Sunday, September 15, 2019

প্যারালাল রিয়্যালিটি

শীলা গার্নার,এদোয়ার্ড রুশো,কেটি –এই তিনজন তিন জগতের বাসিন্দা যারা তাদের অজান্তেই যুক্ত হয়ে আছে একে অপরের সাথে। কিন্তু কিভাবে?

১

শীলা গার্নারের রিয়্যালিটিঃ

ঘটনার সবটুকু স্মৃতি ছয় বছর পর আজও  শীলার মনে উজ্জ্বল।

শব্দটা এমন বিকট হবে, ও ভাবতে পারেনি। শেলফ্‌ থেকে ছোট্ট টিনের ক্যান ধপাস করে পড়ে যাবার শব্দ যে এত অবিশ্বাস্য রকমের বিকট হতে পারে তা শীলার জানা ছিল না। হাতের তালুতে আঁটে এমনই এই ছোট্ট ক্যানটি ধরতে না ধরতেই পিছলে পড়ে গেল ঐ পাশটাতে। আর পড়ে যাওয়া মাত্রই কেউ যেন ক্যানটিকে এর ওজনের চেয়ে দশগুন ভারী করে ফেলল। কর্মরত দোকানী, যিনি বেশ খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি এমন বিকট আওয়াজ শুনে ত্রস্ত হয়েই ছুটে এলেন। কিন্তু পরিস্থিতি সামলে নিতে শীলার বেশী সময় লাগলো না। নিজে বেশ হকচকিয়ে গেলেও ধীরে সুস্থে টিনের কৌটাটি  তুলে স্তরে স্তরে সাজানো ক্যান ফুডগুলোর ওপর আবার সাজিয়ে রাখলো। কিন্তু ও বুঝতে পারছিল না, কেনই বা আঙ্গুলের মৃদু ছোঁয়ায় কৌটোটি পড়ে গেল – যা পড়ার কথা না, আর কেনই বা এতটা শব্দ হলো! এ যেন মোটেই স্বাভাবিক নয়।   

ওর হঠাৎ -ই মনে হলো মাথাটা ঝিমঝিম করছে।   

হারিয়ে যাচ্ছে যেন কোথাও।

অন্য কোন জগতে নয় তো? নাকি সে এখন খুব বিভ্রান্ত।

শীলা আজও  জানে না। তবে স্পষ্ট মনে আছে -ও বেশ হকচকিয়ে ওঠার পর ভীত হয়েই ঐ স্থানটি তৎক্ষণাৎ ত্যাগ করেছিল। পাশের আইল পেরিয়ে চলে গিয়েছিল বিশাল স্টোরটির একদম অপর প্রান্তে, স্টেশনারি জিনিসগুলো সাজিয়ে রাখা হয়েছে যেখানে। খুঁজছিল কিছু প্রয়োজনীয় কলম, কাগজ আর ফোল্ডার। সে দিকটায় কোন ক্রেতা নেই বললেই চলে। কর্মচারীদের উপস্থিতিও নেই। এই কিছুক্ষণ আগের বিকট শব্দের কথা ভুলেই মনোনিবেশ করলো স্টেশনারি জিনিসগুলোর দিকে। 

পছন্দমতো কিছু নির্বাচন করতে গেলে কেনাকাটার ক্ষেত্রে সময় বেশ দ্রুতই চলে যায়। শীলা নিজের মনে ভাবলো তাড়াতাড়ি কাজ সেরে বাড়ি ফিরবে।আর তা ভাবতেই আইলের পাশ ঘেঁষে মনে হলো যেন হাইওয়ে ধরে গাড়ি চলছে।ঠিক তখনই অনুভব করল, ও যেন দাঁড়িয়ে আছে জনাকীর্ণ  রাস্তার মাঝখানে। কোথায় দোকানের শেলফগুলো?  শীলা চারিদিকে তাকালো।

নাহ্‌ সব ঠিক আছে। দোকানের এই নির্জন জায়গাটিতে সারি সারি শেলফ্‌ ছাড়া কিছুই চোখে পড়ছে না।অথচ নিজেকে অনুভূত হচ্ছে অনেক মানুষের মাঝে কোলাহল পূর্ণ জনবহুল এক রাস্তায়।

কি আশ্চর্য!

কাঁধের পাশ দিয়ে দু’জনের সাথে ধাক্কা লাগলো যেন। মনে হচ্ছে কোন এক রাস্তার মাঝে ও দাঁড়িয়ে যেখানে শোঁ শোঁ শব্দ করে দ্রুত বেগে গাড়িগুলো চলে যাচ্ছে।

এই স্টোরের আন্ডারগ্রাউন্ড বেসমেন্টে –এর নীচে কোন রাস্তা নেই তো?

না হলে এমন মনে হচ্ছে কেন? গাড়িগুলো যেন এখন পায়ের নীচে দিয়ে যাচ্ছে।নাকি এই স্থানেই দুটো আলাদা ডাইমেনশানের সম্মিলন ঘটেছে? একই সঙ্গে স্টোরের সুনশান  নীরবতা আর কোলাহলে ভরা গাড়ির শব্দ মিলে মিশে যেন একাকার হয়ে যাচ্ছে।

২ 

এদোয়ার্ড রুশোর রিয়্যালিটিঃ

নিউইয়র্কের বেশ জনাকীর্ণ রাস্তা টাইম স্কয়্যার।কোন বিশেষ কারণে লোক সমাগম না হলেও ভীড় যেন লেগেই আছে এখানে। রুশো বেশ কিছুদিন হলো এসেছে এ শহরে।এত জনবহুল স্থান সে আগে কখনোই দেখেনি। মফঃস্বল থেকে মাত্র এসে খুব বড় শহরের ধাক্কা সামলাতে বেশ কিছু সময় লেগে গিয়েছে। খুব মনে পড়ে তার সেই ফেলে আসা খোলা প্রান্তর, উঠোনওয়ালা বাংলোয় গাছপালায় ঘেরা সবুজ বনানী। শহুরে জীবনে এসব পাওয়া দুষ্কর।তার বহুতল ভবনের অপর দিকে রয়েছে ছোট্ট একটি দোকান।রুটি, মাখন আর জ্যাম কিনবার জন্য রুশো ওখানেই চলে যায় যখন তখন।আজও  হালকা জ্যাকেটটা গায়ে চাপিয়ে এলিভেটর ধরে নেমে এলো নীচের তলায়। বিল্ডিং থেকে বেরিয়ে সামনের খোলা এত্তটুকুন জায়গায় যে বিশাল ক্রেইন বসানো হয়েছে তারই কাজ চলছে রাস্তার ওপাশে। মেরামত কাজের জন্য এসেছে ভারী ভারী যন্ত্রপাতি বহনকারী গাড়ি। এত শব্দ রাস্তায় অথচ ঘর থেকে কিছু টেরই পাওয়য যায় না ।বুঝতে পারা যায় না কত শব্দ যন্ত্রণার রাজ্যে তার বসবাস। এসবের ভীড় ঠেলে এগুতে না এগুতেই হঠাৎ তার মনে হলো আশপাশের গাড়িগুলো যেন উধাও।

সুনশান এক নীরবতা।

ও যেন দাঁড়িয়ে আছে কোন বিশাল এক দোকানের সারি সারি শেলফের মাঝখানে।(ঠিক শীলার মতন।)হেসে ফেলল মনে মনে। দোকানেই তো যাচ্ছে রুশো। কিন্তু পৌঁছানোর আগেই যেন পৌঁছে গেল!

আসলে আনমনা হলে এমনি হয়। যেমনটি এখন হলো। দু’জন পথচারী এক্কেবারে গায়ের ওপর এসে পড়েছে যেন।দোষ রুশোরই। অন্যকিছু ভাবছিল বলেই হয়তোবা খেয়াল করেনি ওদের। তাই অতর্কিতে এই ধাক্কা। তারপরও তো জনস্রোত থেমে নেই।সবাই যে কাজ সেরে যযার যার মতন বাড়ি ফিরছে এই সন্ধ্যায়।

জনাকীর্ণ এ রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে রুশো। ঠায়।

কেন?

ওর মনে হচ্ছে এত ভীড় যেন হঠাতই উধাও । খুব অসংযুক্ত এক অনুভূতি। চারপাশ থেকে নিজের অসংযুক্তি।তাই নিজেকে হারিয়ে ফেলা। সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া  তার চারপাশ থেকে, ক্ষণিকের জন্য। আর ঠিক এমন সময়ই সেই অবিশ্বাস্য রকমের বিকট এক শব্দ। এক বিশাল পাথরখন্ড ক্রেইন থেকে এসে পড়লো সামনের ডাম্পিং গ্রাউন্ডে।বিকট শব্দে রুশো যেন সম্বিৎ ফিরে পেল।

কোথায় ছিল ও এতক্ষণ? ক্ষণিকের জন্য যেন চারপাশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে অন্য এক বাস্তবতায় ঠাঁই নেওয়া, তারপর আবার ফিরে আসা এই টাইম স্কয়্যারেই।  

অথবা অন্য কোন ‘সময়ে’ চলে গিয়ে সব ভুলে যাওয়া।তারপর এলোমেলো হয়ে আবার ফিরে আসা।

কোথায় ছিল সে?

কোথায় যেন ছিল, কোন এক বিশাল স্টেশনারি দোকানের মাঝে। বিকট শব্দে নিজেকে আবার আবিষ্কার করলো সেই ক্রেইনটির কাছে, তার বিল্ডিং –এর উল্টোদিকে  ছোট্ট দোকানটির সামনে।

৩

কেটির রিয়্যালিটি

কেটি সানফ্রান্সিস্কো শহরে এসেছে বেশ কয়েক বছর হলো।এখানকার মিউজিয়ামে কাজ পেয়েই তার এই শহরে আগমন।।নয়নাভিরাম এ শহরে ট্যুরিস্টের আনাগোনা সবসময় লেগেই থাকে। আর এই মিউজিয়ামটি ঝকঝকে তকতকে রাখার দায়িত্ব যে তারই।অবসর মেলে না একটুও । মিউজিয়ামের সামনের দিকে অতিথিদের আগমনের পথে বেশ বড় একটা পোট্রেইট আছে, যার পাঁশে পাথর খোদিত একটি মূর্তি ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে একটি বেদীর ওপর। পাশেই টেবিলে রাখা গেস্টবুকে অতিথিরা সই করেন।

আজকের দিনটা একটূ অন্যরকম কেন যেন। কাজের ফাঁকে বিকট শব্দে! কেটি হকচকিয়ে উঠলো। বেদীর উপর বসানো পাথরের মূর্তিটা হঠাৎ-ই যেন কোন কিছুর বিশাল ধাক্কায় পাশের টেবিল ঘেঁষে মাটিতে পড়ে গেছে।

কিন্তু কেন এমন হলো?

পোট্রেইটের ফ্রেম পরিষ্কার করার কাজে ও এমন ব্যস্ত ছিল যে খেয়াল  করেনি তেমন একটা। আর তখনই এক বিকট আওয়াজ। পিছনে ফিরে তাকালো কেটি। যেন অনেক মানুষের কোলাহল। কিন্তু ঘড়িতে তাকিয়ে দেখলো ভিজিটার্স আওয়ার্স তো শেষ!

