ে দেখলো ভিজিটার্স আওয়ার্স তো শেষ!

তাহলে কেন এত কোলাহল?

কেটি অবাক হয়ে চেয়ে আছে প্রবেশ পথের দরজার দিকে।ও দেখতে পাচ্ছে হল-ওয়ে দিয়ে অজস্র মানুষ হেঁটে কোথায় যেন যাচ্ছে। এ যেন মিউজিয়াম নয়, এক কোলাহল পূর্ণ জনাকীর্ণ রাস্তা। এত ভীড় যে খুব দূরত্ব বজায় রেখেও হাঁটা যাচ্ছে না। কেটির, দুজনের সাথে ধাক্কাও লাগলো । ও হারিয়ে ফেলেছে নিজেকে ঘিঞ্জি এক উঁচু -দালানের শহরে। এ কোন রিয়্যালিটি ? কেটি কি জানে যে এই রিয়ালিটিতে মেওন কেউ আছে যাকে সে চেনে?

বিশাল ফ্রেমে বাঁধানো পোটেইট- টি দেখতে পাচ্ছে না আর। ওর সামনে দাঁড়িয়ে আছে টাইম স্কয়্যারের সেই বিশাল ঘড়িটা। রাস্তায় চলছে মেরামতের কাজ। রাস্তার মাঝে দাঁড়িয়ে আছে একটি অল্প বয়সী ছেলে। কেটি  যেন ওকে আগে থেকেই চেনে। ওর নাম রুশো।

কিন্তু কিভাবে চেনে?

কেটি জানে না।

এখন ওকে যেতে হবে রাস্তা পার হয়ে সামনের দোকানে। আজ তার ক্যান- ফুড কেনার ইচ্ছে আছে।দোকানে এসে শেলফের পাঁশে দাঁড়ানো মাত্রই দেখলো শেলফের কাছে দাঁড়িয়ে আছে খুব পরিচিত একটি মেয়ে। নামটিও তার যেন জানা।

শীলা। কিন্তু এ কিভাবে সম্ভব?

কেটি কি ঘুরে বেড়াচ্ছে বিভিন স্থানে, বিভিন্ন সময়ে আর নিজেকেই খুঁজে পাচ্ছে তার সত্তার প্যারালাল সত্তা হিসাবে শীলাকে বা রুশোকে?

 প্যারালাল রিয়্যালিটির সংযুক্তিঃ

সিকিউরিটি গার্ড ছুটে এসেছেন পড়ে যাওয়া মূর্তিটির কাছে।কিভাবে এত শক্ত গাঁথুনীর বেদী এক ধাক্কায় নষ্ট হলো, ওরা বুঝে উঠতে পারছে না। কেটি তো জানেই না।এইমাত্র তো সে ছিল নিউ ইয়র্কের টাইম স্কয়্যারের সামনে। বেশ চেনা এক ছেলেকে দেখেছে ওখানে। রাস্তা পার হয়ে স্টোরে প্রবেশের পথে দেখেছে আরেকটি চেনা মেয়েকে। নাম যেন কি? এমন সময়ে মিস গার্নার ডাক দিলেন তাকে পেছন থেকে।

-   কেটি।

ফিরে তাকালো কেটি মিস গার্নারের দিকে। তার নেইম প্লেটে তার নাম দেখে চমকে উঠলো কেটি। এ নাম তার পরিচিত। শীলা গার্নার।শীলা পরিচয় করিয়ে দিলেন মিউজিয়ামের কর্মীর সাথে।

মি. এদোয়ার্ড রুশো।

এবার কেটি খানিকটা বিভ্রান্ত।

খুব পরিচিত মনে হচ্ছে ভদ্রলোকের নামের শেষ অংশ। যেন খুব পরিচিত একজনের নাম।ভাঙ্গা মূর্তির অংশগুলোর ট্র্যাশ সংগ্রহ করে নিয়ে যাবার জন্য এসেছেন তিনি। হাতে মস্ত ঝুড়ি।কোথায় যেন এমন নামের মানুষগুলোর দেখা পেয়েছে সে একটু আগেই।

আজকের দিনটা কেটির জন্য অভূতপূর্ব এক অভিজ্ঞতার দিন। চারপাশের চেনা মানুষগুলো কেমন যেন বেশী বেশী পরিচিত মনে হচ্ছে কেটির কাছে। নিজেকে হারিয়ে ফেলছে বারবার তাদের সাথে। চারপাশের বাস্তবতার বাইরেও যেন অন্য কিছু আজ সে অনুভব করছে। অন্য কোন বাস্তবতা তার কাছে যেন একই সময়ে ফিরে ফিরে আসছে বর্তমান হয়ে। ঘুরে ফিরছে সে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে।এক সময় থেকে অন্য সময়ে। এক বাস্তবতা থেকে  অন্য বাস্তবতায়।

তারপর?

তারপর আবার নিজ কর্মস্থলে। প্যারালাল রিয়্যালিটির সেই সত্তারা ভিন্ন পরিচয়ে এখন দাঁড়িয়ে আছেন তার সামনে মিস শীলা গার্নার এবং এদোয়ার্ড রুশো নামে।   

ওর যে এদের সাথে দেখা হয়েছে অন্য রিয়্যালিটিতে।  কেউ কি বিশ্বাস করবে তার এই অভিজ্ঞতার কথা?

মিস শীলা গার্নার জিজ্ঞাসা করলেনঃ কেটি, তুমি কি ভেঙে যাওয়া মূর্তির টুকরোগুলো সরিয়ে এনে মি. রুশোকে তার কাজে সাহায্য করতে পারবে? 

কেটি ফিরে তাকালো মিস শীলার দিকে।

জবাবে বলল, নিশ্চয়ই।

………।।

সেপ্টেম্বর, ২০১৯

Tuesday, March 15, 2016

সময়ের ফাঁদে

মিনার আজ একটু সকাল সকাল বের হয়েছে বাড়ী থেকে। টার্ম পরীক্ষা শুরু। বাড়ি থেকে প্রায় আট কিলোমিটার দূরে যেতে হবে। কলেজ যেতে বেশ খানিকটা পথ পেরুতে হয় গ্রানের সরু রাস্তা ধরে ঐ বনের মাঝ দিয়ে। তারপর একটা ছোট্ট জলাশয়। পার  হলেই বড় রাস্তা। রাস্তা ধরে কিছুদূর এগুলেই কলেজ প্রাঙ্গণ। পরীক্ষার দিন বলেই প্রতিদিনের বাঁধা সময় থেকে একটু সময় বেশীই তাহে রেখে আজ বের হয়েছে। সিকালে পিঠা,গুড় মুড়ির নাস্তা।মায়ের হাতের তৈরী নাস্তার স্বাদ যেন আলাদা। খেয়ে কিছু সঙ্গে নেবে কিনা জিজ্ঞেস করাতে মাকে বলল, আজ নয়। কিন্তু আজ যে পরীক্ষার দিন। মা জোর করেই একটু নাস্তা তার টিফিন বক্সে দিয়ে দিল।৮টায় ক্লাশ শুরু হলে সাড়ে সাতটার দিকে মিনার বেরিয়ে পরে অন্য দিনগুলোতে।আজ আরেকটু আগেই বের হলো। সকাল সাতটা তখন।শীতের সকাল। মেঘের আড়াল হতে সূর্য উঁকি দিতে আলসেমি করছে।চারিদিকে পাখির কিচির মিচির। কুয়াশাচ্ছন্ন মেঠোপথ ধরে মিনার হাঁটতে থাকে। পিছনে মা দাঁড়িয়ে আছে সদর দরোজার চৌকাঠে।পিছনে ফিরে তাকালো মিনার।প্রতিদিনই তো পিছনে ফিরে মাকে দেখে।কিন্তু আজ যেন কেমন একটু লাগলো।বুঝাতে পারবে না। এ যেন কেমন এক অনুভূতি,। মাকে যেন আর দেখতে পাবে না এমনিই কিছু একটা মনে হলো।আর তা ভাবতেই বুকটা ধ্ক করে উঠলো।

নাহ্। কি সব ভাবছে। পরীক্ষার চিন্তায় শুধু উল্টাপাল্টা কথা মনে আসছে। এসব ভাবার কি কোন মানে হয়? তাই হাত নেড়ে হাসিমুখে সামনে রওনা দিল।সরুপঠটা চলে গেছে গাছপালা ভরা ঐ জংগলের দিকে। জঙ্গল পেরুলেই ছোট্ট একটি খালা। আর তার ঐ পাড়েই তো কলেজ।ছোটবেলায় একা আসেনি। বাবা থাকতো তার পথচলার সাথে। একঝন কলেজে উঠে সে একাই পারে এটুকু পথ পাড়ি দিতে। আর পারবেই না কেন।তার আজন্ম বেড়ে উঠা এখানে। এ গ্রামের পথে ধরে চলাফেরা নতুন কিছু তো নয়। গাছ গাছালীতে ভরা জংগলের এই জায়গাটা বেশ মজার।অনেক পাখির কল কাকলি।পাতার ফাঁক দিয়ে সূর্যের উঁকি। আজ যদিও বা বড্ড কুয়াশা। তার উপর একটুই  আধাঁরচ্ছন্ন।

মিনার হাঁটছে,। বেশ কিছুদূর এসে গেছে।মিনিট দশের পথ । তা পেরুলেই জংগল শেষ। এগুতে এগুতে বেশ ক্লান্ত বোধ হচ্ছে হঠাৎই। সারারাত পরীক্ষার প্রস্তুতিতে ভোরের দিকে যা একটু ঘুমিয়েছে।ভাল ঘুমও হয়নি তার। এখন যেন রাজ্যের ক্লান্তি। কিন্তু এ পথ এখনো শেষ হচ্ছে না কেন?

মিনার হাঁটছে তো অনেকক্ষণ।       

সময়ের হিসাব রাখেনি। রাখলে বোধহয় দেখত আধাঘন্টার বেশী হয়ে গেছে। সে এগিয়ে চলছে কিন্তু পথের যেন শেষ মিলছে না। ক্লান্তিতে শরির অবসন্ন।ঘুমে জড়িয়ে আসছে চোখদুটো। হেলান দিয়ে বসে পড়লো ছাতিম গাছের তলে।

তারপর?

আর খেয়াল নেই একদম যেন ঘুমের রাজ্যে –গভীর ঘুমে।

এদিকে সকাল গড়িয়ে দুপুর।কুয়াশা কেটে গেছে।চারিদিকে ঝলমলে দিন।সূর্যের হাসি খেলা পাতার ফাঁকে ফাঁকে।হঠাৎ কোথা হতে কর্কশ কন্ঠে পেঁচা ডেকে উঠতেই মিনারর ঘুমটা ভেঙে গেল।

অনেক দেরী হয়ে গেল না তো? চারিদিকে তাকিয়ে মিনার তো হতভম্ব। সকাল শেষে এখন দুপুরও শেষ প্রায়।পরীক্ষা তো এতক্ষণে শেষ হয়ে যাবার কথা। তাহলে তো ও পৌঁছাতে দেরী করে ফেলল, ভাবতে ভাবতে মিনার উঠে দাঁড়ালো। হাতের ব্যাগটা নিয়ে খুব দ্রুত গতিতে হাঁটা দিল।একটু পরেই জংগলের শেষ প্রান্তে সেই খালের ধারে এসে দাঁড়াল। বছরের এই সময়ে তেমন গভীর জল থাকে না।কিন্তু এখন তো দেখল এক ফোঁটা জল জমার মত তেমন কোন গভীরতাই নেই ।খালটা কেমন যেন একটা সমতল ভূমিতে পরিণত হয়েছে। এই কয়েক ঘন্টায় এত পরিবর্তন। গতকালও তো এতটা মসৃণ সমতল চোখে পড়েনি।

মিনার পা বাড়ালো। একটু এগুতেই বড় রাস্তা। রাস্তাটাকে বেশ যেন চওড়া আর মসৃণ দেখাচ্ছে। মনে হচ্ছে অনেকটা বিদেশ বিদেশ। রাস্তাটা আধুনিক প্রযুক্তিতেই নির্মিত ছিল কিন্তু আজ যেন মনে হচ্ছে অত্যাধুনিক এক মহাসড়ক।  

রাস্তা পার হয়ে কলেজ ক্যাম্পাসের সামনে এসে দাঁড়াতে দেখল বিশাল বড় নামে কলেজ গেইট যেন নতুন সাজে সজ্জিত।আজ যদিও টার্ম পরীক্ষার দিন, কিন্তু এর পাশাপাশি আরো কোন অনুষ্ঠান আছে কিনা কে জানে? তাই কলেজ গেইট এতো সুন্দর করে সাজান? ভিতর প্রবেশের পথে দারোয়ান বাধা দিল। সে যথারীতি পরিচয়পত্র বের করে দেখালো। 

তারিখ ১৫ই মার্চ ২০১৬.

দারোয়ান তার দিকে চমকে তাকালো।মিনার বুঝতে পারছে না কিছুই।আজ তার পরীক্ষা। কোথায় না তাড়াহুড়ো  করে ভেতরে ঢুকিয়ে দেবে তা না, দারোয়ান তার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে কি দেখছে? নতুন দারোয়ান বোধহয়। ওর কাছেও উনি অচেনা। তাই পুরোনো ছাত্র চিনতে পারছে না। ঢুকতে গেলে দারোয়ান বাধাঁ দিয়ে এমন একটা অবাককর প্রশ্ন করে বসলো যার জন্য মিনার কখনোই প্রস্তুত ছিল না। 

: আপনি এই প্রবেশ পত্র পেলেন কোথায়?

মিনার হেসে ফেললো।বললো, ‘আজ আমার টার্ম পরীক্ষা। আজকের জন্য এ প্রবেশপত্র আমি তো দু’দিন আগে সঙ্গগ্রহ করেছি।’     

দারোয়ান বেশ অবাক হয়ে তাকিয়ে থেকে তারিখটা দেখাল মিনারকে। বললো,, ‘আপনার প্রবেশ পত্রের তারিখ তাহলে ভুল আছে।’

: কিন্তু কি সেই ভুল?

: ২০১৬ সাল লেখাটায় ভুল। মনে হয় ছাপার ভুল হবে। এমন প্রবেশ পত্র তো কখনো দেখিই নি। আর কাগজগটা খুব পুরনো।

মিনারের এবার হেসে ফেলতে কোন বাধা নেই। জিজ্ঞেস করলো, ‘তা কত সাল হওয়া উচিৎ?’

