পথচারী
কল্পগল্প
Sunday, May 17, 2026
Tuesday, April 7, 2026
দীপার প্রেম
স্থানঃ লেকচার হল, দ্বিতীয়তলা
ডিউটি করবে দীপা আর সুমন
সময়ঃ রাত আটটা থেকে ১২টা পর্যন্ত
অর্থাৎ এই চার ঘন্টায় লেকচার থিয়েটারের সকল আসবাবপত্র ঝকঝকে, তকতকে করে, বিশাল বড় বড় কার্পেটের ধুলা ঝেড়ে পরের দিনের অফিস মিটিং এর জন্য লেকচার থিয়েটার উপযুক্ত করে রেখে যেতে হবে।
দীপার জন্মসংখ্যা ১৩, তাই ৪ সংখ্যাটি তারিখ হিসেবে আসলেই তার কেমন যেন ছটফট লাগে। আতঙ্ক ঠিক না। কিন্তু একটা অন্যরকম উৎকণ্ঠা। নিজেকে সান্ত্বনা দেয়, এই ভেবে, খারাপ কিছু নিশ্চয়ই হবে না। কারণ ৪ সংখ্যাটি যে তারi জন্মসংখ্যা ।
কিন্তু আজ যে একটু বেশি ধরণের অন্যরকম লাগছে।
কিন্তু কেন?
শুধু দিনটির সংখ্যা ৪ নয়, দিনটি বছরের চতুর্থ মাসের চতুর্থ দিন। মানে এপ্রিলের ৪ তারিখ। আর ২০০২ সালের সংখ্যগুলো যোগ করলেও তো সেই দুই যোগ দুই- চার।
দীপার ভিতরটা কেমন যেন লাগছে। নিজেকে ঠিক মানাতে পারছে না। আজকে নিজেকে কোনভাবেই শান্ত করতে পারছে না। মন বলছে আজ যেন কিছু একটা অপেক্ষা করে আছে ওর জন্য। এসব ভাবতে ভাবতেই লেকচার- হলে প্রবেশ করল দীপা। হলের এ প্রান্ত থেকে ওই প্রান্ত যেন দেখা যায় না। কম করে হলেও ৪০ বা তারও বেশি ছাত্রের আসন বসানো হয়েছে এই থিয়েটারটি। লেকচার থিয়েটারের ঝাড়ামোছার কাজ করছে আজ প্রায় পাঁচ বছর হলো। সাথে সহকর্মী হিসেবে প্রায়শই থাকে সুমন। আজ কেন যে সুমন আসতে এত দেরি করছে। এত বড় লেকচার থিয়েটারের নির্জনতা দীপার কেমন যেন গা ছমছমে ভাবের উদয় করে। এত বছর যাবৎ নাইট ডিউটি করছে, তারপরও লেকচার থিয়েটারের বিশালতা আর নির্জনতার সাথে কেন জানি একাত্ম হতে পারেনি সে। সুমন না আসা পর্যন্ত কি বাইরে অপেক্ষা করবে নাকি ভেতরে যেয়ে কাজ শুরু করে দেবে? আর কতই বা অপেক্ষা করা যায়, এসব সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতেই কানের কাছে মৃদু শিসের শব্দ। ঘাড় ফিরে তাকালো দীপা। সুমন এসেছে অতঃপর। সেই দুষ্টু ভরা হাসি। দীপার প্রশ্ন সরাসরি, 'দেরি হলো কেন? তুমি জানো না একা এত বড় লেকচার হলের নাইট ডিউটিতে আমার ভীষণ ভয় লাগে একা একা?'
সুমনের আবারও হাসি। আর চকিত উত্তর, 'যদি একেবারেই আর না আসি? একা একা যদি কাজ করতে হয় সারাটা জীবন?'
দীপা হকচকিয়ে যায়।
কি যে বলে সুমন, সে বুঝে উঠতে পারে না। অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে শুধু ওর দিকে। সুমন আজ কেমন যেন করে কথা বলছে। কাজ করার কোন মুড যেন তার নেই। হঠাৎ এর মাঝেই সুমন ওর হাতটা ধরে থিয়েটারের একেবারে কোণার দিকে টেনে নিয়ে, কোমর জড়িয়ে ধরে, ওর মুখটা কাছে এনে বলল, 'তোর জন্য একটা চকলেট এনেছি।'
'কোনটা?' দীপার বিস্ময়!
