Saturday, September 10, 2011

আহ্বানে

 

সকাল থেকেই জুলিয়া ভাবছে ও যাবে কি যাবে না। বড্ড মন চাইছে যেতে, রাস্তার ও পাশের ফুলের বাগানটাতে। গ্রীষ্ম এসেছে বহু প্রতীক্ষার পরে। এমন উজ্জ্বল আলো ঝলমলে দিনে সেই পার্কটিতে ঘুরে আসা মন্দ নয়, কিন্তু আজ কেন এত সংকোচ কাজ করছে ওর ও জানে না। এমন তো আগে কখনো হয়নি। তাই কিছুটা ইতস্তত করেই বেরুলো। বাসায় আবার আজ কেউই নেই যে বলে আসবে কোথায় যাচ্ছে। উঠোন পেরিয়ে রাস্তায় এসে দাঁড়ানোর পর জুলিয়া কেন জানি পিছনে ফিরে চাইলো। বাড়িটির জন্য খুব মায়া লাগছে। মনে হচ্ছে ও যেন বাড়ি ছেড়ে খুব দূরে কোথাও চলে যাচ্ছে। অথচ রাস্তা পেরুলেই পার্ক। বেশী তো দূরে নয়।

এদিকটা উপশহর বলে যানবাহন তেমন বিশেষ একটা চোখে পড়ে না। রাস্তা পেরিয়ে ও প্রবেশ করলো ফুলে ঘেরা বাগানটিতে। বেঞ্চ পাতা আছে কিছু দূর পর পরে। ঘন গাছে ঘেরা সরু পায়ে হাঁটা পথ ছায়ায় ঢাকা পড়েছে। গাছের সারি পেরিয়ে কিছুদূর যেতেই মনে হচ্ছে অগোছালো আর অপরিচর্যায় বেড়ে উঠা গাছগাছালীতে পূর্ণ না হলেও বেশ ঘন জংগলেই এবার ও প্রবেশ করেছে। কেমন যেন এক তাগিদ থেকেই জুলিয়া আরেকটু এগুলো। বেশ এবড়ো থেবড়ো পথ। বোধহয় সিটি পার্কের সীমানা শেষ । কিন্তু কোন বাউন্ডারি না দেখে বেশ অবাক হলো। সামনে বিস্তৃত সবুজ বিশাল বনানী। আশপাশে বেশ কিছু প্রস্তরখন্ড ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ঘাসে ঢাকা। একটু ভাল করে খেয়াল করে দেখলো প্রস্তরখন্ডগুলো আসলে শতবর্ষাধিক পুরোনো এপিটাফ। অর্থাৎ বহু আগে এ জায়গাটি সমাধিস্থল ছিল। বেশ অবাক হলো কারণ আগে কখনো ও এসব দেখেনি। আসলে আগে এতদূর আসাও হয়নি। আজ যে কেন এলো, যেন কারো একজনের আহবানে এতদূর চলে আসা। এসব ভাবতে ভাবতে এগিয়ে যেতেই রিহানের কন্ঠস্বর। চমকে পিছনে তাকালো। রিহান ওর সহপাঠী। ওর ছোটবেলার বন্ধু। সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু । ওকে দেখে আরো বেশী অবাক হলো কারণ আজ সকালেই ওর সাথে ইমেইলে কথা হয়েছে কিন্তু তখন তো সে বলেনি যে ও এখানে আসবে। একেই বলে মনের টান। রিহান কাছে এগিয়ে এসে বললো, ‘ওদিকটায় যাবি ঘুরতে?’ আসলে জুলিয়ার এ জায়গাটা একেবারেই অচেনা। পার্কের বিশালতা এবার সে উপলব্ধি করতে পারছে। এত দিনের এই চেনা জায়গায়রও যে অনেক কিছু দেখা বাকী রয়ে গেছে তা বুঝতে পেরেই ও এককথায় রাজী হলো। রিহান বললো ও খুব ভাল চেনে এ জায়গাটা। তাই অনেক গল্প আর অনেক কথা আর অনেকটুকু হেঁটে চলা । রিহান যত না কথা বলে তার থেকে বেশী হাসে। কেন জানি জুলিয়ার কাছে এলে ওর এত প্রাণখোলা হাসি হাসে জুলিয়া ভেবে পায়না। 

