সকাল থেকেই জুলিয়া ভাবছে ও যাবে কি যাবে না। বড্ড মন চাইছে যেতে, রাস্তার ও পাশের ফুলের বাগানটাতে। গ্রীষ্ম এসেছে বহু প্রতীক্ষার পরে। এমন উজ্জ্বল আলো ঝলমলে দিনে সেই পার্কটিতে ঘুরে আসা মন্দ নয়, কিন্তু আজ কেন এত সংকোচ কাজ করছে ওর ও জানে না। এমন তো আগে কখনো হয়নি। তাই কিছুটা ইতস্তত করেই বেরুলো। বাসায় আবার আজ কেউই নেই যে বলে আসবে কোথায় যাচ্ছে। উঠোন পেরিয়ে রাস্তায় এসে দাঁড়ানোর পর জুলিয়া কেন জানি পিছনে ফিরে চাইলো। বাড়িটির জন্য খুব মায়া লাগছে। মনে হচ্ছে ও যেন বাড়ি ছেড়ে খুব দূরে কোথাও চলে যাচ্ছে। অথচ রাস্তা পেরুলেই পার্ক। বেশী তো দূরে নয়।
এদিকটা উপশহর বলে যানবাহন তেমন বিশেষ একটা চোখে পড়ে না। রাস্তা পেরিয়ে ও প্রবেশ করলো ফুলে ঘেরা বাগানটিতে। বেঞ্চ পাতা আছে কিছু দূর পর পরে। ঘন গাছে ঘেরা সরু পায়ে হাঁটা পথ ছায়ায় ঢাকা পড়েছে। গাছের সারি পেরিয়ে কিছুদূর যেতেই মনে হচ্ছে অগোছালো আর অপরিচর্যায় বেড়ে উঠা গাছগাছালীতে পূর্ণ না হলেও বেশ ঘন জংগলেই এবার ও প্রবেশ করেছে। কেমন যেন এক তাগিদ থেকেই জুলিয়া আরেকটু এগুলো। বেশ এবড়ো থেবড়ো পথ। বোধহয় সিটি পার্কের সীমানা শেষ । কিন্তু কোন বাউন্ডারি না দেখে বেশ অবাক হলো। সামনে বিস্তৃত সবুজ বিশাল বনানী। আশপাশে বেশ কিছু প্রস্তরখন্ড ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ঘাসে ঢাকা। একটু ভাল করে খেয়াল করে দেখলো প্রস্তরখন্ডগুলো আসলে শতবর্ষাধিক পুরোনো এপিটাফ। অর্থাৎ বহু আগে এ জায়গাটি সমাধিস্থল ছিল। বেশ অবাক হলো কারণ আগে কখনো ও এসব দেখেনি। আসলে আগে এতদূর আসাও হয়নি। আজ যে কেন এলো, যেন কারো একজনের আহবানে এতদূর চলে আসা। এসব ভাবতে ভাবতে এগিয়ে যেতেই রিহানের কন্ঠস্বর। চমকে পিছনে তাকালো। রিহান ওর সহপাঠী। ওর ছোটবেলার বন্ধু। সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু । ওকে দেখে আরো বেশী অবাক হলো কারণ আজ সকালেই ওর সাথে ইমেইলে কথা হয়েছে কিন্তু তখন তো সে বলেনি যে ও এখানে আসবে। একেই বলে মনের টান। রিহান কাছে এগিয়ে এসে বললো, ‘ওদিকটায় যাবি ঘুরতে?’ আসলে জুলিয়ার এ জায়গাটা একেবারেই অচেনা। পার্কের বিশালতা এবার সে উপলব্ধি করতে পারছে। এত দিনের এই চেনা জায়গায়রও যে অনেক কিছু দেখা বাকী রয়ে গেছে তা বুঝতে পেরেই ও এককথায় রাজী হলো। রিহান বললো ও খুব ভাল চেনে এ জায়গাটা। তাই অনেক গল্প আর অনেক কথা আর অনেকটুকু হেঁটে চলা । রিহান যত না কথা বলে তার থেকে বেশী হাসে। কেন জানি জুলিয়ার কাছে এলে ওর এত প্রাণখোলা হাসি হাসে জুলিয়া ভেবে পায়না।
সূর্যের আলোর রংধনু তৈরি হয়েছে ওদিকটার জলাধারে। আসলে রংধনু কোথাও না কোথাও দেখা দিবেই যখন রিহান ওর কাছ আসবে। শুধু সূর্যালোকের আলোর কিঞ্চিত প্রবেশাধিকার থাকলেই হলো। কিন্তু এতক্ষণ ধরে এগিয়েও এ পথ যেন আর ফুরোতে চাইছে না। ভেবে অবাক হয়েই জুলিয়া আপন মনে প্রশ্ন করলো, পার্কটা খুব বড় নাকি? এবার রিহান হেসে ফেললো। বললো, শেষ নেই।
২
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে। সারাদিনে ফোনে যোগাযোগ করে মেয়েকে না পেয়ে আর বাসায় এসে মেয়েকে না দেখে জুলিয়ার বাবা মা বেশ চিন্তিত হলেন। বন্ধু বান্ধব বলতে কাছে আছে রিহান । কিন্তু ওরা তো পরিবার শুদ্ধ সেই সকালেই চলে গেছে পাশের শহরে ওর দাদীমাকে দেখতে। এমন কিছুই শুনেছিল সকাল বেলায় জুলিয়ার কাছে নাস্তার টেবিলে। আসলে সপ্তাহ শেষের সময়টিতে সবাই কোথাও না কোথাও যাবার জন্য সময় নির্ধারিত করে রাখে। তারাও যাবেন কাল পাশের শহরের ফ্লাওয়ার ফেস্টিভালে। আর জুলিয়া যদি এখনো বাড়ি না ফেরে তাহলে কখনই বা গোছগাছ করবে আর কিভাবেই বা প্রস্তুতি নেবে।
রিহানের সাথে যোগাযোগ করলে ও বললো ওরা ঠিকমতই পৌঁছেছে দাদীমার বাসায়। কিন্তু জুলিয়াকে সে সারাদিনে ফোনে একবারও পায়নি। প্রাণপ্রিয় বন্ধুটির সাথে যোগাযোগ ব্যর্থ হয়েছে জেনে এবার জুলিয়ার বাবা মা ব্যস্ত হয়ে পড়লেন । তারা এই সিদ্ধান্তে এলেন, যে তাদের কন্যাটি নিখোঁজ হয়েছে।
নিখোঁজ সংবাদের ভিত্তিতে সেদিন চারিদিকে খোঁজ লাগানো হলেও আজ অব্দি জুলিয়ার খোঁজ মেলেনি। ছয় বছর হয়ে গেছে জুলিয়া নিরুদ্দেশ। অথচ ও যে খুব কাছেই ফুলে শোভিত ঘন গাছ গাছালীতে ঘেরা সীমানাবিহীন শতাধিক বছরের পুরোনো সেই বিশাল পার্কে ঘুরে বেড়াচ্ছে তা যেমন তার পরিবারের অজানা, তেমনি জুলিয়াও জানে না কে এই বন্ধুরূপী আগুন্তক যার আহবানে তার এই পার্কে আসা, তার সাথেই পার্কে ঘুরে বেড়ানো যা আর শেষ হবার নয়।
....................
১০/০৯/২০১১
