Saturday, June 6, 2009

সেল ট্যুর

 (অন্য গালাক্সি থেকে)

শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগে, সিনিয়র গবেষক হিসেবে কাজ করছেন প্রফেসর রবার্ট প্রায় ২৪ বছর ধরে। প্রতি বছরই নতুন নতুন ছাত্র আসে তার অধীনে গবেষণা করতে।  এবার উইন্টার সেমিস্টারে জেফরিকে কাজে নেয়ার পরিকল্পনা আছে। ছেলেটি খুব স্মার্ট। মনে আছে, ওরা যখন প্রথম বর্ষে এসে সবেমাত্র ক্লাশ শুরু করেছে, প্রফেসর রবার্ট তাদেরকে প্রাথমিক ধারণ দিচ্ছিলেন মানব দেহের কোষ সম্পর্কে । জেফরির প্রশ্নগুলো ছিল বেশ চমকপ্রদ। আর সে থেকেই জেফরির কথা প্রফেসর রবার্টের স্মৃতিতে গেঁথে আছে। আজ ছয় বছর পর গ্র্যাজুয়েশান শেষে জেফরি যখন প্রফেসর রবার্টের  অধীনে গবেষণা করার জন্য আবেদন করলো,  এক ঝলকেই প্রফেসর রবার্টের স্মৃতি তাকে টেনে নিয়ে গেল সেই বহু পিছনে, আজ থেকে ছ’বছর আগের প্রথম বর্ষের P24 ক্লাস রুমের প্রথম লেকচারের দিনে।  প্রথম বর্ষের ছাত্রদের, কৌতুহল ভরা চোখমুখ, উচ্ছল প্রাণদীপ্ত তারুণ্য আর জানার অদম্য আগ্রহ থেকে তৈরী হওয়া অসংখ্য প্রশ্নে ভরা মন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সূচনা যখন হয় তখন অনুভূতিটাই অন্যরকম।


প্রফেসর রবার্ট প্রথম দিন রিভিউ হিসাবে আলোচনা করছিলেন মানব কোষের গঠণ, কোষের অভ্যন্তরস্থ নিউক্লিয়াসের কাজ, মাইটোকন্ড্রিয়ের কাজ। বিশাল স্ক্রিনে পাওয়ার পয়েন্টের স্লাইডে তৈরী মানব কোষের চমৎকার সুন্দর ছবিটি ছাত্রদের সামনে তুলে ধরেছিলেন।পুরো কো্ষটাকে তুলনা দিয়েছিলেন একটা শহরের সাথে। সেই শহরের পাওয়ার প্ল্যান্টগুলো হলো কোষের অভ্যন্তরস্থ মাইটোকন্ড্রিয়া। শহরের ফ্যাক্টরিগুলো হলো রাইবোসোম।তথ্য সংরক্ষণের ভান্ডার হলো জেনম।তার এই তুলনার সাথে ছাত্র ছাত্রীরা উপভোগ করেছিল প্রফেসরের উপস্থাপনার স্টাইল। জেফরির প্রশ্নটা ছিল কোষের প্রাচীর অর্থাৎ সেল -মেমব্রেন নিয়ে। তার প্রশ্ন ছিল, উদ্ভিদ আর মানুষের কোন তফাৎ আছে কিনা তাদের কোষ প্রাচীরের মাঝে।প্রফেসরের উত্তরটা ছিল আরো মজার। তিনি বলেছিলেন, উদ্ভিদের কোষগুলোর প্রাচীর, প্রাণীদের কোষ প্রাচীরের তুলনার বেশ শক্ত। আর তাই কোষের মাঝে ঢুকে যদি কোষের কার্যকারিতা দেখতে চাওয়া যায়, তাহলে প্রাণী কোষই হবে ভ্রমনের উপযুক্ত স্থান। তখন থেকেই জেফরির মনে একটাই খেয়াল, আর সেটা হলো সেল-ট্যুর।

কোষের অভ্যন্তরে সশরীরে ভ্রমন। 

কোষের অভ্যন্তরের শহরটায় ভ্রমন করলে তো মন্দ হয়না। যদিও আকৃতিতে তাকে  বেশ ছোট হয়ে যেতে হবে। যদি যদি লোহিত রক্ত কণিকার  অভ্যন্তরেও প্রবেশ করা যায়, তবে যে কোন একটা ব্যাকটেরিয়ার আকৃতি ধারণ করতে পারলে বেশ ভালো হয়।  কারণ ব্যাক্টেরিয়াগুলোর ব্যাসার্ধ ১.০ মাইক্রোমিটার আর লোহিত রক্ত কণিকাগুলো ব্যাক্টেরিয়াগুলোর থেকে প্রায় সাড়ে সাতগুণ বড়, ৭.৬ মাইক্রোমিটার ব্যাসার্ধ সম্পন্ন।

এই তথ্য জানার পর জেফরির শুধু একটাই ভাবনা, আর তা হলো সেল–ট্যুর। কথাটা সে কাউকে বললো না। বন্ধু বান্ধবেরা হাসি ঠাট্টা করবেই, এই উদ্ভট ট্যুরের কথা শুনে। জেফরি আরো তথ্যের জন্যই সেদিন প্রফেসর রবার্টকে জিজ্ঞেস করেছিল, মানব কোষের বাইরের দিকে প্রাচীরগুলোর আকার আকৃতি সম্বন্ধে।

প্রফেসর তার স্লাইডে দেহের বিভিন্ন স্থানের কোষের ছবিও নিয়ে এসেছিলেন। চামড়ার কোষগুলোর বহিঃআবরণ চ্যাপ্টা। কিন্তু পেশীকোষের বহিঃ আবরণ লম্বা ও সরু ধরণের। মানবদেহ ২০ থেকে ৩০ ট্রিলিয়ন কোষ  নিয়ে গঠিত। এত সংখ্যক কোষের ভেতরে যেয়ে যেয়ে অবকাশ যাপন তো জেফরির জন্য সম্ভব নয়। তবে দু’এক ধরণের কোষে প্রবেশ করলে মন্দ হয় না। সবচেয়ে সহজ হয় ত্বকের কোষগুলোর ভেতর ঘুরে আসা। 

যার প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত সাবান ব্যবহার করেন তাদের চামড়ার বহিঃ আবরণ তেমন শক্ত থাকে না। তাই বিভিন্ন ধরণের ব্যাকটেরিয়া সহজে প্রবেশের সুযোগ পায়। 

যেই ভাবা সেই কাজ।

জেফরি সাথে সাথে যোগাযোগ করলো ওর ছোট ভাইয়ের সাথে , যে কিনা সানফ্লাওয়ার গ্যালাক্সিতে বর্তমানে বসবাস করছে। ঐ গ্যালাক্সির মানুষগুলো পৃথিবীর মানুষদের থেকে প্রযুক্তির দিক দিয়ে ৮০০০ বছর এগিয়ে। তাদের পক্ষেই সম্ভব জেফরির আকার সংকুচিত করে ব্যাকটেরিয়া -আকৃতিতে তাকে রূপান্তর করা।

সামনের গ্রীষ্মের ছুটিতেই জেফরি সিদ্ধান্ত নিল ছোট ভাইয়ের সাথে দেখা করবে। পৃথিবীর গ্রীষ্মকালীন ছুটিতে সানফ্লাওয়ার গ্যলাক্সীতেও চলছিল ছুটির আমেজ।ছোট ভাইয়ের সাথে দেখা করতে গিয়ে তাই দেখা হলো তার বন্ধুদের সাথে।

সবাই মিলে বায়না ধরলো ওরা সবাই যাবে সেল ভ্রমনে। নিজেদের আকৃতিকে ছোট্ট ছোট্ট ব্যাক্টেরিয়ার আকারে রূপান্তর করে ছুটে এলো পৃথিবীতে। পৃথিবীর বাসিন্দাদের সবার তো আর শারিরীক প্রতিরোধ ক্ষমতা একরকম নয়, তাই অপেক্ষাকৃত কম প্রতিরোধ ক্ষমতা সম্পন্ন মানুষদের রক্ত প্রবাহে প্রবেশ করতে, জেফরি ও তার বন্ধুদের বেশী বেগ হলো না। রক্ত প্রবাহে অবস্থিত অসংখ্য ছড়িয়ে থাকা লোহিত কণিকাগুলোর মাঝে ওরা প্রবেশ করলো। লোহিত কণিকার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো,এই কোষগুলো নিউক্লিয়াস, মাইটোকন্ড্রিয়া বিহীন কোষ।আরো অনেক উপাদান এর ক্ষেত্র- মন্ডলে অনুপস্থিত। পুরো কোষ জুড়েই রয়েছে হিমোগ্লোবিন, যা কিনা দেহে অক্সিজেন সরবরাহে সদা নিয়োজিত। প্রোটিন এবং আয়রনের অণু দিয়ে হিমোগ্লোবিন তৈরী। লোহিত কণিকা  গোলাকার আকৃতির হলেও তার দুই পৃষ্ঠদেশ অবতল। ৭.৬ মাইক্রোমিটার ব্যাসার্ধের এই কোষগুলোর মাঝে ঘুরতে ঘুরতে ওরা এক বৈচিত্র্যময় জগতের সন্ধান পেল। কারো কারো লোহিত কণিকাগুলো স্বাভাবিকের চেয়ে বড় আকৃতির। কারোর গুলো স্বাভাবিকের চেয়ে ছোট আকৃতির।পৃথিবীর মানুষেরা  তাদের রক্তে এ ধরণের বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন লোহিত কণিকার  উপস্থিতিকে যথাক্রমে  ম্যাক্রোসাইটিক অ্যানিমিয়া (macrocytic anemia) বা মাইক্রোসাইটিক অ্যানিমিয়া (microcytic anemia) বলে অভিহিত করে। জেফরি ও তার সঙ্গীরা অবাক হলো, যখন দেখল কারো কারো দেহে লোহিত কণিকাগুলো গোলাকৃতি থেকে অর্ধচন্দ্রাকৃতি ধারণ করেছে।অনেকটা কাস্তের মতো (sickle shape). এর উপস্থিতি থাকলে তাকে বলে সিকেল –সেল  অ্যানিমিয়া।

