Sunday, September 15, 2019

প্যারালাল রিয়্যালিটি

শীলা গার্নার,এদোয়ার্ড রুশো,কেটি –এই তিনজন তিন জগতের বাসিন্দা যারা তাদের অজান্তেই যুক্ত হয়ে আছে একে অপরের সাথে। কিন্তু কিভাবে?

শীলা গার্নারের রিয়্যালিটিঃ

ঘটনার সবটুকু স্মৃতি ছয় বছর পর আজও  শীলার মনে উজ্জ্বল।

শব্দটা এমন বিকট হবে, ও ভাবতে পারেনি। শেলফ্‌ থেকে ছোট্ট টিনের ক্যান ধপাস করে পড়ে যাবার শব্দ যে এত অবিশ্বাস্য রকমের বিকট হতে পারে তা শীলার জানা ছিল না। হাতের তালুতে আঁটে এমনই এই ছোট্ট ক্যানটি ধরতে না ধরতেই পিছলে পড়ে গেল ঐ পাশটাতে। আর পড়ে যাওয়া মাত্রই কেউ যেন ক্যানটিকে এর ওজনের চেয়ে দশগুন ভারী করে ফেলল। কর্মরত দোকানী, যিনি বেশ খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি এমন বিকট আওয়াজ শুনে ত্রস্ত হয়েই ছুটে এলেন। কিন্তু পরিস্থিতি সামলে নিতে শীলার বেশী সময় লাগলো না। নিজে বেশ হকচকিয়ে গেলেও ধীরে সুস্থে টিনের কৌটাটি  তুলে স্তরে স্তরে সাজানো ক্যান ফুডগুলোর ওপর আবার সাজিয়ে রাখলো। কিন্তু ও বুঝতে পারছিল না, কেনই বা আঙ্গুলের মৃদু ছোঁয়ায় কৌটোটি পড়ে গেল – যা পড়ার কথা না, আর কেনই বা এতটা শব্দ হলো! এ যেন মোটেই স্বাভাবিক নয়।   

ওর হঠাৎ -ই মনে হলো মাথাটা ঝিমঝিম করছে।   

হারিয়ে যাচ্ছে যেন কোথাও।

অন্য কোন জগতে নয় তো? নাকি সে এখন খুব বিভ্রান্ত।

শীলা আজও  জানে না। তবে স্পষ্ট মনে আছে -ও বেশ হকচকিয়ে ওঠার পর ভীত হয়েই ঐ স্থানটি তৎক্ষণাৎ ত্যাগ করেছিল। পাশের আইল পেরিয়ে চলে গিয়েছিল বিশাল স্টোরটির একদম অপর প্রান্তে, স্টেশনারি জিনিসগুলো সাজিয়ে রাখা হয়েছে যেখানে। খুঁজছিল কিছু প্রয়োজনীয় কলম, কাগজ আর ফোল্ডার। সে দিকটায় কোন ক্রেতা নেই বললেই চলে। কর্মচারীদের উপস্থিতিও নেই। এই কিছুক্ষণ আগের বিকট শব্দের কথা ভুলেই মনোনিবেশ করলো স্টেশনারি জিনিসগুলোর দিকে। 

পছন্দমতো কিছু নির্বাচন করতে গেলে কেনাকাটার ক্ষেত্রে সময় বেশ দ্রুতই চলে যায়। শীলা নিজের মনে ভাবলো তাড়াতাড়ি কাজ সেরে বাড়ি ফিরবে।আর তা ভাবতেই আইলের পাশ ঘেঁষে মনে হলো যেন হাইওয়ে ধরে গাড়ি চলছে।ঠিক তখনই অনুভব করল, ও যেন দাঁড়িয়ে আছে জনাকীর্ণ  রাস্তার মাঝখানে। কোথায় দোকানের শেলফগুলো?  শীলা চারিদিকে তাকালো।

নাহ্‌ সব ঠিক আছে। দোকানের এই নির্জন জায়গাটিতে সারি সারি শেলফ্‌ ছাড়া কিছুই চোখে পড়ছে না।অথচ নিজেকে অনুভূত হচ্ছে অনেক মানুষের মাঝে কোলাহল পূর্ণ জনবহুল এক রাস্তায়।

কি আশ্চর্য!