:এই দেখ।
ক্যাডবারির মুখটা খুলে চকলেট - বারটা দীপাকে না দিয়ে নিজের মুখে আধেক টুপ্ করে পুরে দিল। তারপর দীপার কাছে মুখটা এনে বলল, 'নাও। খাও।'
দীপার পক্ষে এই দুষ্টমি কি বোঝা সম্ভব? কিভাবে খাবে ওর মুখ থেকে? দীপাকে আরো কাছে টেনে নিয়ে বুকের মাঝে চেপে ধরলো এবার সুমন। তারপর বলল, 'আমার মুখ থেকে নিয়েই খাও না।' চক-বারটি তার মুখে আবার পুরে দিয়ে, মুখটা এগিয়ে নিয়ে এলো একদম নাক বরাবর দীপার সামনে।
এমনভাবে জাপটে ধরে আছে কেন সুমন? কখনো তো এমন সে করেনি। কি হয়েছে আজ তার? দীপা না পারছে নিজেকে সুমনের হাত থেকে ছাড়াতে, না পারছে ওর হাত দুটো নাড়াতে। ও খুব শক্ত করে জাপটে ধরেছে দীপাকে। অতএব দীপা এখন বাধ্য। সুমনের আদেশ তাকে পালন করতেই হবে। এছাড়া উপায় নেই ওর বন্ধন থেকে মুক্ত হবার। দীপা মুখটা এগিয়ে চকবারের কাছে নিজের মুখটা স্পর্শ করতেই, সুমনের নাকের সাথে নাক আর কপোলের সাথে কপোলের স্পর্শ কেমন যেন এক শিহরণ জাগালো। আজ প্রথম সুমনের এত ঘনিষ্ঠ হয়েছে সে। এত বছর দু'জন কাজ করেছে, সপ্তাহে প্রায় দুইদিন একসাথে ডিউটি থাকতো তাদের, কিন্তু কখনো দীপা এমন ঘনিষ্ঠতার কথা চিন্তা করেনি। সুমন তার খুব ভালো বন্ধু। কিন্তু আজ যেন সুমন একদম অন্যরকম। দীপাকে তার বুকের মাঝে যেন আগলে রেখে দিতে চাইছে। এমন চাপ দিয়ে ধরে রাখলে আর কিছুক্ষণ পর দম বন্ধ হয়ে দীপা বুঝি চ্যাপ্টা হয়ে যাবে। একটু নিজেকে ছাড়াবার জন্য, হাতটা সরাতে চাইলেও সুমন আরো কাছে নিয়ে যেন ওকে বেঁধে ফেলছে।
দীপা প্রশ্ন করবে কিভাবে? কন্ঠ যেন জড়িয়ে আসছে। তারপরও বলল, 'কি হয়েছে আজ তোমার সুমন? কত কাজ বাকি, জানো? পুরো হলঘর পরিষ্কার করতে হবে। কাল কনফারেন্স আছে তো, মনে নেই?'
সুমনের কোন হুঁশই নেই যেন। ওর চোখের মাঝে সে ডুবে আছে।
দীপার চোখ পিঙ্গল বর্ণের। সাধারণ বাঙালি ধাঁচের নয়। চুলগুলো লালচে, কিন্তু বাঁ পাশের একখানা চুল একদম সোনালী। আর সুমনের চোখগুলো একদম সবুজাভ নীল। সারা দক্ষিণ অঞ্চলের কোন মানুষের চোখ এমন নীলাভ সবুজ হয় না। লম্বা সুঠাম দেহের অধিকারী সুমন, তার চেহারার জোরে আরো ভালো কোন কাজ যোগাড় করতে পারতো। কেন যে এখানে ধোয়া মোছার কাজ নিয়েছে সে, দীপা বুঝতে পারে না। কখনো জিজ্ঞেস করেনি যদিও। জীবনের প্রয়োজনে, জীবিকার তাগিদে একটা কাজ যে জুটেছে সেটাই বড় কথা। তাও আবার এত বড় একটা প্রতিষ্ঠানে, এইতো বেশি। হতে পারে ছোটখাট দায়িত্বের মধ্যে পড়ে এই কাজ, কিন্তু তারপরও চাকরির এই দুর্মূল্যের বাজারে দু'জনের জন্য খুবই জরুরি এই কাজটা। কিন্তু কাজ বাদ দিয়ে চকলেট -বার দেবার উছিলায় দীপাকে এভাবে বুকের মাঝে ধরে রাখার কি কারণ? এটা কি ভালো দেখায়?
সহকর্মী থেকে বন্ধু । কিন্তু প্রেমিক তো নয়। আর আজ সুমনেরই অন্তরঙ্গতায়, প্রথম যেন দীপা নিজেকে অনুভব করল একটু অন্যভাবে। প্রতি রোমকূপে আজ তার অন্যরকম শিহরণ। ইচ্ছে করছে হারিয়ে যেতে সুমনের সাথে দূরে কোথাও। অনেক দূরে। অজানার উদ্দেশে।
সুমন খুব বুঝে দীপাকে। দূরে কোথাও অনেক দূরে চলে যাওয়ার কথা ভাবনায় আসাতেই সুমন প্রশ্ন করে বসলো,
:কি ভাবছিস রে?
:না কিছু না।
: কিছু না মানে কি?
:কিছু না মানে কিছু না। ছাড়ো এবার। যাব আমি।
সুমনের প্রশ্ন, 'কোথায় যাবে?' দীপার উত্তর, 'কাজে।'
সুমনের আবার প্রশ্ন, 'কিসের কাজ?'
:ওমা কাজ আছে না? কালকে কনফারেন্স। তার জন্য থিয়েটার রেডি করতে হবে না?
সুমন অবাক হয়ে বলল, 'সেই সময় যদি না পাই?'
দীপার অবাক প্রশ্ন, 'কেন সময় পাবো না?'
সুমনের কন্ঠস্বরটা যেন একটু দৃঢ় হয়ে গেছে। এবার একটা চাপে যেন মিশিয়ে ফেলবে দীপাকে তার সাথে। মুখটা আবার কানের কাছে এনে বলল, 'সময় নেই দীপা। যেতে হবে আমাকে।' দীপার অবাক চোখে প্রশ্ন, 'কোথায়?' সুমনের ওম্ পেয়ে দীপা যেন গলতে গলতে একদম একাকার। সুমনের বুকের ভিতর মিলে মিশে সে শিহরিত। সুমন খুব ধীরে ধীরে বলল, 'দীপা আমাকে আজ যেতে হবে আমার বাড়িতে। যেখান থেকে আমি এসেছি।'
দীপার মনে হলো, আজ এতদিন একসঙ্গে সুমনের সাথে কাজ করেছে, অথচ জানাই হয় নাই, সুমনের আদি বাড়ির ঠিকানা। আসলে সুমন তাকে যদি এমন ঘোরের মাঝে না ফেলতো, দীপা হয়তোবা এতো গভীরভাবে ওকে নিয়ে কখনোই ভাবতো না। আজ তার এই গভীর আলিঙ্গন, প্রথম স্পর্শ আর বুকের ওম্ নতুন ভবানা জাগাতো না। কিন্তু এমন তো কখনো আগে হয়নি। আজ হঠাৎ কেন? কি হলো সুমনের?