রক্ত প্রবাহের সাথে মিশে জেফরি ও তার বন্ধুরা প্রবেশ করলো মানব দেহের ব্রেইন – সেল,  নিউরনে। কম্পিউটারের প্রসেসারের এক একটি লজিক গেইট এর মতো যেন এক একটি নিউরন। তারা মানুষকে ভাবতে শিখায়, কষ্টে কাঁদতে শিখায়, আনন্দে হাসতে শিখায়। তড়িৎ সংকেত যথাসময়ে শরীরের সকল অঙ্গ প্রত্যঙ্গে পৌঁছে দেয়। নিউরন থেকে প্রাপ্ত তড়িৎ সংকেতের মাধ্যমেই মানুষদের শিহরণ অনুভূত হয়। তারা ভয় পেলে ভয়ে শিহরিত হয়ে তাদের সব লোম খাড়া হয়ে উঠে বা আতংকে শরীর ঠান্ডা হয়ে যায়। কিছু কিছু মানুষের শরীরে নিউরনগুলো সঠিক ভাবে সংকেত পৌঁছাতে পারে না। সে মানুষগুলো অন্যান্যদের তুলনায় প্রখর অনুভূতিসম্পন্ন হয়না। তাদের সংস্পর্শ অন্যরা তেমন পছন্দও করে না।জেফরি অনেকের ব্রেইন সেলে প্রবেশ করে তাদের নিউরনের প্রকৃতি ও মানবদেহে তাদের প্রভাব নির্ণয়ে চেষ্টা করেছে। কিন্তু এভাবে রক্তের সাথে মিশে সকল ধরণের কোষগুলো পর্যবেক্ষণ করতে করতে ওর গ্রীষ্মের পুরো ছুটিটাই শেষ হয়ে যাবার অবস্থা।তাই সিদ্ধান্ত নিল আর সেল ট্যুর নয়।

এবার বাড়ি ফেরার পালা।   

কিন্তু অস্থির কোষ, বোন-সেল্‌ (bone cell) না দেখেই চলে যাবে?

আবারো থমকে দাঁড়ালো।        

মানবদেহের অস্থির প্রাচীরে প্রবেশ করতে চেষ্টা করল।ক্যালসিয়াম আর ফস্‌ফেট আদান প্রদানে দেহের হাড়ের কোষ-আবরণ (bone lining cell)সমূহের দারুণ ভূমিকা । কাজ করে যাচ্ছে সর্বক্ষণ। 

ওরা আরো দেখল অস্টিওক্লাস্ট (Osteoclast) নামের বড় বড় অস্থি কোষ, যারা অস্থির বৃদ্ধি, পুর্ণগঠনে ভূমিকা রাখে। তারপর যেতে যেতে ওদের পথে পড়ল অস্টিওসাইটস্‌(osteocytes), যারা অস্থিকোষের পুষ্টির দিকটা বিশেষ বিবেচনায় রাখে। প্রয়োজনীয় এনজাইম আর খনিজ পদার্থের নিঃসরণ ঘটিয়ে অস্থিকে সুস্থ ও কর্মক্ষম রাখে। তারপর দেখা হলো অস্টিওব্লাস্ট (Osteoblast) কোষের সাথে। এরা দেহের অস্থিকে সুগঠিত করবার জন্য সদা প্রস্তুত। আর অস্টিওজেনিক (Osteogenic) কোষগুলোকে চুপচাপ বসে থাকতে দেখে ওরা আর আগালো না। এবার তারা সত্যিই সত্যিই বাড়ি ফেরার সিদ্ধান্ত নিল।

মোটামুটি সাত দিনের ট্যুর।শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হস্টেলের মোট ৩৩ জন ছাত্রকে ওরা বেছে নিয়েছিল ওদের সেল-ট্যুর সম্পাদনের জন্য। জেফরি এন্ড গং তাদের দেহে প্রবেশের ফলে তাদের কোন ক্ষতি সাধিত হয়েছে, তা কিন্তু নয়। শুধুমাত্র ঐ ৩৩ জন ছাত্র একই সাথে ডাক্তারকে জানিয়েছিল তাদের শরীরে দানা দানা অ্যালার্জির কথা।এতগুলো ছাত্রের একসাথে অ্যালার্জি হবার কথা সে সময় প্রফেসর রবার্টের কানেও পৌঁছে ছিল। সময় ছিল ২০০৯ সাল। জেফরি তার কাছে না আসার দরুণ এবং তাকে কিছু না জানানোর দরুণ প্রফেসার রবার্ট আর তা অনুসন্ধান করবার সুযোগ পাননি। 

২

এরপর বহুদিন কেটে গেছে। জেফরি নিয়মিত ক্লাশ করছে।ওর বন্ধুরা যার যার নিবাসস্থল, সেই সানফ্লাওয়ার গ্যলাক্সিতে ফিরে গেছে। মানব দেহ-কোষ ভ্রমনের ঘটনা সবিস্তারে তাদের সহপাঠীদের বর্ণনা করেছে। এবার তারা পর্যবেক্ষণ করবে মানব ভ্রূণের বৃদ্ধি। আর  মানব দেহকোষ কিভাবে বিভাজিত হয়ে পূর্নাংগ মানব শিশু গঠন করে। এই পদ্ধতিকে পৃথিবীতে ক্লোনিং পদ্ধতি বলে।

তাদের বৈচিত্র্যপূর্ণ এই ভ্রমনের গল্পে আগ্রহী হয়ে এবার তাদের সাথে এসেছে আরো ৬ জন পর্যটক। উদ্দেশ্য সেই আগের মতনই- সেল ট্যুর। কিন্তু এবার ঘটনাটি ঘটলো একটু অন্যরকম। সাউথ ইস্ট এশিয়ার একটি লোকেশান- বাংলাদেশে। সেখানকার প্রত্যন্ত একটি গ্রামে হঠাতই শুরু হলো কিশোরীদের গণহারে মূর্ছারোগ। তাদের ডাক্তাররা একে বলছে মাস্‌-হিস্টিরিয়া।স্থানীয় স্বাস্থ্যবিভাগ কোন কারণ খুঁজে না পেয়ে শেষমেশ উপসঙহারে এলেন যে, মূর্ছা যাওয়ার ঘটনা সাময়িক কোন ছোঁয়াচে আতংকের আবহ। এই আবহ থেকে এই অবস্থার সৃষ্টি, কিন্তু ঠিক হয়ে যাবে। তখন কিন্তু সেই ৩৩ জন এদের শরীরে তাদের সেল –ট্যুর  শুরু করেছে । বাকী আছে ব নতুন ছয়জন পর্যটক। তারা দেখলেন, পত্রিকায় এই ঘটনাটি খুব বড় আকারের খবর হিসাবে তেমন গুরুত্ব পেল না। ছয়জন পর্যটক স্কুলের ৮০০ ছাত্র ছাত্রীদের মাঝ থেকে শুধু এই ৩৩ জন আক্রান্ত কিশোরীদের ক্ষয়িষ্ণু প্রতিরোধ ক্ষমতা দেখে বেশ অবাকই হলেন।

কিন্তু তখনও তাদের জানা ছিল না আজ হতে ১০ বছর পর ২০১৯ সালে এমন একটি ভাইরাস হানা দেবে এই গ্রহে, যা সারা পৃথিবীকে অচল করে দেবে।   

ভাইরাসটির নাম হবে কোভিড-19.

সে মানবদেহের ক্রাউন চক্র বা ‘করোনা’তে  আক্রমন করে মানুষের অতি-জাগতীয় অনুভূতিকে ‘লক্‌’ করে দেবার চেষ্টা করবে। আর তা সম্পূর্ণ ভাবে সফল করতে যদি ব্যর্থ হয়, তাহলে ধীরে ধীরে তাদের  আক্রমণের মাত্রা  তারা কমিয়ে দেবে। তারপর আরও দশ বছর সময় নিয়ে অতর্কিতে আবার হামলা চালাবে ২০২৯/২০৩০ সালে। ঐ সময়ের পর করোনা ভাইরাস পৃথিবীতে আর দেখা যাবে না।কারণ ততদিনে পৃথিবী নামক গ্রহটি 3D থেকে 5D তে যাবার প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন করে ফেলবে। 4D এনার্জি-ফিল্ড এতো তীব্রভাবে সক্রিয় থাকবে যে, এই পৃথিবীর বাসিন্দাদের কোন ভাইরাস দিয়ে আর অসুস্থ করা যাবে না। 

সেই ২০০৯ সালে স্কুলের ছাত্রীদের গণহারে মূর্ছা যাবার কারণের যে ব্যাখ্যা দিতে বিজ্ঞানীরা অপারগ ছিলেন, তারাও বিশেষ ভাবে সচেতন হবেন অন্যগ্রহের প্রাণীদের উপস্থিতি ও আক্রমণের বিষয়ে। ব্যখ্যাতীত অসুস্থতার কারণ, ব্যাখ্যার অভাবে, সমাধান থেকে বঞ্চিত হবে না কখনোই।

...
লেখা আরম্ভ ২০০৯
লেখার সমাপ্তি ২০২৬ (প্রথম করোনার পর, দ্বিতীয় করোনার পূর্বে)