দারোয়ান বলল, ‘এখন তো ২২১৬’ আপনি যেন ২০০ বছর আগের সময় হতে এসেছেন।

মিনার চারিদিকে তাকালো। সামনের মাঠে চোখ পড়ে গেল। সেই টিনের চালে ঘেরা শ্রেণী কক্ষগুলো গেল কোথায়? এতো অত্যাধুনিক সব বিল্ডিং এখন। মূল ভবন, ক্যান্টিন, ছাত্র হস্টেল সব যেন সুউচ্চ ভবনে এক জায়গায় সীমাবদ্ধ করে ফেলা হয়েছে।

নিজের দিকে তাকিয়েও বেশ অবাক লাগছে। এত মলিন কেন ওর ইউনিফর্ম?আই.ডি. কার্ড বের করবে বলে কাঁধের ব্যাগটা নামাল। ব্যাগ খুলতেই মায়ের দেয়া টিফিন চোখে পড়লো। একি অবস্থা খাবারের? সব খাবার শুকিয়ে যেন ধুলোর মতো গুড়ো হয়ে গিয়েছে।   

মিনার থতমত খেয়ে পরীক্ষার হলের দিকে রওনা দিল। কিন্তু কলেজ ভবন যে বড্ড অচেনা। চারপাশের ছেলে মেয়েগুলো এমন কেন?যেন অন্য কোন গ্রহ থেকে এসেছে। অদ্ভুত এক অচেনা পরিবেশ। কাউকে চিনতে পারছে না। স্যারদের দেখা মিলছে না। হেড স্যারের কক্ষ বের করতে বেশ অসুবিধা হলো। না চেনে এই কলেজের করিডোর না চেনে হল-ওয়ে।

অবশেষে দেখা মিললো, কিন্তু স্যারের সাথে কথা বলতেই হোঁচট খেতে হল।আজ কোন টার্ম পরীক্ষা নেই। আর মিনার যে সব কথা বলছে, হেড স্যার কোন ভাবেই মিলাতে পারছেন না। মিনারের পোশাক, কথার ধরণ, বিশেষ করে প্রবেশ পত্রটা। এত প্রাচীন পুরনো ধাঁচের ছাপা অক্ষরের কাগজ হাতে করে এই ছাত্রটি কোথা হতে এসেছে বুঝে উঠতে বড্ড কষ্ট হচ্ছে স্যারের। আজকাল কাগজের ব্যবহার নেই। প্রবেশ পত্র ছাপানোর প্রযুক্তি তো উঠে গেছে সেই কবে। আরো অদ্ভুত হলো এই প্রবেশ পত্রের তারিখ। আজ একই দিনে ২০০ বছর আগের তারিখ নিয়ে ছেলেটি এসেছে। সে এলো কোথা থেকে?

পরীক্ষা হবে না জেনে মিনার চলে এলো বাইরে।বাসায় ফিরতে হবে। বিকেল প্রায় শেষ। রাস্তা পেরুলেই সেই জংগল। যেতে যেতে প্রায় আধা ঘন্টা। মিনার টিফিনের খাবারটুকু ফেলে দিল।এই কয়েকঘন্টায় তার শুকনো খাবার কিভাবে পাউডার হয়ে গেল ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না।সামনে এগিয়ে বাড়ির পথ।মেঠো পথ ধরে আগাতে গিয়ে লক্ষ্য করলো চারপাশের ধানী জমিগুলো উধাও হয়ে গেছে। 

এত কলকারখানা এলো কোথা থেকে? 

আরেকটু এগুতেই বাড়ির উঠোন। কিন্তু কিছুই যে মিলছে না।কোথায় তার বাড়ি? এখানে যে বহুতল বিশিষ্ট সুউচ্চ ভবন। মিনার এবার বিদ্ধ্বস্ত। চারিদিকে তাকিয়ে কোন মানুষের চিহ্ন পেল না। তাহলে এত সুউচ্চ ভবনগুলোতে কারা বাস করে? কারা এরা? এরা এলো কোথা থেকে আর কেনই বা এরকম প্রত্যন্ত গ্রামে এমন স্বপ্পপুরী বানিয়ে বসবাস শুরু করেছে?

মিনার সামনে এগুলো। তন্ন তন্ন করে খুঁজছে তার ঘরের দুয়ার। ঘরে মা যে অপেক্ষা করে আছে তার জন্য।

কিন্তু আর কত অপেক্ষা? বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা এখন।সেই সাত সকালে বেরিয়ে এখনো ফিরেনি মিনার।চিন্তায় অস্থির হয়ে মা লোক পাঠালেন কলেজে খবর নিতে। সন্ধ্যার দিকে খবর পেলেন মিনার আজ কলেজে আসেই নাই। মিনারকে কেউ রাস্তা দিয়ে হেঁটেও যেতে দেখেনি।হতবিহ্বল মা শরীরের সমস্ত শক্তি ছেড়ে দিয়ে বসে পড়লেন বারান্দায়। কিছু ভাবতে পারছেন না। কোথায় যেতে পারে তার ছেলে, আর তো কোন জায়গায়ও নেই এই অজ পাড়াগাঁয়ের আশপাশে।গাঁয়ের সকলে জড়ো হয়েছে মিনারের বাড়িতে। সকলেই খুঁজছে মিনারকে। কোথাও তার হদিস মেলেনি। অথচ মিনার দাঁড়িয়ে আছে ঠিকই তাদের সকলের মাঝে।সে দেখতে পাচ্ছে না বাড়ির উঠোন, গাঁয়ের সমস্ত লোকজন। দেখছে সুউচ্চ এক ভবন। সকলের মাঝে দাঁড়িয়েও সে যেন নেই। দিনটি মার্চের ১৫ তারিখ।স্থানটিও এক। শুধু সময়ের ভেলায় চড়ে মিনার  দুইশত বছর পার হয়ে এসেছে কোন এক ভাবে।

  ……।।

১৫/০৩/২০১৬ 


Sunday, September 27, 2015

নিঃসঙ্গ যাত্রী

 - আপনি?

- হ্যা  আমি!

- আপনি এখানে? ... কেমন করে? 

হেসে ফেললেন তিনি। সেই চিরচেনা হাসি,কিছুটা দুষ্টুমিতে ভরা। চঞ্চল কালো চোখে বুদ্ধির ঝিলিক। খুব উজ্জ্বল দেখাচ্ছে ওনাকে। উজ্জ্বল আভার মাঝে তার স্বর্গীয় সৌন্দর্য্যের মুখচ্ছবি ধীরে ধীরে আরো স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হচ্ছে। পুরো অবয়বই যেন দেখতে পাচ্ছে আমরিন এখন তার সামনে। নির্মল এক আনন্দের অনুভূতি। তার কোন ব্যথা নেই,কোন যন্ত্রণা নেই। তাকে দেখেই কি সব কষ্ট নিমেষে শেষ হয়ে গেল? এক যন্ত্রণাদায়ক চিকিৎসার মাঝে তো সে রয়েছে মাসখানেক ধরে। আর এ সপ্তাহে তার শারিরীক অবস্থা আরোও খারাপের দিকে গিয়েছে। ডাক্তাররা শেষ কথা বলেছেনও তার পরিবারকে। পরিবার মানে তার বাবা,মা, ভাই, বোন সবাই এখন তাকে ঘিরে। 

এখনই শুধু নয়, বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে আমরিনকে ঘিরে রয়েছে সকলে। প্রানান্ত চেষ্টা যেন যে কোন ভাবেই হোক আমরিনকে ঠেকাবে ওরা না যেতে দিতে। কেউই তো চায় না তার প্রিয় মানুষটি তাকে ছেড়ে চলে যাক না ফেরার দেশে। আসলে আমরিনের অসুস্থতা বছরখানেক ধরে। চিকিৎসার শেষ পর্যায়ে মাসখানেক হলো সে হাসপাতালের কক্ষে। এখানে সে আসতে চায়নি। শেষ ঠাঁই তার এখানে হোক কক্ষনো সে চায়নি। কিন্তু সব কথা তো বলেও সময় হয়ে উঠলো না তার সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার। 

আর এখন? 

দীর্ঘ কয়েকদিন ধরে অবচেতন থাকার পর  আরোও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে তাকে বাড়িতে নিয়ে যাবার। কিন্তু বাড়ি নিতে না পারলেও একমুহূর্ত কাছ ছাড়া করছে না তাকে তার পরিবার পরিজনেরা। আজই যেন কেমন একটা দিন অতিবাহিত হলো। 


রক্তলাল হয়ে দেখা দিবে চাঁদ আজকের আকাশে। খুব অদ্ভুত এক দিন আজ। কিন্তু মানসিক চাপ দীর্ঘদিন ধরে নেবার পরও সবার মনে যেন আজ আনন্দের দোলা। সেজন্যই বুঝি খুব অন্যরকম এক দিন আজ। সবার মন বলছে আমরিন আজ চোখ মেলবে। আর এরই প্রতীক্ষায় সারাটি দিন গড়িয়ে দুপুর প্রায়। হাসপাতালের নির্জন বারান্দায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে আছে সবাই। ওর বাবা, মা দাঁড়িয়ে আছে ওর হাতে হাত রেখে। এ পৃথিবীতে ওর আগমনের সময় যেমন তারাই তাকে স্বাগত জানিয়েছিলেন, তেমনি আজ কি তাকে বিদায় জানাবার ভারও তাদের হাতে এসে পড়েছে? কিন্তু এই কি তারা চান? কোন পিতা মাতাই তো তার সন্তানের মৃত্যু দেখতে চান না। কিন্তু হঠাৎই তাদের লক্ষী মেয়েটি আজ বড্ড অসুস্থ। অচেতন হয়ে আছে কয়েকদিন হয়ে গেল। কতবারই ডেকেছে তার নাম ধরে কিন্তু কোন সাড়া নেই, কোন শব্দ মেলেনি। কোথায় চলে গেল তাদের মেয়েটি? নাকি গভীর ঘুমে আছে,আবার জেগে উঠবে। কিছুই তো আর বোধগম্যে হয় না। ডাক্তার নার্সকে জিজ্ঞেস করলে,চুপ করে থাকে ওরা। মেশিন রিডিং দেখে চলে যায় তারা। আজ যদিও চীফ মেট্রন ইমরোজ এসেছেন ওকে দেখতে। খুব দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালনে সিদ্ধহস্ত বলেই ইমরোজের খ্যাতি এই হাসপাতালে সর্বজন বিদিত। ঘরে প্রবেশের পরপরেই যখন উনি জানালার পর্দাটা সরিয়ে দিলেন,বাইরের ঝকঝকে রোদ্দুর ঘরে এসে প্রবেশ করলো।


আমরিন ঘুমিয়ে আছে। নিবিড় তার ঘুম। চীফ মেট্রন ইমরোজ এসে তার পায়ের কাছে দাঁড়ালেন। স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন আমরিনের দিকে। ঘুমের ঘোরেই যেন আমরিন এবার হেসে ফেললো। বাবা, মা সচকিত হয়ে ইমরোজের দিকে তাকালেন। তাদের এ এক অবাক বিস্ময়! আমরিন ঘুমঘোরে হেসে উঠেছে। কোরিডোরের সবাই এসে আমরিনকে ঘিরে ধরেছে। 

আমরিন হাসছে আর জিজ্ঞেস করছে ইমরোজকে,‘আপনি?’ 

ইমরোজ কি উত্তর দেবে বুঝতে পারছে না। এ দায়িত্ব যে আজই ওকে দেয়া হয়েছে। আমরিনকে সে হাত ধরে পৌঁছে দেবে সেই জগতের দ্বারপ্রান্তে যেখান থেকেই কিনা তার এ পৃথিবীতে হয়েছিল আগমন। কিন্তু কিভাবে জানাবে একথা আমরিনের বাবা –মা কে? তারা কি মেনে নিতে চাইবেন তাদের সন্তানের চলে যাওয়ার সংবাদ? কিভাবে ইমরোজ বুঝাবে যে এ কাজের দায়িত্ব এক বিশেষ দায়িত্ব যা সাধারণত ন্যস্ত থাকে চলে যাওয়া পরিজনদের মাঝের কোন অতি আপনজনের কাছে, যিনি এই যাত্রীর খুব কাছের মানুষ। তিনিই আসবেন এই যাত্রীর নতুন যাত্রাপথের সঙ্গী হতে। পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবেন তার শেষ গন্তব্যস্থলে। 

পৃথিবীর এ জীবন শেষ করে আবার ফিরে যাওয়া তার শেষ গন্তব্যস্থলে – এসব যেন কেমন অদ্ভুত মনে হয়। পার্থিব জীবনে থেকে থেকে অভ্যস্ত হয়ে অপার্থিবে মিশে যাবার যাত্রী যেন সঠিক নির্দেশনা হারিয়ে না ফেলে, তাই এমন এক আলোকবর্তিকার আগমন হয় যাত্রার শুরুতে। কিন্তু ইমরোজ এখনও রয়ে গেছেন এখানে। তিনি কিভাবে এ দায়িত্ব নেবেন এ প্রশ্ন আমরিনেরও। 


ইমরোজ বলেছে, সে এ জগতে স্বাভাবিক ভাবে অবস্থান করলেও তার আরেকটি সত্তা সেই অজানা জগতেও বর্তমান, যে কিনা এই কাজের বাকীটুকু সম্পন্ন করবে। প্রথম পর্ব সম্পাদন হয়ে গেছে। 

ইমরোজ এসেছে আমরিনের কক্ষে। পর্দা সরিয়ে বাইরের আলোকচ্ছ্বটায় ভরে তুলেছে ঘরটা। টানা ক’দিন বৃষ্টির পর আজ ঝলমল আকাশে মৃদুমন্দ বাতাসের খেলা। 

শরতের এই আকাশে কাশ ফুলের মেলা। কিন্তু আমরিন আর কাশফুল দেখতে পায় না। পৃথিবীও এখন তার কাছে অস্পষ্ট। দিগন্ত রেখা থেকে ধেয়ে আসা আলোর ছ্বটা ধীরে ধীরে যখন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে ও দেখেছে একটি জ্যোতির্ময় অবয়ব। এই উজ্জ্বল সাদা আলোর মাঝেই তিনি দাঁড়িয়ে। খুব লম্বা দোহারা গড়নের চির পরিচিত ইমরোজ শায়ান। আমরিন অবাক হয়ে তাই জিজ্ঞেস করেছে এতগুলো প্রশ্ন একসাথে। 


আমরিন বুঝতে পেরেছে, ও পৃথিবী ছেড়ে খুব দূরে কোথাও চলে এসেছে এখন। এখান থেকে সূর্যছ্বটা ছাড়া আর কিছুই দেখা যাচ্ছে না। চারিদিকে প্রচন্ড আলো। সে চলছে এক টানেলের মধ্য দিয়ে অসীমের পানে। এ যাত্রাপথ শুধু তার একার। সঙ্গীহীন । 

চিরপরিচিত বাবা, মা, ভাই, বোন এখন নেই ওর সাথে। থাকার কথাও নয়। কারণ এখন যে ওদের সময় নয় ওর সাথে আসবার। এ কথাটিও ওর যেন জানা, কিন্তু কে কখন বলেছে ঠিক মনে করতে পারছে না আমরিন। তবে এটুকু জানে যে ইমরোজ শায়ান রয়ে গেছে ওই দূরের পৃথিবীতে। তার যাত্রাপথে সঙ্গী হবার সময় তো এখনও হয়নি তার। তাই আমরিনের একাই যাবার পালা আর সেভাবেই প্রস্তুতি গ্রহন করেছে সে এই ক’দিন। কিন্তু এরই মাঝে কেউ একজন এসে যখন বলেছে, ‘পার করে দাও আমারে’ –আমরিন হেসে ফেলেছে। তার সেই হাসিতে তার হাসপাতাল কক্ষের সবার চোখে মুখে আনন্দ। 

আমরিন ঘুমের ঘোরে হাসছে কিন্তু ওর মুখোমুখি দাঁড়ানো ইমরোজ শায়ান অপলক তাকিয়ে আছে আমরিনের দিকে। আমরিন অবাক বিস্ময়ে দেখছে ইমরোজকে। এ তো অসম্ভব,তার এতো ভাল লাগার মানুষটিকে আজ এত কাছ থেকে পাওয়া,যার কিনা থাকার কথা ছিল না একদম! সেজন্যই কি ইমরোজ এসেছে তার সামনে? তীক্ষ্ণ চঞ্চল সেই দৃষ্টি। চোখ রাখা যায় না যার চোখে। এক গভীর আবেশে যেন জড়িয়ে আসে সবকিছু। নত হয়ে পড়ে সবকিছু। আজও তাই হচ্ছে। এতো বিহবলতা কিভাবে গ্রহন করবে আমরিন? 