আজকের দিনটা চতুর্থ মাসের চতুর্থ দিন। দীপার জন্মসংখ্যার দিন। ওর কাছে যেন ঝাপসা ঠেকছে সবকিছু। এমন হচ্ছে কেন?
দীপা আবার ছাড়াতে চাইছে নিজেকে, সুমনের বাহুডোর থেকে। না সে উপায় নেই । সুমনের শক্ত বাহুর আগল থেকে, দীপার ছুটে বেরিয়ে পড়া একেবারেই অসম্ভব। তাই তার শেষ চেষ্টা, শেষ প্রশ্ন, ‘কতদূর তোর বাড়ি? আজ হঠাৎ যাবার সিদ্ধান্ত কেন? ক'দিন পরে ফিরবি?'
সুমন শুধু তাকিয়ে আছে দীপার চোখের দিকে। অনেকটা ক্ষণ পার হলে সুমন বলল, 'আমার ঠিকানা তো এই গ্রহে নয়। আমি এসেছি ভেনাস থেকে। তোদের পৃথিবীর প্রেমের দেবী ভেনাস যে গ্রহের অধিকর্তা, সেখান থেকে। এখানে থাকার সময় আমার শেষ। আমাকে যেতে হবে।
দীপা বিহবল এসব শুনে। সুমন কি তাহলে ভীনগ্রহী এক্সট্রা -টেরেস্ট্রিয়াল (ET) নাকি? ET-রা তো এত রক্ত মাংসের মানুষ হয় না। হতে পারে না। তারা যে অন্য গ্রহের অন্যরকম এন্টিটি, অন্য ধরণের সত্তা। সেই সত্তা তার বুকের চাপে, তার সর্বাঙ্গ দিয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে দীপাকে অনুভব করিয়েছে তার হৃদস্পন্দন, তার প্রতিটি ধমণীতে বয়ে যাওয়া শিহরণ। ওর সবটুকু দীপা অনুভব করছে তাকে আগলে রাখার মাঝে। কিভাবে তাহলে বিশ্বাস করবে যে সুমন মানুষ নয়। সে ভীনগ্রহের বাসিন্দা। সুমন যদি নিমেষে চলে যেতে পারে তার গ্রহে, নিমিষে কি আবার আসতে পারে না সেই ভেনাস থেকে পৃথিবীতে?
দীপার সাথে সপ্তাহে দুবার ডিউটি পড়তো তার। লেকচার থিয়েটারে রাত আটটা থেকে বারো টা পর্যন্ত। এবার ওর শিফটে অন্য কেউ হয়তোবা আসবে। কিন্তু সুমন এই পৃথিবীতেই থাকবে না?
তার কি মনে পড়বে পৃথিবীর কথা? পৃথিবীর মানুষগুলোর কথা? নিজের বুকের মাঝে পিষে ফেলে দীপাকে যতক্ষণ ধরে রেখেছিল, সেই সময়টুকুর কথা? ওদের গ্রহে কি সময় বলে কিছু আছে? দীপা কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না। সুমন যদি ভীনগ্রহী হয়, তাহলে দীপাকে পছন্দ করার দরকার কি ছিল?
আজ থেকে দীপা যে ভীষণ একা ।
০৭/০৪/২০২৬
Friday, March 6, 2026
মধ্যরাতের যাত্রী
আজ সুমনার কাজ একটু দেরী করেই শেষ হয়েছে। নার্সিং হোমের এই কাজে আছে প্রায় এক দশক ধরে। কাজ শেষ করতে প্রতিদিনই বেশ রাত হয়ে যায়। বৃদ্ধ রোগীদের দেখাশোনা করে তাদের সারাদিনের আর্জি আব্দার মিটিয়ে বাড়ি ফেরার যখন সময় হয়,তখন শুরু হয় আরেকটি নাটকের অধ্যায়। হোমের সকল বোর্ডারদের ভারাক্রান্ত মুখ। সুমনা চলে যাবে? কেউ তাকে ছাড়তে চায় না।ও এলে নার্সিং হোমে যেন প্রাণ আসে। আর চলে যাওয়ার সময়টা এলেই সবার মুখ কালো। তারপরও সুমনাকে তো বাড়ি ফিরতেই হবে। সেই সকাল থেকে শুরু করে রাত অব্দি কাজ। ওর খুব ভাল লাগে। তাই প্রাণ দিয়ে নিবেদিত সুমনা আরেকটু দেরী সয়ে নিতে পারে প্রয়োজনে।
কিন্তু আজকের বিকেলটা যেন অন্যরকম। কাজ শেষ করতে ওর কেন জানি মন চাইছে না। আর একটু যদি বেশী কাজ আজ থাকতো ভাবতে ভাবতেই হোমের সবচেয়ে বর্ষীয়ান মহিলা হঠাতই যেন অসুস্থ বোধ করা শুরু করলেন। সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত তাকে সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রাখতে গিয়ে সুমনার আজ বেশ দেরী হয়ে গেল। যেমন সে চাইছিলো। কিন্তু মধ্যরাত পেরুলেই বাড়ি ফেরার বাস সিডিউলের একটু পরিবর্তন হয়ে যায়। তখন বাসগুলো আসে বেশ দেরীতে। আর শীতের রাতে মাঝরাতও বেশ গভীর রাত মনে হয়। নিস্তব্ধ চারিদিকের মাঝে বাস স্টপেজে দাঁড়িয়ে বাসের জন্য প্রতীক্ষা এক অন্যরকম অনুভূতি। গ্রীষ্মকালে এরকমটা একেবারেই না।