তাহলে কেন এত কোলাহল?

কেটি অবাক হয়ে চেয়ে আছে প্রবেশ পথের দরজার দিকে।ও দেখতে পাচ্ছে হল-ওয়ে দিয়ে অজস্র মানুষ হেঁটে কোথায় যেন যাচ্ছে। এ যেন মিউজিয়াম নয়, এক কোলাহল পূর্ণ জনাকীর্ণ রাস্তা। এত ভীড় যে খুব দূরত্ব বজায় রেখেও হাঁটা যাচ্ছে না। কেটির, দুজনের সাথে ধাক্কাও লাগলো । ও হারিয়ে ফেলেছে নিজেকে ঘিঞ্জি এক উঁচু -দালানের শহরে। এ কোন রিয়্যালিটি ? কেটি কি জানে যে এই রিয়ালিটিতে মেওন কেউ আছে যাকে সে চেনে?

বিশাল ফ্রেমে বাঁধানো পোটেইট- টি দেখতে পাচ্ছে না আর। ওর সামনে দাঁড়িয়ে আছে টাইম স্কয়্যারের সেই বিশাল ঘড়িটা। রাস্তায় চলছে মেরামতের কাজ। রাস্তার মাঝে দাঁড়িয়ে আছে একটি অল্প বয়সী ছেলে। কেটি  যেন ওকে আগে থেকেই চেনে। ওর নাম রুশো।

কিন্তু কিভাবে চেনে?

কেটি জানে না।

এখন ওকে যেতে হবে রাস্তা পার হয়ে সামনের দোকানে। আজ তার ক্যান- ফুড কেনার ইচ্ছে আছে।দোকানে এসে শেলফের পাঁশে দাঁড়ানো মাত্রই দেখলো শেলফের কাছে দাঁড়িয়ে আছে খুব পরিচিত একটি মেয়ে। নামটিও তার যেন জানা।

শীলা। কিন্তু এ কিভাবে সম্ভব?

কেটি কি ঘুরে বেড়াচ্ছে বিভিন স্থানে, বিভিন্ন সময়ে আর নিজেকেই খুঁজে পাচ্ছে তার সত্তার প্যারালাল সত্তা হিসাবে শীলাকে বা রুশোকে?

৪

 প্যারালাল রিয়্যালিটির সংযুক্তিঃ

সিকিউরিটি গার্ড ছুটে এসেছেন পড়ে যাওয়া মূর্তিটির কাছে।কিভাবে এত শক্ত গাঁথুনীর বেদী এক ধাক্কায় নষ্ট হলো, ওরা বুঝে উঠতে পারছে না। কেটি তো জানেই না।এইমাত্র তো সে ছিল নিউ ইয়র্কের টাইম স্কয়্যারের সামনে। বেশ চেনা এক ছেলেকে দেখেছে ওখানে। রাস্তা পার হয়ে স্টোরে প্রবেশের পথে দেখেছে আরেকটি চেনা মেয়েকে। নাম যেন কি? এমন সময়ে মিস গার্নার ডাক দিলেন তাকে পেছন থেকে।

-   কেটি।

ফিরে তাকালো কেটি মিস গার্নারের দিকে। তার নেইম প্লেটে তার নাম দেখে চমকে উঠলো কেটি। এ নাম তার পরিচিত। শীলা গার্নার।শীলা পরিচয় করিয়ে দিলেন মিউজিয়ামের কর্মীর সাথে।

মি. এদোয়ার্ড রুশো।

এবার কেটি খানিকটা বিভ্রান্ত।

খুব পরিচিত মনে হচ্ছে ভদ্রলোকের নামের শেষ অংশ। যেন খুব পরিচিত একজনের নাম।ভাঙ্গা মূর্তির অংশগুলোর ট্র্যাশ সংগ্রহ করে নিয়ে যাবার জন্য এসেছেন তিনি। হাতে মস্ত ঝুড়ি।কোথায় যেন এমন নামের মানুষগুলোর দেখা পেয়েছে সে একটু আগেই।

আজকের দিনটা কেটির জন্য অভূতপূর্ব এক অভিজ্ঞতার দিন। চারপাশের চেনা মানুষগুলো কেমন যেন বেশী বেশী পরিচিত মনে হচ্ছে কেটির কাছে। নিজেকে হারিয়ে ফেলছে বারবার তাদের সাথে। চারপাশের বাস্তবতার বাইরেও যেন অন্য কিছু আজ সে অনুভব করছে। অন্য কোন বাস্তবতা তার কাছে যেন একই সময়ে ফিরে ফিরে আসছে বর্তমান হয়ে। ঘুরে ফিরছে সে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে।এক সময় থেকে অন্য সময়ে। এক বাস্তবতা থেকে  অন্য বাস্তবতায়।

তারপর?

তারপর আবার নিজ কর্মস্থলে। প্যারালাল রিয়্যালিটির সেই সত্তারা ভিন্ন পরিচয়ে এখন দাঁড়িয়ে আছেন তার সামনে মিস শীলা গার্নার এবং এদোয়ার্ড রুশো নামে।   

ওর যে এদের সাথে দেখা হয়েছে অন্য রিয়্যালিটিতে।  কেউ কি বিশ্বাস করবে তার এই অভিজ্ঞতার কথা?

মিস শীলা গার্নার জিজ্ঞাসা করলেনঃ কেটি, তুমি কি ভেঙে যাওয়া মূর্তির টুকরোগুলো সরিয়ে এনে মি. রুশোকে তার কাজে সাহায্য করতে পারবে? 

কেটি ফিরে তাকালো মিস শীলার দিকে।

জবাবে বলল, নিশ্চয়ই।

………।।

সেপ্টেম্বর, ২০১৯

Tuesday, March 15, 2016

সময়ের ফাঁদে

মিনার আজ একটু সকাল সকাল বের হয়েছে বাড়ী থেকে। টার্ম পরীক্ষা শুরু। বাড়ি থেকে প্রায় আট কিলোমিটার দূরে যেতে হবে। কলেজ যেতে বেশ খানিকটা পথ পেরুতে হয় গ্রানের সরু রাস্তা ধরে ঐ বনের মাঝ দিয়ে। তারপর একটা ছোট্ট জলাশয়। পার  হলেই বড় রাস্তা। রাস্তা ধরে কিছুদূর এগুলেই কলেজ প্রাঙ্গণ। পরীক্ষার দিন বলেই প্রতিদিনের বাঁধা সময় থেকে একটু সময় বেশীই তাহে রেখে আজ বের হয়েছে। সিকালে পিঠা,গুড় মুড়ির নাস্তা।মায়ের হাতের তৈরী নাস্তার স্বাদ যেন আলাদা। খেয়ে কিছু সঙ্গে নেবে কিনা জিজ্ঞেস করাতে মাকে বলল, আজ নয়। কিন্তু আজ যে পরীক্ষার দিন। মা জোর করেই একটু নাস্তা তার টিফিন বক্সে দিয়ে দিল।৮টায় ক্লাশ শুরু হলে সাড়ে সাতটার দিকে মিনার বেরিয়ে পরে অন্য দিনগুলোতে।আজ আরেকটু আগেই বের হলো। সকাল সাতটা তখন।শীতের সকাল। মেঘের আড়াল হতে সূর্য উঁকি দিতে আলসেমি করছে।চারিদিকে পাখির কিচির মিচির। কুয়াশাচ্ছন্ন মেঠোপথ ধরে মিনার হাঁটতে থাকে। পিছনে মা দাঁড়িয়ে আছে সদর দরোজার চৌকাঠে।পিছনে ফিরে তাকালো মিনার।প্রতিদিনই তো পিছনে ফিরে মাকে দেখে।কিন্তু আজ যেন কেমন একটু লাগলো।বুঝাতে পারবে না। এ যেন কেমন এক অনুভূতি,। মাকে যেন আর দেখতে পাবে না এমনিই কিছু একটা মনে হলো।আর তা ভাবতেই বুকটা ধ্ক করে উঠলো।

নাহ্। কি সব ভাবছে। পরীক্ষার চিন্তায় শুধু উল্টাপাল্টা কথা মনে আসছে। এসব ভাবার কি কোন মানে হয়? তাই হাত নেড়ে হাসিমুখে সামনে রওনা দিল।সরুপঠটা চলে গেছে গাছপালা ভরা ঐ জংগলের দিকে। জঙ্গল পেরুলেই ছোট্ট একটি খালা। আর তার ঐ পাড়েই তো কলেজ।ছোটবেলায় একা আসেনি। বাবা থাকতো তার পথচলার সাথে। একঝন কলেজে উঠে সে একাই পারে এটুকু পথ পাড়ি দিতে। আর পারবেই না কেন।তার আজন্ম বেড়ে উঠা এখানে। এ গ্রামের পথে ধরে চলাফেরা নতুন কিছু তো নয়। গাছ গাছালীতে ভরা জংগলের এই জায়গাটা বেশ মজার।অনেক পাখির কল কাকলি।পাতার ফাঁক দিয়ে সূর্যের উঁকি। আজ যদিও বা বড্ড কুয়াশা। তার উপর একটুই  আধাঁরচ্ছন্ন।

মিনার হাঁটছে,। বেশ কিছুদূর এসে গেছে।মিনিট দশের পথ । তা পেরুলেই জংগল শেষ। এগুতে এগুতে বেশ ক্লান্ত বোধ হচ্ছে হঠাৎই। সারারাত পরীক্ষার প্রস্তুতিতে ভোরের দিকে যা একটু ঘুমিয়েছে।ভাল ঘুমও হয়নি তার। এখন যেন রাজ্যের ক্লান্তি। কিন্তু এ পথ এখনো শেষ হচ্ছে না কেন?

মিনার হাঁটছে তো অনেকক্ষণ।       

সময়ের হিসাব রাখেনি। রাখলে বোধহয় দেখত আধাঘন্টার বেশী হয়ে গেছে। সে এগিয়ে চলছে কিন্তু পথের যেন শেষ মিলছে না। ক্লান্তিতে শরির অবসন্ন।ঘুমে জড়িয়ে আসছে চোখদুটো। হেলান দিয়ে বসে পড়লো ছাতিম গাছের তলে।

তারপর?