এখন অনেক দূরে চলে এসেছে যেন। ছুটে চলেছে সামনে। তীব্র গতি তার। পিছন ফিরে তাকাচ্ছে বারবার কিন্তু এখন  পৃথিবী আর স্পষ্ট নয়। কিন্তু ইমরোজ তার পাশে। চলছে দুজন দুরন্ত গতিতে,পাশাপাশি। অনেকটুকু পথ পাড়ি দিয়ে প্রবেশ করবে নতুন এক অন্য জগতে,যেখানে তাদের আসল ঠিকানা। মেশিন রিডিং বন্ধ হয়ে গেল সব। থেমে গেল সব একে একে। চীফ মেট্রন ইমরোজের  দীর্ঘশ্বাসে ঘরটা ভারী হয়ে উঠলো। 

পার্থিব জগতের এই মেশিনগুলো এ মুহূর্তে আর ধরতে পারছে না আমরিনের উপস্থিতি। যদিও অপার্থিবের উদ্দেশ্যে তার জীবন – যাত্রাপথের শেষটা শুরু হয়েছিল বেশ কয়েকদিন আগেই।    

.............

২৭ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৫


Saturday, September 10, 2011

আহ্বানে

 

সকাল থেকেই জুলিয়া ভাবছে ও যাবে কি যাবে না। বড্ড মন চাইছে যেতে, রাস্তার ও পাশের ফুলের বাগানটাতে। গ্রীষ্ম এসেছে বহু প্রতীক্ষার পরে। এমন উজ্জ্বল আলো ঝলমলে দিনে সেই পার্কটিতে ঘুরে আসা মন্দ নয়, কিন্তু আজ কেন এত সংকোচ কাজ করছে ওর ও জানে না। এমন তো আগে কখনো হয়নি। তাই কিছুটা ইতস্তত করেই বেরুলো। বাসায় আবার আজ কেউই নেই যে বলে আসবে কোথায় যাচ্ছে। উঠোন পেরিয়ে রাস্তায় এসে দাঁড়ানোর পর জুলিয়া কেন জানি পিছনে ফিরে চাইলো। বাড়িটির জন্য খুব মায়া লাগছে। মনে হচ্ছে ও যেন বাড়ি ছেড়ে খুব দূরে কোথাও চলে যাচ্ছে। অথচ রাস্তা পেরুলেই পার্ক। বেশী তো দূরে নয়।

এদিকটা উপশহর বলে যানবাহন তেমন বিশেষ একটা চোখে পড়ে না। রাস্তা পেরিয়ে ও প্রবেশ করলো ফুলে ঘেরা বাগানটিতে। বেঞ্চ পাতা আছে কিছু দূর পর পরে। ঘন গাছে ঘেরা সরু পায়ে হাঁটা পথ ছায়ায় ঢাকা পড়েছে। গাছের সারি পেরিয়ে কিছুদূর যেতেই মনে হচ্ছে অগোছালো আর অপরিচর্যায় বেড়ে উঠা গাছগাছালীতে পূর্ণ না হলেও বেশ ঘন জংগলেই এবার ও প্রবেশ করেছে। কেমন যেন এক তাগিদ থেকেই জুলিয়া আরেকটু এগুলো। বেশ এবড়ো থেবড়ো পথ। বোধহয় সিটি পার্কের সীমানা শেষ । কিন্তু কোন বাউন্ডারি না দেখে বেশ অবাক হলো। সামনে বিস্তৃত সবুজ বিশাল বনানী। আশপাশে বেশ কিছু প্রস্তরখন্ড ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ঘাসে ঢাকা। একটু ভাল করে খেয়াল করে দেখলো প্রস্তরখন্ডগুলো আসলে শতবর্ষাধিক পুরোনো এপিটাফ। অর্থাৎ বহু আগে এ জায়গাটি সমাধিস্থল ছিল। বেশ অবাক হলো কারণ আগে কখনো ও এসব দেখেনি। আসলে আগে এতদূর আসাও হয়নি। আজ যে কেন এলো, যেন কারো একজনের আহবানে এতদূর চলে আসা। এসব ভাবতে ভাবতে এগিয়ে যেতেই রিহানের কন্ঠস্বর। চমকে পিছনে তাকালো। রিহান ওর সহপাঠী। ওর ছোটবেলার বন্ধু। সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু । ওকে দেখে আরো বেশী অবাক হলো কারণ আজ সকালেই ওর সাথে ইমেইলে কথা হয়েছে কিন্তু তখন তো সে বলেনি যে ও এখানে আসবে। একেই বলে মনের টান। রিহান কাছে এগিয়ে এসে বললো, ‘ওদিকটায় যাবি ঘুরতে?’ আসলে জুলিয়ার এ জায়গাটা একেবারেই অচেনা। পার্কের বিশালতা এবার সে উপলব্ধি করতে পারছে। এত দিনের এই চেনা জায়গায়রও যে অনেক কিছু দেখা বাকী রয়ে গেছে তা বুঝতে পেরেই ও এককথায় রাজী হলো। রিহান বললো ও খুব ভাল চেনে এ জায়গাটা। তাই অনেক গল্প আর অনেক কথা আর অনেকটুকু হেঁটে চলা । রিহান যত না কথা বলে তার থেকে বেশী হাসে। কেন জানি জুলিয়ার কাছে এলে ওর এত প্রাণখোলা হাসি হাসে জুলিয়া ভেবে পায়না। 

সূর্যের আলোর রংধনু তৈরি হয়েছে ওদিকটার জলাধারে। আসলে রংধনু কোথাও না কোথাও দেখা দিবেই যখন রিহান ওর কাছ আসবে। শুধু সূর্যালোকের আলোর কিঞ্চিত প্রবেশাধিকার থাকলেই হলো। কিন্তু এতক্ষণ ধরে এগিয়েও এ পথ যেন আর ফুরোতে চাইছে না। ভেবে অবাক হয়েই জুলিয়া আপন মনে প্রশ্ন করলো, পার্কটা খুব বড় নাকি? এবার রিহান হেসে ফেললো। বললো, শেষ নেই।

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে। সারাদিনে ফোনে যোগাযোগ করে মেয়েকে না পেয়ে আর বাসায় এসে মেয়েকে না দেখে জুলিয়ার বাবা মা বেশ চিন্তিত হলেন। বন্ধু বান্ধব বলতে কাছে আছে রিহান । কিন্তু ওরা তো পরিবার শুদ্ধ সেই সকালেই চলে গেছে পাশের শহরে ওর দাদীমাকে দেখতে। এমন কিছুই শুনেছিল সকাল বেলায় জুলিয়ার কাছে নাস্তার টেবিলে। আসলে সপ্তাহ শেষের সময়টিতে সবাই কোথাও না কোথাও যাবার জন্য সময় নির্ধারিত করে রাখে। তারাও যাবেন কাল পাশের শহরের ফ্লাওয়ার ফেস্টিভালে। আর জুলিয়া যদি এখনো বাড়ি না ফেরে তাহলে কখনই বা গোছগাছ করবে আর কিভাবেই বা প্রস্তুতি নেবে। 

রিহানের সাথে যোগাযোগ করলে ও বললো ওরা ঠিকমতই পৌঁছেছে দাদীমার বাসায়। কিন্তু জুলিয়াকে সে সারাদিনে ফোনে একবারও পায়নি। প্রাণপ্রিয় বন্ধুটির সাথে যোগাযোগ ব্যর্থ হয়েছে জেনে এবার জুলিয়ার বাবা মা ব্যস্ত হয়ে পড়লেন । তারা এই সিদ্ধান্তে এলেন, যে তাদের কন্যাটি নিখোঁজ হয়েছে। 

নিখোঁজ সংবাদের ভিত্তিতে সেদিন চারিদিকে খোঁজ লাগানো হলেও আজ অব্দি জুলিয়ার খোঁজ মেলেনি। ছয় বছর হয়ে গেছে জুলিয়া নিরুদ্দেশ। অথচ ও যে খুব কাছেই ফুলে শোভিত ঘন গাছ গাছালীতে ঘেরা সীমানাবিহীন শতাধিক বছরের পুরোনো সেই বিশাল পার্কে ঘুরে বেড়াচ্ছে তা যেমন তার পরিবারের অজানা, তেমনি জুলিয়াও জানে না কে এই বন্ধুরূপী আগুন্তক যার আহবানে তার এই পার্কে আসা, তার সাথেই পার্কে ঘুরে বেড়ানো যা আর শেষ হবার নয়।

....................

১০/০৯/২০১১

Thursday, January 6, 2011

ছায়া মানব

১ 

ধীরে ধীরে চোখ মেললেন মিসেস গিলবার্ট। খুব ক্লান্ত তিনি। গতকাল এমারজেন্সি সার্জারি হয়েছে কয়েক ঘন্টার নোটিসে। কাউকে খবর দেবার আগেই ডাক্তররা তাকে ভর্তি করে ফেললেন হাসপাতালে। এই আশি বছরের দীর্ঘ জীবনে রোগ ব্যাধির ছোঁয়া তেমন একটি নেই। গতকালই  হঠাত ব্যথার চরম প্রকাশ যার কারণে এখানে আসা। সকালে ভর্তি হলেন আর সন্ধ্যায় অপারেশান। ব্যথা নেই তেমন একটা এখন। কিন্তু বেশ দুর্বল। অপারেশান থিয়েটার থেকে পোস্ট অপারেটিভ কেয়ারে রেখেছিল দুই ঘন্টা। এখন ওয়ার্ডে নিয়ে এসেছে। রাত বাজে আড়াইটা। চারিদিকে শুনশান নিস্তব্ধতা। মাঝে মাঝে ওয়ার্ডের রোগীদের যন্ত্রণাকাতর আর্তনাদ ভেঙে দেয় সকল নিস্তব্ধতাকে। মন খারাপ হয়ে যায়। মনে হয় রোগ ব্যাধির কাছে মানুষ কতই না অসহায়। তারপরও মিসেস গিলবার্ট জানেন না তিনি কতটা ভাগ্যবান। প্রচুর রক্তক্ষরণ সামাল দিতে হয়েছে তাকে অপারেশানের সময়। দ্বিগুন সময় লেগেছে সার্জারীতে। কিন্তু এখন তিনি রাহুমুক্ত। 

রাত মনে হয় নির্ঘুম কেটে যাবে। পাশে জানালা দিয়ে দেখা যাচ্ছে দূর আকাশের মেঘগুলো। একটা অন্ধকারাচ্ছন্ন আলো ঘিরে রেখেছে বাইরে। বাতিগুলো সব নেভানো। গভীর রাত বলেই হয়তোবা রোগীদের বিশ্রামের জন্য আলো নেভানো। শরীর ভীষণ দুর্বল বলেই হয়তো বেশ ঠান্ডা অনুভব করছেন। আরেকটা চাদর জড়ালে ভাল লাগতো। মাথার পাশে বোতামটা চাপলেই নার্স কথা বলে উঠবে স্পিকারে । আর আদেশ করা মাত্রই ত্বরিত গতিতে ছুটে আসবে রোগীর কাছে। তা সত্ত্বেও নার্সদের ডেকে বিরক্ত করতে মন চায় না কোন রোগীরই একান্ত না পারলে। কিন্তু ঠান্ডা যে লাগছে ভীষণ। ধীরে ধীরে হাতটা নাড়াতে চেষ্টা করলেন তিনি।  ডানপাশে মাথার কাছে লম্বা তার দিয়ে বেড সাইড সুইচটা রোগীর কাছেই রাখা থাকে। কিন্তু হাত সরাতেই এখন যেন খুব ক্লান্তি। একটা অপারেশন রোগীকে এভাবে প্রভাবিত করে? সমস্ত শক্তিগুলো যেন নিঃশেষ করে নিয়ে যায়। আবারো চেষ্টা করলেন । হাতটা আগাতেই মনে হলো খুব কাছে যেন কেউ কথা বলে উঠলো। বেশ ভারী কন্ঠস্বরে,

– আমি এসেছি।
চমকে উঠলেন মিসেস গিলবার্ট। বললেন, 
– কে তুমি ? ওহ্‌ নার্স বুঝি।
  – আমি নার্স নই। আমি ট্রিস্টিন। তোমার সংবাদ বাহক।
– মানে? 
– মানে আমি তোমাকে জানাতে এসেছি কিছু তথ্য। 
– কি তথ্য? 