গভীর রাতে তাই নার্সিং হোমের উল্টোদিকের রাস্তায় বাসের জন্য অপেক্ষারত সুমনা চেয়ে থাকে প্রিয় কর্মক্ষেত্রের আলোয় ঘেরা চত্বরের দিকে। রাস্তার এদিকে আলো না থাকলেও নার্সিং হোমের আলোটুকুর আলতো স্পর্শ বাস স্টপেজকে আলোকিত করে রাখে কিছুটা হলেও। আধো আলো আধো অন্ধকারের মাঝে এ অপেক্ষাও তার ভাল লাগে। তবে ধৈর্য্য পেরুবার আগেই বাস চলে আসে। দু’এক জন যাত্রী এ স্টপেজে এসে মাঝে মাঝে দাঁড়ায়। কিন্তু এ মধ্যরাতে কেউ নেই আজ। সুমনা একাই অপেক্ষারত বাসের পথ বরাবর চেয়ে। এলাকাটা রেসিডেন্সিয়াল বলে এখানে যাত্রী চলাচল কম। তারপরও সুমনা খেয়াল করলো দূর থেকে কে যেন হেঁটে আসছে স্টপেজের দিকে। ধবধবে সাদা শার্ট পরিহিত ভদ্রলোকটির হাত দুটো পকেটে ভরা। শান্ত, ধীর পদক্ষেপ বেশ স্পষ্ট প্রতীয়মান। বাস ধরার তাড়া যেন খুব একটা নেই তার অথচ গন্তব্য মনে হচ্ছে এই স্টপেজ। আরেকটু কাছে যখন তিনি এলেন তার ব্যক্তিত্ব ও হাঁটার ভংগীমা দেখে সুমনার কেন জানি মনে হলো সে তাকে চিনে! এবং সত্যিই তাই। সুমনা চিনে ফেলেছে। এ তো তিনিই,তার খুব প্রিয় সেই মানুষটি যাকে দেখেই ভাল লাগতো সেই বহু আগের দিনগুলোতে। কিন্তু তিনি তো এ শহরে থাকেন না,আজ এলেনই বা কি জেনে,যে সুমনা এই স্টপেজে থেকে বাসে উঠবে? আর আজকের দিনটিও তো অন্যরকম। তার গতানুগতিক দিনের মত ঠিক রাত ১০ টায় তো কাজ শেষ হয়নি!
উনি এবার স্টপেজে এসে পৌঁছেছেন। মনে হচ্ছে যেন সুমনার কথা জেনেই তিনি এখানে এসেছেন। সুমনার দিকে তাকিয়ে আছেন, তাকে দেখছেন। খুব সলজ্জ এক অস্বস্তিতে পড়ে গেল ও। এত কাছে তিনি দাঁড়িয়েছেন। দেখছেন খুব সরাসরি। এই মধ্যরাতের বাস প্রায়ই খালি আসে আর পাশের শহরে সুমনাকে পৌঁছে দেয়া অব্দি তেমন কোন স্টপেজও নেই যে নতুন যাত্রীর আগমন ঘটে। কিন্তু আজ সুমনা একা নয় উনিও যাবেন এই বাসে। সুমনার সংগী হয়ে। কিন্তু একে কি সঙ্গী বলা চলে? জীবনের পথচলায় যাকে কখনো পাশে পায়নি,আজ একঘন্টার বাস ট্রিপে তিনি পাশে উপবিষ্ট থাকলেই কি সঙ্গী হয়ে যেতে পারেন? কল্পনায় পেয়ে নিয়েছে তাকে বহুবার কিন্তু বাস্তবে আজ তার এই হঠাত উপস্থিতি তাকে বিস্মিত করে চলছে নিরন্তর। তার প্রচন্ড ভাল লাগার ধাক্কা যেন বিস্ময়েও সমাপ্তি টানতে পারছে না। নিস্তব্ধ,একাগ্র,তীক্ষ্ণ, প্রক্ষিপ্ত দৃষ্টি দেখে মনে হচ্ছে উনি আজ তারই জন্য এসেছেন। তার সাথে যাবেন।কিন্তু তার স্টপেজেই কি নামবেন? যদি তাই হয় সুমনা কি তাকে বলতে পারবে তার বাড়িতে আসবার জন্য। তা কি করে হয়? এত চেনা হওয়া সত্ত্বেও কখনো তো কথা হয়নি ওনার সাথে। কি সব এলোমেলো চিন্তা মনে আসছে। আজ সবকিছু সত্যিই ব্যতিক্রম।
বাস আসবার পথের দিকটায় দাঁড়িয়েছেন তিনি। কিন্তু এবার বুঝি অপেক্ষার পালা শেষ হতে যাচ্ছে। ওনার পেছনে ঝলসানো হেডলাইটের আলো চোখে পড়ছে সুমনার। একটা বাঁক ঘুরে এপথে মোড় নিয়েছে বাসটি। এগিয়ে এসে নিঃশব্দে দাঁড়িয়েছে তাদের সামনে। এখান থেকে শুরু করে সামনের দিকে এগুলে এ শহর শেষ হয়ে শুরু হয় ঘন বনে ঘেরা সরু রাস্তা, বহুদূর পর্যন্ত যেটি বিস্তৃত হয়ে শেষ হয় পাশের শহরে এসে। এই নির্জন পথটুকু চলতে খুব ভাল লাগে সুমনার। গতি তার পছন্দ কিন্তু তার সাথে যদি থাকে নির্জনতা তা তার একাকীত্বের সাথে যেন বেশী করে মানিয়ে নেয়। কিন্তু আজ যে সে একা নয়। ঠিক মুখোমুখি বসেছেন উনি। সুমনার মুখোমুখি। সুমনাকে দেখছেন বিভোর হয়ে। কিন্তু কি-ই বা আছে দেখার? ফেলে আসার পেছনের সেই সময়গুলোর সুমনা আর আজকের সুমনা অনেকটাই যে অন্যরকম। কাজ ছাড়া যার আর কাজ নেই জীবনে,ভাললাগা যার কল্পনা, ভালবাসা যার স্বপ্ন,প্রেমহীন,সংগীবিহীন জীবনে মনের মানুষের উপস্থিতি যেখানে অলীক,সেখানে সুমনার একাকী বসবাস,তার কেটে যাওয়া প্রতিটি নিঃসঙ্গ দিনের নিস্তরঙ্গ মুহূর্তের হিসেব যেন পাই পাই করে নিচ্ছেন তিনি। দেখছেন অপলক। তীক্ষ্ণ,প্রখর সেই চিরচেনা দৃষ্টি। বাসে ওরা আজ দুজন যাত্রী।