আর খেয়াল নেই একদম যেন ঘুমের রাজ্যে –গভীর ঘুমে।

এদিকে সকাল গড়িয়ে দুপুর।কুয়াশা কেটে গেছে।চারিদিকে ঝলমলে দিন।সূর্যের হাসি খেলা পাতার ফাঁকে ফাঁকে।হঠাৎ কোথা হতে কর্কশ কন্ঠে পেঁচা ডেকে উঠতেই মিনারর ঘুমটা ভেঙে গেল।

অনেক দেরী হয়ে গেল না তো? চারিদিকে তাকিয়ে মিনার তো হতভম্ব। সকাল শেষে এখন দুপুরও শেষ প্রায়।পরীক্ষা তো এতক্ষণে শেষ হয়ে যাবার কথা। তাহলে তো ও পৌঁছাতে দেরী করে ফেলল, ভাবতে ভাবতে মিনার উঠে দাঁড়ালো। হাতের ব্যাগটা নিয়ে খুব দ্রুত গতিতে হাঁটা দিল।একটু পরেই জংগলের শেষ প্রান্তে সেই খালের ধারে এসে দাঁড়াল। বছরের এই সময়ে তেমন গভীর জল থাকে না।কিন্তু এখন তো দেখল এক ফোঁটা জল জমার মত তেমন কোন গভীরতাই নেই ।খালটা কেমন যেন একটা সমতল ভূমিতে পরিণত হয়েছে। এই কয়েক ঘন্টায় এত পরিবর্তন। গতকালও তো এতটা মসৃণ সমতল চোখে পড়েনি।

মিনার পা বাড়ালো। একটু এগুতেই বড় রাস্তা। রাস্তাটাকে বেশ যেন চওড়া আর মসৃণ দেখাচ্ছে। মনে হচ্ছে অনেকটা বিদেশ বিদেশ। রাস্তাটা আধুনিক প্রযুক্তিতেই নির্মিত ছিল কিন্তু আজ যেন মনে হচ্ছে অত্যাধুনিক এক মহাসড়ক।  

রাস্তা পার হয়ে কলেজ ক্যাম্পাসের সামনে এসে দাঁড়াতে দেখল বিশাল বড় নামে কলেজ গেইট যেন নতুন সাজে সজ্জিত।আজ যদিও টার্ম পরীক্ষার দিন, কিন্তু এর পাশাপাশি আরো কোন অনুষ্ঠান আছে কিনা কে জানে? তাই কলেজ গেইট এতো সুন্দর করে সাজান? ভিতর প্রবেশের পথে দারোয়ান বাধা দিল। সে যথারীতি পরিচয়পত্র বের করে দেখালো। 

তারিখ ১৫ই মার্চ ২০১৬.

দারোয়ান তার দিকে চমকে তাকালো।মিনার বুঝতে পারছে না কিছুই।আজ তার পরীক্ষা। কোথায় না তাড়াহুড়ো  করে ভেতরে ঢুকিয়ে দেবে তা না, দারোয়ান তার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে কি দেখছে? নতুন দারোয়ান বোধহয়। ওর কাছেও উনি অচেনা। তাই পুরোনো ছাত্র চিনতে পারছে না। ঢুকতে গেলে দারোয়ান বাধাঁ দিয়ে এমন একটা অবাককর প্রশ্ন করে বসলো যার জন্য মিনার কখনোই প্রস্তুত ছিল না। 

: আপনি এই প্রবেশ পত্র পেলেন কোথায়?

মিনার হেসে ফেললো।বললো, ‘আজ আমার টার্ম পরীক্ষা। আজকের জন্য এ প্রবেশপত্র আমি তো দু’দিন আগে সঙ্গগ্রহ করেছি।’     

দারোয়ান বেশ অবাক হয়ে তাকিয়ে থেকে তারিখটা দেখাল মিনারকে। বললো,, ‘আপনার প্রবেশ পত্রের তারিখ তাহলে ভুল আছে।’

: কিন্তু কি সেই ভুল?

: ২০১৬ সাল লেখাটায় ভুল। মনে হয় ছাপার ভুল হবে। এমন প্রবেশ পত্র তো কখনো দেখিই নি। আর কাগজগটা খুব পুরনো।

মিনারের এবার হেসে ফেলতে কোন বাধা নেই। জিজ্ঞেস করলো, ‘তা কত সাল হওয়া উচিৎ?’

দারোয়ান বলল, ‘এখন তো ২২১৬’ আপনি যেন ২০০ বছর আগের সময় হতে এসেছেন।

মিনার চারিদিকে তাকালো। সামনের মাঠে চোখ পড়ে গেল। সেই টিনের চালে ঘেরা শ্রেণী কক্ষগুলো গেল কোথায়? এতো অত্যাধুনিক সব বিল্ডিং এখন। মূল ভবন, ক্যান্টিন, ছাত্র হস্টেল সব যেন সুউচ্চ ভবনে এক জায়গায় সীমাবদ্ধ করে ফেলা হয়েছে।

নিজের দিকে তাকিয়েও বেশ অবাক লাগছে। এত মলিন কেন ওর ইউনিফর্ম?আই.ডি. কার্ড বের করবে বলে কাঁধের ব্যাগটা নামাল। ব্যাগ খুলতেই মায়ের দেয়া টিফিন চোখে পড়লো। একি অবস্থা খাবারের? সব খাবার শুকিয়ে যেন ধুলোর মতো গুড়ো হয়ে গিয়েছে।   

মিনার থতমত খেয়ে পরীক্ষার হলের দিকে রওনা দিল। কিন্তু কলেজ ভবন যে বড্ড অচেনা। চারপাশের ছেলে মেয়েগুলো এমন কেন?যেন অন্য কোন গ্রহ থেকে এসেছে। অদ্ভুত এক অচেনা পরিবেশ। কাউকে চিনতে পারছে না। স্যারদের দেখা মিলছে না। হেড স্যারের কক্ষ বের করতে বেশ অসুবিধা হলো। না চেনে এই কলেজের করিডোর না চেনে হল-ওয়ে।

অবশেষে দেখা মিললো, কিন্তু স্যারের সাথে কথা বলতেই হোঁচট খেতে হল।আজ কোন টার্ম পরীক্ষা নেই। আর মিনার যে সব কথা বলছে, হেড স্যার কোন ভাবেই মিলাতে পারছেন না। মিনারের পোশাক, কথার ধরণ, বিশেষ করে প্রবেশ পত্রটা। এত প্রাচীন পুরনো ধাঁচের ছাপা অক্ষরের কাগজ হাতে করে এই ছাত্রটি কোথা হতে এসেছে বুঝে উঠতে বড্ড কষ্ট হচ্ছে স্যারের। আজকাল কাগজের ব্যবহার নেই। প্রবেশ পত্র ছাপানোর প্রযুক্তি তো উঠে গেছে সেই কবে। আরো অদ্ভুত হলো এই প্রবেশ পত্রের তারিখ। আজ একই দিনে ২০০ বছর আগের তারিখ নিয়ে ছেলেটি এসেছে। সে এলো কোথা থেকে?

২

পরীক্ষা হবে না জেনে মিনার চলে এলো বাইরে।বাসায় ফিরতে হবে। বিকেল প্রায় শেষ। রাস্তা পেরুলেই সেই জংগল। যেতে যেতে প্রায় আধা ঘন্টা। মিনার টিফিনের খাবারটুকু ফেলে দিল।এই কয়েকঘন্টায় তার শুকনো খাবার কিভাবে পাউডার হয়ে গেল ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না।সামনে এগিয়ে বাড়ির পথ।মেঠো পথ ধরে আগাতে গিয়ে লক্ষ্য করলো চারপাশের ধানী জমিগুলো উধাও হয়ে গেছে। 

এত কলকারখানা এলো কোথা থেকে? 

আরেকটু এগুতেই বাড়ির উঠোন। কিন্তু কিছুই যে মিলছে না।কোথায় তার বাড়ি? এখানে যে বহুতল বিশিষ্ট সুউচ্চ ভবন। মিনার এবার বিদ্ধ্বস্ত। চারিদিকে তাকিয়ে কোন মানুষের চিহ্ন পেল না। তাহলে এত সুউচ্চ ভবনগুলোতে কারা বাস করে? কারা এরা? এরা এলো কোথা থেকে আর কেনই বা এরকম প্রত্যন্ত গ্রামে এমন স্বপ্পপুরী বানিয়ে বসবাস শুরু করেছে?

মিনার সামনে এগুলো। তন্ন তন্ন করে খুঁজছে তার ঘরের দুয়ার। ঘরে মা যে অপেক্ষা করে আছে তার জন্য।

৩

কিন্তু আর কত অপেক্ষা? বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা এখন।সেই সাত সকালে বেরিয়ে এখনো ফিরেনি মিনার।চিন্তায় অস্থির হয়ে মা লোক পাঠালেন কলেজে খবর নিতে। সন্ধ্যার দিকে খবর পেলেন মিনার আজ কলেজে আসেই নাই। মিনারকে কেউ রাস্তা দিয়ে হেঁটেও যেতে দেখেনি।হতবিহ্বল মা শরীরের সমস্ত শক্তি ছেড়ে দিয়ে বসে পড়লেন বারান্দায়। কিছু ভাবতে পারছেন না। কোথায় যেতে পারে তার ছেলে, আর তো কোন জায়গায়ও নেই এই অজ পাড়াগাঁয়ের আশপাশে।গাঁয়ের সকলে জড়ো হয়েছে মিনারের বাড়িতে। সকলেই খুঁজছে মিনারকে। কোথাও তার হদিস মেলেনি। অথচ মিনার দাঁড়িয়ে আছে ঠিকই তাদের সকলের মাঝে।সে দেখতে পাচ্ছে না বাড়ির উঠোন, গাঁয়ের সমস্ত লোকজন। দেখছে সুউচ্চ এক ভবন। সকলের মাঝে দাঁড়িয়েও সে যেন নেই। দিনটি মার্চের ১৫ তারিখ।স্থানটিও এক। শুধু সময়ের ভেলায় চড়ে মিনার  দুইশত বছর পার হয়ে এসেছে কোন এক ভাবে।

  ……।।

১৫/০৩/২০১৬ 


Sunday, September 27, 2015

নিঃসঙ্গ যাত্রী

 - আপনি?

- হ্যা  আমি!

- আপনি এখানে? ... কেমন করে? 

হেসে ফেললেন তিনি। সেই চিরচেনা হাসি,কিছুটা দুষ্টুমিতে ভরা। চঞ্চল কালো চোখে বুদ্ধির ঝিলিক। খুব উজ্জ্বল দেখাচ্ছে ওনাকে। উজ্জ্বল আভার মাঝে তার স্বর্গীয় সৌন্দর্য্যের মুখচ্ছবি ধীরে ধীরে আরো স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হচ্ছে। পুরো অবয়বই যেন দেখতে পাচ্ছে আমরিন এখন তার সামনে। নির্মল এক আনন্দের অনুভূতি। তার কোন ব্যথা নেই,কোন যন্ত্রণা নেই। তাকে দেখেই কি সব কষ্ট নিমেষে শেষ হয়ে গেল? এক যন্ত্রণাদায়ক চিকিৎসার মাঝে তো সে রয়েছে মাসখানেক ধরে। আর এ সপ্তাহে তার শারিরীক অবস্থা আরোও খারাপের দিকে গিয়েছে। ডাক্তাররা শেষ কথা বলেছেনও তার পরিবারকে। পরিবার মানে তার বাবা,মা, ভাই, বোন সবাই এখন তাকে ঘিরে। 

এখনই শুধু নয়, বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে আমরিনকে ঘিরে রয়েছে সকলে। প্রানান্ত চেষ্টা যেন যে কোন ভাবেই হোক আমরিনকে ঠেকাবে ওরা না যেতে দিতে। কেউই তো চায় না তার প্রিয় মানুষটি তাকে ছেড়ে চলে যাক না ফেরার দেশে। আসলে আমরিনের অসুস্থতা বছরখানেক ধরে। চিকিৎসার শেষ পর্যায়ে মাসখানেক হলো সে হাসপাতালের কক্ষে। এখানে সে আসতে চায়নি। শেষ ঠাঁই তার এখানে হোক কক্ষনো সে চায়নি। কিন্তু সব কথা তো বলেও সময় হয়ে উঠলো না তার সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার। 

আর এখন? 