– আজ তোমার প্রত্যাবর্তনের দিন ছিল। কিন্তু তা হয়নি। তোমার অসীম ইচ্ছাশক্তির কারণে ইশ্বর তোমায় রেখে দিলেন। অপারেশন সাকসেসফুল হলো। কিন্তু তোমার বদলে আরেকজনকে অবশ্যই যাতে হবে। 

মিসেস গিলবার্ট থমকে গেলেন কথাগুলো শুনে। সামনে মিশমিশে অন্ধকারে কালো একটা ছায়া যেন দাঁড়িয়ে আছে তার সামনে। কিন্তু এ অন্ধকারে ঘরে ছায়াই বা আসবে কোথা হতে? নিজের অজন্তেই অবাক হয়ে প্রশ্ন করলেন,

– কাকে যেতে হবে?

– তোমার প্রাণপ্রিয় নাতিনীকে। আজ হতে ৭ দিন পর। ২২ শে মার্চ। ক্যালিফর্নিয়ায় বাতসরিক স্কি প্রতিযোগীতায় অংশগ্রহনের জন্য স্কুলের ১২ জন শিশু থাকবে ঐ স্কি গ্রুপে ।ওরা কেউই পারবে না প্রতিযোগীতার কেন্দ্রে পৌঁছাতে।  তার আগেই ওদের প্লেনটা ভূপতিত হবে শহরের কেন্দ্রে কোন ফুলে ঘেরা প্রশস্ত বাগানের নির্জন কোণে। তাই প্লেনটি বিধ্বস্ত হলেও শহরের ব্যস্ততম অঞ্চলগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। 

কি বলছে এসব এই ছায়ামানব? মিসেস গিলবার্ট বুঝে উঠতে পারছেন না। তার নাতনীকেই বা এ চিনে কিভাবে? 

তুমি কে বলে উঠতেই আবারো সেই একই উত্তর ভেসে এলো।

– আমি ট্রিসটিন। একজন বার্তাবাহক, তোমাদের সকলের দেখাশুনা করাও আমার দায়িত্বের মাঝে পড়ে। 

– তাহলে আমার নাতনীকে কেন?

– ওকেই এখন বেশী প্রয়োজন। কারণ ওর স্কি করার পারদর্শীতা ওকে এতটাই বেপরোয়া করে তুলেছে যে, যে কোন সময়ে ওকে বরণ করে নিতে হবে অকাল পঙ্গুত্ব। কিন্তু তা আমি হতে দেবনা। ভালোয় ভালোয় এই ডাইমেনশান থেকে সরিয়ে নিয়ে স্থাপন করবো ওকে অন্য কোন খানে, যেখানে খুব সাধাসিধে জীবন যাপন করে ও সমাপ্ত করবে ওর জীবনচক্র।

মিসেস গিলবার্ট কান্না মিশ্রিত কন্ঠে কাতর অনুনয় করে বললেন,

– কিন্তু ওকে ছাড়া আমি বাঁচবো কিভাবে? 

ছায়ামানব ট্রিস্টিন এবার আলতো স্পর্শে হাত রাখলো মিসেস গিলবার্টের হাতে। ভীষণ শীতল সে স্পর্শ। দেহটা যেন অসাড় বোধ হচ্ছে। একটু নড়বার চুল পরিমাণ শক্তিও নেই অবশিষ্ট। ট্রিস্টিনের শেষ উত্তর একটিই।

– তোমার জীবনীশক্তি প্রচন্ড। নাতির চলে যাওয়ার ধাক্কা সইতে তুমি পারবে। এখন ওরই যাবার সময়।

জুলিয়ান এখন পড়ছে থার্ড গ্রেডে। বয়স ৮ বছর। এই বয়সেই স্কিতে ভীষণ নৈপুণ্য অর্জন করে ফেলেছে সে। একসপ্তাহ পরেই রওনা দেবে বাতসরিক স্কি প্রতিযোগীতায় অংশ নিতে। তবুও মনটা জানি কেন ভাল নেই তার। চোখের সামনে শুধু ভেসে উঠছে বৃদ্ধ দাদির অসাড় একটি দেহ।

কেন এমন হচ্ছে? বার্ধক্য এলেও শারিরীক দিক দিয়ে এই বয়সেও দাদী রোগ বালাইয়ের উর্ধ্বে। তারপরও কেন এমন মনে হচ্ছে? দুদিন আগেই তো কথা হল। ওনার অসাড় দেহ বার বার চোখের সামনে ভেসে উঠছে কেন ভেবে কোন কারণ পেল না জুলিয়ান। আজ বোধহয় সারা রাত আর ঘুম আসবে না তার। কিছু ভেবে না পেয়ে বেড সাইডের ল্যাম্পটায় জুলিয়ান হাত বাড়ালো। আজ যেন সব কিছু অন্য রকম। ল্যম্পটা যেন হাতের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে বার বার। ডান দিকে ভর দিয়ে কাত হয়ে হাতটা আগালো ল্যাম্পের দিকে। আর তখনই খেয়াল করলো বিছানা আর সাইড টেবিলের মাঝের ওই জায়গায় কে যেন দাঁড়িয়ে। জুলিয়ান মাথা তুলে তাকালো  উপরে। 

দীর্ঘ মানুষের অবয়বে একটি কালো ছায়া। 

কিন্তু ছায়াই বা আসবে কোথা হতে এই অন্ধকার ঘরে? জুলিয়ান বেশ অবাক হয়েই বিড়বিড় করে বলে উঠলো, কি এটা?

ছায়ামানব যেন তাও শুনে ফেলেছে। ছোট্ট একটি উত্তর দিয়ে বললো,
– আমি ট্রিসটিন।
জুলিয়ান বেশ অবাক! জানতে চেয়ে বললো,
– কোথা হতে এসেছ?
– 7D থেকে। তোমায় কিছু বলতে চাই। 
– বল।
খুব ধীরে গম্ভীর কন্ঠস্বরে ছায়াটি বলে উঠলো,
– তোমার দাদী সুস্থ আছেন।

জুলিয়ান এত অবাকের মাঝেও না হেসে পারলো না। আজ সারাদিনই তো সে দাদীর কথা ভেবেছে। কিন্তু এ ছায়াটি সে কথা জানলো কিভাবে? এবার আরো অবাক করে দিয়ে ছায়াটি প্রশ্ন করলো,

– স্কি করতে যাবে তো এই মাসের ২২ তারিখে? তাইনা?
– হ্যা মার্চের ২২ তারিখে।  সকাল সকাল রওনা দিলে বেশ আগেই ওখানে পৌঁছে যাব।
ট্রিসটিনের বেশ সরাসরি উত্তর,
– না  তোমরা  পৌঁছাবে না।
– পৌঁছাব না? কেন?

– তোমেদের নিয়ে যাব ফুলে ফুলে শোভিত খুব সুন্দর এক বাগানে, যেখানে অজস্র মানুষ ঘুমিয়ে আছে নিশ্চিন্ত মনে। জায়গাটি এই ক্যালিফর্নিয়ার মনটোনা এয়ারপোর্ট  থেকে  মাত্র ৫০০ ফুট দূরে। তোমাদের প্লেন রানওয়ে পর্যন্ত পৌঁছাবে না। তার আগেই পড়ে যাবে। 

– পড়ে যাবে?
– হ্যা পড়ে যাবে।
– কিন্তু কেন?
– কারন তোমার স্কি করার যে আর প্রয়োজন নেই।

স্বপ্ন কি না সত্যি জুলিয়ান জানে না। ঘুম ভেঙে গেল ওর। বাইরে ভোর হয়ে এসেছে। কেউ তো নেই মাথার কাছে দাঁড়িয়ে। কিছু কিছু কথা মনে পড়ছে। দাদী, স্কি ট্রিপ, ফুলের বাগান।  নেট ব্রাউজ করে কিছু তথ্যও পেয়ে গেল।  ক্যালিফর্নিয়ায় তাদের অরোভিল থেকে  মনটোনা যেতে ঘন্টাখানেকের পথ। সেখানেই ওদের স্কি রিসোর্ট। 

দাদীর সাথে কুশল বিনময় করবে আজ।

ফোনটা বেজেই চলছে। প্রায় আধাঘন্টা হলো। কিন্তু কেউ তুলছে না। কেন? সকলের এই সময়টা  মিসেস গিলবার্ট তো বাসায় থাকেন। উনি যে খুব একটা বাইরে যান তাও না। এই ব্রেক ফাস্টের সময়টা পিছনের কাঁচে ঘেরা বারান্দায় বসে থাকেন। পিছনে গাছ গাছালী ভরা বনানী। দৃশ্যটা খুব সুন্দর। শীতকালে তুষারাবৃত হয়ে সাদা হয়ে যায় চারিধার। ঋতুর সৌন্দর্য্য আলাদা আলাদা। শীতের সময়ে এই বারান্দা সানরুম হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

ফোন যখন কেউই  ধরছে না, জুলিয়ান আর চেষ্টা করলো না। চলে গেল স্কুলে। হাঁটা পথ পাঁচ মিনিটের। যখন আরো ছোট ছিল, মা–ই নিয়ে যেতেন স্কুলে। এখন ও নিজে যেতে পারে, আর ছুটি হলে একদৌড়ে বাড়ি।

আজ বাড়ি ফিরে দেখল বাবা মা বেশ চিন্তিত। তারাও ফোন করে কোন সাড়াশব্দ পাননি মিসেস গিলবার্টের। ওখানে প্রতিবেশী যারা আছেন তারাও বেশ বৃদ্ধ। তাই কাকেই বা বলবে ওনার খবর নিতে। পুলিশের সাহায্য ছাড়া আর বুঝি উপায় নেই। 

একে একে সকল তথ্যই পুলিশ নিল। নাম, বাড়ি নম্বর, রাস্তার নাম সবই।

খোঁজ শুরু করলো। অবশেষে পেয়েও গেল। হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন মিসেস গিলবার্ট গতকাল। বাড়ি হতে দুমিনিটের পথ দিব্যি হেঁটে চলে গেছেন। আর তখনই ডাক্তররা ধরে বেঁধে ভর্তি করে নিয়েছেন, কাউকে জানাতে পারেননি ততক্ষণাত। অপারেশনের পর আজ সকালে সুস্থ তিনি। সব শুনে জুলিয়ানের মা বাবা আশ্বস্ত হলেন।   

কিছুদিন পরেই রওনা দেবেন তারা স্কি ট্রিপে। স্কুল চলছে তাই দাদীর কাছে যাবার সুযোগ নেই জুলিয়ানের । ফিরে এসে গ্রীষ্মকালীন ছুটি শুরু হতে মাস দেড়েক বাকী, তখনই না হয় জুলিয়ান  ওখানে যাবে, এসব ভেবে ভেবে রাতে ঘুমুতে চেষ্টা করল চোখের পাতা দুটো এক করে। স্বপ্নের রাজ্যে যখন প্রবেশের সময় তখনই গতরাতের মতো একটি কন্ঠস্বর। কে জানি তাকে ডাকছে বেশ গম্ভীর স্বরে। 

– জুলিয়ান।

বেশ কাছ থেকেই। 

চোখ মেলতেই চিনে ফেললো তাকে। সেই ছায়ামানব, ট্রিস্টিন। কিছু বলছে না আজ, শুধু চেয়ে আছে। কথা বলতে খুব কষ্ট হচ্ছে জুলিয়ানের। সেও কিছু বলতে চেয়ে পারছে না। খুব অবসন্ন আর ক্লান্ত লাগছে। চারিদিকে বেশ ঠান্ডা অনুভূত হচ্ছে। যেন দম বন্ধ হয়ে আসার মত অদৃশ্য চাপ। কেউ তাকে এক নিমেষে অবশ করে দিয়েছে। 

বাবাকে এ কথা বলে লাভ নেই। তারা হয়তোবা বিশ্বাস করবেন না। যাই হোক। ঘুমিয়ে পড়ল জুলিয়ান।

সময়কালঃ ২২ শে মার্চ ২০০৯

জুলিয়ান এবং তার সঙ্গীরা রওনা দিয়েছে তাদের প্রতিযোগীতার কেন্দ্রস্থলে। ঘন্টাখানেকের পথ। তাই  ছোট্ট একটি প্লেন নিয়ে যাত্রা। ৮ থেকে ১০ বছরের ১২ জন ফুটফুটে শিশু সহ মোট ১৪ জন যাত্রী প্লেনে। আজ সকাল বেশ সুন্দর। তাপমাত্রা শূন্যের  কিছু নিচে।আকাশের মেঘগুলো তুলোর মতো ভেসে বেড়াচ্ছে চারিদিকে। নিচে বাড়িঘর, জলাশয় আর রাস্তা এক নয়নাভিরাম দৃশ্য তৈরি করেছে। ঐ তো দূরে রানওয়ে। আর বেশীক্ষণ লাগবে না শহরে পৌঁছাতে। মাটির কাছাকাছি নেমে আসছে ওদের প্লেন বেশ সাবলীল গতিতে। তাই শহরের দৃশ্য আরোও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

ফুলের বাগানে ঘেরা একটা কবরস্থান। বেশ প্রাচীন মনে হচ্ছে। এত স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে , প্লেনটা বোধহয় বেশ নীচু দিয়ে উড়ে চলছে। ফুলগুলো সব ফুটতে শুরু করেছে। মার্চের এই ২২ তারিখেই বসন্তকে ওরা বরণ করে নেয়। 

জুলিয়ানের হঠাত মনে পড়ে গেল ট্রিস্টিনের কথা। ও বলেছিল সুন্দর সাজানো বাগানের কথা। ওখানে যাবার কথা। কিন্তু রানওয়ে থেকে না নেমে তো ঐ বাগানে ওরা পৌঁছাতে পারে না। আর মাত্র ৫০০ ফুট দূরেই রানওয়ে। তাহলে প্লেনটি বারবার এই সাজানো বাগানের ওপর চক্কর দিচ্ছে কেন? এবার বেশ নীচের দিকে ধাবিত হচ্ছে মনে হয়। নাম পড়া যাচ্ছে বাগানটির। হলি ক্রস সেমিটারি। কিন্তু এই বাগানেই ল্যান্ড করবে নাকি? কিছু বুঝে উঠতে পারার আগেই একটা বিকট শব্দ। 

তারপর নিস্তব্ধ। চারিদিক। অন্ধকার।

চোখে মেলে চাইলেন মিসেস গিলবার্ট। শরীর এখনো বেশ দুর্বল। এই দুঃস্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙ্গে গেল। একটা প্লেন বিধ্বস্তের পুরো ঘটনা কেন প্রত্যক্ষ করলেন এভাবে? ঘুমের ঘোরে ক্ষণিকের চিন্তা যখন স্বপ্ন আকারে আসে তখন বিচ্ছিন্ন ভাবনাগুলো কত কল্পনারই না সৃষ্টি করে। তাই এসব বিষয় গুরুত্ব দিলে কি চলে?