ও খুব অস্বস্তিতে পড়েছে। বার বার দেখছে ড্রাইভারের সামনের বিশাল কাঁচের জানালা ভেদ করে ছুটে চলা সরু রাস্তা। বার বার চোখ পড়ে যাচ্ছে ওনার দিকে। চারপাশে জনবসতি নেই বলে রাস্তার আলোও নেই। বাসের হেড লাইটের ক্ষীণ আলোয় রাস্তাটি যতটুকু আলোকিত হয়,তারই সাথে পাশের গাঢ় অন্ধকারের মিশেল পুরো পথকে করে তুলেছে রহস্যময়। বাড়ি ফেরার সময়ের এই ভ্রমণ খুব ভাল লাগে সুমনার। তাই এত দূরে কাজ নিতে আসাও তার একটি কারণ। ফিরতি পথে দু চারজন যাত্রী সবসময় থাকলেও আজই ব্যতিক্রম। আসলে আজ সব কিছুই বেশ আকস্মিক ও অস্বাভাবিক। এসব ভাবতে ভাবতেই ঘড়ির দিকে চোখ পড়লো সুমনার। ড্রাইভার নিশ্চিন্তে চালিয়ে যাচ্ছেন তার বাস, সামনের পথটুকু পিছনে পড়ে এগিয়ে যাচ্ছে বাস দ্রুত গতিতে। অথচ এতক্ষণ পরেও রাস্তা যেন আজ শেষ হতে চাইছে না। সময় দেখতে গিয়ে বেশ অবাক হলো ও এবার। বাসটি সেই ১২ টায় স্টপেজে এসে দাঁড়িয়েছিল আর এখনো সেই সময়ই দেখাচ্ছে?
সময় কি তাহলে থেমে আছে? সুমনার অবাক হওয়া দেখে এবার উনি মৃদু হেসে ফেললেন,যেন ঠিক ঠিক বুঝতে পারছেন সুমনার ঘড়ি বন্ধ হয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা।সুমনার খুব রাগ হচ্ছে। কিছুই বুঝতে পারছে না। এভাবে বহুবার সময় দেখতো সে ওনার আসবার অপেক্ষায় থেকে। আজ তিনি তো সত্যিই এসেছেন,আর তাই কি সময় দেখার প্রয়োজন যে ফুরিয়ে এসেছে তা জানিয়ে দিতে চাইছে সময় তার নিজ থেকে? এত দীর্ঘভ্রমণের পরও আজ পথ কেন জানি শেষ হতে চাইছে না। ড্রাইভারও বেশ নিশ্চিন্ত মনে স্টিয়ারিং ধরে আছেন, যেন তিনিও ভেবে নিয়েছেন আজকের এযাত্রা শেষ হবার নয়। রাস্তার উল্টোদিক থেকে আজ একটি গাড়িও এ পথ অতিক্রম করেনি। এ পথে বুঝি আজ তারা দুজনাই শুধু যাত্রী,অসীম,অনন্ত সময় ধরে।
২
পরদিন সকাল দশটা পেরিয়ে একঘন্টা অতিক্রান্ত। নার্সিং হোমের সদস্যরা আবারো একটি নতুন দিনের আশায় তাদের সকাল শুরু করেছেন। প্রতিদিন চোখ মেলেই যাদের প্রথম ভাবনা হয়,আমি বেঁচে আছি,তাদের জন্য একটি সকাল আসা যেন একটি আশীর্বাদের মতো। অপেক্ষাও করছেন সুমনার আগমনের। এত দেরী সে কখনোই করে না। কাল অনেক রাত অব্দি কাজ করেছিল বলেই হয়তোবা আজ হতে পারে এই দেরী।
লিভিং রুমে এসে বসেছে সকলে প্রতিদিনের মতো। একটু হালকা নাস্তার পর চা খেতে খেতে খবরকাগজ পড়া, টুকটাক গল্প করা। তেমন কোন খবর থাকলে তা নিয়ে আলাপ করা। যদিও আজ তেমন কোন খবর নেই, শুধু শেষের পাতার ডান দিকের কলাম একটি খবর ছাপিয়েছে একটু বিস্ময়কর। নার্সিং হোম থেকে দশ কিলোমিটার দূরে গতকাল রাতে একটি বাস পথচ্যুত হয়ে পাশের গভীর খাদে পড়ে যায় কোন কারণ ছাড়াই। বাসের ড্রাইভারের সাথে কন্ট্রোল রুমের সার্বক্ষণিক যোগাযোগ থাকা সত্ত্বেও কেন বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারালো তা এখনো কারো বোধগম্য নয়। বাসে ড্রাইভার ছাড়া দুজনের বেশী যাত্রী না থাকলেও অগ্নি নির্বাপক কর্মীরা জানিয়েছে, যাত্রী যে দুজন মৃত্যুবরণ করেছে তাদের দেহ কোন ভাবেই সনাক্ত করবার উপায় নেই।
...............