দীর্ঘ কয়েকদিন ধরে অবচেতন থাকার পর  আরোও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে তাকে বাড়িতে নিয়ে যাবার। কিন্তু বাড়ি নিতে না পারলেও একমুহূর্ত কাছ ছাড়া করছে না তাকে তার পরিবার পরিজনেরা। আজই যেন কেমন একটা দিন অতিবাহিত হলো। 


রক্তলাল হয়ে দেখা দিবে চাঁদ আজকের আকাশে। খুব অদ্ভুত এক দিন আজ। কিন্তু মানসিক চাপ দীর্ঘদিন ধরে নেবার পরও সবার মনে যেন আজ আনন্দের দোলা। সেজন্যই বুঝি খুব অন্যরকম এক দিন আজ। সবার মন বলছে আমরিন আজ চোখ মেলবে। আর এরই প্রতীক্ষায় সারাটি দিন গড়িয়ে দুপুর প্রায়। হাসপাতালের নির্জন বারান্দায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে আছে সবাই। ওর বাবা, মা দাঁড়িয়ে আছে ওর হাতে হাত রেখে। এ পৃথিবীতে ওর আগমনের সময় যেমন তারাই তাকে স্বাগত জানিয়েছিলেন, তেমনি আজ কি তাকে বিদায় জানাবার ভারও তাদের হাতে এসে পড়েছে? কিন্তু এই কি তারা চান? কোন পিতা মাতাই তো তার সন্তানের মৃত্যু দেখতে চান না। কিন্তু হঠাৎই তাদের লক্ষী মেয়েটি আজ বড্ড অসুস্থ। অচেতন হয়ে আছে কয়েকদিন হয়ে গেল। কতবারই ডেকেছে তার নাম ধরে কিন্তু কোন সাড়া নেই, কোন শব্দ মেলেনি। কোথায় চলে গেল তাদের মেয়েটি? নাকি গভীর ঘুমে আছে,আবার জেগে উঠবে। কিছুই তো আর বোধগম্যে হয় না। ডাক্তার নার্সকে জিজ্ঞেস করলে,চুপ করে থাকে ওরা। মেশিন রিডিং দেখে চলে যায় তারা। আজ যদিও চীফ মেট্রন ইমরোজ এসেছেন ওকে দেখতে। খুব দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালনে সিদ্ধহস্ত বলেই ইমরোজের খ্যাতি এই হাসপাতালে সর্বজন বিদিত। ঘরে প্রবেশের পরপরেই যখন উনি জানালার পর্দাটা সরিয়ে দিলেন,বাইরের ঝকঝকে রোদ্দুর ঘরে এসে প্রবেশ করলো।


আমরিন ঘুমিয়ে আছে। নিবিড় তার ঘুম। চীফ মেট্রন ইমরোজ এসে তার পায়ের কাছে দাঁড়ালেন। স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন আমরিনের দিকে। ঘুমের ঘোরেই যেন আমরিন এবার হেসে ফেললো। বাবা, মা সচকিত হয়ে ইমরোজের দিকে তাকালেন। তাদের এ এক অবাক বিস্ময়! আমরিন ঘুমঘোরে হেসে উঠেছে। কোরিডোরের সবাই এসে আমরিনকে ঘিরে ধরেছে। 

আমরিন হাসছে আর জিজ্ঞেস করছে ইমরোজকে,‘আপনি?’ 

ইমরোজ কি উত্তর দেবে বুঝতে পারছে না। এ দায়িত্ব যে আজই ওকে দেয়া হয়েছে। আমরিনকে সে হাত ধরে পৌঁছে দেবে সেই জগতের দ্বারপ্রান্তে যেখান থেকেই কিনা তার এ পৃথিবীতে হয়েছিল আগমন। কিন্তু কিভাবে জানাবে একথা আমরিনের বাবা –মা কে? তারা কি মেনে নিতে চাইবেন তাদের সন্তানের চলে যাওয়ার সংবাদ? কিভাবে ইমরোজ বুঝাবে যে এ কাজের দায়িত্ব এক বিশেষ দায়িত্ব যা সাধারণত ন্যস্ত থাকে চলে যাওয়া পরিজনদের মাঝের কোন অতি আপনজনের কাছে, যিনি এই যাত্রীর খুব কাছের মানুষ। তিনিই আসবেন এই যাত্রীর নতুন যাত্রাপথের সঙ্গী হতে। পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবেন তার শেষ গন্তব্যস্থলে। 

পৃথিবীর এ জীবন শেষ করে আবার ফিরে যাওয়া তার শেষ গন্তব্যস্থলে – এসব যেন কেমন অদ্ভুত মনে হয়। পার্থিব জীবনে থেকে থেকে অভ্যস্ত হয়ে অপার্থিবে মিশে যাবার যাত্রী যেন সঠিক নির্দেশনা হারিয়ে না ফেলে, তাই এমন এক আলোকবর্তিকার আগমন হয় যাত্রার শুরুতে। কিন্তু ইমরোজ এখনও রয়ে গেছেন এখানে। তিনি কিভাবে এ দায়িত্ব নেবেন এ প্রশ্ন আমরিনেরও। 


ইমরোজ বলেছে, সে এ জগতে স্বাভাবিক ভাবে অবস্থান করলেও তার আরেকটি সত্তা সেই অজানা জগতেও বর্তমান, যে কিনা এই কাজের বাকীটুকু সম্পন্ন করবে। প্রথম পর্ব সম্পাদন হয়ে গেছে। 

ইমরোজ এসেছে আমরিনের কক্ষে। পর্দা সরিয়ে বাইরের আলোকচ্ছ্বটায় ভরে তুলেছে ঘরটা। টানা ক’দিন বৃষ্টির পর আজ ঝলমল আকাশে মৃদুমন্দ বাতাসের খেলা। 

শরতের এই আকাশে কাশ ফুলের মেলা। কিন্তু আমরিন আর কাশফুল দেখতে পায় না। পৃথিবীও এখন তার কাছে অস্পষ্ট। দিগন্ত রেখা থেকে ধেয়ে আসা আলোর ছ্বটা ধীরে ধীরে যখন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে ও দেখেছে একটি জ্যোতির্ময় অবয়ব। এই উজ্জ্বল সাদা আলোর মাঝেই তিনি দাঁড়িয়ে। খুব লম্বা দোহারা গড়নের চির পরিচিত ইমরোজ শায়ান। আমরিন অবাক হয়ে তাই জিজ্ঞেস করেছে এতগুলো প্রশ্ন একসাথে। 


আমরিন বুঝতে পেরেছে, ও পৃথিবী ছেড়ে খুব দূরে কোথাও চলে এসেছে এখন। এখান থেকে সূর্যছ্বটা ছাড়া আর কিছুই দেখা যাচ্ছে না। চারিদিকে প্রচন্ড আলো। সে চলছে এক টানেলের মধ্য দিয়ে অসীমের পানে। এ যাত্রাপথ শুধু তার একার। সঙ্গীহীন । 

চিরপরিচিত বাবা, মা, ভাই, বোন এখন নেই ওর সাথে। থাকার কথাও নয়। কারণ এখন যে ওদের সময় নয় ওর সাথে আসবার। এ কথাটিও ওর যেন জানা, কিন্তু কে কখন বলেছে ঠিক মনে করতে পারছে না আমরিন। তবে এটুকু জানে যে ইমরোজ শায়ান রয়ে গেছে ওই দূরের পৃথিবীতে। তার যাত্রাপথে সঙ্গী হবার সময় তো এখনও হয়নি তার। তাই আমরিনের একাই যাবার পালা আর সেভাবেই প্রস্তুতি গ্রহন করেছে সে এই ক’দিন। কিন্তু এরই মাঝে কেউ একজন এসে যখন বলেছে, ‘পার করে দাও আমারে’ –আমরিন হেসে ফেলেছে। তার সেই হাসিতে তার হাসপাতাল কক্ষের সবার চোখে মুখে আনন্দ। 

আমরিন ঘুমের ঘোরে হাসছে কিন্তু ওর মুখোমুখি দাঁড়ানো ইমরোজ শায়ান অপলক তাকিয়ে আছে আমরিনের দিকে। আমরিন অবাক বিস্ময়ে দেখছে ইমরোজকে। এ তো অসম্ভব,তার এতো ভাল লাগার মানুষটিকে আজ এত কাছ থেকে পাওয়া,যার কিনা থাকার কথা ছিল না একদম! সেজন্যই কি ইমরোজ এসেছে তার সামনে? তীক্ষ্ণ চঞ্চল সেই দৃষ্টি। চোখ রাখা যায় না যার চোখে। এক গভীর আবেশে যেন জড়িয়ে আসে সবকিছু। নত হয়ে পড়ে সবকিছু। আজও তাই হচ্ছে। এতো বিহবলতা কিভাবে গ্রহন করবে আমরিন? 

এখন অনেক দূরে চলে এসেছে যেন। ছুটে চলেছে সামনে। তীব্র গতি তার। পিছন ফিরে তাকাচ্ছে বারবার কিন্তু এখন  পৃথিবী আর স্পষ্ট নয়। কিন্তু ইমরোজ তার পাশে। চলছে দুজন দুরন্ত গতিতে,পাশাপাশি। অনেকটুকু পথ পাড়ি দিয়ে প্রবেশ করবে নতুন এক অন্য জগতে,যেখানে তাদের আসল ঠিকানা। মেশিন রিডিং বন্ধ হয়ে গেল সব। থেমে গেল সব একে একে। চীফ মেট্রন ইমরোজের  দীর্ঘশ্বাসে ঘরটা ভারী হয়ে উঠলো। 

পার্থিব জগতের এই মেশিনগুলো এ মুহূর্তে আর ধরতে পারছে না আমরিনের উপস্থিতি। যদিও অপার্থিবের উদ্দেশ্যে তার জীবন – যাত্রাপথের শেষটা শুরু হয়েছিল বেশ কয়েকদিন আগেই।    

.............