সূর্যের আলোর রংধনু তৈরি হয়েছে ওদিকটার জলাধারে। আসলে রংধনু কোথাও না কোথাও দেখা দিবেই যখন রিহান ওর কাছ আসবে। শুধু সূর্যালোকের আলোর কিঞ্চিত প্রবেশাধিকার থাকলেই হলো। কিন্তু এতক্ষণ ধরে এগিয়েও এ পথ যেন আর ফুরোতে চাইছে না। ভেবে অবাক হয়েই জুলিয়া আপন মনে প্রশ্ন করলো, পার্কটা খুব বড় নাকি? এবার রিহান হেসে ফেললো। বললো, শেষ নেই।

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে। সারাদিনে ফোনে যোগাযোগ করে মেয়েকে না পেয়ে আর বাসায় এসে মেয়েকে না দেখে জুলিয়ার বাবা মা বেশ চিন্তিত হলেন। বন্ধু বান্ধব বলতে কাছে আছে রিহান । কিন্তু ওরা তো পরিবার শুদ্ধ সেই সকালেই চলে গেছে পাশের শহরে ওর দাদীমাকে দেখতে। এমন কিছুই শুনেছিল সকাল বেলায় জুলিয়ার কাছে নাস্তার টেবিলে। আসলে সপ্তাহ শেষের সময়টিতে সবাই কোথাও না কোথাও যাবার জন্য সময় নির্ধারিত করে রাখে। তারাও যাবেন কাল পাশের শহরের ফ্লাওয়ার ফেস্টিভালে। আর জুলিয়া যদি এখনো বাড়ি না ফেরে তাহলে কখনই বা গোছগাছ করবে আর কিভাবেই বা প্রস্তুতি নেবে। 

রিহানের সাথে যোগাযোগ করলে ও বললো ওরা ঠিকমতই পৌঁছেছে দাদীমার বাসায়। কিন্তু জুলিয়াকে সে সারাদিনে ফোনে একবারও পায়নি। প্রাণপ্রিয় বন্ধুটির সাথে যোগাযোগ ব্যর্থ হয়েছে জেনে এবার জুলিয়ার বাবা মা ব্যস্ত হয়ে পড়লেন । তারা এই সিদ্ধান্তে এলেন, যে তাদের কন্যাটি নিখোঁজ হয়েছে। 

নিখোঁজ সংবাদের ভিত্তিতে সেদিন চারিদিকে খোঁজ লাগানো হলেও আজ অব্দি জুলিয়ার খোঁজ মেলেনি। ছয় বছর হয়ে গেছে জুলিয়া নিরুদ্দেশ। অথচ ও যে খুব কাছেই ফুলে শোভিত ঘন গাছ গাছালীতে ঘেরা সীমানাবিহীন শতাধিক বছরের পুরোনো সেই বিশাল পার্কে ঘুরে বেড়াচ্ছে তা যেমন তার পরিবারের অজানা, তেমনি জুলিয়াও জানে না কে এই বন্ধুরূপী আগুন্তক যার আহবানে তার এই পার্কে আসা, তার সাথেই পার্কে ঘুরে বেড়ানো যা আর শেষ হবার নয়।

....................