কাঁধের পাশ দিয়ে দু’জনের সাথে ধাক্কা লাগলো যেন। মনে হচ্ছে কোন এক রাস্তার মাঝে ও দাঁড়িয়ে যেখানে শোঁ শোঁ শব্দ করে দ্রুত বেগে গাড়িগুলো চলে যাচ্ছে।

এই স্টোরের আন্ডারগ্রাউন্ড বেসমেন্টে –এর নীচে কোন রাস্তা নেই তো?

না হলে এমন মনে হচ্ছে কেন? গাড়িগুলো যেন এখন পায়ের নীচে দিয়ে যাচ্ছে।নাকি এই স্থানেই দুটো আলাদা ডাইমেনশানের সম্মিলন ঘটেছে? একই সঙ্গে স্টোরের সুনশান  নীরবতা আর কোলাহলে ভরা গাড়ির শব্দ মিলে মিশে যেন একাকার হয়ে যাচ্ছে।

 

এদোয়ার্ড রুশোর রিয়্যালিটিঃ

নিউইয়র্কের বেশ জনাকীর্ণ রাস্তা টাইম স্কয়্যার।কোন বিশেষ কারণে লোক সমাগম না হলেও ভীড় যেন লেগেই আছে এখানে। রুশো বেশ কিছুদিন হলো এসেছে এ শহরে।এত জনবহুল স্থান সে আগে কখনোই দেখেনি। মফঃস্বল থেকে মাত্র এসে খুব বড় শহরের ধাক্কা সামলাতে বেশ কিছু সময় লেগে গিয়েছে। খুব মনে পড়ে তার সেই ফেলে আসা খোলা প্রান্তর, উঠোনওয়ালা বাংলোয় গাছপালায় ঘেরা সবুজ বনানী। শহুরে জীবনে এসব পাওয়া দুষ্কর।তার বহুতল ভবনের অপর দিকে রয়েছে ছোট্ট একটি দোকান।রুটি, মাখন আর জ্যাম কিনবার জন্য রুশো ওখানেই চলে যায় যখন তখন।আজও  হালকা জ্যাকেটটা গায়ে চাপিয়ে এলিভেটর ধরে নেমে এলো নীচের তলায়। বিল্ডিং থেকে বেরিয়ে সামনের খোলা এত্তটুকুন জায়গায় যে বিশাল ক্রেইন বসানো হয়েছে তারই কাজ চলছে রাস্তার ওপাশে। মেরামত কাজের জন্য এসেছে ভারী ভারী যন্ত্রপাতি বহনকারী গাড়ি। এত শব্দ রাস্তায় অথচ ঘর থেকে কিছু টেরই পাওয়য যায় না ।বুঝতে পারা যায় না কত শব্দ যন্ত্রণার রাজ্যে তার বসবাস। এসবের ভীড় ঠেলে এগুতে না এগুতেই হঠাৎ তার মনে হলো আশপাশের গাড়িগুলো যেন উধাও।

সুনশান এক নীরবতা।

ও যেন দাঁড়িয়ে আছে কোন বিশাল এক দোকানের সারি সারি শেলফের মাঝখানে।(ঠিক শীলার মতন।)হেসে ফেলল মনে মনে। দোকানেই তো যাচ্ছে রুশো। কিন্তু পৌঁছানোর আগেই যেন পৌঁছে গেল!

আসলে আনমনা হলে এমনি হয়। যেমনটি এখন হলো। দু’জন পথচারী এক্কেবারে গায়ের ওপর এসে পড়েছে যেন।দোষ রুশোরই। অন্যকিছু ভাবছিল বলেই হয়তোবা খেয়াল করেনি ওদের। তাই অতর্কিতে এই ধাক্কা। তারপরও তো জনস্রোত থেমে নেই।সবাই যে কাজ সেরে যযার যার মতন বাড়ি ফিরছে এই সন্ধ্যায়।

জনাকীর্ণ এ রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে রুশো। ঠায়।

কেন?