Friday, April 3, 2009

বোধ

 


১

রৌদ্র ঝলমল সকাল। আনমনে বাইরে তাকিয়ে আছে শীলা। সূর্য রশ্মির অসীম কৃপায় কিভাবে বেঁচে আছে এ জীবজগত আর এ মানব সভ্যতা, এসব কথা পড়াতে হবে আজকের ক্লাসে। কোয়ান্টাম তত্ত্ব। ফোটন কণিকার রহস্য ভেদ। বিজ্ঞানীরা যে ভাবে অগ্রসর হচ্ছেন তাতে বুঝি আর কোন রহস্যই অজানা থাকবে না। শীলা সেদিন খুব সহজেই ব্যাখ্যা করছিল খুব জটিল একটা জিনিস। প্রকৃতির নিয়মগুলো কিভাবে এত সুনিপুণ ভাবে পরিচালিত হচ্ছে ভেবে নিজের অজান্তেই নিজেকে সমর্পণ করেছিল প্রকৃতির কাছে। এই প্রকৃতিই হল বোধ, যার নিজের রয়েছে নিয়ন্ত্রণ করার অপার ক্ষমতা। যদি ধরে নেয়া যায় বিন্দুসম এক একটি আলোক কণা এক একটি বোধ, যাদের নিজেদেরই ক্ষমতা রয়েছে সিদ্ধান্ত গ্রহণের। ছাত্রদের মাঝ থেকে একটি প্রশ্ন এলো,

- যেমন?

শীলা বলল,

- একটি আলোক বিন্দু বহুদূর পথ পাড়ি দিয়ে এ পৃথিবীতে এসে পড়ছে। সেই সূর্যদেবতার আধারে জন্ম নিয়ে এই পথ পাড়ি দিয়েছে সে স্বীয় ইচ্ছায়। উদ্দেশ্য পৃথিবীতে যাবে। পৃথিবীর বুকে এসে এর তাপ, উষ্ণতা, আলো সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করবে। তাই স্বেচ্ছায় সে বরণ করেছে এই ভ্রমণ। চেষ্টা করবে পৃথিবীতে জীবনের স্পন্দন টিকিয়ে রাখতে। তার বোধ তাকে নিবেদিত করেছে এ লক্ষ্যে। তার এ অনুধাবন শক্তি এতটাই প্রখর যে সে জীবিতকে দান করে প্রাণ আর মৃতকে দান করে জীবন।

আবারো প্রশ্ন,

- সেই জীবন প্রদীপ নিভু নিভু এক দৃষ্টিহীন মানুষের কথা কি বলবেন, যাকে নিয়ে গবেষণার সূত্রপাত?

শীলা আগেও বলেছিল এ কথা তার ক্লাসে। লোকটি বেঁচে আছে তার চোখের অসাড় স্নায়ুগুলো নিয়ে দুই দশক ধরে। শীলা ভেবেছে ফোটন কণাগুলোর কথা। যদি তা হয় অফুরান প্রাণশক্তির আধার, তারাই কি পারে না এই মৃত স্নায়ুগুলোকে আবারো প্রাণবন্ত করে তুলতে? এ ভাবনা থেকেই যাত্রা শুরু ওর গবেষণার। প্রতিদিনই ঘন্টা দু’য়েক করে আলোক তরঙ্গ প্রবাহিত করে চোখের স্নায়ুগুলো পুনুরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করে যাচ্ছে ও। কারণ আলোক তরঙ্গ বহন করছে একটি নয়, দু’টি নয়, অজস্র আলোক কণিকা। তারা প্রত্যেকেই স্বতন্ত্র বোধে বলীয়ান। তারাই পারবে প্রাণহীন স্নায়ুকোষগুলো সজীব করে তুলতে।

এই ব্যাখ্যায় তার লেকচার হয়ে উঠেছিল আরো বিস্ময়ের। ছাত্রদের মাঝ থেকে একটি প্রশ্ন ছিল বেশ ভাল।

- ফোটন কণিকার, সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা বর্জন করে,নির্দিষ্ট পথ পরিভ্রমণের ক্ষমতা যদি থেকেই থাকে তাহলে আমরা এই আস্ত বড় বড় মানুষগুলো সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছি কেন?

২

ল্যাবে সবচেয়ে সপ্রতিভ সহকর্মীর নাম জিসান। চিন্তাগুলো তার খুব ধারালো। আজ তার প্রশ্নটা ছিল বড্ড অদ্ভুত। প্রশ্নের সাথে তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি মনে করিয়ে দেয় সে যেন সবকিছুই আগেভাগে জানে। গত মাসের রিসার্চের ফলাফল সম্বন্ধে ক্লাস লেকচারে সে এ নিয়ে অনেক কথা বলেছে। আজও জানতে চেয়েছে সেই অন্ধ লোকটির কথা। উত্তর দিতে গিয়ে শীলার শুধু মনে হয়েছে জিসান যেন এ রিসার্চের ফলাফলে অনেকটা আশাবাদী। জিসানের প্রশ্ন করার ভঙ্গী যেন উত্তরের প্রত্যাশায় নয় বরং ওকে যাচাই করার আশায়। মাঝে মাঝে ওর মনে হয় জিসান বুঝি মানুষ বেশধারী অন্য কোন জগত থেকে আসা আগুন্তুক, যারা কিনা সে জগতে অনেক বেশী প্রগতিশীল সভ্যতার ধারক। জিসান এ জগতে এ সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে তার সহকর্মী, তার গাইড। কিন্তু অন্য কোন জগতে হয়তো বা তার শিক্ষক। অন্তত জিসানের বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান দেখে শীলার অবচেতন মনে এটাই দৃঢ় বিশ্বাস হয়ে গেঁথে গেছে।


৩

এখন গ্রীষ্মের ছুটি এসে পড়েছে প্রায় দুই মাসের। এই সময়টুকু শুধুই ল্যাবের কাজটুকু সেরে নিতে পারবে। এই সময়ে ক্লাসের তাড়া নেই। নিজের জন্য যথেষ্ট সময় নিয়েই বাসা থেকে বেরুলো। গাড়ির দরজার কাছে এসে চাবিটা বের করতেই মনে হল চাবিটা তো আনা হয়নি। আসলে আজ সকালে হাতের ধাক্কায় চাবিটা টেবিলের ওপর থেকে নীচে পড়ে গিয়েছিল। আলসেমি করে তখন আর তুলে রাখা হয়নি। আবার তাই ফিরে এলো ঘরে। চাবি, মানিব্যাগ, কয়েন আর টুকটাক কাগজপত্রগুলো অফিস হতে এসে টেবিলের প্রান্তে রাখে। ঘর ঢুকে দেখল সব কিছু ঠিকঠাক আছে, জায়গা মতো, এমনকি পড়ে যাওয়া চাবিটাও হয়তোবা টেবিলের তলায়। কিন্তু নাহ্, নেই তো ওখানে। পায়ের ধাক্কায় পাশের সোফার নীচে চলে গেল নাকি? কিন্তু তাও তো না। শীলা বুঝে উঠতে পারেনা মাঝে মাঝে কিভাবে তার সামনে থেকে জিনিসগুলো উধাও হয়ে যায়। ওকি ভুলোমন হয়ে যাচ্ছে আজকাল? নাকি বিশ্বাস করে নেবে চাবিটা অন্য কোন ডাইমেনশানে স্থানান্তরিত হয়ে গেছে। ফেরত না আসা পর্যন্ত তাকে আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। এসব আজগুবি চিন্তা মাথায় নিয়ে হাত গুটিয়ে বসে থাকা তো সম্ভব নয়।অফিসে যেতে হবে। তারপর ল্যাব ওয়ার্ক। আর সময় নেই হাতে। ঝটপট একটা ট্যাক্সি ডেকে অফিসে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল।

৪

অন্ধ রোগীটি জন্ম থেকে অন্ধ নয়। সময়ের সাথে সাথে অন্ধত্বকে বরণ করে নিতে হয়েছে। নিয়তি। কিন্তু কদিন ধরে খেয়াল করছে ওর দৃষ্টির কিছুটা পরিবর্তন। কেউ সামনে দাঁড়ালে সে দেখতে পায় আবছা ছায়া। ডাক্তার, নার্সরা এতেই খুশী। তার স্নায়ুতে প্রেরিত আলোর কণাগুলো যেন এক একটা সৈনিক। আসাড় কোষগুলোকে উজ্জীবিত করার চেষ্টায় তারা সংগ্রামরত। সফল হতে পারলে এ চিকিৎসা যুগান্তকারী সাফল্য আনবে চিকিতসা বিজ্ঞানে। এসব ভাবতে ভাবতে শীলা করিডোরে মুখোমুখি হল জিসানের।

-কিভাবে এলে? জিসানের প্রশ্ন। যেন জেনেই বলছে আজ ওর চাবিটা খোয়া গেছে।

বেশ অবাক হয়েই শীলা বলল, গাড়িতে তো নয়, বাসে।

জিসানের দ্বিতীয় প্রশ্ন, চাবিটা কি হারিয়ে গেছে?

শীলা এবার হেসেই ফেললো। বললো,তুমি জানলে কিভাবে?

জিসান এবার বেশ স্থির গলায় বললো, তোমার রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে যাবে।

-তাই ভাব?

-না ভাবি না। এটাই নিয়ম।

-নিয়ম মানে?