১০/০৯/২০১১

Thursday, January 6, 2011

ছায়া মানব

১ 

ধীরে ধীরে চোখ মেললেন মিসেস গিলবার্ট। খুব ক্লান্ত তিনি। গতকাল এমারজেন্সি সার্জারি হয়েছে কয়েক ঘন্টার নোটিসে। কাউকে খবর দেবার আগেই ডাক্তররা তাকে ভর্তি করে ফেললেন হাসপাতালে। এই আশি বছরের দীর্ঘ জীবনে রোগ ব্যাধির ছোঁয়া তেমন একটি নেই। গতকালই  হঠাত ব্যথার চরম প্রকাশ যার কারণে এখানে আসা। সকালে ভর্তি হলেন আর সন্ধ্যায় অপারেশান। ব্যথা নেই তেমন একটা এখন। কিন্তু বেশ দুর্বল। অপারেশান থিয়েটার থেকে পোস্ট অপারেটিভ কেয়ারে রেখেছিল দুই ঘন্টা। এখন ওয়ার্ডে নিয়ে এসেছে। রাত বাজে আড়াইটা। চারিদিকে শুনশান নিস্তব্ধতা। মাঝে মাঝে ওয়ার্ডের রোগীদের যন্ত্রণাকাতর আর্তনাদ ভেঙে দেয় সকল নিস্তব্ধতাকে। মন খারাপ হয়ে যায়। মনে হয় রোগ ব্যাধির কাছে মানুষ কতই না অসহায়। তারপরও মিসেস গিলবার্ট জানেন না তিনি কতটা ভাগ্যবান। প্রচুর রক্তক্ষরণ সামাল দিতে হয়েছে তাকে অপারেশানের সময়। দ্বিগুন সময় লেগেছে সার্জারীতে। কিন্তু এখন তিনি রাহুমুক্ত। 

রাত মনে হয় নির্ঘুম কেটে যাবে। পাশে জানালা দিয়ে দেখা যাচ্ছে দূর আকাশের মেঘগুলো। একটা অন্ধকারাচ্ছন্ন আলো ঘিরে রেখেছে বাইরে। বাতিগুলো সব নেভানো। গভীর রাত বলেই হয়তোবা রোগীদের বিশ্রামের জন্য আলো নেভানো। শরীর ভীষণ দুর্বল বলেই হয়তো বেশ ঠান্ডা অনুভব করছেন। আরেকটা চাদর জড়ালে ভাল লাগতো। মাথার পাশে বোতামটা চাপলেই নার্স কথা বলে উঠবে স্পিকারে । আর আদেশ করা মাত্রই ত্বরিত গতিতে ছুটে আসবে রোগীর কাছে। তা সত্ত্বেও নার্সদের ডেকে বিরক্ত করতে মন চায় না কোন রোগীরই একান্ত না পারলে। কিন্তু ঠান্ডা যে লাগছে ভীষণ। ধীরে ধীরে হাতটা নাড়াতে চেষ্টা করলেন তিনি।  ডানপাশে মাথার কাছে লম্বা তার দিয়ে বেড সাইড সুইচটা রোগীর কাছেই রাখা থাকে। কিন্তু হাত সরাতেই এখন যেন খুব ক্লান্তি। একটা অপারেশন রোগীকে এভাবে প্রভাবিত করে? সমস্ত শক্তিগুলো যেন নিঃশেষ করে নিয়ে যায়। আবারো চেষ্টা করলেন । হাতটা আগাতেই মনে হলো খুব কাছে যেন কেউ কথা বলে উঠলো। বেশ ভারী কন্ঠস্বরে,

– আমি এসেছি।
চমকে উঠলেন মিসেস গিলবার্ট। বললেন, 
– কে তুমি ? ওহ্‌ নার্স বুঝি।
  – আমি নার্স নই। আমি ট্রিস্টিন। তোমার সংবাদ বাহক।
– মানে? 
– মানে আমি তোমাকে জানাতে এসেছি কিছু তথ্য। 
– কি তথ্য? 

– আজ তোমার প্রত্যাবর্তনের দিন ছিল। কিন্তু তা হয়নি। তোমার অসীম ইচ্ছাশক্তির কারণে ইশ্বর তোমায় রেখে দিলেন। অপারেশন সাকসেসফুল হলো। কিন্তু তোমার বদলে আরেকজনকে অবশ্যই যাতে হবে। 

মিসেস গিলবার্ট থমকে গেলেন কথাগুলো শুনে। সামনে মিশমিশে অন্ধকারে কালো একটা ছায়া যেন দাঁড়িয়ে আছে তার সামনে। কিন্তু এ অন্ধকারে ঘরে ছায়াই বা আসবে কোথা হতে? নিজের অজন্তেই অবাক হয়ে প্রশ্ন করলেন,

– কাকে যেতে হবে?