ওর মনে হচ্ছে এত ভীড় যেন হঠাতই উধাও । খুব অসংযুক্ত এক অনুভূতি। চারপাশ থেকে নিজের অসংযুক্তি।তাই নিজেকে হারিয়ে ফেলা। সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া  তার চারপাশ থেকে, ক্ষণিকের জন্য। আর ঠিক এমন সময়ই সেই অবিশ্বাস্য রকমের বিকট এক শব্দ। এক বিশাল পাথরখন্ড ক্রেইন থেকে এসে পড়লো সামনের ডাম্পিং গ্রাউন্ডে।বিকট শব্দে রুশো যেন সম্বিৎ ফিরে পেল।

কোথায় ছিল ও এতক্ষণ? ক্ষণিকের জন্য যেন চারপাশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে অন্য এক বাস্তবতায় ঠাঁই নেওয়া, তারপর আবার ফিরে আসা এই টাইম স্কয়্যারেই।  

অথবা অন্য কোন ‘সময়ে’ চলে গিয়ে সব ভুলে যাওয়া।তারপর এলোমেলো হয়ে আবার ফিরে আসা।

কোথায় ছিল সে?

কোথায় যেন ছিল, কোন এক বিশাল স্টেশনারি দোকানের মাঝে। বিকট শব্দে নিজেকে আবার আবিষ্কার করলো সেই ক্রেইনটির কাছে, তার বিল্ডিং –এর উল্টোদিকে  ছোট্ট দোকানটির সামনে।

কেটির রিয়্যালিটি

কেটি সানফ্রান্সিস্কো শহরে এসেছে বেশ কয়েক বছর হলো।এখানকার মিউজিয়ামে কাজ পেয়েই তার এই শহরে আগমন।।নয়নাভিরাম এ শহরে ট্যুরিস্টের আনাগোনা সবসময় লেগেই থাকে। আর এই মিউজিয়ামটি ঝকঝকে তকতকে রাখার দায়িত্ব যে তারই।অবসর মেলে না একটুও । মিউজিয়ামের সামনের দিকে অতিথিদের আগমনের পথে বেশ বড় একটা পোট্রেইট আছে, যার পাঁশে পাথর খোদিত একটি মূর্তি ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে একটি বেদীর ওপর। পাশেই টেবিলে রাখা গেস্টবুকে অতিথিরা সই করেন।

আজকের দিনটা একটূ অন্যরকম কেন যেন। কাজের ফাঁকে বিকট শব্দে! কেটি হকচকিয়ে উঠলো। বেদীর উপর বসানো পাথরের মূর্তিটা হঠাৎ-ই যেন কোন কিছুর বিশাল ধাক্কায় পাশের টেবিল ঘেঁষে মাটিতে পড়ে গেছে।

কিন্তু কেন এমন হলো?

পোট্রেইটের ফ্রেম পরিষ্কার করার কাজে ও এমন ব্যস্ত ছিল যে খেয়াল  করেনি তেমন একটা। আর তখনই এক বিকট আওয়াজ। পিছনে ফিরে তাকালো কেটি। যেন অনেক মানুষের কোলাহল। কিন্তু ঘড়িতে তাকিয়ে দেখলো ভিজিটার্স আওয়ার্স তো শেষ!

তাহলে কেন এত কোলাহল?

কেটি অবাক হয়ে চেয়ে আছে প্রবেশ পথের দরজার দিকে।ও দেখতে পাচ্ছে হল-ওয়ে দিয়ে অজস্র মানুষ হেঁটে কোথায় যেন যাচ্ছে। এ যেন মিউজিয়াম নয়, এক কোলাহল পূর্ণ জনাকীর্ণ রাস্তা। এত ভীড় যে খুব দূরত্ব বজায় রেখেও হাঁটা যাচ্ছে না। কেটির, দুজনের সাথে ধাক্কাও লাগলো । ও হারিয়ে ফেলেছে নিজেকে ঘিঞ্জি এক উঁচু -দালানের শহরে। এ কোন রিয়্যালিটি ? কেটি কি জানে যে এই রিয়ালিটিতে মেওন কেউ আছে যাকে সে চেনে?

বিশাল ফ্রেমে বাঁধানো পোটেইট- টি দেখতে পাচ্ছে না আর। ওর সামনে দাঁড়িয়ে আছে টাইম স্কয়্যারের সেই বিশাল ঘড়িটা। রাস্তায় চলছে মেরামতের কাজ। রাস্তার মাঝে দাঁড়িয়ে আছে একটি অল্প বয়সী ছেলে। কেটি  যেন ওকে আগে থেকেই চেনে। ওর নাম রুশো।

কিন্তু কিভাবে চেনে?