কিছুদিন আগে যে ছায়ামানবের সাক্ষাত তার ঘটেছিল সে তো আরো অমূলক। অপারেশানের পর দুর্বল শরীরে অশরীরী অস্তিত্বের উপস্থিতি শুধু নয়, বন জঙ্গলের বাঘ ভালুকের অস্তিত্বও অমূলক নয় কারোর জন্য যে কিনা ঐ ব্যথানাশকের ঘোরে মৌলিক চিন্তা করার সামর্থ্য হারিয়ে ফেলে। আর সেই দিনের সেই কথাগুলো, নাতনীর স্কি রিসোর্টে যাবার পথে ফুলে ঘেরা সেমিটারিতে প্লেন ক্র্যাশের অতি কাল্পনিক গল্প  হয়তো মনের অন্তস্থলে গিঁথে ছিল বলেই এ স্বপ্নের অবতারণা। পুরো গল্পটা দিয়ে স্বপ্ন দেখে রাত পার হয়ে গেল। দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের অজান্তে মিসেস গিলবার্ট  চোখ বুজলেন। নাতনীর জন্য অনেক প্রার্থনা করে হাত বাড়ালেন বেড সুইচের দিকে। নার্সকে খবর দিলেন আসতে। বলবেন ফোনের লাইনটি লাগিয়ে দিতে। নাতনীর সাথে কথা বলবেন এখনই। ছোট্ট জুলিয়ানের কন্ঠ শুনতে ভীষণ মন চাইছে তার।

.......

লেখাঃ খুব সম্ভবত ২০০৯
ব্লগে প্রকাশ ০৭/০১/২০১১


Saturday, November 13, 2010

অনুভবে

 


টনি, রুম্পা, জনি আজ ঠিক করেছে সারাদিন কাটাবে ওদের ট্রি হাউজে। বাড়ির পিছনে বিশাল বাগান জুড়ে অনেক গাছ গাছালীর সমাহার। ওখানেই ওদের তিন ভাইবোনের জন্য বানানো হয়েছে ট্রি-হাউজ। প্রায় দোতলার সমান উচ্চতা হবে। সেই উঁচুতে ১০ ফুট বাই ৮ ফুট একটি ঘর। ঘরটির জানালা দিয়ে বাইরে তাকালেই শহরের নামকরা একটি চিড়িয়াখানা। আসলে চিড়িয়াখানার পাশেই বাড়ি বানাবার জন্য প্লটটি  পেয়েছিলেন ওদের বাবা সেই কবে। বাড়ি বানিয়ে কিছুটা খালি জমি রেখেছিলেন পেছনে। ছোট্ট একটা লন। কিছু গাছপালা। নির্জন নিরিবিলি কোলাহলমুক্ত এ জায়গায় প্রতি সন্ধ্যায় বসে চা খেতে আর বাচ্চাদের খেলা দেখতে দেখতে বাবা মায়ের সময় কেটে যায় ভীষণ আনন্দে। বাচ্চাদের আবদারে তাদের জন্য ছোট্ট ট্রি হাউজ গড়ে দিয়েছেন তারা। 

সপ্তাহের ছুটির সারাটা দিন, পারলে সারা রাতও তারা খেলতে খেলতে পার করে দেয় ট্রি-হাউজে। অন্যদিন সকালে ঘুম না ভাঙ্গলেও ছুটির দিনে ঐ ট্রি-হাউজে খেলার নেশায় খুব ভোরে ওদের ঘুম ভেঙ্গে যায়। একটুও ইচ্ছে করে না বেলা পর্যন্ত ঘুমুতে। সকাল হলেই দে ছুট। 

আজও তাই করলো ওরা। সপ্তাহের এই ছুটির দিনটা সবচেয়ে বেশী আকাংখিত। তাই  সকাল হতেই তিনজন ওখানে। ওদের সব খেলনাগুলো ট্রিহাউজেই রাখা থাকে। তিনজনের মধ্যে টনি ১০, রুম্পা ৮, জনি ৫ বছর। বড় হয়ে টনির এখন অনেক দায়িত্ব। নিজে খেলা করলেও ছোট ভাইবোনকেও দেখাও তার কর্তব্য। ওদের খেয়াল রাখা আবার নিজের খেলা দুটোই তাকে করতে হয়। 

বলা নেই কওয়া নেই হঠাতই চোখে পড়লো রুম্পা একটু ঝুঁকে জানালার বাইরে কি যেন দেখছে। টনি কাছে এগিয়ে এসে পাশে দাঁড়াতেই দেখলো মনোরম এক দৃশ্য। ওদের ট্রি হাউজের ঘরটি যেন আকৃতিতে বিশাল হয়ে মিশে গেছে ওই দূরের একটি ঝর্ণার সাথে। তাই একটুও দ্বিধা না করে ওরা এক পা দু’পা করে এগিয়ে গেল সেই ঝর্ণার দিকে। ঝর্ণার পাশে চোখ জুড়ানো ফুলের বাগান আর  তার মাঝে অনেকগুলো প্রজাপতি খেলা করছে। এ যেন একদম রূপকথার স্বপ্নপুরী। আরেকটু সামনে এগুলো। বাহ কি সুন্দর! সামনে সবুজ ঘাসে আবৃত বিশাল মাঠ আর তারই প্রান্তে ঢালু রাস্তা মিশেছে ঐ দূরের ছোট্ট একটি গ্রামে। মাঠটা পার হয়ে দুজনে দৌড়ে চলে এলো রাস্তায়। তারপর ওই রাস্তা বেয়ে আরো সামনে ঐ ছোট্ট গ্রামে। ওখানে যে আরো বিস্ময় ! তাদেরই মতন অনেক ছোট ছোট ছেলেমেয়ে খেলা করছে। টনি আর রুম্পার তর সইলো না। এক দৌড়ে ওদের কাছে যেয়ে হাজির। বললো, ‘আমাদের খেলতে নেবে তোমাদের সাথে?’

শিশুগুলো ভীষণ মিশুক। তাই এক কথায় ওদেরকে বন্ধু করে নিল। 

প্রথমেই ওরা জিজ্ঞেস করলো রুম্পা আর টনিকে, ‘তোমরাও কি আমাদের মতন এখানে এসেছ?’ 

আমাদের মতন মানে? 

ওরা কিছুই বুঝে উঠতে না পারায় বাচ্চাগুলো হাসতে হাসতে দে ছুট। ওরাও সাথে সাথে।  তাদের সঙ্গে অনেক খেলাধূলোয় আর অনেক মজায় মেতে উঠলো। কিন্তু এত খেলেও যেন বিকেল গড়িয়ে আর সন্ধ্যে নামছে না। বাবা মা বাসায় যাবার জন্য আর ডাকছে না ভেবে টনি  আর রুম্পার বেশ ভাল লাগলো। এমনটাই তো ওরা চেয়েছিল এতদিন। কিন্তু কখনই তা হয়নি। আর আজ যেন যা চাওয়া তাই সাথে সাথে পেয়ে যাওয়া। বাবা মায়ের শাসন নেই। সময়ের বালাই নেই। স্কুলে যাবার তাড়া নেই। খেলা আর খেলা। 

ওদের নতুন বন্ধুদের নামগুলো বেশ মজার। সংখ্যা দিয়ে। যেমন ডি-ওয়ান, ডি-টু, ডি-থ্রি,  ডি১১. আর এভাবেই ওই নতুন ১১ জন বন্ধু ওদের কাছে নিজেরদের পরিচয় দিল। টনিকে নতুন নাম না দিয়ে বললো, ‘থাক, তোমাদের নাম আপাতত টনি আর রুম্পাই থাক।’ 

সাথে সাথে দু’ ভাইবোনের প্রতিবাদ। ‘কেন? আমাদের নাম  যদি তোমাদের নামের মতো সংখ্যা দিয়ে হয় তাহলে মন্দ কি,আমাদের নামও তোমাদের মতন করে দাও।’ কিন্তু টনির কথায় ওরা রাজী হলো না। বলল, ‘এখন নয়। পরে।’ 

রুম্পা বলল, ‘কেন এখন সম্ভব নয়? আমরা তো তোমাদের বন্ধু, তাইনা?’ 

শিশুরা খলখল করে হেসে উঠলো। শুরু হল হুড়োহুড়ি, ছুটোছুটি। বরফ পানি, হাইড অ্যান্ড সিক, আরো কত খেলা। 

খেলা শেষে পিপাসার্ত হয়ে এলো ঝর্ণার ধারে। পানির স্বাদ এত অন্যরকম যেন পানি তো নয় এ এক প্রশান্তির আবেশ। সব ক্লান্তি এক নিমেষে উধাও । তারপর আবার খেলা।   

আশপাশের ফুলের গাছগুলোতে অনেক ফুল ফুটে আছে। নানা রঙের প্রজাপতি উড়ছে কিন্তু ফুলগুলোর নাম না জানা। পাখিরা ডালে ডালে খেলা করছে। রুম্পা ভাবলো এই বাগানটার ছবি আঁকলে কেমন হয়। রাস্তার ধারে বসে মাটিতে আঁচড় কেটে নিজের কল্পনা মিশিয়ে এঁকে ফেললো ছোট্ট একটি হরিণ ছানারও ছবি। ওর এত্ত সুন্দর ছবি আঁকা দেখে সবাই জানতে চাইলো এটা কি? রুম্পা বললো, ‘আমদের বাড়ির পাশে মস্তবড় একটা চিড়িয়াখানা আছে। সেখানে খাঁচায় খাঁচায় বন্দী থাকে অনেক পশু পাখি। তারমাঝে ওর সবচেয়ে প্রিয় হলো চিত্রা হরিণ। এটা তারই ছবি।’ ওর কথা শুনে ওর বন্ধুরা বেশ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো, ‘তোমাদের পৃথিবী এত্ত সুন্দর?’

এমন প্রশ্ন শুনে টনি বেশ অবাক হয়েই বললো, ‘পৃথিবীটা কি আমাদের একার, তোমাদের না?’ ওরা সব্বাই একসঙ্গে বলে উঠলো, ‘না তো! পৃথিবী থেকে তো তোমরা দুজনেই চলে এসেছো বেশ কিছুক্ষণ আগে।’ টনি আর রুম্পা ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না পৃথিবী থেকে ওরা কোথাই বা চলে  এসেছে? খুব উতসুক হয়ে জানতে চাইলে ওরা বুঝিয়ে বললো এখন তাদের অন্য এক মাত্রার জগতে আগমন ঘটেছে। এ জগতটি হলো পৃথিবী থেকে আবার পরের জন্মে ফিরে যাবার বিরতিস্থান। হতে পারে সেই পরের জন্ম হবে পৃথিবীতে বা সেই গ্রহ ছেড়ে অন্য কোন গ্রহে। কিন্তু যেখানেই হোক না কেন প্রতিটি শিশুদের পৃথিবীর জীবন শেষ করে নতুন জীবনচক্র শুরু করবার অন্তর্বর্তীকালীন সময়টুকু এ জগতেই কাটাতে হয়। আর সেখানেই টনি আর রুম্পার অনুপ্রবেশ ঘটেছে তাদের অজান্তেই। পৃথিবী ছেড়ে তারা চলে এসেছে অনেক আগেই। কিন্তু কিভাবে এলো  এ প্রশ্ন করতেই ডি-ওয়ান বললো,

--তোমরা যখন ট্রি হাউজে খেলা করছিলে, তখন কি দেখেছিলে সুন্দর একটি বাগানের দৃশ্য? রুম্পা আর টনি সাথে সাথে বলে উঠলো, ‘নিশ্চয়ই। আর তা দেখেই তো আমরা হাঁটতে হাঁটতে প্রবেশ করলাম ঐ সুন্দর বাগানে।’ সবচেয়ে ফুটফুটে বন্ধুটি তখন বললো, ‘তারপর কি হলো জানো? যেইনা তোমারা ওই বাগানে প্রবেশ করলে সেই সময় তোমাদের ছোট ভাইটি দেখল তোমরা দু’জন ট্রি হাউজের জানালা দিয়ে নীচে ধপ্পাস। বাড়ির সকলে এসে দেখলো তোমাদের নিথর দেহ মাটিতে পড়ে আছে। তোমরা আর  বেঁচে নেই।’      

--তার মানে ? আমরা কি ওখানে মারা গিয়েছি।

-- মারা যাওনি। ডাইমেনশানের একটু পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু অতসত কি পৃথিবীর মানুষেরা বোঝে? একদমই না । কেঁদেকেটে বুক ভাসিয়ে সারাটা জীবন নষ্ট করে দেয়। ভেবে নেয় প্রাণহীন হয়ে যাওয়া মানে অজানায় হারিয়ে যাওয়া। তারাও তোমাদের নিয়ে এমনটিই  ভাবছেন এখন। তারা জানতেও পারছেন না যে তোমরা এই সুন্দর বাগানে খেলা করছো।’  

টনি আর রুম্পা বেশ অবাক স্বরেই বললো, ‘আমাদের এই সুন্দর বাগানে আসবার কথা কি বাবা মাকে জানানো যায়না?’ 

ডি-ওয়ান বললো, ‘মনে হয় না । কারণ তারা আছে মাত্র ত্রি-মাত্রিক জগতে আর আমরা যে তার থেকেও অনেক বেশী মাত্রায় আছি।  তারা আমাদের দেখতেও পাবে না, শুনতেও পাবে না, বুঝতেও পারবে না।’ 

রুম্পার  সাথে সাথে প্রশ্ন, ‘তাহলে আমরা এখন কত ডাইমেনশানে আছি?’ 

সব নতুন বন্ধুরা নিজেকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখিয়ে বললো, ‘ডাইমেনশন-১৩ তে। আর তাই ১৩ এর নীচে যতগুলো মাত্রার জগত আছে সব আমরা দেখতে পাই, অনুভব করতে পাই, কিন্তু তারা তা পারেনা। তোমরা যেমন ত্রি- মাত্রার ঘনক, দ্বি-মাত্রার তল আর একক মাত্রার বিন্দুর সংজ্ঞা জানো আমরাও তেমনি আরো বহুমাত্রিক  জ্যামিতিক আকারের সংজ্ঞা জানি যা অত ক্ষুদ্র পরিসীমায় তোমাদের ঐ পৃথিবী থেকে জানা সম্ভবই নয়।’

টনি বেশ অবাক হয়েই জানতে চাইলো, ‘আর  ১৩ ডাইমেনশানের চেয়ে  বেশী মাত্রা  যদি হয় তা কি তোমরা দেখতে পাও?’ 