-সব কিছুরই বোধ আছে এ জগতে। কম হোক আর বেশী হোক। এই বোধগুলো সকলেই তাদের নিয়ম পালন করতে চায়, দায়িত্ব সম্পূর্ণ করতে চায়। ব্যাতিক্রম শুধু তোমাদের গ্রহের মানুষগুলো।

এবার শীলার ধাক্কা খাবার জোগাড়।

-আমাদের গ্রহ মানে? এ গ্রহ কি তোমার নয় জিসান?

জিসান আর কোন কথা বললো না। আজ একটি বিশেষ দিন। আজ জিসান চলে যাবে অন্য কোথাও। এই স্পেইস-টাইম থেকে অন্য কোথাও। শীলাকে জানাবে না তা। ওর যে বড্ড মন খারাপ হবে। শীলার কাজ দেখার জন্যই জিসান এসেছিল এই স্পেইস-টাইমে । পৌছে দিয়েছিল একটি কি-ওয়ার্ড ওর মনোজগতে।

বোধ। 

যা থেকে পরবর্তীতে শীলার এ গবেষণার শুরু। এই শুরু একদিন এ গ্রহের মানুষদের অমরত্ব দান করবে।জিসানের দায়িত্বটুকু তাই আজ শেষ। এখনই ওর যাবার সময়, এখান হতে অনেক দূরে।

৫

সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত প্রায়। ল্যাব থেকে বেরিয়ে বাড়ি অভিমুখে রওনা দিল শীলা।বেশ ক্লান্ত সারাদিনের পর। ঘরে এসে আলো জ্বালালো। প্রথমেই চোখে পড়লো গাড়ির চাবিটা। কেউ যেন সযত্নে রেখে গেছে টেবিলের ওপরে। হঠাতই ফোন বেজে উঠলো। এত রাতে! আলসেমি লাগছে খুব, তাই ফোনটা ধরলো না। মেসেজ মেশিনে চলে গেছে ইনকামিং কল। জিসানের কন্ঠস্বর।

-ভাল থেকো শীলা।চাবিটা খুঁজে পেয়েছ এতক্ষণে? কাল আর ঝামেলা হবে না ল্যাবে আসতে। আমি যদিও কাল হতে ল্যাবে আর আসবোনা। আমার যে যেতে হবে এবার। লং ট্যুরে।

........

মন্ট্রিয়ল

০৪.০৪.০৯


Saturday, March 14, 2009

ছন্দে পতন


১

সায়েম ওর স্পেসশিপ নিয়ে সারাদিন ঘুরে বেড়িয়েছে। বেড়াতে ওর খুব ভাল লাগে। সময় পেলেই কাজের ফাঁকে ফাঁকে চলে যায় গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে,গ্যালাক্সী থেকে গ্যালাক্সীতে।মহাশূন্য ভ্রমণকালে একবার হঠাত করেই মিল্কিওয়ে ছায়াপথে তার প্রবেশ। তারপর একবার নয় বেশ কয়েকবারই এসেছে সে এখানে। যে গ্যালাক্সী থেকে সে এসেছে তার নাম সানফ্লাওয়ার গ্যালাক্সী।তার বাসস্থান থেকে পৃথিবী নামক গ্রহের দূরত্ব ৩৫ মিলিয়ন আলোকবর্ষ মাত্র। সূর্যমুখী ফুলের মত দেখতে বলেই গ্যালাক্সীটির এরূপ নামকরণ। পৃথিবীতে এর আরো একটি নাম রয়েছে আর তা হলো M63।এর সর্পিলাকার বাহুগুলো কেন্দ্রের সাথে শক্তভাবে যুক্ত। মিল্কিওয়ের মতো এর বিশাল বপু নেই। ব্যাস মাত্র ৬০ লক্ষ আলোকবর্ষ,মিল্কিওয়ে থেকে ৪০ লক্ষ আলোকবর্ষ কম বলেই মাত্র দশ বিলিয়ন নক্ষত্র নিয়ে মহাকাশে তার অবস্থান।

পৃথিবী গ্রহটি কেমন সায়েম প্রথমদিকে তেমন বিশেষ কিছু জানতনা। ঘুরতে ঘুরতে এই ছায়াপথের কত না নক্ষত্রের এ পাশ ওপাশ পেরিয়ে এ সৌরজগতে সেদিন তার প্রথম প্রবেশ। এর আনাচে কানাচে ঘুরে যেই না চলে যাবে বলে সিদ্ধান্ত নিল হঠাতই চোখে পড়লো সবুজ শ্যামলিমার এক বনভূমি। 

কি ওটা? 

সায়েম বুঝেনি যে, সে এই দূর আকাশ থেকে পৃথিবীর বুকের ঘন আমাজন জঙ্গলটা দেখতে পাচ্ছে। উৎসুক দৃষ্টিতে চেয়েছিল। কি যে সুন্দর লাগছে । একবার গেলে কেমন হয়? যেই ভাবা সেই কাজ। প্রবেশ করলো পৃথিবীর বায়ুমন্ডলে। যতই গ্রহটির কাছে আসছে, ততই সুন্দর লাগছে। সবুজ ছোপ ছোপ জঙ্গল, মাঝে মাঝে নীল নীল সাগর মহাসাগর মন মাতানো দৃশ্য তৈরী করেছে বটে। কিন্তু আজ হাতে তেমন সময় নেই।অফিসে প্রচুর কাজ পড়ে আছে। ফিরে যেতে হবে তার নিজ গ্রহে। দ্রুত দিক পরিবর্তন করে ফিরে এলো মিল্কিওয়ে গ্যালক্সীর একদম বাইরে। মিনিট পাঁচেকের ভ্রমণ। তারপরেই তার আবাসস্থল। কিন্তু সারাদিনই ভেবেছে পৃথিবীকে নিয়ে।। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি বলা চলে একে। আবারো ওখানে যাবে, কাল না হয় পরশু।

পরদিন খুব সকালে বের হলো বাসা থেকে। এবার তার স্পেশসিপের দিক মিল্কিওয়ের দিকে। তথ্যও পেয়েছে অনেক। স্পাইরাল আকারের এই গ্যালাক্সীটির ব্যাসার্ধ ১ লক্ষ আলোক বর্ষ। ২০০ থেকে ৪০০ মিলিয়ন নক্ষত্রের সমাহার এতে। আমাদের সৌরজগতের মাঝে প্রবেশ করতেই সায়েম লক্ষ্য করলো পাশ দিয়ে শনির বলয় আর বৃহস্পতির বিশাল বপু। একটু এগুলে হালকা গোলাপী রঙের মঙ্গলের আকাশ। আর তারপরেই পৃথিবীর নীল আকাশ। ঐতো সেই ঘন সবুজ আমাজনের জঙ্গল। এবার স্পেসশীপটা একটু নীচু করে চালালে আরো ভাল করে দেখা যাবে পৃথিবীকে। চমতকার সব পর্বতশৃঙ্গ।সায়েমদের মত মানুষ সদৃশ কেউ কি আছে এ গ্রহে?

খোঁজ করলে পেতেও পারে।তারা কি প্রযুক্তির দিক দিয়ে খুব উন্নত? এতগুল প্রশ্ন মনে ভীড় করেছে একসঙ্গে।জানার ইচ্ছের শেষ নেই। কিন্তু কিভাবে জানবে? মন্দ হয়না যদি স্পেসশিপটা কোথাও পার্ক করে পৃথিবীর বুকে কিছুক্ষণ বিচরণ করে ওদের সকল তথ্যগুলো জানা যায়। সভ্যতার কত সাল অতিক্রম করছে তা জানা গেলেও ধারণা পাওয়া যাবে। চলার পথে লক্ষ্য করলো পৃথিবীর আবহাওয়া তার গতিপথে বাধা সৃষ্টি করছে না। এঁকে বেঁকে সায়েম এগিয়ে চলছে পৃথিবীর আকাশ পথে।

বাহ্,ওদের কিছু উড়োজাহাজ আছে দেখছি। বেশ শব্দ করে চলে তারা। ওড়ার লক্ষণ দেখে মনে হচ্ছে তারা সায়েমকে দেখতে পাচ্ছে না। সুতরাং ওকে বেশ সাবধান থাকতে হবে। এঁকে বেঁকে চলার মাঝে যে আনন্দ তাতে ছন্দপতন সে একেবারেই চায় না। কারো সাথে ধাক্কা লেগে গেলে নির্ঘাত অ্যাকসিডেন্ট। ওর ক্ষতির সম্ভবনা কম কারণ ওর শিপ হালকা হলেও মজবুত এবং টেকসই। এ প্রযুক্তি ব্যবহার করতে বুঝা যাচ্ছে আরো একশত বছর সময় লাগবে এখানকার বাসিন্দাদের। ওরা ন্যানো প্রযুক্তির বোধহয় খুব প্রারম্ভে!