২৭ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৫


Saturday, September 10, 2011

আহ্বানে

 

সকাল থেকেই জুলিয়া ভাবছে ও যাবে কি যাবে না। বড্ড মন চাইছে যেতে, রাস্তার ও পাশের ফুলের বাগানটাতে। গ্রীষ্ম এসেছে বহু প্রতীক্ষার পরে। এমন উজ্জ্বল আলো ঝলমলে দিনে সেই পার্কটিতে ঘুরে আসা মন্দ নয়, কিন্তু আজ কেন এত সংকোচ কাজ করছে ওর ও জানে না। এমন তো আগে কখনো হয়নি। তাই কিছুটা ইতস্তত করেই বেরুলো। বাসায় আবার আজ কেউই নেই যে বলে আসবে কোথায় যাচ্ছে। উঠোন পেরিয়ে রাস্তায় এসে দাঁড়ানোর পর জুলিয়া কেন জানি পিছনে ফিরে চাইলো। বাড়িটির জন্য খুব মায়া লাগছে। মনে হচ্ছে ও যেন বাড়ি ছেড়ে খুব দূরে কোথাও চলে যাচ্ছে। অথচ রাস্তা পেরুলেই পার্ক। বেশী তো দূরে নয়।

এদিকটা উপশহর বলে যানবাহন তেমন বিশেষ একটা চোখে পড়ে না। রাস্তা পেরিয়ে ও প্রবেশ করলো ফুলে ঘেরা বাগানটিতে। বেঞ্চ পাতা আছে কিছু দূর পর পরে। ঘন গাছে ঘেরা সরু পায়ে হাঁটা পথ ছায়ায় ঢাকা পড়েছে। গাছের সারি পেরিয়ে কিছুদূর যেতেই মনে হচ্ছে অগোছালো আর অপরিচর্যায় বেড়ে উঠা গাছগাছালীতে পূর্ণ না হলেও বেশ ঘন জংগলেই এবার ও প্রবেশ করেছে। কেমন যেন এক তাগিদ থেকেই জুলিয়া আরেকটু এগুলো। বেশ এবড়ো থেবড়ো পথ। বোধহয় সিটি পার্কের সীমানা শেষ । কিন্তু কোন বাউন্ডারি না দেখে বেশ অবাক হলো। সামনে বিস্তৃত সবুজ বিশাল বনানী। আশপাশে বেশ কিছু প্রস্তরখন্ড ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ঘাসে ঢাকা। একটু ভাল করে খেয়াল করে দেখলো প্রস্তরখন্ডগুলো আসলে শতবর্ষাধিক পুরোনো এপিটাফ। অর্থাৎ বহু আগে এ জায়গাটি সমাধিস্থল ছিল। বেশ অবাক হলো কারণ আগে কখনো ও এসব দেখেনি। আসলে আগে এতদূর আসাও হয়নি। আজ যে কেন এলো, যেন কারো একজনের আহবানে এতদূর চলে আসা। এসব ভাবতে ভাবতে এগিয়ে যেতেই রিহানের কন্ঠস্বর। চমকে পিছনে তাকালো। রিহান ওর সহপাঠী। ওর ছোটবেলার বন্ধু। সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু । ওকে দেখে আরো বেশী অবাক হলো কারণ আজ সকালেই ওর সাথে ইমেইলে কথা হয়েছে কিন্তু তখন তো সে বলেনি যে ও এখানে আসবে। একেই বলে মনের টান। রিহান কাছে এগিয়ে এসে বললো, ‘ওদিকটায় যাবি ঘুরতে?’ আসলে জুলিয়ার এ জায়গাটা একেবারেই অচেনা। পার্কের বিশালতা এবার সে উপলব্ধি করতে পারছে। এত দিনের এই চেনা জায়গায়রও যে অনেক কিছু দেখা বাকী রয়ে গেছে তা বুঝতে পেরেই ও এককথায় রাজী হলো। রিহান বললো ও খুব ভাল চেনে এ জায়গাটা। তাই অনেক গল্প আর অনেক কথা আর অনেকটুকু হেঁটে চলা । রিহান যত না কথা বলে তার থেকে বেশী হাসে। কেন জানি জুলিয়ার কাছে এলে ওর এত প্রাণখোলা হাসি হাসে জুলিয়া ভেবে পায়না। 

সূর্যের আলোর রংধনু তৈরি হয়েছে ওদিকটার জলাধারে। আসলে রংধনু কোথাও না কোথাও দেখা দিবেই যখন রিহান ওর কাছ আসবে। শুধু সূর্যালোকের আলোর কিঞ্চিত প্রবেশাধিকার থাকলেই হলো। কিন্তু এতক্ষণ ধরে এগিয়েও এ পথ যেন আর ফুরোতে চাইছে না। ভেবে অবাক হয়েই জুলিয়া আপন মনে প্রশ্ন করলো, পার্কটা খুব বড় নাকি? এবার রিহান হেসে ফেললো। বললো, শেষ নেই।

২

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে। সারাদিনে ফোনে যোগাযোগ করে মেয়েকে না পেয়ে আর বাসায় এসে মেয়েকে না দেখে জুলিয়ার বাবা মা বেশ চিন্তিত হলেন। বন্ধু বান্ধব বলতে কাছে আছে রিহান । কিন্তু ওরা তো পরিবার শুদ্ধ সেই সকালেই চলে গেছে পাশের শহরে ওর দাদীমাকে দেখতে। এমন কিছুই শুনেছিল সকাল বেলায় জুলিয়ার কাছে নাস্তার টেবিলে। আসলে সপ্তাহ শেষের সময়টিতে সবাই কোথাও না কোথাও যাবার জন্য সময় নির্ধারিত করে রাখে। তারাও যাবেন কাল পাশের শহরের ফ্লাওয়ার ফেস্টিভালে। আর জুলিয়া যদি এখনো বাড়ি না ফেরে তাহলে কখনই বা গোছগাছ করবে আর কিভাবেই বা প্রস্তুতি নেবে। 

রিহানের সাথে যোগাযোগ করলে ও বললো ওরা ঠিকমতই পৌঁছেছে দাদীমার বাসায়। কিন্তু জুলিয়াকে সে সারাদিনে ফোনে একবারও পায়নি। প্রাণপ্রিয় বন্ধুটির সাথে যোগাযোগ ব্যর্থ হয়েছে জেনে এবার জুলিয়ার বাবা মা ব্যস্ত হয়ে পড়লেন । তারা এই সিদ্ধান্তে এলেন, যে তাদের কন্যাটি নিখোঁজ হয়েছে। 

নিখোঁজ সংবাদের ভিত্তিতে সেদিন চারিদিকে খোঁজ লাগানো হলেও আজ অব্দি জুলিয়ার খোঁজ মেলেনি। ছয় বছর হয়ে গেছে জুলিয়া নিরুদ্দেশ। অথচ ও যে খুব কাছেই ফুলে শোভিত ঘন গাছ গাছালীতে ঘেরা সীমানাবিহীন শতাধিক বছরের পুরোনো সেই বিশাল পার্কে ঘুরে বেড়াচ্ছে তা যেমন তার পরিবারের অজানা, তেমনি জুলিয়াও জানে না কে এই বন্ধুরূপী আগুন্তক যার আহবানে তার এই পার্কে আসা, তার সাথেই পার্কে ঘুরে বেড়ানো যা আর শেষ হবার নয়।

....................

১০/০৯/২০১১

Thursday, January 6, 2011

ছায়া মানব

১ 

ধীরে ধীরে চোখ মেললেন মিসেস গিলবার্ট। খুব ক্লান্ত তিনি। গতকাল এমারজেন্সি সার্জারি হয়েছে কয়েক ঘন্টার নোটিসে। কাউকে খবর দেবার আগেই ডাক্তররা তাকে ভর্তি করে ফেললেন হাসপাতালে। এই আশি বছরের দীর্ঘ জীবনে রোগ ব্যাধির ছোঁয়া তেমন একটি নেই। গতকালই  হঠাত ব্যথার চরম প্রকাশ যার কারণে এখানে আসা। সকালে ভর্তি হলেন আর সন্ধ্যায় অপারেশান। ব্যথা নেই তেমন একটা এখন। কিন্তু বেশ দুর্বল। অপারেশান থিয়েটার থেকে পোস্ট অপারেটিভ কেয়ারে রেখেছিল দুই ঘন্টা। এখন ওয়ার্ডে নিয়ে এসেছে। রাত বাজে আড়াইটা। চারিদিকে শুনশান নিস্তব্ধতা। মাঝে মাঝে ওয়ার্ডের রোগীদের যন্ত্রণাকাতর আর্তনাদ ভেঙে দেয় সকল নিস্তব্ধতাকে। মন খারাপ হয়ে যায়। মনে হয় রোগ ব্যাধির কাছে মানুষ কতই না অসহায়। তারপরও মিসেস গিলবার্ট জানেন না তিনি কতটা ভাগ্যবান। প্রচুর রক্তক্ষরণ সামাল দিতে হয়েছে তাকে অপারেশানের সময়। দ্বিগুন সময় লেগেছে সার্জারীতে। কিন্তু এখন তিনি রাহুমুক্ত। 

রাত মনে হয় নির্ঘুম কেটে যাবে। পাশে জানালা দিয়ে দেখা যাচ্ছে দূর আকাশের মেঘগুলো। একটা অন্ধকারাচ্ছন্ন আলো ঘিরে রেখেছে বাইরে। বাতিগুলো সব নেভানো। গভীর রাত বলেই হয়তোবা রোগীদের বিশ্রামের জন্য আলো নেভানো। শরীর ভীষণ দুর্বল বলেই হয়তো বেশ ঠান্ডা অনুভব করছেন। আরেকটা চাদর জড়ালে ভাল লাগতো। মাথার পাশে বোতামটা চাপলেই নার্স কথা বলে উঠবে স্পিকারে । আর আদেশ করা মাত্রই ত্বরিত গতিতে ছুটে আসবে রোগীর কাছে। তা সত্ত্বেও নার্সদের ডেকে বিরক্ত করতে মন চায় না কোন রোগীরই একান্ত না পারলে। কিন্তু ঠান্ডা যে লাগছে ভীষণ। ধীরে ধীরে হাতটা নাড়াতে চেষ্টা করলেন তিনি।  ডানপাশে মাথার কাছে লম্বা তার দিয়ে বেড সাইড সুইচটা রোগীর কাছেই রাখা থাকে। কিন্তু হাত সরাতেই এখন যেন খুব ক্লান্তি। একটা অপারেশন রোগীকে এভাবে প্রভাবিত করে? সমস্ত শক্তিগুলো যেন নিঃশেষ করে নিয়ে যায়। আবারো চেষ্টা করলেন । হাতটা আগাতেই মনে হলো খুব কাছে যেন কেউ কথা বলে উঠলো। বেশ ভারী কন্ঠস্বরে,

– আমি এসেছি।
চমকে উঠলেন মিসেস গিলবার্ট। বললেন, 
– কে তুমি ? ওহ্‌ নার্স বুঝি।
  – আমি নার্স নই। আমি ট্রিস্টিন। তোমার সংবাদ বাহক।
– মানে? 
– মানে আমি তোমাকে জানাতে এসেছি কিছু তথ্য। 
– কি তথ্য? 

– আজ তোমার প্রত্যাবর্তনের দিন ছিল। কিন্তু তা হয়নি। তোমার অসীম ইচ্ছাশক্তির কারণে ইশ্বর তোমায় রেখে দিলেন। অপারেশন সাকসেসফুল হলো। কিন্তু তোমার বদলে আরেকজনকে অবশ্যই যাতে হবে। 

মিসেস গিলবার্ট থমকে গেলেন কথাগুলো শুনে। সামনে মিশমিশে অন্ধকারে কালো একটা ছায়া যেন দাঁড়িয়ে আছে তার সামনে। কিন্তু এ অন্ধকারে ঘরে ছায়াই বা আসবে কোথা হতে? নিজের অজন্তেই অবাক হয়ে প্রশ্ন করলেন,

– কাকে যেতে হবে?