ডি-ওয়ান বললো, ‘এই অন্তর্বর্তীকালীন জগতটির মাত্রা ১৩ বলেই এর বেশী মাত্রা আমাদের  জন্য অনুভবের উর্ধ্বে।পরবর্তীতে অন্য কোন গ্রহে অন্য কোন অবস্থায় কত মাত্রায় নতুন জীবনচক্র লাভ করবো তাও আমরা জানি না। কিন্তু এইটুকু নিশ্চিত যে আমাদের থেকে বেশী ডাইমেনশান সম্পন্ন সৃষ্টি এই মহাজগতেই আছে। তারা আমাদের ইন্দ্রিয়গোচর না হলেও আমরা তাদের পর্যবেক্ষণ ও তত্ত্বাবধানে সব সময়ই আছি।’

টনি আর রুম্পা আজ যেন অনেক কিছু ভাবতে পারছে নতুন করে। তারা নিমেষেই বুঝে ফেলেছে উচ্চ মাত্রার সৃষ্টি কিভাবে নিম্ন মাত্রাদের ওপর নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। কিন্তু সর্বোচ্চ কত মাত্রায় এই মহাজগত সৃষ্ট বলতে গিয়ে ডি-ওয়ান একটু থমকে গেল। ভেবে বললো, ‘হয়তো বা অসীম মাত্রার।’

টনি বললো, ‘অসীম কেন হবে, একটা সংখ্যা তো হবে।’ 

ডি-সেভেন বেশ উতসাহের সাথে এগিয়ে এলো। বেশ সবজান্তার ভঙ্গীতে বললো, 

--সংখ্যার হিসেবও তো এক এক মাত্রার জগতে এক এক রকম । পৃথিবীর মানুষদের হিসেব ০ থেকে ৯ পর্যন্ত। বাইনারি হিসেব ০ থেকে ১ পর্যন্ত। সুতরাং এ সংখ্যাতত্ত্বের কি শেষ আছে? এখানেও হিসেব অন্যরকম। কিন্তু তোমরা তো সদ্য এসেছো পৃথিবী থেকে তাই বোঝার সুবিধার্থে আমাদের নামগুলো ১ থেকে ১১ পর্যন্ত রেখেছি কারণ আমরা যে ১১ জন।

--কিন্তু তোমাদের কোন নাম থাকবে না সে জন্য?

--নামতো একটা বিশেষ্য। আমাদেরকে কি বিশেষভাবে বিশেষায়িত করার প্রয়োজন আছে?

--তাহলে কি আমাদের কোন বৈশিষ্ট্যও থাকবে না?

--প্রয়োজন কি আছে? আমরা যে পৃথিবীর মানুষদের দেয়া সকল বিশেষণের উর্ধ্বে।

--বাহ তাহলে তো সংগাই পালটে যাবে জীবনের।

--জীবনের নয়, অবস্থার। তোমরা দুজনেই এখন ট্রানজিশান অবস্থায় আছ। নতুন জীবন বাছাইয়ের সময় প্যারামিটারগুলো  আবার নির্ধারণ করে নেবে।    

-- তাহলে এবার যদি এ জগত থেকে আবার পৃথিবীতে ফিরে যেতে চাই, পারবো কি? 

-- না। কারণ এই সকাল থেকে যতক্ষণ পর্যন্ত এখানে খেলা করছো ইতিমধ্যে পৃথিবীতে তোমাদের অন্তেষ্ট্যিক্রিয়া সম্পন্ন হয়ে দুই যুগ পার হয়ে গিয়েছে। তোমাদেরকে ধারণকারী দেহ, মাটির সাথে মিশে বিলীন হয়ে গেছে। ওখানে তোমাদের পার্থিব কোন অস্তিত্ব অবশিষ্ট নেই। 

এই সময়টুকুতে দুই যুগ পার হয়ে গেছে ভেবে টনি আর রুম্পা হেসে ফেললো। কিন্তু ওদের কেন বয়স বাড়ছে না এ জগতে ? সময় কেন এগুচ্ছে না আর, কেন থেমে আছে? নিশ্চয়ই পৃথিবীর থ্রি-ডি স্পেসের দেহে আর আবদ্ধ নেই বলেই হয়তো বা। তাই বুড়ো হবার ও বালাই নেই। টনি বললো, ‘তাহলে আমরা এখন কি?’

--তোমরা এখন সত্তা। দেহবিহীন। এটাই তোমাদের পরিচয়। যদি তোমরা অন্য কোন গ্রহে যেয়ে মানুষের দেহ ধারণ কর তাহলে মানুষ হবে। অথবা অন্য কিছু, যা তোমার মন চাইবে। রুম্পা সাথে সাথে বললো, ‘আমি পৃথিবীতে গেলে ডলফিন হব আর সারাদিন জলের ভেতর খেলা করবো।’ শুনে ডি-১১  বললো, ‘জানো আমি তিনজন্ম আগে ডলফিন ছিলাম। তারপর ঘাস ফড়িং তারপর খরগোশ। সবগুলোই পৃথিবীর থ্রি-ডি স্পেসে।’   

টনির ইচ্ছে হচ্ছে একটু পৃথিবী থেকে ঘুরে আসতে। সাথে রুম্পাও প্রস্তুত। যেই ভাবা সেই কাজ। প্রথমেই হাজির হলো ওদের প্রিয় ট্রি-হাউজে। মনে হল যেন বহুদিন এখানে কেউ আসেনি। খেলনাগুলো ধুলোর পুরু আস্তরণে ঢাকা। জানালার পাশ দিয়ে চিড়িয়াখানাটা আর নেই। ওখানে হাউজিং সোসাইটির বিশাল অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিং গড়ে উঠেছে। সেই সকালেই না ওরা বেরুলো ওই ঝর্ণা দেখতে আর তারই মাঝে এত্ত পরিবর্তন। তর সইলো না ওদের বাবা মাকে দেখার। বাড়ির ভেতর প্রবেশ করতেই দেখলো লিভিং রুমে বসে রয়েছে একজন বৃদ্ধ আর একজন বৃদ্ধা। নিশ্চুপ তারা। কারা এরা? 

রুম্পা টনি কাছে যেয়ে দাঁড়ালেও টের পেলেন না তারা। ওরা চিনতে পেরেছে। ওনারা তাদেরই বাবা মা। সত্যিই সময়  বয়ে গেছে দুই যুগ। তাদের বার্ধক্যের ছাপ এবার তারই নিশ্চিত প্রমাণ। কাছে যেয়ে তাদের ডাকলেও তারা শুনতে পেলেন না। দেখতেও পেলেন না। কি করা যায় ভাবছে টনি। আর তখনই নীরবতা ভেঙে বৃদ্ধা তার স্বামীকে বললেন,

--আজ যেন ছেলেমেয়ে দুটোর কথা খুব বেশী বেশী মনে পড়ছে। মনে হচ্ছে ওরা যেন আমার খুব কাছেই আছে। 

রুম্পা টনি তো হেসেই সারা। ওরা তো ওদের মায়ের সামনেই দাঁড়ানো। কেন যে মা দেখতে পাচ্ছে না। আসলে ডাইমেনশান পরিবর্তনের এই এক ঝামেলা। একবার যদি পরিবর্তন ঘটে তাহলেই তাকে বলা হয় অন্তর্ধান। রুম্পা টনিরও এখন এই ডাইমেনশান থেকে অন্তর্ধান ঘটেছে। তাই তারা দৃষ্টিগোচর হচ্ছে না। যতই কাছ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকুক আর মা কে জড়িয়ে বসে থাকুকনা কেন কিছুই তাদের দৃষ্টিগোচর হবে না। 

বৃদ্ধা আবারো বলে উঠলেন, ‘জানো, বাচ্চা দুটো যেন আমার খুব আছে এসে বসেছে।’ বৃদ্ধ ভদ্রলোক এবার ধীর গলায় বললেন, ‘একটা অদ্ভুত ব্যপার কি জানো, তুমি যখন এমনটি ভাবছিলে, আমার মনেও ঠিক এমন চিন্তা এসেছে। আমরা যেন একই সময়ে একই কথা ভেবে চলছি নিজেদেরই অজান্তে।’ 

টনি একটু হতাশ। কিছুতেই বোঝাতে পারছে না যে সে তাদের বড্ড কাছে। রুম্পা এবার টনিকে সান্ত্বনা দিয়ে বললো, ‘আমরা অন্য জগতে, অন্য মাত্রায় আছি তো কি হয়েছে, আমাদের দেখতে না পেলেই বা কি।  দেখা বা শোনা তো চোখ আর কানের কাজ। তারা তো ঠিকই আমাদের অস্তিত্ব টের পেয়েছেন। পাননি?’ 

টনি মাথা নেড়ে সায় দিলেও চোখে তার প্রশ্ন, কিন্তু কিভাবে? 

অনুভবে। 

রুম্পার ছোট্ট একটি উত্তর যেন এবার নতুন বোধের জন্ম দিল।

অনুভবে। 

ঠিক তাই। 

অনুভবে। 

সত্তার অনুভবে।

সত্তা সবসময় অপরিবর্তনশীল  – তা যে কোন অবস্থায় হোক বা যে কোন মাত্রায়। 

তাই বাস্তব বিবর্জিত বলে মানব মস্তিষ্ক যখন প্রাকৃতিক ঘটনাবলীকে তুচ্ছ বিবেচনা করে, মানব মন তখনও তার সত্তার মাঝে সে সত্যকে অনুভব করে।          

Sunday, September 5, 2010

চিহ্ন

ব্রায়ান বেশ কিছুদিন ধরেই অনুসরন করছে জেমীকে। কারণ তেমন কিছুই না। অনেকদিন পর বাল্যবন্ধুকে ফিরে পাওয়ার আনন্দ। সেই ছেলেবেলায় জেমীর সাথে তার কতনা মজার দিনগুলো কেটেছে। সময় যদি হিসেব করে, তাহলে এখন হতে ৮০০০ পরের কথা। ক্যালেন্ডার অনুযায়ী সালটা হবে ১০,০১০. ব্রায়ান আর জেমী তখন অ্যান্ড্রামিডা গ্যালাক্সীতে হেসে খেলে কাটিয়ে দিচ্ছে তাদের ছেলেবেলা। ড্রইং খাতায় আঁকাআঁকি করছে অসংখ্য সব জ্যামিতিক চিত্র। কখনো চতুর্ভুজ, কখনো বৃত্ত অলংকৃত জটিল জ্যামিতিক নকশা। আর এখন? ছেলেবেলা অনেক পেছনে। কর্মক্ষেত্রে ছিটকে পড়েছে যে যার দিকে। এখন ব্রায়ান একজন গ্যালাক্সী রোমার। একজন টাইম ট্র্যাভেলার। জেমী একজন বিজ্ঞানী। তাই গ্যালাক্সী ভ্রমণের ফাঁকে ফাঁকে হঠাতই ব্রায়ানের মিল্কিওয়ের সন্ধান পাওয়া। তারই ধার ঘেঁষে যাবার সময় সৌরজগতের নীলসবুজে ছাওয়া পৃথিবী নামক গ্রহকে এক ঝলকে ভাল লেগে যাওয়া।

তারপর?

বর্তমান ১০০১০ সাল থেকে ৮০০০ বছর পেছনে এসে ২০১০ সালের টাইম পোর্টাল দিয়ে এই টাইম স্পেসে আগমন। পৃথিবীর থ্রিডি স্পেসের বৈশিষ্ট্যমন্ডিত জীবজগত দেখে ব্রায়ান মুগ্ধ। অবস্থাগত দিক দিয়ে সে আংশিক পদার্থ এবং আংশিক শক্তিরূপে থাকতে বেশী স্বাচ্ছ্যন্দ বোধ করে, যা কিনা একটু অন্যরকম হলেও পৃথিবীতে তার ভালই লাগছে। তবুও সে কি জানতো তার জন্য অপেক্ষা করছে কি অসম্ভব এক চমক? পৃথিবী ভ্রমণে হঠাতই তার ফ্রিকোয়েন্সি ডিটেকটর সনাক্ত করে ফেললো তার ছেলেবেলার অ্যান্ড্রামিডান বন্ধু জেমীকে।

জেমী এখানে? এই থ্রি-ডি স্পেসে? এই সময়ে?

ব্রায়ানের উপস্থিতি কি সে টের পাবে? দুঃসাধ্য ব্যপার হবে ওর জন্য । প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে এ সময়কার সবকিছু এত পেছানো যে তার মাঝে জেমীর বাস্তবতা তার ৮০০০ বছর পরের স্মৃতিকে ধারণ করতে পারবে বলে মনে হয়না। জেমী বড়জোর তার বোধ বা অন্তর্দৃষ্টির দিক দিয়ে অন্যদের তুলনায় অনেক বেশী আগানো থাকতে পারে, যার নাগাল হয়তোবা কেউই পায় না এপৃথিবীতে। শুধু ব্রায়ান বা তাদের মতো অতি আধুনিক মানুষগুলোই তা টের পায়। তাই জেমীকে জেমীকে চিনতে পেরেছে সে এক নিমেষে। মনে পড়ে গেছে তার ছেলেবেলাকে।

এই তিন মাত্রা হতে আরো ৩০ মাত্রা বেশী এমন এক জগত থেকে ব্রায়ান এসেছে বলে তার পক্ষে এত নিম্ন মাত্রার বৈশিষ্ট্য ধারণ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। পার্থিব রূপ যে এত কঠিন জানা ছিল না ব্রায়ানের! তবুও ব্রায়ান জানাতে চায় তার উপস্থিতি জেমীকে।

