৩
সোহানের পরীক্ষা শেষ হয়েছে গত সপ্তাহে। ইয়ার ফাইনালের ঝামেলায় অনেকদিন ব্যস্ত ছিল। পরীক্ষা শেষ হওয়াতে স্বস্তির নিঃশ্বাস। এবার তাই ভাবছে ঘুরবে বেড়াবে যদিও ঘুরার মতো তেমন কোন বিশেষ জায়গা নেই এই জনবহুল শহরে। তাই দূরে কোথাও একটু নির্মল বাতাসের ছোঁয়া লাগে যেখানে, সেখানেই যাবে। মা থাকলে হয়তোবা মাকে জিজ্ঞেস করতো কোথায় যাবে। বাবাকে বলার কোন মানেই হয় না। মা হারিয়ে যাবার পর বাবা তো প্রায় নিস্তব্ধ। কারো সাথে তেমন একটা কথা বলেন না তিনি। প্রানবন্ত বাড়িটা যেন এখন প্রাণহীন কয়েকটা মানুষের নিস্তব্ধ বসবাস আর সময়কে বয়ে নিয়ে চলা। মায়ের চলে যাবার পরে সোহান স্কুল পাশ করেছে। কলেজ পাশ করে গ্র্যাজুয়াশানও কমপ্লিট করে ফেলেছে। কেমেস্ট্রিতে পড়তে গিয়ে পাড়ার বন্ধুদের কাছে রসায়নবিদ নামেও খ্যাতি অর্জন করেছে। রসায়নের অসম্ভব সব আবিষ্কারের কোন কিছু না করেই তার এই খ্যাতি তার মন্দ লাগে না।
আজ ফাইনাল পরীক্ষার প্রশ্নপত্র গুলো গুছিয়ে রাখতে রাখতে এই সবকিছুই মনের মাঝে উঁকি দিচ্ছিল। মাকে যদি জানাতে পারতো। মা নেই। মাতো তার কোথাও নেই। হঠাতই মা নিখোঁজ একদম বাড়ির ভিতর থেকে। কিন্তু কিভাবে,সে কারণ আজও কেউ খুঁজে পায়নি। আজও কেউ জানে না মা কোথায় গেলেন সেদিন। মায়ের কথা ভাবলেই তার কন্ঠস্বর শুনতে ইচ্ছে করে খুব। মাকে ছুঁতে ইচ্ছে করে। মায়ের পাশে বসতে ইচ্ছে করে। আবারো তারপর দীর্ঘশ্বাস এসে মনকে একদোলায় আনমনে করে তুলে। সম্বিত ফিরে পেতে সোহান আবিষ্কার করে নিজেকে খুব একা। কল্পনাগুলো খুব দূরে হারিয়ে যায়। এমনটা ওর প্রায়ই বোধ হয়। কোন এক অনন্তে নিজেকে হারিয়ে ফেলা অথচ কাকে বলবে এ কথা।
বাবার কন্ঠস্বরে চমক ভাঙে সোহানের। মজহার সাহেব ছেলেকে আদর করে ডাকেন ছোটকা। দু’ছেলের মধ্যে ছোট বলেই এত আদুরে ডাক নাম তার। অনেকদিন পরে বাবা এসেছেন তার ঘরে। পরীক্ষা শেষে বেড়াতে যাবে দূরে কোথাও এমন প্ল্যান জানানোর পর বাবা নিশ্চুপ ছিলেন কিছুদিন। আজ তাই জিজ্ঞাসা করছেন বেড়াবার কোন জায়গা ঠিক হলো কিনা। কিছু না ভেবেই সোহান উত্তর দিল মেজ খালার বাসায় যাবে। ওই শহরে একটা ছিমছাম সুন্দর পাহারী ঝর্ণা আছে, যা দেখতে পর্যটকদের অভাব হয় না অথচ তার এখনো দেখা হয়ে উঠলো না। বাবাকে বললো, দুদিনের মধ্যেই রওনা দেবার সকল ব্যবস্থা করে ফেলবে। সোহানের এই যাবার মুহূর্তে কি যেন ভেবে মজহার সাহেবও সিদ্ধান্ত নিলেন ছেলের সাথে ভ্রমণে।
৪
ট্যুরিজম স্পটগুলোয় মানুষের উপচে পড়া ভীড়। খালার বাসায় দুদিন থেকে সোহান তার বাবাকে নিয়ে বেড়াতে বেরুলো। পাহাড়ি ঝর্ণা যে অনবদ্য জলপ্রপাতের সূচনা করেছে তা দেখতে তার যত না ভাল লাগে তার থেকেও বেশী ভাল লাগে প্রকৃতির নিপুণ হাতে আঁকা চারিপাশ। বিশেষ করে ভোরের বেলায় সূর্য উঠার একটু আগ দিয়ে অমন সুন্দর পরিবেশে আনমনে হাঁটতে হাঁটতে পথ হারিয়ে ফেলতে যেন মজা। সোহানের তেমনই লাগছিল আজ সকালটা। আনমনে পাহাড়ের ঢালের কোল ঘেঁষে অনেকটা পথ চলে এসেছে নিজের অজান্তে। ছোট ছোট পাথুরে কণা। সারা রাস্তা জুড়েই তাই। সোহান এমন একটা পরিবেশই যেন খুঁজছিল মনে মনে। সূর্য উঠার আরো কিছুক্ষণ দেরী। চারিদিকে নরম আলোয় রাতের আঁধার কেটে গেছে। সোহান হেঁটে চলছে ধীর গতিতে। একাকী। আনমনে। হঠাতই মনে হলো কানের পাশ দিয়ে কারো ফিসফিস শব্দ। ওকেই ডাকছে যেন। ওর আদরের ডাকনামে।
-ছোটকা।
সোহান চকিতে পিছনে ফিরে চাইলো। কেউ তো নেই তার আশেপাশে।
আবারো সেই ডাক। ঠিক যেন মায়ের গলা। মা ডাকছে খুব কাছ থেকে। অথচ আওয়াজটা ভেসে আসছে যেন বহুদূর থেকে। বহুদূরে যেন মা থাকেন, হয়তোবা দেখতেও পাচ্ছেন ওকে। নাহলে ডাকছেন কেন?