– তোমার প্রাণপ্রিয় নাতিনীকে। আজ হতে ৭ দিন পর। ২২ শে মার্চ। ক্যালিফর্নিয়ায় বাতসরিক স্কি প্রতিযোগীতায় অংশগ্রহনের জন্য স্কুলের ১২ জন শিশু থাকবে ঐ স্কি গ্রুপে ।ওরা কেউই পারবে না প্রতিযোগীতার কেন্দ্রে পৌঁছাতে।  তার আগেই ওদের প্লেনটা ভূপতিত হবে শহরের কেন্দ্রে কোন ফুলে ঘেরা প্রশস্ত বাগানের নির্জন কোণে। তাই প্লেনটি বিধ্বস্ত হলেও শহরের ব্যস্ততম অঞ্চলগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। 

কি বলছে এসব এই ছায়ামানব? মিসেস গিলবার্ট বুঝে উঠতে পারছেন না। তার নাতনীকেই বা এ চিনে কিভাবে? 

তুমি কে বলে উঠতেই আবারো সেই একই উত্তর ভেসে এলো।

– আমি ট্রিসটিন। একজন বার্তাবাহক, তোমাদের সকলের দেখাশুনা করাও আমার দায়িত্বের মাঝে পড়ে। 

– তাহলে আমার নাতনীকে কেন?

– ওকেই এখন বেশী প্রয়োজন। কারণ ওর স্কি করার পারদর্শীতা ওকে এতটাই বেপরোয়া করে তুলেছে যে, যে কোন সময়ে ওকে বরণ করে নিতে হবে অকাল পঙ্গুত্ব। কিন্তু তা আমি হতে দেবনা। ভালোয় ভালোয় এই ডাইমেনশান থেকে সরিয়ে নিয়ে স্থাপন করবো ওকে অন্য কোন খানে, যেখানে খুব সাধাসিধে জীবন যাপন করে ও সমাপ্ত করবে ওর জীবনচক্র।

মিসেস গিলবার্ট কান্না মিশ্রিত কন্ঠে কাতর অনুনয় করে বললেন,

– কিন্তু ওকে ছাড়া আমি বাঁচবো কিভাবে? 

ছায়ামানব ট্রিস্টিন এবার আলতো স্পর্শে হাত রাখলো মিসেস গিলবার্টের হাতে। ভীষণ শীতল সে স্পর্শ। দেহটা যেন অসাড় বোধ হচ্ছে। একটু নড়বার চুল পরিমাণ শক্তিও নেই অবশিষ্ট। ট্রিস্টিনের শেষ উত্তর একটিই।

– তোমার জীবনীশক্তি প্রচন্ড। নাতির চলে যাওয়ার ধাক্কা সইতে তুমি পারবে। এখন ওরই যাবার সময়।

২

জুলিয়ান এখন পড়ছে থার্ড গ্রেডে। বয়স ৮ বছর। এই বয়সেই স্কিতে ভীষণ নৈপুণ্য অর্জন করে ফেলেছে সে। একসপ্তাহ পরেই রওনা দেবে বাতসরিক স্কি প্রতিযোগীতায় অংশ নিতে। তবুও মনটা জানি কেন ভাল নেই তার। চোখের সামনে শুধু ভেসে উঠছে বৃদ্ধ দাদির অসাড় একটি দেহ।

কেন এমন হচ্ছে? বার্ধক্য এলেও শারিরীক দিক দিয়ে এই বয়সেও দাদী রোগ বালাইয়ের উর্ধ্বে। তারপরও কেন এমন মনে হচ্ছে? দুদিন আগেই তো কথা হল। ওনার অসাড় দেহ বার বার চোখের সামনে ভেসে উঠছে কেন ভেবে কোন কারণ পেল না জুলিয়ান। আজ বোধহয় সারা রাত আর ঘুম আসবে না তার। কিছু ভেবে না পেয়ে বেড সাইডের ল্যাম্পটায় জুলিয়ান হাত বাড়ালো। আজ যেন সব কিছু অন্য রকম। ল্যম্পটা যেন হাতের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে বার বার। ডান দিকে ভর দিয়ে কাত হয়ে হাতটা আগালো ল্যাম্পের দিকে। আর তখনই খেয়াল করলো বিছানা আর সাইড টেবিলের মাঝের ওই জায়গায় কে যেন দাঁড়িয়ে। জুলিয়ান মাথা তুলে তাকালো  উপরে। 

দীর্ঘ মানুষের অবয়বে একটি কালো ছায়া। 

কিন্তু ছায়াই বা আসবে কোথা হতে এই অন্ধকার ঘরে? জুলিয়ান বেশ অবাক হয়েই বিড়বিড় করে বলে উঠলো, কি এটা?

ছায়ামানব যেন তাও শুনে ফেলেছে। ছোট্ট একটি উত্তর দিয়ে বললো,
– আমি ট্রিসটিন।
জুলিয়ান বেশ অবাক! জানতে চেয়ে বললো,
– কোথা হতে এসেছ?
– 7D থেকে। তোমায় কিছু বলতে চাই। 
– বল।
খুব ধীরে গম্ভীর কন্ঠস্বরে ছায়াটি বলে উঠলো,
– তোমার দাদী সুস্থ আছেন।

জুলিয়ান এত অবাকের মাঝেও না হেসে পারলো না। আজ সারাদিনই তো সে দাদীর কথা ভেবেছে। কিন্তু এ ছায়াটি সে কথা জানলো কিভাবে? এবার আরো অবাক করে দিয়ে ছায়াটি প্রশ্ন করলো,

– স্কি করতে যাবে তো এই মাসের ২২ তারিখে? তাইনা?
– হ্যা মার্চের ২২ তারিখে।  সকাল সকাল রওনা দিলে বেশ আগেই ওখানে পৌঁছে যাব।
ট্রিসটিনের বেশ সরাসরি উত্তর,
– না  তোমরা  পৌঁছাবে না।
– পৌঁছাব না? কেন?

– তোমেদের নিয়ে যাব ফুলে ফুলে শোভিত খুব সুন্দর এক বাগানে, যেখানে অজস্র মানুষ ঘুমিয়ে আছে নিশ্চিন্ত মনে। জায়গাটি এই ক্যালিফর্নিয়ার মনটোনা এয়ারপোর্ট  থেকে  মাত্র ৫০০ ফুট দূরে। তোমাদের প্লেন রানওয়ে পর্যন্ত পৌঁছাবে না। তার আগেই পড়ে যাবে। 

– পড়ে যাবে?
– হ্যা পড়ে যাবে।
– কিন্তু কেন?
– কারন তোমার স্কি করার যে আর প্রয়োজন নেই।

স্বপ্ন কি না সত্যি জুলিয়ান জানে না। ঘুম ভেঙে গেল ওর। বাইরে ভোর হয়ে এসেছে। কেউ তো নেই মাথার কাছে দাঁড়িয়ে। কিছু কিছু কথা মনে পড়ছে। দাদী, স্কি ট্রিপ, ফুলের বাগান।  নেট ব্রাউজ করে কিছু তথ্যও পেয়ে গেল।  ক্যালিফর্নিয়ায় তাদের অরোভিল থেকে  মনটোনা যেতে ঘন্টাখানেকের পথ। সেখানেই ওদের স্কি রিসোর্ট। 

দাদীর সাথে কুশল বিনময় করবে আজ।

৩

ফোনটা বেজেই চলছে। প্রায় আধাঘন্টা হলো। কিন্তু কেউ তুলছে না। কেন? সকলের এই সময়টা  মিসেস গিলবার্ট তো বাসায় থাকেন। উনি যে খুব একটা বাইরে যান তাও না। এই ব্রেক ফাস্টের সময়টা পিছনের কাঁচে ঘেরা বারান্দায় বসে থাকেন। পিছনে গাছ গাছালী ভরা বনানী। দৃশ্যটা খুব সুন্দর। শীতকালে তুষারাবৃত হয়ে সাদা হয়ে যায় চারিধার। ঋতুর সৌন্দর্য্য আলাদা আলাদা। শীতের সময়ে এই বারান্দা সানরুম হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

ফোন যখন কেউই  ধরছে না, জুলিয়ান আর চেষ্টা করলো না। চলে গেল স্কুলে। হাঁটা পথ পাঁচ মিনিটের। যখন আরো ছোট ছিল, মা–ই নিয়ে যেতেন স্কুলে। এখন ও নিজে যেতে পারে, আর ছুটি হলে একদৌড়ে বাড়ি।

আজ বাড়ি ফিরে দেখল বাবা মা বেশ চিন্তিত। তারাও ফোন করে কোন সাড়াশব্দ পাননি মিসেস গিলবার্টের। ওখানে প্রতিবেশী যারা আছেন তারাও বেশ বৃদ্ধ। তাই কাকেই বা বলবে ওনার খবর নিতে। পুলিশের সাহায্য ছাড়া আর বুঝি উপায় নেই। 

একে একে সকল তথ্যই পুলিশ নিল। নাম, বাড়ি নম্বর, রাস্তার নাম সবই।

খোঁজ শুরু করলো। অবশেষে পেয়েও গেল। হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন মিসেস গিলবার্ট গতকাল। বাড়ি হতে দুমিনিটের পথ দিব্যি হেঁটে চলে গেছেন। আর তখনই ডাক্তররা ধরে বেঁধে ভর্তি করে নিয়েছেন, কাউকে জানাতে পারেননি ততক্ষণাত। অপারেশনের পর আজ সকালে সুস্থ তিনি। সব শুনে জুলিয়ানের মা বাবা আশ্বস্ত হলেন।   

কিছুদিন পরেই রওনা দেবেন তারা স্কি ট্রিপে। স্কুল চলছে তাই দাদীর কাছে যাবার সুযোগ নেই জুলিয়ানের । ফিরে এসে গ্রীষ্মকালীন ছুটি শুরু হতে মাস দেড়েক বাকী, তখনই না হয় জুলিয়ান  ওখানে যাবে, এসব ভেবে ভেবে রাতে ঘুমুতে চেষ্টা করল চোখের পাতা দুটো এক করে। স্বপ্নের রাজ্যে যখন প্রবেশের সময় তখনই গতরাতের মতো একটি কন্ঠস্বর। কে জানি তাকে ডাকছে বেশ গম্ভীর স্বরে। 

– জুলিয়ান।

বেশ কাছ থেকেই। 

চোখ মেলতেই চিনে ফেললো তাকে। সেই ছায়ামানব, ট্রিস্টিন। কিছু বলছে না আজ, শুধু চেয়ে আছে। কথা বলতে খুব কষ্ট হচ্ছে জুলিয়ানের। সেও কিছু বলতে চেয়ে পারছে না। খুব অবসন্ন আর ক্লান্ত লাগছে। চারিদিকে বেশ ঠান্ডা অনুভূত হচ্ছে। যেন দম বন্ধ হয়ে আসার মত অদৃশ্য চাপ। কেউ তাকে এক নিমেষে অবশ করে দিয়েছে। 