Saturday, January 31, 2026
এখনি সময়
তোমাকে যেতে হবে।
এখনই।
চমকে তাকালো ঊর্জা সামনের দিকে। গভীর মনোযোগ দিয়ে কম্পিউটারের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ছিল। গুরু গম্ভীর এ আদেশ যেন তার সকল মনোযোগ ছিন্ন করে দিয়েছে এক নিমিষে।
কিন্তু কাউকে তো দেখতে পাচ্ছে না আশেপাশে।
কার কন্ঠ?
ঘর ভর্তি মানুষ। বিশাল ড্রইং রুমে প্রচুর অতিথির সমাগম। তারই কোণায় টেবিল পাতা। খাবার সামগ্রী সাজানো থরে থরে। টেবিলের একপাশে ছোট্ট চেয়ারে বসে মাথা ঝুঁকে কাজ করছে ঊর্জা। কেইটরিং –এর কাজ নিয়েছে ।মাসখানেক হলো। আজ এই বাড়িতে অতিথি আপ্যায়নের দায়িত্ব। তার এই কাজ পেতে বেশ কষ্ট হলেও এই কয়েক মাসে বেশ সুনাম অর্জন করে ফেলেছে। ব্যবসা সুনাম অর্জনের সাথে সাথে বেশ ভালোই চলছে। হিসাব নিকাশের কাজগুলো আরেকবার দেখছিল সে স্ক্রিনে চোখ রেখে। এমন সময় এরকম ভাবে কেউ বলছে, ‘যেতে হবে।‘ বেশ আদেশের সুর যেন কন্ঠে। কিন্তু কে কথা বলছে? আর কোথায় বা তাকে যেতে হবে ?
স্ক্রিন থেকে মাথা তুলতেই অতিথিবৃন্দের মাঝে অরুণাভকে চোখে পড়লো। অনেকদিনের চেনা অরুণাভ, তার বন্ধু ঠিক বলা যায় না, আবার পরিচয়ের যে গভীরতা, তাতে দূরের বলে, পর মনে করে, ‘অবন্ধু’ ভাবনাটাও মেনে নেওয়া যায় না। আসলে অরুণাভ যে তার কি, সে জানে না। বন্ধুও নয়, প্রিয়তম তো নয়ই - কোন অধিকারে তা বলবে? ভালো লাগে যদিও তাকে খুব । কিন্তু সেও তো বসে আছে বেশ দূরে । কাছাকাছি কেউ বসেনি তার চারপাশে।
কার কন্ঠ এটি তাহলে?
কথাটা শোনার সাথে সাথেই শিরদাঁড়া বেয়ে যেমন বিদ্যুৎ খেলে যায়, তেমনি গ্রীবা আর স্কন্ধের মাঝ দিয়ে একটা বিদ্যুতের চমক অনুভব করল ঊর্জা। তাই ঘাড় তুলে তাকালো সামনে। কেউ নেই কোথাও।
কে বলল অমন করে?
ভাবতে ভাবতেই দেখলো, সামনে দাঁড়িয়ে আছেন সৌম্য, শান্তরূপে একজন অতি দীর্ঘকায়া সুপুরুষ। দেখেই মনে হয় যেন কোন শান্তির দেবদূত। যেন সেইন্ট জার্মেইন। কে ইনি? হালকা হালকা ধোঁয়ার ভেতর দিয়ে দেখা যায়, কি যায় না। অস্পষ্ট কুয়াশা কুয়াশা ভাব। কিন্তু জানালা বন্ধ এই ঘরে এই সন্ধ্যার সময় কুয়াশা আসবে কোথা থেকে?
ঊর্জা একটু সচেতন হলো এবার। কিছু বলতে চেয়েও বলতে পারছে না। তাকিয়ে আছে স্থির। আর দূর থেকে অরুণাভ দেখছে, ঊর্জা যেন কারো সাথে কথা বলছে আপন মনে।
যাবে নাকি ঊর্জার কাছে আজ? কখনো তো কথা বলেনি। দেখা হয়েছে কতবার। আজ কি দুর্বলতার পাশ কেটে ঊর্জার সামনে যেয়ে দাঁড়াবে? জিজ্ঞাসা করবে, কেমন আছো তুমি ?