সায়েম মাটি থেকে এখন মাত্র কয়েক ফিট উপরে। বেশ স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে ব্লক ব্লক ঘরবাড়ি, রাস্তায় স্রোতের মত মানুষ। কিছু দূর এগুতেই অনিচ্ছাকৃত ধাক্কা লেগে গেল ফ্যান মিলের ব্লেডের সাথে। এত শব্দ হল কেন? ব্লেডের সাথে আঘাত লাগায় কিছুটা বিমর্ষ হয়ে সিদ্ধান্ত নিল আজ আর নয় এখানে, ফিরে যাবে এখনই এই মুহূর্তে।

২

মিসেস ক্লিফোর্ড তখনও কিছু টের পাননি। সায়েম চলে যাওয়ার ঘন্টা দু’য়েক পরের কথা। শহর থেকে খাবার কিনে বাড়ি ফিরছেলেন মিসেস ক্লিফোর্ড। উনি শহর থেকে দূরে একটি ছোট্ট গ্রামে নিরিবিলি থাকতে অভ্যস্ত। সপ্তাহান্তে বাজার করতে শহরে যান। ওনার গ্রামটি পাহাড়ের ঠিক পাদদেশে। সুইজারল্যান্ডের পাহাড়ী ভূ-প্রকৃতি খুবই মনোরম। ঐ উঁচু জায়গায় তিনি বাড়ির বৈদ্যুতিক শক্তি সরবরাহের জন্য ১২০ ফুট উচুঁতে উইন্ডমিল স্থাপন করেছেন।এরই একটি ফ্যানের ব্লেড ভেঙে যাওয়াতে আজ মিসেস ক্লিফোর্ড তার বাড়ীর আলোহীন দশা দেখে হতবাক। ঝড়ের গতি সইবার মতন করেই ফ্যানের ব্লেডগুলো বানানো। আজকের আবহাওয়া ও চমতকার। তাহলে কি এমন উড়ে এসে পড়লো আর ব্লেডটি ভেগে গেল তা ঠিক বুঝে উঠতে পারলেন না মিসেস ক্লিফোর্ড ।আজ রাতটুকু তাকে অন্ধকারেই কাটাতে হবে। ছেলেকে জানিয়েছেন ইতিমধ্যে। যা করবার কাল সকালে হবে।

৩

সায়েম এবারের সপ্তাহান্তে আবারো ঠিক করলো পৃথিবীকে দেখতে যাবে।এবার ও এমন একটা স্পেসশীপ নেবে যা পৃথিবীর র্যা ডারে ধরা পড়ে। মজাই হবে এবার। এমন একজন আগুন্তককে দেখে ওদের বেশ অবাক লাগবে বোধহয়। এসব ভাবতে ভাবতেই সায়েম তার খুব প্রিয় সাদা রূপালী প্রলেপের স্পেসশীপটা নিয়ে বেরিয়ে পড়লো। এই ক্রাফটি গোলাকার চাকতির মতোন দেখতে। ভিতরে তার প্রিয় রিডিং রুমও আছে।

পৃথিবীর আকাশে পৌঁছে দেখতে পেল নীচে একটা খোলা মাঠ। ওখানে নেমে আশপাশটা খেয়াল করতে চোখে পড়লো একটু কাছেই গাছ গাছালীতে ঘেরা সুন্দর একটা বাড়ি। বাড়ির জানালা ভেদ করে ছোট্ট একটি শিশুর অবাক করা দৃষ্টি ঠিক তার ওপর। কাছে যেয়ে জিজ্ঞেস করবে নাকি কেমন আছ? তাই করো। ততক্ষণাত শিশুটি দৌড়ে কোথায় যেন চলে গেল। হায়রে অর্বাচীন, ভয় পেয়েছে বোধহয়।

মিস্টার ও মিসেস হ্যারিসন নর্থ ক্যারলিনার এই উপশহরে বসবাস করে আসছেন বছর দশেক ধরে। এখানেই তাদের একমাত্র সন্তান হ্যারির জন্ম। বছর তিনেক আগে স্কুলে ভর্তি হয়েছে সে। এখন থার্ড গ্রেডে। এই ৮ বছর বয়সেই তার ছোট্ট পৃথিবীর আনাচে কানাচে তার চেনা।কিন্তু আজকের এই বিশাল গোলাকার আকাশযানটির নিঃশব্দ অবতরণ এবং ঠিক তার জানালার পাশে-এ যেন তার কাছে অবিশ্বাস্য এবং অচেনা। ও খেলতে খেলতেই খেয়াল করেছে স্পেসশীপটি । গুটিগুটি করে এগিয়ে গেছে জানলার কাছে। এত্ত বড় স্পেসক্র্যাফটি এত নিঃশব্দে চলে কি করে? কিছুই বুঝতে পারছে না হ্যারি। নীচের তলার লিভিং রুমের পাশের জানালায় কে যেন এসে দাঁড়িয়েছে। ওই ক্র্যাফট থেকেই সম্ভবত বের হয়ে এসেছেন তিনি। ভয়ে হ্যারি চলে এলো দোতলার টিভি রুমে বাবা মায়ের কাছে। হ্যারির ভীতসন্ত্রস্ত বর্ণনায় ওনারা কিছুই বুঝলেন না। বাচ্চাদের কল্পনাপ্রবণ মন কত কিছুই না ভাবে। হ্যারিকে ঘুম পাড়িয়ে লেইট নাইটের নিউজ দেখে হ্যারিসন দম্পতি ঘুমানোর প্রস্তুতি নিতে গেলেন। টিভিটা খোলাই ছিল। হঠাত একটি বিশেষ খবর দুই লাইনে স্ক্রিনের পর্দায় ভেসে উঠলো। খবরটা বেশ চমকপ্রদও। আজ সন্ধ্যা ৭ টায় তাদের শহরের আকাশে গোলাকার রূপালী সাদা আভা ছড়ানো একটি শব্দহীন উড়ন্ত বস্তু দেখা গেছে। শহরের পূর্বদিকের এয়ারফোর্স বেইজের র্যা ডার পর্যবেক্ষণ দলটিও যেন ছোট্ট হ্যারির মত মন গড়া ইউ এফ ও দেখা শুরু করেছে- ভেবে বেশ মজাই পেলেন তারা। ভাবলেন কল্পলোকে ভেসে যেতে কার না ইচ্ছে করে!

৪

নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে হেমন্তের মেঘমুক্ত আকাশে নর্থ ক্যারোলিনার এই ছোট্ট গ্রামে ছোট বড় সকলেই ঘুড়ি খেলায় মত্ত থাকে ।প্রতিযোগীতার সময়ে আকাশ ছেয়ে যায় অজস্র ঘুড়িতে। সে সময়ে সায়েমের স্পেস্ক্র্যাফট চালানো তার সাবলীল গতি হারিয়ে ফেলে। চলার ছন্দে পতন অনুভব করে। তবুও সায়েম সাবধান থাকে ঘুড়িগুলো রক্ষা করার জন্য-মাঝে মাঝে দু একটা দুষ্টুমি করা ছাড়া।

আজ  একটা লাল ঘুড়ি বেশ উপরে উঠেছে। সুতোটা কেটে দিতে ইচ্ছে হল খুব । যার ঘুড়ি তার না হয় একটু খারাপ লাগবে। কিন্তু খালি আকাশে ঘুড়ির সুতো কাটার রহস্য কখনো কি টের পাবে?

জ্যাকের হাতের মাপটা ভীষণ ভাল। সুতোর টান আর বাতাসের গতির সাথে তাল মিলিয়ে ওর ঘুড়ি ওড়ানো এতই নিখুঁত হয় যে,ঘুড়িটা তার চোখের সীমানা পেরিয়ে কোথায় যেন হারিয়ে গিয়ে আবার ফিরে 

আসে। কিন্তু আজ কেন এর ব্যতিক্রম হচ্ছে ও বুঝতে পারছে না। সেই যে দূর আকাশে ঘুড়িটা উড়ে গেছে,আজ আর তা ফিরে আসার নামও নেই। জ্যাকের হঠাতই মনে হল শক্ত কিছুর সাথে যেন আটকে গেছে তার ঘুড়ি। মেঘমুক্ত নীল আকাশে তেমন কিছু চোখেও পড়ছে না।অত্ত দূরে দেখাও কঠিন কিন্তু আটকে যাবার টান আজ সে ঠিকই অনুভুব করেছে। বন্ধুদের বলেও লাভ নেই এই কথা, বাবা মাকে বলেও না।কেউই মানবে না জ্যাকের কথা। ঘুড়ি তো হারিয়ে যেতেই পারে তাই বলে অদৃশ্য স্পেস্ক্র্যাফটের সাথে ঘুড়ির সুতো আটকে যাবে নাকি?

কিন্তু আজ ঠিক তাই-ই হলো। লাল ঘুড়িটা আজ সায়েমের দখলে। আর কাটা সুতোই শেষমেশ জ্যাকের প্রাপ্তি । সান্ত্বনা দিয়ে ভাবলো ঘুড়ি না হারালে কি ঘুড়ি খেলা নেশা ধরাতে পারে?

৫

সায়েমের সহপাঠী রবিন পুরোপুরি উশৃঙ্খল। যখন যা মন চায় তাই করে বেড়ানো তার স্বভাব। ও যেন সায়েমেরই বিপরীত রূপ –এক অনাহুত –সায়েমের অ্যান্টি ইউনিভার্স থেকে।রবিনের বাবা মায়ের আদি নিবাস পিন–হুইল গ্যলাক্সি M33 তে।এর ব্যাসার্ধ ২৫ হাজার আলোকবর্ষ। অ্যান্ড্রমিডা থেকে আরোও অর্ধ মিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে অর্থাৎ পৃথিবী থেকে ৩ মিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে এর অবস্থান। ওখান থেকে এসে তারা বসতি স্থাপন করেছেন সানফ্লাওয়ারে। রবিনের জন্মও এখানে। কিন্তু পিন–হুইলে প্রায়ই সে বেড়াতে যায়। মিল্কিওয়ের কথা সে জেনেছে সায়েমের কাছ থেকে। আর তারপর থেকেই পৃথিবীতে তার আগমন।