বাবাকে এ কথা বলে লাভ নেই। তারা হয়তোবা বিশ্বাস করবেন না। যাই হোক। ঘুমিয়ে পড়ল জুলিয়ান।

৪

সময়কালঃ ২২ শে মার্চ ২০০৯

জুলিয়ান এবং তার সঙ্গীরা রওনা দিয়েছে তাদের প্রতিযোগীতার কেন্দ্রস্থলে। ঘন্টাখানেকের পথ। তাই  ছোট্ট একটি প্লেন নিয়ে যাত্রা। ৮ থেকে ১০ বছরের ১২ জন ফুটফুটে শিশু সহ মোট ১৪ জন যাত্রী প্লেনে। আজ সকাল বেশ সুন্দর। তাপমাত্রা শূন্যের  কিছু নিচে।আকাশের মেঘগুলো তুলোর মতো ভেসে বেড়াচ্ছে চারিদিকে। নিচে বাড়িঘর, জলাশয় আর রাস্তা এক নয়নাভিরাম দৃশ্য তৈরি করেছে। ঐ তো দূরে রানওয়ে। আর বেশীক্ষণ লাগবে না শহরে পৌঁছাতে। মাটির কাছাকাছি নেমে আসছে ওদের প্লেন বেশ সাবলীল গতিতে। তাই শহরের দৃশ্য আরোও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

ফুলের বাগানে ঘেরা একটা কবরস্থান। বেশ প্রাচীন মনে হচ্ছে। এত স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে , প্লেনটা বোধহয় বেশ নীচু দিয়ে উড়ে চলছে। ফুলগুলো সব ফুটতে শুরু করেছে। মার্চের এই ২২ তারিখেই বসন্তকে ওরা বরণ করে নেয়। 

জুলিয়ানের হঠাত মনে পড়ে গেল ট্রিস্টিনের কথা। ও বলেছিল সুন্দর সাজানো বাগানের কথা। ওখানে যাবার কথা। কিন্তু রানওয়ে থেকে না নেমে তো ঐ বাগানে ওরা পৌঁছাতে পারে না। আর মাত্র ৫০০ ফুট দূরেই রানওয়ে। তাহলে প্লেনটি বারবার এই সাজানো বাগানের ওপর চক্কর দিচ্ছে কেন? এবার বেশ নীচের দিকে ধাবিত হচ্ছে মনে হয়। নাম পড়া যাচ্ছে বাগানটির। হলি ক্রস সেমিটারি। কিন্তু এই বাগানেই ল্যান্ড করবে নাকি? কিছু বুঝে উঠতে পারার আগেই একটা বিকট শব্দ। 

তারপর নিস্তব্ধ। চারিদিক। অন্ধকার।

৫

চোখে মেলে চাইলেন মিসেস গিলবার্ট। শরীর এখনো বেশ দুর্বল। এই দুঃস্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙ্গে গেল। একটা প্লেন বিধ্বস্তের পুরো ঘটনা কেন প্রত্যক্ষ করলেন এভাবে? ঘুমের ঘোরে ক্ষণিকের চিন্তা যখন স্বপ্ন আকারে আসে তখন বিচ্ছিন্ন ভাবনাগুলো কত কল্পনারই না সৃষ্টি করে। তাই এসব বিষয় গুরুত্ব দিলে কি চলে?

কিছুদিন আগে যে ছায়ামানবের সাক্ষাত তার ঘটেছিল সে তো আরো অমূলক। অপারেশানের পর দুর্বল শরীরে অশরীরী অস্তিত্বের উপস্থিতি শুধু নয়, বন জঙ্গলের বাঘ ভালুকের অস্তিত্বও অমূলক নয় কারোর জন্য যে কিনা ঐ ব্যথানাশকের ঘোরে মৌলিক চিন্তা করার সামর্থ্য হারিয়ে ফেলে। আর সেই দিনের সেই কথাগুলো, নাতনীর স্কি রিসোর্টে যাবার পথে ফুলে ঘেরা সেমিটারিতে প্লেন ক্র্যাশের অতি কাল্পনিক গল্প  হয়তো মনের অন্তস্থলে গিঁথে ছিল বলেই এ স্বপ্নের অবতারণা। পুরো গল্পটা দিয়ে স্বপ্ন দেখে রাত পার হয়ে গেল। দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের অজান্তে মিসেস গিলবার্ট  চোখ বুজলেন। নাতনীর জন্য অনেক প্রার্থনা করে হাত বাড়ালেন বেড সুইচের দিকে। নার্সকে খবর দিলেন আসতে। বলবেন ফোনের লাইনটি লাগিয়ে দিতে। নাতনীর সাথে কথা বলবেন এখনই। ছোট্ট জুলিয়ানের কন্ঠ শুনতে ভীষণ মন চাইছে তার।

.......

লেখাঃ খুব সম্ভবত ২০০৯
ব্লগে প্রকাশ ০৭/০১/২০১১


Saturday, November 13, 2010

অনুভবে

 


টনি, রুম্পা, জনি আজ ঠিক করেছে সারাদিন কাটাবে ওদের ট্রি হাউজে। বাড়ির পিছনে বিশাল বাগান জুড়ে অনেক গাছ গাছালীর সমাহার। ওখানেই ওদের তিন ভাইবোনের জন্য বানানো হয়েছে ট্রি-হাউজ। প্রায় দোতলার সমান উচ্চতা হবে। সেই উঁচুতে ১০ ফুট বাই ৮ ফুট একটি ঘর। ঘরটির জানালা দিয়ে বাইরে তাকালেই শহরের নামকরা একটি চিড়িয়াখানা। আসলে চিড়িয়াখানার পাশেই বাড়ি বানাবার জন্য প্লটটি  পেয়েছিলেন ওদের বাবা সেই কবে। বাড়ি বানিয়ে কিছুটা খালি জমি রেখেছিলেন পেছনে। ছোট্ট একটা লন। কিছু গাছপালা। নির্জন নিরিবিলি কোলাহলমুক্ত এ জায়গায় প্রতি সন্ধ্যায় বসে চা খেতে আর বাচ্চাদের খেলা দেখতে দেখতে বাবা মায়ের সময় কেটে যায় ভীষণ আনন্দে। বাচ্চাদের আবদারে তাদের জন্য ছোট্ট ট্রি হাউজ গড়ে দিয়েছেন তারা। 

সপ্তাহের ছুটির সারাটা দিন, পারলে সারা রাতও তারা খেলতে খেলতে পার করে দেয় ট্রি-হাউজে। অন্যদিন সকালে ঘুম না ভাঙ্গলেও ছুটির দিনে ঐ ট্রি-হাউজে খেলার নেশায় খুব ভোরে ওদের ঘুম ভেঙ্গে যায়। একটুও ইচ্ছে করে না বেলা পর্যন্ত ঘুমুতে। সকাল হলেই দে ছুট। 

আজও তাই করলো ওরা। সপ্তাহের এই ছুটির দিনটা সবচেয়ে বেশী আকাংখিত। তাই  সকাল হতেই তিনজন ওখানে। ওদের সব খেলনাগুলো ট্রিহাউজেই রাখা থাকে। তিনজনের মধ্যে টনি ১০, রুম্পা ৮, জনি ৫ বছর। বড় হয়ে টনির এখন অনেক দায়িত্ব। নিজে খেলা করলেও ছোট ভাইবোনকেও দেখাও তার কর্তব্য। ওদের খেয়াল রাখা আবার নিজের খেলা দুটোই তাকে করতে হয়। 

বলা নেই কওয়া নেই হঠাতই চোখে পড়লো রুম্পা একটু ঝুঁকে জানালার বাইরে কি যেন দেখছে। টনি কাছে এগিয়ে এসে পাশে দাঁড়াতেই দেখলো মনোরম এক দৃশ্য। ওদের ট্রি হাউজের ঘরটি যেন আকৃতিতে বিশাল হয়ে মিশে গেছে ওই দূরের একটি ঝর্ণার সাথে। তাই একটুও দ্বিধা না করে ওরা এক পা দু’পা করে এগিয়ে গেল সেই ঝর্ণার দিকে। ঝর্ণার পাশে চোখ জুড়ানো ফুলের বাগান আর  তার মাঝে অনেকগুলো প্রজাপতি খেলা করছে। এ যেন একদম রূপকথার স্বপ্নপুরী। আরেকটু সামনে এগুলো। বাহ কি সুন্দর! সামনে সবুজ ঘাসে আবৃত বিশাল মাঠ আর তারই প্রান্তে ঢালু রাস্তা মিশেছে ঐ দূরের ছোট্ট একটি গ্রামে। মাঠটা পার হয়ে দুজনে দৌড়ে চলে এলো রাস্তায়। তারপর ওই রাস্তা বেয়ে আরো সামনে ঐ ছোট্ট গ্রামে। ওখানে যে আরো বিস্ময় ! তাদেরই মতন অনেক ছোট ছোট ছেলেমেয়ে খেলা করছে। টনি আর রুম্পার তর সইলো না। এক দৌড়ে ওদের কাছে যেয়ে হাজির। বললো, ‘আমাদের খেলতে নেবে তোমাদের সাথে?’

শিশুগুলো ভীষণ মিশুক। তাই এক কথায় ওদেরকে বন্ধু করে নিল। 

প্রথমেই ওরা জিজ্ঞেস করলো রুম্পা আর টনিকে, ‘তোমরাও কি আমাদের মতন এখানে এসেছ?’ 

আমাদের মতন মানে? 

ওরা কিছুই বুঝে উঠতে না পারায় বাচ্চাগুলো হাসতে হাসতে দে ছুট। ওরাও সাথে সাথে।  তাদের সঙ্গে অনেক খেলাধূলোয় আর অনেক মজায় মেতে উঠলো। কিন্তু এত খেলেও যেন বিকেল গড়িয়ে আর সন্ধ্যে নামছে না। বাবা মা বাসায় যাবার জন্য আর ডাকছে না ভেবে টনি  আর রুম্পার বেশ ভাল লাগলো। এমনটাই তো ওরা চেয়েছিল এতদিন। কিন্তু কখনই তা হয়নি। আর আজ যেন যা চাওয়া তাই সাথে সাথে পেয়ে যাওয়া। বাবা মায়ের শাসন নেই। সময়ের বালাই নেই। স্কুলে যাবার তাড়া নেই। খেলা আর খেলা। 

ওদের নতুন বন্ধুদের নামগুলো বেশ মজার। সংখ্যা দিয়ে। যেমন ডি-ওয়ান, ডি-টু, ডি-থ্রি,  ডি১১. আর এভাবেই ওই নতুন ১১ জন বন্ধু ওদের কাছে নিজেরদের পরিচয় দিল। টনিকে নতুন নাম না দিয়ে বললো, ‘থাক, তোমাদের নাম আপাতত টনি আর রুম্পাই থাক।’ 

সাথে সাথে দু’ ভাইবোনের প্রতিবাদ। ‘কেন? আমাদের নাম  যদি তোমাদের নামের মতো সংখ্যা দিয়ে হয় তাহলে মন্দ কি,আমাদের নামও তোমাদের মতন করে দাও।’ কিন্তু টনির কথায় ওরা রাজী হলো না। বলল, ‘এখন নয়। পরে।’ 

রুম্পা বলল, ‘কেন এখন সম্ভব নয়? আমরা তো তোমাদের বন্ধু, তাইনা?’ 