– তোমার প্রাণপ্রিয় নাতিনীকে। আজ হতে ৭ দিন পর। ২২ শে মার্চ। ক্যালিফর্নিয়ায় বাতসরিক স্কি প্রতিযোগীতায় অংশগ্রহনের জন্য স্কুলের ১২ জন শিশু থাকবে ঐ স্কি গ্রুপে ।ওরা কেউই পারবে না প্রতিযোগীতার কেন্দ্রে পৌঁছাতে।  তার আগেই ওদের প্লেনটা ভূপতিত হবে শহরের কেন্দ্রে কোন ফুলে ঘেরা প্রশস্ত বাগানের নির্জন কোণে। তাই প্লেনটি বিধ্বস্ত হলেও শহরের ব্যস্ততম অঞ্চলগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। 

কি বলছে এসব এই ছায়ামানব? মিসেস গিলবার্ট বুঝে উঠতে পারছেন না। তার নাতনীকেই বা এ চিনে কিভাবে? 

তুমি কে বলে উঠতেই আবারো সেই একই উত্তর ভেসে এলো।

– আমি ট্রিসটিন। একজন বার্তাবাহক, তোমাদের সকলের দেখাশুনা করাও আমার দায়িত্বের মাঝে পড়ে। 

– তাহলে আমার নাতনীকে কেন?

– ওকেই এখন বেশী প্রয়োজন। কারণ ওর স্কি করার পারদর্শীতা ওকে এতটাই বেপরোয়া করে তুলেছে যে, যে কোন সময়ে ওকে বরণ করে নিতে হবে অকাল পঙ্গুত্ব। কিন্তু তা আমি হতে দেবনা। ভালোয় ভালোয় এই ডাইমেনশান থেকে সরিয়ে নিয়ে স্থাপন করবো ওকে অন্য কোন খানে, যেখানে খুব সাধাসিধে জীবন যাপন করে ও সমাপ্ত করবে ওর জীবনচক্র।

মিসেস গিলবার্ট কান্না মিশ্রিত কন্ঠে কাতর অনুনয় করে বললেন,

– কিন্তু ওকে ছাড়া আমি বাঁচবো কিভাবে? 

ছায়ামানব ট্রিস্টিন এবার আলতো স্পর্শে হাত রাখলো মিসেস গিলবার্টের হাতে। ভীষণ শীতল সে স্পর্শ। দেহটা যেন অসাড় বোধ হচ্ছে। একটু নড়বার চুল পরিমাণ শক্তিও নেই অবশিষ্ট। ট্রিস্টিনের শেষ উত্তর একটিই।

– তোমার জীবনীশক্তি প্রচন্ড। নাতির চলে যাওয়ার ধাক্কা সইতে তুমি পারবে। এখন ওরই যাবার সময়।

জুলিয়ান এখন পড়ছে থার্ড গ্রেডে। বয়স ৮ বছর। এই বয়সেই স্কিতে ভীষণ নৈপুণ্য অর্জন করে ফেলেছে সে। একসপ্তাহ পরেই রওনা দেবে বাতসরিক স্কি প্রতিযোগীতায় অংশ নিতে। তবুও মনটা জানি কেন ভাল নেই তার। চোখের সামনে শুধু ভেসে উঠছে বৃদ্ধ দাদির অসাড় একটি দেহ।

কেন এমন হচ্ছে? বার্ধক্য এলেও শারিরীক দিক দিয়ে এই বয়সেও দাদী রোগ বালাইয়ের উর্ধ্বে। তারপরও কেন এমন মনে হচ্ছে? দুদিন আগেই তো কথা হল। ওনার অসাড় দেহ বার বার চোখের সামনে ভেসে উঠছে কেন ভেবে কোন কারণ পেল না জুলিয়ান। আজ বোধহয় সারা রাত আর ঘুম আসবে না তার। কিছু ভেবে না পেয়ে বেড সাইডের ল্যাম্পটায় জুলিয়ান হাত বাড়ালো। আজ যেন সব কিছু অন্য রকম। ল্যম্পটা যেন হাতের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে বার বার। ডান দিকে ভর দিয়ে কাত হয়ে হাতটা আগালো ল্যাম্পের দিকে। আর তখনই খেয়াল করলো বিছানা আর সাইড টেবিলের মাঝের ওই জায়গায় কে যেন দাঁড়িয়ে। জুলিয়ান মাথা তুলে তাকালো  উপরে। 