সেদিন পৃথিবীর আকাশ ছেড়ে বাড়ি ফিরবার সময়ে রবিনের স্পেসক্রাফটের সাথে তার ছোটখাটো একটা যুদ্ধই বেঁধে গেল। কারণ খুব সামান্য। সায়েম চায়নি রবিন তার পেনসিল টর্চের আলো ফেলে, যখন তখন পৃথিবীর আকাশে বিদ্যুতের চমক সৃষ্ট করুক। ঝড় বাদল নেই এমন আবহাওয়ায় পৃথিবীর মানুষগুলো যথাসম্ভব চেষ্টা করে বাড়ির বাইরের কাজগুলো সেরে ফেলতে। আর অমন সময়ে রবিনের টর্চ লাইটের হাজার ভোল্টের বিদ্যুত চমক গত বছরই জ্যাকির বাবাকে পঙ্গু করে ফেলেছে। প্রাণহানি হবারও সম্ভবনা থাকে বিদ্যুত চমকে। বয়েজ স্কাউটের সেই ১১ জন স্কাউট গতবছরই ক্যম্পিং এর সময়ে ভর দুপুরে বিদ্যুত চমকে নিহত হয়েছে শুধুমাত্র রবিনের কারণে। ক্যালিফোর্নিয়ায় যখন তখন দাবানলে পুড়ে ছারখার হয়ে পড়ে লক্ষ লক্ষ একর জমি শুধু মাত্র রবিনের একটা পেন্সিল টর্চের আলোতে।কিন্তু কেন এসব খেলা রবিনের ভাল লাগে তা সায়েম বুঝে উঠতে পারেনা।

তখন সময় ২০০৬ সাল। 

টেক্সাসের সীমানা বরাবর দাবানলের প্রজ্জ্বলিত শিখা টেক্সাসের ম্যাপকে রাতের অন্ধকারে প্রকট করে তুলেছিল। যেন পুরো ম্যাপের সীমানা ধরে জ্বলছে মশাল মিছিল। রবিন সে সময়কার অনেকগুলো স্ক্রিনশট নিয়ে রেখেছিল। তারও তিনবছর পর অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে প্রায় ২০০ লোকের প্রাণহানি ঘটেছে। দাবানলের আগুন ধেয়ে এসেছিল জনপদে। মানুষগুলো কিভাবে বিচলিত হচ্ছিল দেখে রবিন হেসে বলে ফেলেছিল ‘পুওর আর্থ ক্রিয়েচার!’

এই গ্রহের বিজ্ঞানীদের ধারণা গ্রীষ্মের প্রচন্ড দাবদাহ শুষ্ক বনাঞ্চলে এই বিপর্যয় সৃষ্টি করে। আরও বহু ব্যাখ্যা তাদের ঝুলিতে সবসময়ই মজুদ থাকে। কিন্তু তারা ভাবতেও পারেনা সানফ্লাওয়ার গ্যালাক্সি থেকে আগত রবিনের কীর্তিকলাপের কথা। যার নীরব সাক্ষী শুধু সায়েম।

রবিনের সাথে সায়েমের ছোটখাটো যুদ্ধ বেঁধে যাওয়ার সময় অ্যারিজোনার এয়ারফোর্স বেইজের রাডারে তা ধরা পড়ে গেল। সাথে সাথেই ওদের কিছু যুদ্ধ জাহাজ আকাশে অবস্থান গ্রহন করলো। সময় সকাল আটটা হবে। ইউ এফ ও দুটির যুদ্ধ দেখতে পেলেও পৃথিবীর ফাইটার জেটের চালকরা লক্ষ্য করলো একটি নির্দিষ্ট সীমারেখা অতিক্রম করে তারা কিছুতেই ইউ এফ ও-র কাছ ঘেষঁতে পারছে না। যেন এক অজানা শক্তি বলয় ঘিরে রেখেছে ইউ এফ ও দুটির চারিধার।সেদিনই রবিন শেষবারের মতো জানিয়ে দিল সায়েমকে, সে আরো কিছু করবে এ পৃথিবীতে যা সায়েমের কখনোই পছন্দ হবে না।

ও যেন দিনদিন বেপরোয়া হয়ে উঠছে। তাই সায়েমের সাথে যুদ্ধ থামিয়ে রওনা দিল নিউইয়র্কের আকাশে ।

৬

নিউইয়র্কের বাফেলো শহরের বিমানবন্দরটি পৃথিবীর ব্যস্ততম বিমানবন্দর। রবিন কিছুদূর এসেই লক্ষ্য করলো প্রায় ৪০/৫০ জন যাত্রীর কন্টিনেন্টাল এয়ারক্রাফট-৩০৩৭ অবতরণের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

একটা ধাক্কা।

নিমেষে প্লেনট ভূপাতিত হলো।সব মিলিয়ে পাঁচ সেকেন্ড হবে। যাত্রীরা কিছু বুঝে উঠবার আগেই প্রচন্ড বেগে কন্টিনেন্টাল এয়ারক্রাফট-৩০৩৭ বাফেলো শহরের একটি বাড়ীর ছাদে চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে গেল। সময়টা পৃথিবীর মানুষের কাছে ১৩ ই ফেব্রুয়ারি, ২০০৯. সেইদিনের কন্ট্রোল টাওয়ারটির সাথে প্লেনটির অতর্কিত সংযোগ বিচ্ছিন্ন হবার কারণ আজও  তাই রহস্যজনক।

৭

পৃথিবীর মহাকাশ গবেষকরা বহুদিনের সাধনায় মঙ্গল গ্রহে তাদের চালিত রোবটটি থেকে বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করে আসছে বছর পাঁচেক ধরে। ল্যান্ড রোভার, মঙ্গলের পাথুরে ভূ-অঞ্চল, জলপ্রবাহের ছাপ বিশিষ্ট শুকিয়ে যাওয়া নদীপথ,পিরামিড সদৃশ বিভিন্ন স্থাপনার চিত্র পাঠাতে শুরু করেছে ২০০০ সালের গোড়ার দিক থেকে। এই ল্যান্ড রোভারের সাথে পৃথবীর যোগাযোগ ব্যবস্থা এতটাই সুনিপুণ যে বিজ্ঞানীরা গর্বিত তাদের গবেষণায় অর্জিত সাফল্যে। কিন্ত এতটা এগিয়ে যাওয়া গবেষণাকে থমকে দেয়া রবিনের জন্য কোন ব্যাপারই না। আর কাজটা সে করে বসলো ঝোঁকের মাথায়। তারিখ পৃথিবীর সময় অনুযায়ী ২০০৯ এর জানুয়ারীর শেষ সপ্তাহ হবে। নতুন প্রেসিডেন্ট আমেরিকায় শপথ নিয়েছেন। তার কিছুদিন পরই বিজ্ঞনীরা লক্ষ্য করলেন মঙ্গলের ল্যান্ড রোভার তাদের সাথে সকল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করেছে। শত চেষ্টায়ও যোগাযোগ স্থাপন সম্ভব হচ্ছেনা। পৃথিবীর কোন সংকেতই যেন সে সঠিকভাবে অনুধাবন করতে পারছে না। কোন অজানা কারণে তার অবস্থাগত পার্থক্যের দরুণ কর্মসম্পাদন বিঘ্নিত হচ্ছে কি না এরকম হাজারো প্রশ্ন বিজ্ঞানীদের মনে ঘুরপাক খেলেও রবিনের দুষ্টুমি তাদেরকে চরম বিপদে ফেলে দিয়েছে। এতদিনের পরিশ্রম সাধনা যেন কোন কারণ ছাড়াই সমাপ্ত হয়ে গেল। তারা জানলেনও না রবিন মাত্র ৫৬ হজার আলোকবর্ষ দূরের প্রতিবেশী। ও একটু নয়, বেশ কিছুটা বেপরোয়া বলে সামনে তাদের কাজে আরো বিপত্তি অপেক্ষা করছে।

৮

ফেব্রুয়ারি ১৫, ২০০৯

সকালে ঘুম থেকে উঠে যে খবরটা সকলের চোখে পড়লো তা ভয়ানক। অতলান্তিক মহাসাগরের নীচে ব্রিটিশ ও ফ্রান্সের সাবমেরিনের অতর্কিত সংঘর্ষে সবমেরিনে সংরক্ষিত নিউক্লিয়ার বোমার বিস্ফারণ। সাগরতলে প্রলয়লীলার আশংকা। সাবমেরিন দুটির সকল ক্রুসহ সে অঞ্চলের কোন প্রানীর বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে সবকিছু।

খবরটা সায়েমের ভাল লাগেনি।এমন একটা ঘটনা সত্যিই দুঃখজনক। কিন্তু ঘটনাটা যখন ঘটেছিল, রবিন তখন কোথায় ছিল? রবিনকে বেশ কিছুদিন ধরেই দেখছে না সায়েম। সেদিনের বিবাদের পর রবিন যেন নিরুদ্দেশ। কোথায় কোন অঘটন ঘটাচ্ছে কিনা কে জানে।যেকোন দুঃসংবাদে সায়েমের মন যটটা খারাপ হয় রবিন যেন ততটুকুই আনন্দিত হয়। কিন্তু কেন এমন হবে? সব ভালোর সাথে কি সমান রকমের খারাপও থাকতে হবে? খারাপের অস্তিত্ব প্রকৃতিতে না থাকলে কি হতোনা? সমস্যা যেটা হতো তা হল ভালোর সংজ্ঞা নির্ণায়ন সম্ভবপর হতোনা। আর এই বিপরীত দুই বৈশিষ্ট্যই দুটি অস্তিত্বের জন্ম দিয়েছে। একজন সায়েম,আরেকজন রবিন।