৫
নিয়মিত ভোরবেলাই উঠে পড়েন মজহার সাহেব। কিন্তু আজ একটু দেরী হয়ে গেছে। ঘুম থেকে উঠে দেখলেন সোহান বাইরে গেছে হাঁটতে। হালকা শীত শীত লাগছে আজকের সকালটা। সোহান কখন গেছে তিনি জানেন না। তবে আর কিছুক্ষণের মধ্যে ফিরে আসবে বলে মনে হচ্ছে। প্রাতঃরাশ সেরে খবর কাগজটা পড়া শেষ করতেই ঘড়ি দেখে সময়টা ঠিক করে নিলেন টিভির খবরের সাথে। সকাল নয়টা বেজে ত্রিশ মিনিট। বেশ সময় কেটে গেছে অথচ সোহান গেছে সেই কখন। এখনো ফিরে আসছে না তাই চিন্তা করার পালা শুরু হলো মজহার সাহেবের।
খবর কাগজটা গুটিয়ে ঘরের দিকে রওনা হলে। কাপড় চোপড় পালটে বাইরে বেরুবেন ছেলেকে খুঁজবার আশায়। তৈরী হয়ে বের হতে গিয়ে লক্ষ্য করলেন হাতের ঘড়িটা নেয়া হয়নি। ফিরে এসে টেবিলের ওপর থেকে ঘড়িটা নিয়ে আবারো আয়নার সামনে দাঁড়ালেন। চুলটা ঠিক করতে গিয়ে বিস্ময়ে অবাক হলেন।
আয়নায় কিছুক্ষণের জন্য হলেও তিনি আলেয়াকে দেখেছেন তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে। এ যেন আলেয়াকে পাশে নিয়ে দাঁড়ানো নিজেরই প্রতিরূপ কিন্তু এখানে নয়,তার প্রতিরূপ ইউনিভার্সে। আলেয়াকে উনি স্পষ্টই দেখছেন। চুলগুলো কপালের কাছে আলতো করে ছড়ানো,মেটে রঙের তাঁতের শাড়ি পরা। গলাট কেঁপে উঠলো মজহার সাহেবের। কিছু বলতে চেয়েও পারছেন না। অজস্র চেষ্টা করেও পারছেন না। কেমন যেন অবশ লাগছে । তবুও তো আলেয়াকে নাম ধরে ডাকতে ইচ্ছে করছে তার। আয়নার প্রাচীর ভেদ করে ওই প্রতিরূপ ইউনিভার্সের মাঝ থেকে বের করে নিয়ে আসতে ইচ্ছে করছে তার প্রিয়তমা স্ত্রীকে।
হঠাতই দরজা খোলার শব্দ হলো। মজহার সাহেবের অনুভূতি হারিয়ে যায়নি কোথাও। হাতের ঘড়িতে সময় দেখলেন। পনের মিনিট পেরিয়ে গেছে সকাল দশটা বেজে। দরজা খুলে ছোট ছেলে সোহান প্রবেশ করলো ঘরে। ওর চোখে বিস্ময়। প্রাতঃভ্রমণে আজ সে তার মায়ের কন্ঠস্বর শুনেছে। বাবাকে বলবে তার এ অনুভূতির কথা।
ওর মা নিশ্চয়ই আছেন কোথাও না কোথাও,এ বিশ্ব চরাচরে। খুব আবেগে আপ্লুত হয়ে এখনই বলবে, বাবা মা এসেছিলেন,আজ সকালে আমার কাছে। অতিবাস্তব অনুভূতিতে জড়ানো মজহার সাহেব এ বর্ণনার প্রতিটি বিন্দু উপলব্ধি করবেন তার হৃদয়ের গভীরতম প্রকোষ্ঠে।


No comments:
Post a Comment