দীর্ঘ মানুষের অবয়বে একটি কালো ছায়া। 

কিন্তু ছায়াই বা আসবে কোথা হতে এই অন্ধকার ঘরে? জুলিয়ান বেশ অবাক হয়েই বিড়বিড় করে বলে উঠলো, কি এটা?

ছায়ামানব যেন তাও শুনে ফেলেছে। ছোট্ট একটি উত্তর দিয়ে বললো,
– আমি ট্রিসটিন।
জুলিয়ান বেশ অবাক! জানতে চেয়ে বললো,
– কোথা হতে এসেছ?
– 7D থেকে। তোমায় কিছু বলতে চাই। 
– বল।
খুব ধীরে গম্ভীর কন্ঠস্বরে ছায়াটি বলে উঠলো,
– তোমার দাদী সুস্থ আছেন।

জুলিয়ান এত অবাকের মাঝেও না হেসে পারলো না। আজ সারাদিনই তো সে দাদীর কথা ভেবেছে। কিন্তু এ ছায়াটি সে কথা জানলো কিভাবে? এবার আরো অবাক করে দিয়ে ছায়াটি প্রশ্ন করলো,

– স্কি করতে যাবে তো এই মাসের ২২ তারিখে? তাইনা?
– হ্যা মার্চের ২২ তারিখে।  সকাল সকাল রওনা দিলে বেশ আগেই ওখানে পৌঁছে যাব।
ট্রিসটিনের বেশ সরাসরি উত্তর,
– না  তোমরা  পৌঁছাবে না।
– পৌঁছাব না? কেন?

– তোমেদের নিয়ে যাব ফুলে ফুলে শোভিত খুব সুন্দর এক বাগানে, যেখানে অজস্র মানুষ ঘুমিয়ে আছে নিশ্চিন্ত মনে। জায়গাটি এই ক্যালিফর্নিয়ার মনটোনা এয়ারপোর্ট  থেকে  মাত্র ৫০০ ফুট দূরে। তোমাদের প্লেন রানওয়ে পর্যন্ত পৌঁছাবে না। তার আগেই পড়ে যাবে। 

– পড়ে যাবে?
– হ্যা পড়ে যাবে।
– কিন্তু কেন?
– কারন তোমার স্কি করার যে আর প্রয়োজন নেই।

স্বপ্ন কি না সত্যি জুলিয়ান জানে না। ঘুম ভেঙে গেল ওর। বাইরে ভোর হয়ে এসেছে। কেউ তো নেই মাথার কাছে দাঁড়িয়ে। কিছু কিছু কথা মনে পড়ছে। দাদী, স্কি ট্রিপ, ফুলের বাগান।  নেট ব্রাউজ করে কিছু তথ্যও পেয়ে গেল।  ক্যালিফর্নিয়ায় তাদের অরোভিল থেকে  মনটোনা যেতে ঘন্টাখানেকের পথ। সেখানেই ওদের স্কি রিসোর্ট। 

দাদীর সাথে কুশল বিনময় করবে আজ।

ফোনটা বেজেই চলছে। প্রায় আধাঘন্টা হলো। কিন্তু কেউ তুলছে না। কেন? সকলের এই সময়টা  মিসেস গিলবার্ট তো বাসায় থাকেন। উনি যে খুব একটা বাইরে যান তাও না। এই ব্রেক ফাস্টের সময়টা পিছনের কাঁচে ঘেরা বারান্দায় বসে থাকেন। পিছনে গাছ গাছালী ভরা বনানী। দৃশ্যটা খুব সুন্দর। শীতকালে তুষারাবৃত হয়ে সাদা হয়ে যায় চারিধার। ঋতুর সৌন্দর্য্য আলাদা আলাদা। শীতের সময়ে এই বারান্দা সানরুম হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