রবিন কেন পারেনি সেই কাজ থেকে নিজেকে বিরত রাখতে যেদিন সে সাইবেরিয়ার আকাশের ৫০০ মাইল উপরে কসমস আর ইরিডিয়াম স্যাটেলাইট দুটোর সংঘর্ষ বাঁধালো? পৃথিবীর তারিখ ফেব্রুয়ারি ৭, ২০০৯, জিএমটি সময় ১৬টা ৫৫ মিনিট। হঠাতই পৃথিবীতে সংবাদ এলো সংঘর্ষের।প্রায় ৯০০ কেজি ওজনের রাশান মিলিটারি স্যাটেলাইট কসমস ভেঙে গুড়োগুড়ো হয়ে গিয়েছে ৫৬০ কেজি ওজনের ইউএস স্যাটেলাইট ইরিডিয়ামের সাথে ধাক্কা লেগে। দূর আকাশে থেকে পৃথিবীকে যেন স্পষ্ট ভাবে দেখা যাচ্ছেনা। পৃথিবীর চিত্র যেন আবৃত হয়ে আছে স্যাটেলাইটের অসংখ্য খন্ড খন্ড কণা দিয়ে। হয়তোবা গুড়ো গুড়ো অংশগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়বে এ গ্রহে ইতস্তত ভাবে।১৯৫৭ সালে রাশিয়া যখন স্পুতনিক-১ উত্থাপন করলো তারপর হতে ২০০০ সাল পর্যন্ত ২৬৭১টি স্যাটেলাইট উত্থিত হয়েছে। আর এ সময়ের মধ্যে প্রায় ১৭০০০ বস্তুর খন্ডাংশ বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন সময়ে এসে পড়েছে। তবে ইউএস সারিভিয়্যালান্স মিশনের বরাতে যেটুকু আশার বাণী শুনা যায় তা হলো, পৃথিবীর বায়ুমন্ডলে প্রবেশের সাথে সাথে সেই খন্ডাংশটুকু প্রজ্জ্বলিত হয়ে শেষ হয়ে যায় অথবা সাগরে পড়ে সাগরের জলে হারিয়ে যায়। অতিপ্রাকৃত এসব ঘটনায় এই গ্রহের মানুষগুলো আতঙ্কিত হয়ে পড়লেও ভীন গ্রহ থেকে আসা রবিনের কাজের ছন্দপতন কখনই ঘটে না।

……

মার্চ,২০০৯

মন্ট্রিয়ল

Thursday, August 31, 2006

সুমনার কথা

 

১

সুমনা চিন্তিত। একটু নয়, বেশ খানিকটা। কি ভাবে বলবে  কথাটা ও সৌমেনকে ঠিক  বুঝে উঠতে পারছে না। সৌমেন ওর এত দিনের চেনা এত কাছের। গত ছ’বছর ধরে দু’জনে দু’জনার। এর মাঝে কেন সুমনা সত্যিটুকু আড়াল করে রেখেছিল? বুঝাতে পারবে না ও সৌমেনকে। সুমনা বুঝাতে পারবে না যে এই ছয়টি বছর ওর কাছে ছ’ সেকেন্ড ও নয়। সুমনার অবস্থাটা সৌমেনের তুলনায় যে একটু আলাদা। ওর আগমন যে অন্য এক জগৎ থেকে। মহাবিশ্ব ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ করেই পৃথিবী নামক গ্রহে এসে পড়েছিল সুমনা  পৃথিবীর সময়ের ২০০০ সালে। মহাবিশ্ব পরিভ্রমণের প্রাক্কালে মানব রূপে নয় বরং আলোকজ্জ্বল শক্তিরূপে সে ধাবিত হচ্ছে। মানব দেহের আবদ্ধ খোলস ফেলে ও যখন ভ্রমণ শুরু করে, এই বন্ধনহীন ভ্রমণ আর প্রচন্ড গতিতে চলাচল ওর জন্য কোন বাধাই সৃষ্টি করে না। স্বাধীন, মুক্ত ভাবে ও ঘুরে বেড়াতে পারে। কিন্তু গতি বেশী থাকায়  সময়ের তেমন হিসেব সে আর খুঁজে পায় না। ও টাইম ডায়ালেশনের শিকার। অতি কষ্টে যদি এক এক করে তার ছয় সেকেন্ড ও পার হয়, তাও যেন তার কাছে অনন্ত কাল মনে হয়। কিন্তু পৃথিবী ঘুরে দেখবার জন্য তো এত্ত সময়ের দরকার নেই। এবার তাই সুমনার গন্তব্য অন্য কোন গ্যালাক্সীর কোন এক সৌরজগতের কোন একটি গ্রহে।

সৌমেন সুমনার তুলনায় অপেক্ষাকৃত ধীর গতি সম্পন্ন। তাই টাইম ডায়ালেশন -এর  বালাই নেই ওর কাছে। প্রতিটি মুহূর্ত  দিয়েই ওর সময়ের কাল গড়া, ও  ধাবিত হচ্ছে শুধুমাত্র ভবিষ্যতের দিকে। উলটৌ দিকে নয়। অর্থাৎ  সৌমেন যে পৃথিবী নামক গ্রহের বাসিন্দা সে স্থানে সময়ের পিঠে চড়ে ওরা শুধু ভবিষ্যতের দিকেই এগোয়। ফিরে যেতে পারেনা তাদের অতীতে। তাই অতীত তাদের কাছে শুধুই ফেলে আসা। প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতার কারণেই সৌমেনদের এরকমটি অবস্থা। সুমনারা অমন নয়। সময়ের দিক থেকে তথা প্রযুক্তির দিক থেকে সৌমেনদের থেকে প্রায় দশ হাজার বছর এগিয়ে আছে সুমনাদের জগতের মানুষেরা। ওরা এতটাই উন্নত যে  শুধু পদার্থগত রূপে নয়, শক্তিরূপেও তারা নিজেদের উপস্থাপনায় সক্ষম। সময়ের বাহনে চড়ে ওরা ঘুরে বেড়াতে পারে অতীতে, বর্তমানে, ভবিষ্যতে। এমনকি একই মুহূর্তে অবস্থান করতে পারে তিন কালে। সুমনারা খেলার ছলে ঘুরে বেড়াতে পারে তাদের বাল্যকালে, কৈশোরে, বার্ধক্যে। তাই  তো ওদের মহাপ্রয়াণ বলে কিছু যেন নেই। পৃথিবীর মানুষগুলোর আছে। ঘটনাটিকে ওরা মৃত্যু বলে অভিহিত করে। মনে করে মৃত্যু মানে সমাপ্তি। জীবনের সমাপ্তি। মানুষটি যে বস্তুরূপ হতে শক্তিরূপ লাভ করলো, তা এ পৃথিবীর মানুষ বুঝতে বড়ই নারাজ। বলেও লাভ নেই।  সুমনা জানে, দেহ হতে আত্মার বন্ধনহীন মুক্তিই এনে দিতে পারে মহাবিশ্ব পরিভ্রমণের অপার স্বাধীনতা। কিন্তু এই বন্ধনহীন মুক্তি সৌমেনেদের কাছে যেহেতু ’মৃত্যু’ নামে পরিচিত তাই যখনই কোন শক্তির বিশাল ধাক্কায় দেহ হতে আত্মার মুক্তি ঘটে অমনি সৌমেনরা কেঁদে কেঁটে অস্থির হয়ে পড়ে। ব্যাখ্যা  করে, সচল হৃদপিন্ডের অচলতায় মানুষটির মৃত্যু হয়েছে। উনি ইহলোক ত্যাগ করেছেন, আর ফিরে আসবেন না ওদের কাছে। যদিই বা আসেন তবে তাকে ভূত বলে গণ্য করা হবে। এসব কারণেই সেই  তথাকথিত মৃত ব্যক্তিটি  ইচ্ছে থাকলেও আর ফিরে আসতে পারেন না এই ধরণীতে তার আপনজনের মাঝে। ঘুরে বেড়ান, ওদের মাঝেই অদৃশ্য হয়ে। সুমনা তাই শুধু অবলোকন করে কিছু বলে না। আবারো পুরোনো কথায় ফিরে যেতে হয়, সৌমেনদের সময়টায় ওরা জ্ঞানে বিজ্ঞানে একেবারেই  প্রারম্ভিক পর্যায়ে।  

২ 

সময় ২০০০ সাল, ৩১ শে অগাস্ট। সৌমেন সদ্য কলেজে ভর্তি  হয়েছে। আজ কলেজের প্রথম দিন। আড়াই লক্ষ আলোকবর্ষ দূরের অ্যান্ড্রমিডা গ্যালাক্সী থেকে আগমন ঘটেছে সুমনার।  সাথে আরো দু’জন সঙ্গী।  বাবা, মা আর সন্তানের রূপে বসবাস শুরু করেছে সৌমেনের শহরে। সুমনা কিছুটা শান্ত, মেধাবী, অমায়িক। ওর বাবা, মা দু’জনেই আর্টিস্ট। কলেজের প্রথম দিনে আজ সুমনাই ওর বন্ধু হয়ে গেল । তারপর কলেজের দুইটি বছরের এই স্বপ্নময় দিনগুলো দ্রুতই শেষ হয়ে যায়। তারপর  ইউনিভার্সিটির চারটি বছর। দারুণ মজা, অসম্ভব সব আনন্দ। সুমনা যে সবসময়  ওরই সাথে এই ছয়টি বছর। কিন্তু প্রচন্ড গতিতে ধাবমান বলে সময় যেন সুমনার কাছে এগুতে চায় না। সময়ের অনুভবতা ধীর হয়ে পড়ে, শুরু হয় টাইম ডায়ালেশন। তাই সৌমেনের কাছে একটি  বছর যেমন ৩৬৫ দিনের ২৪ ঘন্টার ৩৬০০ সেকেন্ডের সমাহার, সুমনার  কাছে তা ধীর অনুভূত হয়ে পরিণত হয় মাত্র এক সেকেন্ডে।  পৃথিবীর সময়ের সৌমেনের ৬ টি বছর আজ  সুমনার সময়ের কাছে  হয়ে আছে ৬ টি সেকেন্ড। আর প্রচন্ড গতি সম্পন্ন বলেই এই পৃথিবী দেখবার জন্য   ৬ টি সেকেন্ড যথেষ্ট। পৃথিবীর আনাচে কানাচে ঘুরে এবার তার প্ল্যান অন্য কোন গ্যালাক্সী। গ্রীষ্মের ছুটি কাটাবার জন্য সুমনারা এমনই  গ্যালাক্সী থেকে গ্যালাক্সী ভ্রমণে বের হয়। সৌমেনেদের কাছে এ আরেক অকল্পনীয় ব্যাপার।    