ঘড়ির সময় অনুসারে এখন রাত ১২ টা ।

তারিখ ০৮.০৮.২০১০

টরন্টোর রাস্তায় জেমী তার সাদা গাড়ীটা নিয়ে এদিক সেদিক ঘুরে বেড়াচ্ছে। ব্রায়ানের বড্ড ইচ্ছে করছে ওর কাছে যেতে। অনুসরণ শুরু করলো একটা কালো গাড়ী নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ। মিনিট দশেক তো হবেই। সাবধানী দূরত্ব বজাই রাখছে সতত। কিন্তু জেমী কি টের পেয়েছে তাকে এ অনুসরণের? হঠাত আচমকা জেমী ডান দিকে মোড় নিল। নিরুদ্দেশ হয়ে গেল সাথে সাথে। জেমীর এই সূক্ষ্ম ‘হঠাত এর হিসেব ব্রায়ান ধরতে পারেনি। তাই হারিয়ে ফেলল জেমীকে। পরাজয়ের আনন্দ মেনে নিল ব্রায়ান আজ রাতের জন্য। কিন্তু কাল সকালে ও আবারো জেমীকে অনুসরণ করবে। ওকে জানানোর জন্য আরো কিছু করবে। মন চাইছে ছেলেবেলার ছবিগুলো এঁকে ওর সামনে হাজির করতে। পারবে কি জেমী ওসব ছবির কথা মনে করতে। নিশ্চয়ই না। কিন্তু ব্রায়ান রেখে যাবে ওর আঁকা চিহ্ন ওর বন্ধুর জন্য এ পৃথিবীর বুকে। পরদিন সকাল পেরিয়ে বিকেল। ব্রায়ান লক্ষ্য করলো জেমীর গাড়ি পার্ক করা আছে ড্যানফোর্থ এভিনিউর গ্রোসারী স্টোরের সামনে। কাছে গেল। কিছু একটা লিখে দেবে কি? কিন্তু ওর লেখা অক্ষরগুলো কি জেমী চিনতে পারবে? আজ হতে ৮০০০ বছর পর জেমী যে ভাষায় কথা বলে ভাব বিনিময় করতো তা এখন ভাবাও যে জেমীর কাছে কল্পনাতীত কল্পনা। ব্রায়ান গাড়ীর কাছে যেয়ে তার উইন্ডশীল্ডে আঁকলো ছোট্ট একটা আয়তক্ষেত্র। আর ঐ জায়গাটুকুকে প্রকট করার জন্য বসিয়ে দিল ধূলোর পুরু আস্তর। ঠিক মাপ মতন ধূলোর প্রলেপ একটি নিখুঁত আয়তাকার অঞ্চল জুড়ে জেমীর দৃষ্টি এড়ায় নি। ছোট্ট আয়তাকার ধূলোর ছাপ দেখে সে বেশ অবাকই হয়েছে। সারা গাড়ীতে কোথাও যেখানে ধূলোর উপস্থিতি নেই যেখানে সেখানে মাপ মতন নিখুঁত ধূলোর আস্তর এলো কিভাবে? জেমী জানতেও পারলো না এ যে তারই ভবিষ্যতের ছেলেবেলার বন্ধুর রেখে যাওয়া চিহ্ন।

আজ সময় ২৯শে জুলাই, ২০১০

জাপানী তেল বহনকারী জাহাজ ‘এম স্টার আরব আমীরাতের ফুজাইরাহ বন্দরে নোঙর করেছে। মাত্র সকাল এখন। ব্রায়ান বেশ কিছুক্ষণ ধরে লক্ষ্য করছে জাহাজটিকে। ইচ্ছে করছে জাহাজে একটা আঁচড় কেটে দিতে। বেশী গভীরে প্রোথিত এমন নয় তাহলে জাহাজের ফাটলে ওদের ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। তাই হালকা একটা কিছু । না হয় জ্যামিতিক কোন চিহ্ন। ব্রায়ান জাহাজের পেছনে নীচের দিকে এঁকে ফেললো বিশাল এক চতুর্ভুজ। দেখে মনে হচ্ছে যেন জাহাজের উপরিতল কোন চারকোনা কঠিন বস্তুর আঘাতে বা চাপে টোপ খেয়ে বেশ ভেতর ঢুকে আছে।


এ যেন এক দক্ষ কারিগরের হাতে তৈরী খুব হিসেবী কায়দায় আঁকা সুণিপুন একটি চতুর্ভুজ সম ভেতর বসে যাওয়া অঞ্চল বিশেষ, যার ধাক্কায় জাহাজের ভেতরের দেয়ালের সকল জিনিসপত্র ছিটকে এদিক সেদিকে পড়ে গেছে সমস্ত ঘরময়। সকল আসবাবপত্রকে স্থানচ্যুত হয়েছে এক নিমেষে। এই শব্দহীন সংঘর্ষের কারণ যদিও অজানা, কখন বা কিভাবে এমন হলো তারও প্রমাণ নেই, তাই জাহাজ কর্তৃপক্ষ সঠিক কোন বিশ্লেষণ দিতে অপারগতা প্রকাশ করলেন মিডিয়ার সামনে। খবরটি ইয়াহু'র প্রথম খবর হয়েছে আজ। ব্রায়ান হাসছে আর ভাবছে জেমী দেখবে জাহাজের গায়ে প্রোথিত জ্যামিতিক চিত্রটি কিন্তু মেলাতে কি পারবে এবারের আঁকা এই চতুর্ভুজটিকে তার গাড়ীর উইন্ডশিল্ডের ওপরে আঁকা ছোট্ট সেই চতুর্ভুজের সাথে? এই বিশালাকৃতিটির সাথে সেটার তুলনা চলে না। কিন্তু এ যে ব্রায়ানেরই আঁকা আরেকটি জ্যামিতিক ছবি, তার এঁকে রাখা চিহ্ন।

তখন সময় ১লা জুন ২০১০

গুয়েতেমালা শহরের কেন্দ্রে ৬৬ ফুট ব্যাসার্ধের একটি বৃত্ত আঁকলো ব্রায়ান। প্রায় ১০০ ফুট গভীর করে সুনিপুণ হাতে তার কম্পাস দিয়ে এঁকে ফেললো এই গোলাকার চিত্র। মাটি ক্ষয়ে সৃষ্টি হলো সিঙ্ক হোলের। পৃথিবীর বাসিন্দারা অবাক হয়ে দেখলো প্রকৃতির খাম খেয়ালীপনা, যা তাদের বোধগম্যেরও উর্ধ্বে। তবুও বিশ্লেষকরা মতামত দিলেন এই বলে, যে মৌসুমী ঝড় আগাথা-র নিয়ে আসা অঝোর বৃষ্টিই শহরের মাটি ধুয়ে এই সিংক হোলে সৃষ্টি করেছে।

কারন হিসেবে তারা যে ব্যাখ্যাই দেকনা কেন ব্রায়ান বেশ আনন্দিত। ভাবলো তার ছেলেবেলার বন্ধুকে দেখাবার জন্য আরও ছবি আঁকবে সে এ পৃথিবীর বুকে। তৈরী করবে অনবদ্য ক্রপ সার্কেল ডিজাইন। তাই যেই ভাবা সেই কাজ। চলে গেল সময়ের ২০০৯ সালের জুলাই মাসে। ও সময়ের গ্রীষ্মকালের আবহাওয়া ব্রায়ানের এই ছবিটা আঁকবার জন্য খুব উপযোগী বলেই এ সময়টা বেছে নিয়েছে।

স্থান ইংল্যান্ডের উইল্টশায়ার আর অক্সফোর্ডশায়ার। ক্রপ সার্কেলের জন্য জায়গা দুটির বেশ সুনাম হলেও খামার চাষীদের জন্য মাথায় বাড়ি। প্রকৃতির খামখেয়ালী চিত্রে চিত্রিত হয়ে কার জমির কতটুকু অংশ এ গ্রীষ্মে বিনষ্ট হবে তা আগভাগে কেউই যে আঁচ করতে পারেনা। আর অংকিত চিত্র ফুটে ওঠে রাতের গভীরে মিনিট খানেকের মাঝে। এ যে অদৃশ্য এক চিত্রশিল্পীর অপ্রতিরোধ্য খেয়ালের তাড়নায় সৃষ্ট কিছু চিত্রকর্ম। আজ ই শুধু নয়, বহু বছর ধরেই তো এমন হয়ে আসছে। কিন্তু কে সেই অদৃশ্য চিত্রকর? কার আঁকা এত সুনিপুণ চিত্রকর্ম? এবারের আঁকিয়ে ব্রায়ান। কিন্তু তারা কি তা জানে? আজ অক্সফোর্ডশায়ার সে এঁকেছে ৬০০ ফুট লম্বা একটি জেলিফিশ। ইয়েটসব্যারি, উইল্টশায়ারের শস্যক্ষেত্রে এঁকেছে ১৫০ ফুট দীর্ঘ ড্রাগন ফ্লাই। এবারের চিত্রিত ক্রপ সার্কেলগুলো সবার কাছে ভিন্ন মাত্রার আঙ্গিক সৃষ্টি করেছে। কারণ, বরাবরের মতো এ যে সাদামাটা গোল বা সরল রেখা বা চারকোনা ডিজাইন নয়। এ যেন জ্যামিতিক আকারের বিচিত্র জটিল সজ্জা, গাণিতিক মাপে মাপে যার নিখুঁত বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু আবারো সকলের মনে সেই একই প্রশ্ন কে এই অদৃশ্য আঁকিয়ে।

 

অ্যান্ড্রমিডা থেকে আসা ব্রায়ানকে তারা কেউ চিনবে না। খেলার ছলে তার কত না চিহ্ন সারা পৃথিবীর বুক জুড়ে সে রেখে

যাবে।

এখন তো ব্রায়ান প্রৌঢ়ত্বের দ্বারপ্রান্তে। সময় চলে গেছে অনেক। বাল্যবন্ধু জেমী চলে এসেছে ৮০০০ পেছনের ত্রিমাত্রিক জগতে। ব্রায়ান রয়ে গেছে তার অশরীরীয় ৩৩-মাত্রার জগতে। জেমীর কল্পনার উর্ধ্বে এসব উর্ধ্বমাত্রার জগত। কিন্তু জেমী যে তার ভবিষ্যতের সেই জগত থেকেই আসা, যেখানে আলোর একটু ঝলকানির মতো ঘটে উর্ধমাত্রার প্রাণীদের নিছিক কোন খেয়ালী কর্মকান্ড। পৃথিবীবাসী মানুষগুলো ব্যাখ্যাতীত এসব ঘটনায় অভিভূত হয়ে যায়। ওদের অনুভূতি যে একেবারেই ভোতা নয় তার প্রমাণ ব্রায়ান পেয়ে যায় বেশ জোরেসোরেই। যে কোন অতিপ্রাকৃত ঘটনায় তাদের মাঝে হৈচৈ পড়ে যায়। ব্রায়ান খুব পুলকিত হয়। কিন্তু তবুও জেমী যে তার ধরা ছোঁয়ার বহুদূরে। জেমীকে তার সময়ের কাঠামোতে আবার ফিরে পেতে হয়তোবা আরো অপেক্ষার প্রয়োজন হতে পারে ব্রায়ানের, যখন জেমী এ সময়ের খেলা সাঙ্গ করে আবারো মিলিত হবে ব্রায়ানের টাইম-স্পেসে কোন এক অদূর ভবিষ্যতে।

০৬/০৯/২০১০

Monday, August 16, 2010

নিকষ কালো


মারফির ঘুমটা ভেঙে গেল প্রচন্ড এক বিস্ফোরণের শব্দে। টেবিল ক্লকে সময়টা দেখবার চেষ্টা করলো। রাত ১ টা বেজে ৪৫ মিনিট। জানালার পর্দা সরিয়ে বাইরে চোখ রাখলো। ইচ্ছে করছে বাইরে যাবার, কিন্তু সে উপায়ও নেই। ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহ। প্রচন্ড শীতে আবৃত হয়ে আছে টরন্টোর কাছে মিসিসাগা শহরটি। কিন্তু বাইরে কি হলো ভেবে আর ইচ্ছে করছে না ঘরে বসে থাকতে। বাইরে বেরুতেই হবে। শীতের জ্যাকেটটা গায়ে দিয়ে মারফি বেরিয়ে এলো ওর অ্যাপার্টমেন্ট থেকে। দূরের নিকষ কালো আকাশে রক্তিম আভা। দু’ব্লক পরেই রয়েছে একটা নির্মানাধীন বাড়ি। সেখানেই কি কিছু হলো? এই শীতে তুষার পাড়িয়ে মারফি হাজির হলো ৪১০ নম্বর ব্র্যাম্পটন হাইওয়ের কাছে। বিধ্বস্ত হয়েছে পুরো বাড়ীটা। নির্মানাধীন বলে লোকজন কেউই ছিল না এতরাতে। তাই হতাহতের সংখ্যা শূন্য। কিন্তু ১ মিলিয়ন ডলারের ক্ষয়ক্ষতির কারণ নির্ধারণে যদি পুলিশরা সফল না হয়  তাহলে এরকম অগ্নিকান্ডের শঙ্কা দিন দিন বৃদ্ধিই পাবে।

তারিখ ২২শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৯

একটি ডকুমান্ট ওপেন করলেন সার্জেন্ট ক্রিস হ্যারি।সময় রাত ২ টা বেজে ৩৫ মিনিট। ফাইলটির প্রথম লাইনে লিখলেন দুটি শব্দ।

‘সন্দেহজনক অগ্নিকান্ড’

দ্বিতীয় লাইনে, ‘স্থান ৪১০ নম্বর ব্র্যাম্পটন’

তৃতীয় লাইনে কিছুই পেলেন না লেখার মত। কারণ কোন তথ্যই তার দল উদ্ধার করতে পারেনি এ যাবত। কিছুক্ষণ ভেবে উইন্ডোজ বন্ধ করতে গিয়ে দেখলেন আরেকটি ফোল্ডার।  নাম ‘উইপিপেগ।’ এ ফোল্ডারটিও শূন্য। কোন তথ্যই এ পর্যন্ত জোগাড় হয়নি। উইনিপেগের ১৪০০ বাসিন্দা ২০০৯ এর গোড়ার দিকে তাদের রাতের আকাশে সিগার আকৃতির শব্দবিহীন একটি স্পেসক্রাফট উড়ে যেতে দেখেছিল। শুধু মানুষের চোখে নয়, র্যা ডারেও এর অস্তিত্ব ধরা পড়েছিল। কিন্তু তদন্তের ফলাফল শূন্য। খানিকটা আনমনা হয়েই সার্জেন্ট হ্যারি উইন্ডোটি বন্ধ করে দিলেন। পাশে রাখা ব্রিফকেসটি তুলে নিয়ে কাঁচের দরোজা ঠেলে বেরিয়ে এলেন অফিস থেকে। আজ আন্ডার গ্রাউন্ড ট্রেনে বাড়ি ফিরবেন। গাড়ীতে ড্রাইভ করে বাড়ি ফিরতে সময় লাগে দু’ঘন্টা আর ট্রেনে যেতে বিশ মিনিট। 

শহরের শেষ প্রান্তে তার বাড়ী। এই মিনিট বিশেক দূরন্ত ট্রেনে বসে থাকতে গিয়ে মাঝে মাঝে হাঁপিয়ে উঠেন তিনি। তখন পত্রিকা বা বই হয় তার সঙ্গী। কিন্তু আজ কিছুতেই মন বসছে না বইতে। একটার পর একটা আনসলভড মিস্ট্রি আর ভাল লাগছে না। মাথায় হাত রেখে জানালার কাছে হেলান দিয়ে বসে এসব কথা  ভাবতে ভাবতে হঠাতই জানালার কাঁচ দিয়ে বাইরে তাকালেন। মাটির নীচের সুড়ঙ্গ ধরে নিকষ কালো অন্ধকারে পাতাল রেল ছুটে চলছে এক অসম্ভব গতিতে। আজ যেন ট্রেনের গতিটা একটু বেশি মাত্রায় অস্বাভাবিক ঠেকছে।