ভাবতেই জানি কেমন স্থির হয়ে আসে অরুণভের কন্ঠ। শরীর স্থির হয়ে আসে। আর ভাবতে পারে না কিছু। নিজেকে সচল করে রাখতে গিয়ে ঊর্জার কথা ভাবলেই তার কেন যে এমন হয়, সে বুঝে না। অথচ এই নিমন্ত্রণে এসে ঊর্জার দেখা পাবে, তা তার সাত কল্পনার বাইরে ছিল। ঊর্জা এখানে কেইটারার হিসেবে অনুষ্ঠান তদারকির কাজ করছে – ঠিক তার সামনে। ভাবতেই জানি কেমন লাগছে অরুণাভের। প্রাণ ভরে দেখছে অরুণাভ তাকে। আশেপাশে আরো অনেক অতিথিরা এসেছেন। বসে গল্প শুরু করছেন। কিন্তু কোনদিকে অরুণাভের খেয়াল নেই। খেয়াল নেই তা ঠিক না, আসলে আশপাশ তার আর আগ্রহের বিষয় মনে হচ্ছে না। সামনে যে ঊর্জা রয়েছে, তাকে দেখেই তার সবটুকু সময় যেন কেটে যাচ্ছে।
অনুষ্ঠান শুরুর সময় দেওয়া হয়েছে সন্ধ্যা সাতটা। চলবে রাত নয়টা পর্যন্ত। সাতটা বাজতে অতিথিরা এসে পড়তে শুরু করেছেন। ঊর্জা টেবিল সাজানো, খাবার আনা নেওয়ার তদারকির ভার নিয়েছে নিজেই। বিকেল চারটা থেকে কাজ শুরু করেছে ওরা। ব্যুফে সিস্টেমে, অতিথিদের ডাকলেই তারা এসে এসে খাবার নিয়ে যার যার মতো টেবিলে বসে যাবেন। সারাটা ঘর সাজানো হয়েছে সাদা রঙের থিম দিয়ে। এই ঘরটা যেন হালকা কুয়াশা ঘেরা লাগছে। তাই বোধহয় সাদা থিমের প্রভাবে সামনে তাকাতেই ঊর্জা, কুয়াশার প্রলপের মাঝে কোন একজনের দর্শন যেন লাভ করলো। কিন্তু আবারো প্রশ্ন তার মনে, কে ইনি?
এবার সেই কন্ঠস্বর। আদেশ নয়। কিন্তু ফেলে দেবার মতনও নয়। শুনতেই যেন হবে। ঊর্জা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে এবার ওনাকে। সেইন্ট জার্মেইন স্বয়ং যেন তার সামনে।
কিন্তু আসলে কি উনি? এরকম অ্যাঞ্জেলিক সুপুরুষদের ছবি তো আমরা হরহামেশা দেখি ইন্টারনেটে। আসলেই কি তারা দেখতে এত দ্যুতিময় হয়? জানেনা ঊর্জা।
কিন্তু সে বিমোহিত। মোহগ্রস্ত। তাকালো আবার। কন্ঠস্বর বলে উঠলো, ‘তোমার যাওয়ার সময় হয়েছে। তোমায় যেতে হবে।‘
ঊর্জা এবার একটু যেন সচেতনতা ফিরে পেয়েছে। তাই জিজ্ঞেস করল দেবদূতরূপী সেই জনাকে, ‘কোথায় যেতে হবে?’
কি মায়া ভরা চোখ তাঁর। কি তীক্ষ্ণ সেই দৃষ্টি। কি প্রচন্ড মমতার ছোঁয়া। বলে উঠলেন, ‘তোমার যাওয়ার সময় হয়েছে। আমি তোমায় নিতে এসেছি। এখনি যেতে হবে।‘
এবার ঊর্জার আর বুঝতে বাকি নেই। ইনি-ই ওর গার্ডিয়ান অ্যাঞ্জেল। তার আর সময় নেই এই ডাইমেনশনে থাকার । তার যে যেতেই হবে। কিন্তু এই ঘর ভরা মানুষের মাঝে নিমন্ত্রণ চলাকালীন সময়ে? অনুষ্ঠানের কি হবে? সবাই যখন দেখবে ঘরের সেই বিশাল খাবার টেবিলের কোণায় মাথা নিচু করে একটি মেয়ে অজ্ঞান অবস্থায় পড়ে আছে। ( অজ্ঞান এজন্যই বলা, কারণ মৃত তো বলা যায় না হুট করে।) নাহ্ এই পরিবেশ তৈরি করতে চায় না ঊর্জা। অথচ দেবদূতের তৎক্ষণাত আদেশ পরিবর্তন করে আরেকটু সময় কি সে পাবে না ? এইখানে এই কাজটা না হোক। বাইরে কোথাও। অন্তত অরুণাভের সামনে নয়। অরুণাভ অনেকক্ষণ ধরেই দেখছে ঊর্জা স্ক্রিনের সামনের দিকে উপরে মাথা তুলে বিড়বিড় করে কারো সাথে কথা বলেই যাচ্ছে। কি হলো ঊর্জার আজ?
এবার অনুরোধের পালা। ঊর্জা বিনয়ের সাথে আবদার করে ফেলল সেন্ট জার্মেইনকে।
- ‘বাইরে যাই, এই ঘর ছেড়ে?’
- কোথায় যাবে?