৩ 

সূর্য ঝলমল দিন। সপ্তাহ খানেক হলো গ্রীষ্মের  ছুটিতে সাইবেরিয়া থেকে বেড়াতে এসেছে ১২ টি পরিবার কৃষ্ণ সাগরের তীরে। আজ  ওদের  ছুটি কাটাবার শেষ দিন। ফিরে যাবে যার যার গন্তব্যে। ১২ টি পরিবারের ওরা ৬৫ জন এক সাথে দারুণ সময় কাটিয়েছে।  গ্রীষ্মের  এই সময়টুকুতে এত আনন্দ এত মজা আর কখনো বুঝি এ জীবনে ওদের আসবে না। ঘন্টা তিনেক পরেই ওদের ফ্লাইট। তারপর সত্যিই এ জীবন আর ওদের থাকবে না। বিদ্যুৎ চমকের তীব্র ঝলকানিতে, লক্ষ ভোল্টের আলোর ছটায় প্লেনটি ক্র্যাশ করবে। ভস্মে রূপান্তরিত দেহ গুলো থেকে আত্মার পুরোপুরি মুক্তি ঘটাতে এমন একটি বিশাল বিস্ফোরণেরই প্রয়োজন ছিল। প্রকৃতি তাই-ই ঠিক করে রেখেছে। তারপর ওরা প্রবেশ করবে অনন্তলোকের সীমাহীন সীমানার মাঝে। অনন্তলোক পরিভ্রমণের  মাঝে ফিরেও আসতে পারে ক্ষণিকের জন্য এই কৃষ্ণ সাগরের তীরে ঝিনুক হয়ে। তারপর হয়তোবা ছুটে চলে যাবে শোকাতুর পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের কাছে। কিছুদিন থাকবে ওদের কাছে। বাগানে গোলাপ হয়ে ফুটবে। গোলাপটিকে পরম যত্নে বাগান থেকে তুলে এনে ফুলদানীতে রাখবেন মা। তিনি কি জানবেন প্লেন দুর্ঘটনায় নিহত তার পুত্র এখন তারই ঘরে এসেছে। 

জীবন বড় অদ্ভুত। এরকম মন্তব্যই শুনবে সুমনা সৌমেনের কাছ থেকে যদি এই গল্পটি ও বলে বসে। একেই বলে গল্প বানানো। নয়তো কি?  দুর্ঘটনার আর কি ব্যাখ্যা থাকতে পারে? রাস্তায় চলতে চলতে কারোর কোন চলন্ত যানের সাথে সংঘর্ষ হলে তাকে  বলে সড়ক  দুর্ঘটনা যার কারণ হয়ে দাঁড়ায় ব্যক্তিটির দুর্ভাগ্য। দেহের কোষগুলো স্বাভাবিক কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করলে তাকে বলে ক্যান্সার। এর পরিণতি যদি হয় মৃত্যু তাও শেষে এসে দুর্ভাগ্য বলেই  চিহ্নিত হয়। কিন্তু  চলে যাবার জন্য তো  একটা সময় লাগে একটা ঘটনা লাগে। আজ যে সুমনারও এ পৃথিবী ছেড়ে চলে যাবার দিন। সুমনা কিভাবে বুঝাবে তা সৌমেনকে? সুমনা কিভাবে বলবেঃ সৌমেন, আজ আমি পৃথিবী ছেড়ে চলে যাবো তোমাদের সময়  ভোর ছয়টা বেজে পাঁচ মিনিটে, ৩১ শে অগাস্ট, ২০০৬, প্লিজ এতে কষ্ট পেও না , কারণ ঘটনাটি পূর্ব থেকেই নির্ধারিত।     

৪ 

এবারের অগাস্ট মাসটা দারুণ। খুব গরম পড়ার কথা। কিন্তু ১৫/১৬ তারিখ থেকেই ঝিরঝিরে ঠান্ডা আবেশ। মন চায় শুধু এদিক সেদিক বেড়াতে। সৌমেন ভাবছে ও এবারও সুমনার পরিবারের সাথে বেড়াতে যাবে উত্তরের পাহাড়ী জায়গাগুলো দেখতে। সেদিন কথা প্রসংগে বলেছিলও, অথচ  আশ্চর্য করে দিয়ে সুমনা বলে কিনা, সৌমেনকে এবার ওদের সাথে নেবে না। ভীষণ আঘাত পেয়েছে সৌমেন। কেমন যেন স্বার্থপরের মতন শুনাচ্ছিল সুমনার কথাগুলো। এমনতো কখোনই বলেনি ও। প্রতি গ্রীষ্মে কত জায়গায় না ওরা বেড়িয়েছে। এবার  এমন কি হলো যে সুমনা সরাসরি না বলে বসলো। কষ্ট পেয়েছে সৌমেন , কিন্তু কিছু বলেনি। গত তিন দিন ধরে ই-মেইলেও যোগাযোগ নেই সুমনার সাথে। সৌমেনও চায় না ওদের পারিবারিক গেট টুগেদারে ব্যাঘাত ঘটাতে। শুধু অপেক্ষা করছে ওর ফিরে আসার। জায়গাটি বেড়াবার জন্য সুন্দর হলেও গত দু’বছরে চার চার বার চারটি পরিবারের মৃত্যু ঘটেছে। এবার সুমনারা ওখানেই যাচ্ছে বেড়াতে। সৌমেন মানা করতে চেয়েও কিছু বলেনি। এত কুসংস্কারচ্ছন্ন হলে এই আধুনিক সমাজে সবাই হাস্যকর মনে করবে।  

সুমনাকে বিদায় দেবার সময় নিজের অজান্তেই সৌমেনের এক দীর্ঘশ্বাস এসে পড়লো। সুমনা তার অবাক সুন্দর চোখে অবাক হয়ে সৌমেনের দিকে তাকিয়ে রইলো স্থির কিছুক্ষণ। কি সুন্দর যে সেই অবাক করা দৃষ্টি।  সৌমেনের প্রাণটা ভরে উঠলো। তাহলে আর হাহাকার কেন? বেড়াতে যেতে চাচ্ছে নিজেরা, যাক। চার পাঁচ দিনই তো। এ কয়টা দিন এমন আর কি। এসব চিন্তাই করছে সৌমেন আজ  সকাল থেকে। আনমনা হয়ে চায়ের কাপ হাতে নিয়ে বসে আছে তো আছেই। জানালা দিয়ে ভোরে সূর্য উঠা দেখতে সৌমেন অপেক্ষা করে থাকে। আজ এত অন্যমনস্ক, কখন যে ভোর হয়ে সকাল হয়ে গেছে টেরও পায়নি। ঘড়িতে বাজে প্রায় সকাল ন’টা। খবর শুনবার জন্য টিভিটা অন্ করলো। প্রথম খবরটা বেশ অদ্ভুত - আজ ৩১ শে অগাস্ট। ভোর ৬ টা বেজে পাঁচ মিনিট। কাঞ্চনবাহার রিসোর্টের কেয়ার টেকার এর বক্তব্যঃ কিভাবে কি হলো বুঝলাম না।  রিসোর্টে বেড়াতে আসা পরিবারটি প্রতি ভোরেই হাঁটতে বের হন। চারিদিক ঘুরে বেড়ান। আজ সকালে প্রচন্ড বৃষ্টি। তবুও তারা বের হলেন হাতে ছাতা নিয়ে, রেইন কোট চাপিয়ে। কিছুদূর যেতে না যেতেই বজ্রপাত। লুটিয়ে পড়লো মা , বাবা আর তাদের আদরের কন্যাটি। কেন যে এই বৃষ্টিতে তারা বের হলেন বুঝলাম না। 

সৌমেনের হৃদস্পন্দন বাড়ছে। অসীম থেকে অসীমতর হচ্ছে। সৌমেন ছুটছে, কোথায় যেন ছুটছে। ধরে রাখবে, ও ধরে রাখবে সুমনাকে। ছাড়বে না কিছুতেই, যেতে দেবে না কোথাও। ও সর্বশক্তি দিয়ে নিজেকে শান্ত করতে চাইছে, বুঝাতে চাইছে সুমনার বজ্রাঘাতে মৃত্যু হয় নি। সুমনার জীবনাবসান হতে পারে না। ও চলে যাতে পারে না। অন্তত সৌমেনকে ছেড়ে ও চলে যেতে পারে না। চলে যাওয়ার জন্য তো ও আসেনি। তাহলে কেন চলে গেল? কেন নিতে চায় নি সুমনা  ওকে ওদের সাথে ওই রিসোর্টে ? সুমনা কি জানতো যে ও চলে যাবে? 


রচনাকালঃ ৩১শে অগাস্ট,২০০৬

দীপার প্রেম

 তারিখঃ ৪ঠা এপ্রিল ২০০২ স্থানঃ লেকচার হল, দ্বিতীয়তলা  ডিউটি করবে দীপা আর সুমন  সময়ঃ রাত আটটা থেকে ১২টা পর্যন্ত  অর্থাৎ এই চার ঘন্টায় লেকচ...