ফোন যখন কেউই  ধরছে না, জুলিয়ান আর চেষ্টা করলো না। চলে গেল স্কুলে। হাঁটা পথ পাঁচ মিনিটের। যখন আরো ছোট ছিল, মা–ই নিয়ে যেতেন স্কুলে। এখন ও নিজে যেতে পারে, আর ছুটি হলে একদৌড়ে বাড়ি।

আজ বাড়ি ফিরে দেখল বাবা মা বেশ চিন্তিত। তারাও ফোন করে কোন সাড়াশব্দ পাননি মিসেস গিলবার্টের। ওখানে প্রতিবেশী যারা আছেন তারাও বেশ বৃদ্ধ। তাই কাকেই বা বলবে ওনার খবর নিতে। পুলিশের সাহায্য ছাড়া আর বুঝি উপায় নেই। 

একে একে সকল তথ্যই পুলিশ নিল। নাম, বাড়ি নম্বর, রাস্তার নাম সবই।

খোঁজ শুরু করলো। অবশেষে পেয়েও গেল। হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন মিসেস গিলবার্ট গতকাল। বাড়ি হতে দুমিনিটের পথ দিব্যি হেঁটে চলে গেছেন। আর তখনই ডাক্তররা ধরে বেঁধে ভর্তি করে নিয়েছেন, কাউকে জানাতে পারেননি ততক্ষণাত। অপারেশনের পর আজ সকালে সুস্থ তিনি। সব শুনে জুলিয়ানের মা বাবা আশ্বস্ত হলেন।   

কিছুদিন পরেই রওনা দেবেন তারা স্কি ট্রিপে। স্কুল চলছে তাই দাদীর কাছে যাবার সুযোগ নেই জুলিয়ানের । ফিরে এসে গ্রীষ্মকালীন ছুটি শুরু হতে মাস দেড়েক বাকী, তখনই না হয় জুলিয়ান  ওখানে যাবে, এসব ভেবে ভেবে রাতে ঘুমুতে চেষ্টা করল চোখের পাতা দুটো এক করে। স্বপ্নের রাজ্যে যখন প্রবেশের সময় তখনই গতরাতের মতো একটি কন্ঠস্বর। কে জানি তাকে ডাকছে বেশ গম্ভীর স্বরে। 

– জুলিয়ান।

বেশ কাছ থেকেই। 

চোখ মেলতেই চিনে ফেললো তাকে। সেই ছায়ামানব, ট্রিস্টিন। কিছু বলছে না আজ, শুধু চেয়ে আছে। কথা বলতে খুব কষ্ট হচ্ছে জুলিয়ানের। সেও কিছু বলতে চেয়ে পারছে না। খুব অবসন্ন আর ক্লান্ত লাগছে। চারিদিকে বেশ ঠান্ডা অনুভূত হচ্ছে। যেন দম বন্ধ হয়ে আসার মত অদৃশ্য চাপ। কেউ তাকে এক নিমেষে অবশ করে দিয়েছে। 

বাবাকে এ কথা বলে লাভ নেই। তারা হয়তোবা বিশ্বাস করবেন না। যাই হোক। ঘুমিয়ে পড়ল জুলিয়ান।

সময়কালঃ ২২ শে মার্চ ২০০৯

জুলিয়ান এবং তার সঙ্গীরা রওনা দিয়েছে তাদের প্রতিযোগীতার কেন্দ্রস্থলে। ঘন্টাখানেকের পথ। তাই  ছোট্ট একটি প্লেন নিয়ে যাত্রা। ৮ থেকে ১০ বছরের ১২ জন ফুটফুটে শিশু সহ মোট ১৪ জন যাত্রী প্লেনে। আজ সকাল বেশ সুন্দর। তাপমাত্রা শূন্যের  কিছু নিচে।আকাশের মেঘগুলো তুলোর মতো ভেসে বেড়াচ্ছে চারিদিকে। নিচে বাড়িঘর, জলাশয় আর রাস্তা এক নয়নাভিরাম দৃশ্য তৈরি করেছে। ঐ তো দূরে রানওয়ে। আর বেশীক্ষণ লাগবে না শহরে পৌঁছাতে। মাটির কাছাকাছি নেমে আসছে ওদের প্লেন বেশ সাবলীল গতিতে। তাই শহরের দৃশ্য আরোও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