কেটি জানে না।

এখন ওকে যেতে হবে রাস্তা পার হয়ে সামনের দোকানে। আজ তার ক্যান- ফুড কেনার ইচ্ছে আছে।দোকানে এসে শেলফের পাঁশে দাঁড়ানো মাত্রই দেখলো শেলফের কাছে দাঁড়িয়ে আছে খুব পরিচিত একটি মেয়ে। নামটিও তার যেন জানা।

শীলা। কিন্তু এ কিভাবে সম্ভব?

কেটি কি ঘুরে বেড়াচ্ছে বিভিন স্থানে, বিভিন্ন সময়ে আর নিজেকেই খুঁজে পাচ্ছে তার সত্তার প্যারালাল সত্তা হিসাবে শীলাকে বা রুশোকে?

 প্যারালাল রিয়্যালিটির সংযুক্তিঃ

সিকিউরিটি গার্ড ছুটে এসেছেন পড়ে যাওয়া মূর্তিটির কাছে।কিভাবে এত শক্ত গাঁথুনীর বেদী এক ধাক্কায় নষ্ট হলো, ওরা বুঝে উঠতে পারছে না। কেটি তো জানেই না।এইমাত্র তো সে ছিল নিউ ইয়র্কের টাইম স্কয়্যারের সামনে। বেশ চেনা এক ছেলেকে দেখেছে ওখানে। রাস্তা পার হয়ে স্টোরে প্রবেশের পথে দেখেছে আরেকটি চেনা মেয়েকে। নাম যেন কি? এমন সময়ে মিস গার্নার ডাক দিলেন তাকে পেছন থেকে।

-   কেটি।

ফিরে তাকালো কেটি মিস গার্নারের দিকে। তার নেইম প্লেটে তার নাম দেখে চমকে উঠলো কেটি। এ নাম তার পরিচিত। শীলা গার্নার।শীলা পরিচয় করিয়ে দিলেন মিউজিয়ামের কর্মীর সাথে।

মি. এদোয়ার্ড রুশো।

এবার কেটি খানিকটা বিভ্রান্ত।

খুব পরিচিত মনে হচ্ছে ভদ্রলোকের নামের শেষ অংশ। যেন খুব পরিচিত একজনের নাম।ভাঙ্গা মূর্তির অংশগুলোর ট্র্যাশ সংগ্রহ করে নিয়ে যাবার জন্য এসেছেন তিনি। হাতে মস্ত ঝুড়ি।কোথায় যেন এমন নামের মানুষগুলোর দেখা পেয়েছে সে একটু আগেই।

আজকের দিনটা কেটির জন্য অভূতপূর্ব এক অভিজ্ঞতার দিন। চারপাশের চেনা মানুষগুলো কেমন যেন বেশী বেশী পরিচিত মনে হচ্ছে কেটির কাছে। নিজেকে হারিয়ে ফেলছে বারবার তাদের সাথে। চারপাশের বাস্তবতার বাইরেও যেন অন্য কিছু আজ সে অনুভব করছে। অন্য কোন বাস্তবতা তার কাছে যেন একই সময়ে ফিরে ফিরে আসছে বর্তমান হয়ে। ঘুরে ফিরছে সে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে।এক সময় থেকে অন্য সময়ে। এক বাস্তবতা থেকে  অন্য বাস্তবতায়।

তারপর?

তারপর আবার নিজ কর্মস্থলে। প্যারালাল রিয়্যালিটির সেই সত্তারা ভিন্ন পরিচয়ে এখন দাঁড়িয়ে আছেন তার সামনে মিস শীলা গার্নার এবং এদোয়ার্ড রুশো নামে।   

ওর যে এদের সাথে দেখা হয়েছে অন্য রিয়্যালিটিতে।  কেউ কি বিশ্বাস করবে তার এই অভিজ্ঞতার কথা?

মিস শীলা গার্নার জিজ্ঞাসা করলেনঃ কেটি, তুমি কি ভেঙে যাওয়া মূর্তির টুকরোগুলো সরিয়ে এনে মি. রুশোকে তার কাজে সাহায্য করতে পারবে? 

কেটি ফিরে তাকালো মিস শীলার দিকে।

জবাবে বলল, নিশ্চয়ই।

………।।

সেপ্টেম্বর, ২০১৯

No comments:

Post a Comment

পথচারী

 পথচারী