- হাসপাতাল তো কাছাকাছি নেই। তবে রাস্তার ওপারে একটা ফার্মেসি আছে। ওখানে যাব। অনুষ্ঠানের হোস্টকে বলার সময় তো পাবো না। আমার গ্রুপকে জানিয়ে যাব, যে ফার্মেসি যাচ্ছি ওষুধ আনতে। শরীর ভালো লাগছে না, বলা মিথ্যে বলা হবে। আমি কি ফার্মেসি পর্যন্ত যেতে পারি? আর কয়েকটা মিনিট সময় দিন। আমি স্থান ত্যাগ করতে চাই। এই ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে চাই। আমি অরুণাভ-র সামনে নিশ্চুপ প্রাণহীন হয়ে পড়ে থাকতে চাই না। ও আমাকে ওভাবে দেখুক, তা আমি চাই না।
সেইন্ট জার্মেইন কিছু বললেন না।
ঊর্জা উঠে দাঁড়ালো। উঁচু চেয়ারগুলোর পাশ দিয়ে হেঁটে ঘর থেকে বের হওয়ার সময় পিছনে ফিরে তাকালো। অরুণাভকে আরেকবার দেখে নিল। সেই তীক্ষ্ণ ব্যক্তিত্ব, অপরূপ মুখশ্রী, মন ভোলানো হাসি আর দুষ্টুমি ভরা কালো চোখ। আর দেখা পাবে কিনা জানে না ঊর্জা।
এই দুনিয়া ছেড়ে ঊর্জা কোথায় যাবে তা তার জানা নেই। গন্তব্যহীন, ঠিকানা বিহীন যাত্রা। কিন্তু তার কাছে ঠিকানা না থাকলেও সেইন্ট জার্মেইন তা জানেন। তার দায়িত্বে, তার গাইডেন্সে ঊর্জার ‘এক্সিট’ হয়ে যাবে। এখন। ঠিক এখন।
২
রাত প্রায় আটটা। শীতের সময়য় অনেক রাত। ঊর্জা হাঁটতে হাঁটতে চলে এসেছে ফার্মেসির দরজায়। দরজার সামনে আরেকজন কেউ দাঁড়িয়ে আছেন। ঊর্জা তাকে চেনে না। তিনিও দীর্ঘকায়া সুদর্শন, সুপুরুষ। ঊর্জা হেঁটে ঢুকছে ফার্মেসির দরজা দিয়ে। কুয়াশা ঘেরা মেঠো পথ যেন সামনে । দুপাশে দুজন অ্যাঞ্জেল তার সাথে হেঁটে যাচ্ছেন। তাকে যে যেতেই হবে। এখনই সময়। আর একটুও পরে নয়। ঘন্টাখানিক আগেও নয়।
ঊর্জা চলছে। একাকী?
না।
সাথে দুজন গাইড আছেন।
অরুণাভ আজ আসবে বলে কেইটারিং –এর কাজটা সমাপ্ত করা পর্যন্ত সে ওখানে ছিল। হয়তোবা ভাগ্যেই লেখা ছিল। কাজ যখন শেষ হলো তখন ওর দায়িত্ব শেষ। যাবার সময় । অনুষ্ঠান থেকে নয়। এই দুনিয়াদারি থেকে।
৩
ফার্মেসিতে কেইটারিং –এর কোন এক কর্মী প্রবেশ করার পথেই চেতনাহীন হয়ে পড়লে অ্যাম্বুলেন্স ডেকে তাকে নেবার ব্যবস্থা করা হয়।
অনুষ্ঠান থেকে ঊর্জা কেন চলে গেল তা দেখবার প্রয়োজন তো অভ্যাগত অতিথিদের ছিল না। শুধু অরুণাভ তার সকল মনোযোগটুকু দিয়ে ওকে ঘরের বাইরে চলে যেতে দেখেছে। তাদের কেইটারিং এর কত কাজই না থাকে, বিশেষ করে হল –ঘরের পেছনের কিচেনে। কিন্তু সামনের দিকের দরজা দিয়ে ঊর্জা বের হয়েছে। যাবার বেলায় অরুণাভকে এক ঝলক দেখেছেও। শান্ত, স্থির ভঙ্গিতে ঊর্জা হলঘর প্রস্থান করেছে। সন্ধ্যে আটটার দিকে। এখন অনুষ্ঠান প্রায় শেষ। কিন্তু ঊর্জা এখনো তার ডেস্কে ফেরেনি। অরুণাভ চলে যাবে দশটার দিকে।
অনুষ্ঠান শেষ হলে আর কেনই-বা এই হলঘরে একা একা বসে থাকবে? কার জন্যই বা অপেক্ষা করবে ? ঊর্জা তো বাইরে গিয়েছে। সে তো এখানে নেই। আসবে কিনা জানেও না। কথা বলাই যে হয়নি কখনো, তার সাথে।
…………
৩১/০১/২০২৬
পথচারী
পথচারী
-
১ সুমনা চিন্তিত। একটু নয়, বেশ খানিকটা। কি ভাবে বলবে কথাটা ও সৌমেনকে ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। সৌমেন ওর এত দিনের চেনা এত কাছের। গত ছ’বছর ধর...
-
৩ সোহানের পরীক্ষা শেষ হয়েছে গত সপ্তাহে। ইয়ার ফাইনালের ঝামেলায় অনেকদিন ব্যস্ত ছিল। পরীক্ষা শেষ হওয়াতে স্বস্তির নিঃশ্বাস। এবার তাই ভাবছে ঘুরবে...

.jpeg)