ট্রেন চালক জন স্টুয়ার্ট স্থির মনোনিবেশে ট্রেনের গতি নিয়ন্ত্রণ করছেন। নাইট শিফটে তিনি এ কাজের সাথে যুক্ত আছে দীর্ঘ ২১ বছর ধরে। প্রতিদিন একই রুটিন । শহরের একপ্রান্ত থেকে যাত্রী অপর প্রান্তে পৌঁছে দেয়া। ঘড়িতে সময় দেখলেন রাত ২ টা বেজে ২০ মিনিট। সামনে তাকালেন আবার। কিন্তু কেমন যেন মনে হল, যেন সামনের অন্ধকারটুকু আর তার কাছে প্রতীয়মান হচ্ছে না। এ যেন আরো অনেক বেশী কালোয় ছেয়ে যাওয়া এক অচেনা অন্ধকার।  এত নিকষ কালো আধাঁর তিনি আগে কখনো দেখেন নি। সুড়ঙ্গ পথের বাতিগুলো কি সব নিভে গেল নাকি? কিন্তু কেন তা হবে? পাওয়ার ফেইলিওর এর তো প্রশ্নই আসেনা। তাহলে তো ট্রেন চলাই থেমে যেত। জানালা খুলে আশপাশ বুঝার চেষ্টা করলেন। খুব হালকা মনে হচ্ছে নিজেকে। অনেকটা যেন ওজনহীন। চলার পথে লোহার পাতের সাথে চাকার সংঘর্ষে যে বিকট শব্দ সৃষ্টি হয় তাও যেন শোনা যাচ্ছে না। অথচ ট্রেন তো  চলছে অবিরাম গতিতে। আর মাত্র তিন মিনিট। তারপরই যাত্রী নামিয়ে ফিরতি পথে রওনা হবেন জন। আর বাড়ির পথে পা বাড়াবেন সার্জেন্ট হ্যারি। এত রাতে উনি ছাড়া কোন যাত্রীও নেই এই ট্রেনে। 

কর্মক্লান্ত বেলা পেরিয়ে এই বাড়ি ফেরার মুহূর্তটি ভীষণ ভাবে উপভোগ করেন সার্জেন্ট। মাত্র তো আর তিনটি মিনিট। আবারো ঘড়ি দেখলেন তিনি। সময়টা পেরুতে চাইছে না কেন? এমন মনে হচ্ছে কেন, যেন সময় আজ মান করে তার চলা থামিয়ে ঠাঁয় বসে আছে। আজ যেন সে কিছুতেই এগুবে না। ঘড়ির দিকে আবারো চাইলেন তিনি। কাঁটা যেন হঠতাই থেমে গেছে। বেশ খানিক্ষণ আগে দেখলেন রাত ২ টা বেজে ২০ মিনিট। এখনও তাই? ভুল দেখেননি তো? কিন্তু তা কি করে হয়? বিশ মিনিটেই বাড়ি পৌঁছে যান তিনি। আর সে সময় তো এতক্ষণে পারও হয়ে গেছে। তাহলে ঘড়ি কি সময়ের হিসেব আর করতে পারছে না, নাকি তার হিসেবে ভুল হচ্ছে? বড্ড যেন দীর্ঘ মনে হচ্ছে আজকের এ যাত্রা। কোন ভাবেই যেন পথ আর শেষ হতে চাইছে না। নিজেকে অসম্ভব হালকা ঠেকছে নিজের কাছে। জানালার কাঁচ দিয়ে বাইরে তাকালেন আবার। ট্রেনটা যেন উন্মত্ত গতিতে ছুটে চলছে। কিন্তু কোথায়, কোন গন্তব্যে? তার বাড়ীর স্টপেজই তো শেষ স্টপেজ। এই স্টপেজ ছাড়িয়ে ট্রেন তো আর এগুবে না। ফেরত আসবে মিসিসাগা শহরে। বিরামহীন এ ছুটে চলা তাহলে কেন?  কোন উদ্দেশে ? এমারজেন্সী বাটনে চাপ দিলেন ট্রেন থামানোর সংকেত দিয়ে। সময় আরো কিছুক্ষণ পার হলো কিন্তু থামার নাম নেই। সংকেত দেখে গতি কমানোর চেষ্টা করলেন ট্রেন চালক। সামনে তাকালেন। নিকষ কালো আধাঁরে অসংখ্য ঘন কালো বুদবুদ ভেসে বেড়াচ্ছে তার চারিদিকে। অদৃশ্য এক শক্তি যেন টেনে নিয়ে যাচ্ছে মোহনীয় আকর্ষণে আরো গহীনে তার নিজের ভেতরে সীমাহীন ঘন অন্ধকারে। যতই সামনে এগুচ্ছে ততই যেন ট্রেনের গতি বেড়ে চলছে। অথচ পথ যে শেষ হচ্ছে না। চালক জন স্টুয়ার্ট  চমকে উঠলেন ব্যপারটা খেয়াল করে। তিনি তার ট্রেন সহ কি মিশে গেছেন অন্য কোন জগতে নাকি প্রবেশ করেছেন ব্ল্যাকহোলের অজানা সুড়ঙ্গপথে? এর কেন্দ্রের সীমাহীন আকর্ষণে এ যাত্রার গতিরোধ তো তাহলে অসম্ভব ব্যপার। কিন্তু কি ভাবে এমন হল?  কার ইশারায়? হায় ইশ্বর!

মোবাইলে কল করলেন একমাত্র যাত্রী সার্জেন্ট হ্যারিকে। কিন্তু কি আশ্চর্য, বৈদ্যুতিক তরঙ্গগুলো যেন তাদের অবস্থান থেকে নড়তে চাইছে না। ফোনটা বাজছে না। অথচ ট্রেন থামাবার সংকেত তো ঠিকই জ্বলে উঠেছে। উপায় না দেখে জন পেছনের দরজা দিয়ে যাত্রী কক্ষে প্রবেশ করলেন। কক্ষটি বেশ প্রশস্ত হওয়া সত্ত্বেও আজ কেন জানি একে আকারে লম্বাটে আর সরু দেখাচ্ছে। সার্জেন্টকে দেখে একটু অবাকই হলেন তিনি। আজ তাকে এতটাই লম্বা দেখাচ্ছে যেন মনে হচ্ছে তার দীর্ঘ অবয়ব ট্রেনের ছাদ ছুঁয়ে ফেলবে। ব্ল্যাকহোলের তীব্র মহাকর্ষীয় বলের চাপে বস্তু তার আকৃতিও হারাবে এমন কথা তিনি কোথায় যেন পড়েছিলেন। শুধু আকৃতি হারানোই নয়, বস্তু প্রচন্ড চাপে পিষ্ট অবশেষে বিলীন হয়ে যাবে অসীমতায়। কিন্তু এগুলো তো বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব যা শুধু বইয়ের মাঝে গাণিতিক সমীকরণে সীমাবদ্ধ থাকে। বাস্তবে কি হয়? বস্তু আসলেই কি আকার পরিবর্তন করতে করতে চিপসে যেতে পারে? এ প্রশ্ন ট্রেনের একমাত্র যাত্রী সার্জেন্ট হ্যারির মনেও উদয় হল ঠিক একই সময় যখন কিনা ট্রেন চালক জন স্টুয়ার্ট তা সামনে এসে দাঁড়ালেন। এই মাঝারী গড়নের গোলগাল  লোকটি কেমন যেন চিপসেটে হয়ে তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু এমন মনে হবেই বা কেন। নির্ঘাত দৃষ্টিভ্রম। দুজনেরই দৃষ্টিভ্রমে দেখতে পাওয়া দুজনের প্রায় বিলীন অবস্থা আজ বাস্তব হয়ে যে তাদের সামনে ঠাঁয় দাঁড়িয়েছে তা তারা ভাববার দুঃসাহসও করলেন না। অথচ দুজনের অস্তিত্ব , অনুভূতি এখনই যে হারাবার দ্বারপ্রান্তে। এ উপলব্ধির আগেই কৃষ্ণগহবরে নিপতিত তাদের ট্রেনটি পাতলা কাগজের মতন এক সমতল বস্তুতে পরিণত হলো এবং আরো সংকুচিত হয়ে কুঁকড়ে বিন্দুসম আকৃতি ধারণ করে কৃষ্ণগহবরের রাহুগ্রাসে নিপতিত হলো। শহরের সকলে পরেরদিন আরেকটি খবরে বিস্মিত হলো। আর তা হলো-গতকালের রহস্যময় অগ্নিকান্ডের পর তদন্তকারী পুলশ অফিসার নিরুদ্দেশ । শুধু তাই নয়। নাইট শিফটের ট্রেন চালক জন স্টুয়ার্ট ও তার  যাত্রীগামী পাতাল রেলেরও হদিস পাওয়া যাচ্ছে না।

সকালের খবর পড়ে মারফির মন কিছুটা খারাপ হয়ে গেল। ৪১০ নম্বর ব্র্যাম্পটনের অগ্নিকান্ডের সূত্রপাত নির্ণয় অসম্ভব হতে পারেনা। জানার সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে কিন্তু কারণ নিশ্চয়ই আছে। আর সেই পুলিশ অফিসারের নিরেদ্দেশ হয়ে যাওয়া তদন্তের ঠিক পরপরেই-এ যেন আবছা একটা যোগসূত্র তৈরী করে ফেলেছে। যারাই অগ্নিকান্ড ঘটাক না কেন তারাই চায় না এর তদন্ত হোক। তাই পাতাল রাস্তা ধরে ছুটে চলা ট্রেনটিকে উধাও করে দিয়েই তারা যান সর্বান্তকরণে নিশ্চিত হয়েছে এ তদন্তের সীমারেখা টেনে দিতে। আর সেই পাতাল রেলের  সুড়ঙ্গপথে প্রবেশের এক অদম্য ইচ্ছা এখন মারফিকে পেয়ে বসেছে। যাবে সে ওখানে যেভাবেই হোক। না হয় প্রয়োজন হলে রেল ইঞ্জিনিয়ারের ছদ্মবেশ ধরেই প্রবেশ করবে ওই প্রবেশ নিষেধ এলাকায়। এসব আকাশ পাতাল চিন্তা করতে করতেই মারফি তার গাড়ীটার স্টার্ট অন্‌ করলো। 

গাড়ীটা স্টার্ট নিতে গিয়েই থেমে গেল। আবারো চেষ্টা করলো। সবই ঠিক ঠাক কিন্তু তারপরও গাড়ী যেন কিছুতেই স্টার্ট নিচ্ছে না। যেন আজ তার মন চাইছে না মারফিকে নিয়ে অজানা গন্তব্যের উদ্দেশ্যে যাত্রা করতে। বেশ কিছুক্ষণ চেষ্টা করে মারফি সিদ্ধান্ত নিল পায়ে হেঁটেই যাবে ঐ স্পটে যেখানে পাতাল সুড়ঙ্গ পথের সূচনা হয়েছে। গাড়ীর দরজাটা লক্‌ করে ঘুরে দাঁড়াতেই হোঁচট খেল কিসের যেন একটা হ্যাচকা টানে। ওর কোটের আস্তিনটা দরজার ভেতরে আটকে আছে। এমন কেন হচ্ছে? যেন তার প্রিয় মন্টিকার্লো- ২০০৩  তাকে আটকে রেখে আজ বারণ করছে কোথাও যেতে। মারফি হেসে ফেলল নিজ মনে। গাড়ী কি মানুষ নাকি যে বাধা দেবে, নিষেধ করবে, বারণ  না শুনলে জামার আস্তিন ধরে আটকানোর চেষ্টা করবে। নিশ্চয়ই নয় । অথচ প্রাণহীন জড় মন্টিকার্লোর দেহের অভ্যন্তরস্থ পরমাণুগুলো তো স্পন্দনহীণ নয়। সে স্পন্দনে অনুরণন আছে। সেই অনুরণনে যদি তৈরী হয় অনুভূতিসম্পন্ন বোধ তার প্রভাব কি অনস্বীকার্য? আর এ বোধ  যদি পরিচালিত হয় প্রকৃতির নির্দেশে তাহলে নির্দেশ গ্রহণ ও পালন করবার মতো ক্ষমতাও প্রতিটি বস্তুকণার রয়েছে তা সে জড়ই হোক আর জীবই হোক। তাই বুঝি মন্টিকার্লো তার অনুভূতি দিয়ে আজ ঠিকই আঁচ করতে পেরেছে কিছু একটা ঘটবার। মারফির যাত্রাপথকে রোহিত করছে তাই বারবার, বেশ কয়েকভাবেই। কিন্তু মারফি কি সেই সংকেত অনুধাবন করতে পেরেছে, যাতে ছিল মারফিকে বলা অনেকগুলো কথা । যেখানে বলা হয়েছে পাতাল রেলপথের অস্বাভাবিকতার কথা, যা কিনা সেই সুড়ঙ্গকে ঠেলে ক্ষণিকের জন্য হলেও যুক্ত করে ফেলে ছায়াপথের কেন্দ্র বরাবর ঠিকানাবিহীন অন্য কোন ডাইমেনশানে, যে কিনা নিমেষে শুষে নেয় সবকিছুর অস্তিত্ব, হরণ করে সকল অনুভব । যেখানে অচকিতে স্থানান্তর ঘটে যায় অন্য কোন জগতের সাথে, যেখানে আজই  প্রবেশ করেছেন সার্জেন্ট ক্রিস হ্যারি তার কাজের রহস্য কিনারা না করতে পেরেই। যেখানে প্রবেশ করেছেন ট্রেন চালক জন স্টুয়ার্ট কিছু না জেনেই। যে জগতে নেই আলো, শুধুই অন্ধকার। যে জগত নিকষ কালো, জীবনের ওপার। যেখান থেকে আর ফেরা যাবে না। কিন্তু তারা জানবেও না তাদের এ যাত্রা অন্তহীন, সময়ের উর্ধ্বে। আজ মারফিও যাবে সেখানে । প্রবেশ করবে সেই জগতে। প্রকৃতি বোধহয় তা চাইছে না, তাই বাধা দিয়েছে বারবার । কিন্তু মারফির তীব্র কৌতুহল তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে সেই অজানা উদ্দেশে তারই অজান্তে।

   শেষ।


দীপার প্রেম

 তারিখঃ ৪ঠা এপ্রিল ২০০২ স্থানঃ লেকচার হল, দ্বিতীয়তলা  ডিউটি করবে দীপা আর সুমন  সময়ঃ রাত আটটা থেকে ১২টা পর্যন্ত  অর্থাৎ এই চার ঘন্টায় লেকচ...