ফুলের বাগানে ঘেরা একটা কবরস্থান। বেশ প্রাচীন মনে হচ্ছে। এত স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে , প্লেনটা বোধহয় বেশ নীচু দিয়ে উড়ে চলছে। ফুলগুলো সব ফুটতে শুরু করেছে। মার্চের এই ২২ তারিখেই বসন্তকে ওরা বরণ করে নেয়। 

জুলিয়ানের হঠাত মনে পড়ে গেল ট্রিস্টিনের কথা। ও বলেছিল সুন্দর সাজানো বাগানের কথা। ওখানে যাবার কথা। কিন্তু রানওয়ে থেকে না নেমে তো ঐ বাগানে ওরা পৌঁছাতে পারে না। আর মাত্র ৫০০ ফুট দূরেই রানওয়ে। তাহলে প্লেনটি বারবার এই সাজানো বাগানের ওপর চক্কর দিচ্ছে কেন? এবার বেশ নীচের দিকে ধাবিত হচ্ছে মনে হয়। নাম পড়া যাচ্ছে বাগানটির। হলি ক্রস সেমিটারি। কিন্তু এই বাগানেই ল্যান্ড করবে নাকি? কিছু বুঝে উঠতে পারার আগেই একটা বিকট শব্দ। 

তারপর নিস্তব্ধ। চারিদিক। অন্ধকার।

চোখে মেলে চাইলেন মিসেস গিলবার্ট। শরীর এখনো বেশ দুর্বল। এই দুঃস্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙ্গে গেল। একটা প্লেন বিধ্বস্তের পুরো ঘটনা কেন প্রত্যক্ষ করলেন এভাবে? ঘুমের ঘোরে ক্ষণিকের চিন্তা যখন স্বপ্ন আকারে আসে তখন বিচ্ছিন্ন ভাবনাগুলো কত কল্পনারই না সৃষ্টি করে। তাই এসব বিষয় গুরুত্ব দিলে কি চলে?

কিছুদিন আগে যে ছায়ামানবের সাক্ষাত তার ঘটেছিল সে তো আরো অমূলক। অপারেশানের পর দুর্বল শরীরে অশরীরী অস্তিত্বের উপস্থিতি শুধু নয়, বন জঙ্গলের বাঘ ভালুকের অস্তিত্বও অমূলক নয় কারোর জন্য যে কিনা ঐ ব্যথানাশকের ঘোরে মৌলিক চিন্তা করার সামর্থ্য হারিয়ে ফেলে। আর সেই দিনের সেই কথাগুলো, নাতনীর স্কি রিসোর্টে যাবার পথে ফুলে ঘেরা সেমিটারিতে প্লেন ক্র্যাশের অতি কাল্পনিক গল্প  হয়তো মনের অন্তস্থলে গিঁথে ছিল বলেই এ স্বপ্নের অবতারণা। পুরো গল্পটা দিয়ে স্বপ্ন দেখে রাত পার হয়ে গেল। দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের অজান্তে মিসেস গিলবার্ট  চোখ বুজলেন। নাতনীর জন্য অনেক প্রার্থনা করে হাত বাড়ালেন বেড সুইচের দিকে। নার্সকে খবর দিলেন আসতে। বলবেন ফোনের লাইনটি লাগিয়ে দিতে। নাতনীর সাথে কথা বলবেন এখনই। ছোট্ট জুলিয়ানের কন্ঠ শুনতে ভীষণ মন চাইছে তার।

.......

লেখাঃ খুব সম্ভবত ২০০৯
ব্লগে প্রকাশ ০৭/০১/২০১১


পথচারী

 পথচারী