শিশুরা খলখল করে হেসে উঠলো। শুরু হল হুড়োহুড়ি, ছুটোছুটি। বরফ পানি, হাইড অ্যান্ড সিক, আরো কত খেলা। 

খেলা শেষে পিপাসার্ত হয়ে এলো ঝর্ণার ধারে। পানির স্বাদ এত অন্যরকম যেন পানি তো নয় এ এক প্রশান্তির আবেশ। সব ক্লান্তি এক নিমেষে উধাও । তারপর আবার খেলা।   

আশপাশের ফুলের গাছগুলোতে অনেক ফুল ফুটে আছে। নানা রঙের প্রজাপতি উড়ছে কিন্তু ফুলগুলোর নাম না জানা। পাখিরা ডালে ডালে খেলা করছে। রুম্পা ভাবলো এই বাগানটার ছবি আঁকলে কেমন হয়। রাস্তার ধারে বসে মাটিতে আঁচড় কেটে নিজের কল্পনা মিশিয়ে এঁকে ফেললো ছোট্ট একটি হরিণ ছানারও ছবি। ওর এত্ত সুন্দর ছবি আঁকা দেখে সবাই জানতে চাইলো এটা কি? রুম্পা বললো, ‘আমদের বাড়ির পাশে মস্তবড় একটা চিড়িয়াখানা আছে। সেখানে খাঁচায় খাঁচায় বন্দী থাকে অনেক পশু পাখি। তারমাঝে ওর সবচেয়ে প্রিয় হলো চিত্রা হরিণ। এটা তারই ছবি।’ ওর কথা শুনে ওর বন্ধুরা বেশ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো, ‘তোমাদের পৃথিবী এত্ত সুন্দর?’

এমন প্রশ্ন শুনে টনি বেশ অবাক হয়েই বললো, ‘পৃথিবীটা কি আমাদের একার, তোমাদের না?’ ওরা সব্বাই একসঙ্গে বলে উঠলো, ‘না তো! পৃথিবী থেকে তো তোমরা দুজনেই চলে এসেছো বেশ কিছুক্ষণ আগে।’ টনি আর রুম্পা ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না পৃথিবী থেকে ওরা কোথাই বা চলে  এসেছে? খুব উতসুক হয়ে জানতে চাইলে ওরা বুঝিয়ে বললো এখন তাদের অন্য এক মাত্রার জগতে আগমন ঘটেছে। এ জগতটি হলো পৃথিবী থেকে আবার পরের জন্মে ফিরে যাবার বিরতিস্থান। হতে পারে সেই পরের জন্ম হবে পৃথিবীতে বা সেই গ্রহ ছেড়ে অন্য কোন গ্রহে। কিন্তু যেখানেই হোক না কেন প্রতিটি শিশুদের পৃথিবীর জীবন শেষ করে নতুন জীবনচক্র শুরু করবার অন্তর্বর্তীকালীন সময়টুকু এ জগতেই কাটাতে হয়। আর সেখানেই টনি আর রুম্পার অনুপ্রবেশ ঘটেছে তাদের অজান্তেই। পৃথিবী ছেড়ে তারা চলে এসেছে অনেক আগেই। কিন্তু কিভাবে এলো  এ প্রশ্ন করতেই ডি-ওয়ান বললো,

--তোমরা যখন ট্রি হাউজে খেলা করছিলে, তখন কি দেখেছিলে সুন্দর একটি বাগানের দৃশ্য? রুম্পা আর টনি সাথে সাথে বলে উঠলো, ‘নিশ্চয়ই। আর তা দেখেই তো আমরা হাঁটতে হাঁটতে প্রবেশ করলাম ঐ সুন্দর বাগানে।’ সবচেয়ে ফুটফুটে বন্ধুটি তখন বললো, ‘তারপর কি হলো জানো? যেইনা তোমারা ওই বাগানে প্রবেশ করলে সেই সময় তোমাদের ছোট ভাইটি দেখল তোমরা দু’জন ট্রি হাউজের জানালা দিয়ে নীচে ধপ্পাস। বাড়ির সকলে এসে দেখলো তোমাদের নিথর দেহ মাটিতে পড়ে আছে। তোমরা আর  বেঁচে নেই।’      

--তার মানে ? আমরা কি ওখানে মারা গিয়েছি।

-- মারা যাওনি। ডাইমেনশানের একটু পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু অতসত কি পৃথিবীর মানুষেরা বোঝে? একদমই না । কেঁদেকেটে বুক ভাসিয়ে সারাটা জীবন নষ্ট করে দেয়। ভেবে নেয় প্রাণহীন হয়ে যাওয়া মানে অজানায় হারিয়ে যাওয়া। তারাও তোমাদের নিয়ে এমনটিই  ভাবছেন এখন। তারা জানতেও পারছেন না যে তোমরা এই সুন্দর বাগানে খেলা করছো।’  

টনি আর রুম্পা বেশ অবাক স্বরেই বললো, ‘আমাদের এই সুন্দর বাগানে আসবার কথা কি বাবা মাকে জানানো যায়না?’ 

ডি-ওয়ান বললো, ‘মনে হয় না । কারণ তারা আছে মাত্র ত্রি-মাত্রিক জগতে আর আমরা যে তার থেকেও অনেক বেশী মাত্রায় আছি।  তারা আমাদের দেখতেও পাবে না, শুনতেও পাবে না, বুঝতেও পারবে না।’ 

রুম্পার  সাথে সাথে প্রশ্ন, ‘তাহলে আমরা এখন কত ডাইমেনশানে আছি?’ 

সব নতুন বন্ধুরা নিজেকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখিয়ে বললো, ‘ডাইমেনশন-১৩ তে। আর তাই ১৩ এর নীচে যতগুলো মাত্রার জগত আছে সব আমরা দেখতে পাই, অনুভব করতে পাই, কিন্তু তারা তা পারেনা। তোমরা যেমন ত্রি- মাত্রার ঘনক, দ্বি-মাত্রার তল আর একক মাত্রার বিন্দুর সংজ্ঞা জানো আমরাও তেমনি আরো বহুমাত্রিক  জ্যামিতিক আকারের সংজ্ঞা জানি যা অত ক্ষুদ্র পরিসীমায় তোমাদের ঐ পৃথিবী থেকে জানা সম্ভবই নয়।’

টনি বেশ অবাক হয়েই জানতে চাইলো, ‘আর  ১৩ ডাইমেনশানের চেয়ে  বেশী মাত্রা  যদি হয় তা কি তোমরা দেখতে পাও?’ 

ডি-ওয়ান বললো, ‘এই অন্তর্বর্তীকালীন জগতটির মাত্রা ১৩ বলেই এর বেশী মাত্রা আমাদের  জন্য অনুভবের উর্ধ্বে।পরবর্তীতে অন্য কোন গ্রহে অন্য কোন অবস্থায় কত মাত্রায় নতুন জীবনচক্র লাভ করবো তাও আমরা জানি না। কিন্তু এইটুকু নিশ্চিত যে আমাদের থেকে বেশী ডাইমেনশান সম্পন্ন সৃষ্টি এই মহাজগতেই আছে। তারা আমাদের ইন্দ্রিয়গোচর না হলেও আমরা তাদের পর্যবেক্ষণ ও তত্ত্বাবধানে সব সময়ই আছি।’

টনি আর রুম্পা আজ যেন অনেক কিছু ভাবতে পারছে নতুন করে। তারা নিমেষেই বুঝে ফেলেছে উচ্চ মাত্রার সৃষ্টি কিভাবে নিম্ন মাত্রাদের ওপর নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। কিন্তু সর্বোচ্চ কত মাত্রায় এই মহাজগত সৃষ্ট বলতে গিয়ে ডি-ওয়ান একটু থমকে গেল। ভেবে বললো, ‘হয়তো বা অসীম মাত্রার।’

টনি বললো, ‘অসীম কেন হবে, একটা সংখ্যা তো হবে।’ 

ডি-সেভেন বেশ উতসাহের সাথে এগিয়ে এলো। বেশ সবজান্তার ভঙ্গীতে বললো, 

--সংখ্যার হিসেবও তো এক এক মাত্রার জগতে এক এক রকম । পৃথিবীর মানুষদের হিসেব ০ থেকে ৯ পর্যন্ত। বাইনারি হিসেব ০ থেকে ১ পর্যন্ত। সুতরাং এ সংখ্যাতত্ত্বের কি শেষ আছে? এখানেও হিসেব অন্যরকম। কিন্তু তোমরা তো সদ্য এসেছো পৃথিবী থেকে তাই বোঝার সুবিধার্থে আমাদের নামগুলো ১ থেকে ১১ পর্যন্ত রেখেছি কারণ আমরা যে ১১ জন।

--কিন্তু তোমাদের কোন নাম থাকবে না সে জন্য?

--নামতো একটা বিশেষ্য। আমাদেরকে কি বিশেষভাবে বিশেষায়িত করার প্রয়োজন আছে?

--তাহলে কি আমাদের কোন বৈশিষ্ট্যও থাকবে না?

--প্রয়োজন কি আছে? আমরা যে পৃথিবীর মানুষদের দেয়া সকল বিশেষণের উর্ধ্বে।

--বাহ তাহলে তো সংগাই পালটে যাবে জীবনের।

--জীবনের নয়, অবস্থার। তোমরা দুজনেই এখন ট্রানজিশান অবস্থায় আছ। নতুন জীবন বাছাইয়ের সময় প্যারামিটারগুলো  আবার নির্ধারণ করে নেবে।    

-- তাহলে এবার যদি এ জগত থেকে আবার পৃথিবীতে ফিরে যেতে চাই, পারবো কি? 

-- না। কারণ এই সকাল থেকে যতক্ষণ পর্যন্ত এখানে খেলা করছো ইতিমধ্যে পৃথিবীতে তোমাদের অন্তেষ্ট্যিক্রিয়া সম্পন্ন হয়ে দুই যুগ পার হয়ে গিয়েছে। তোমাদেরকে ধারণকারী দেহ, মাটির সাথে মিশে বিলীন হয়ে গেছে। ওখানে তোমাদের পার্থিব কোন অস্তিত্ব অবশিষ্ট নেই। 

এই সময়টুকুতে দুই যুগ পার হয়ে গেছে ভেবে টনি আর রুম্পা হেসে ফেললো। কিন্তু ওদের কেন বয়স বাড়ছে না এ জগতে ? সময় কেন এগুচ্ছে না আর, কেন থেমে আছে? নিশ্চয়ই পৃথিবীর থ্রি-ডি স্পেসের দেহে আর আবদ্ধ নেই বলেই হয়তো বা। তাই বুড়ো হবার ও বালাই নেই। টনি বললো, ‘তাহলে আমরা এখন কি?’

--তোমরা এখন সত্তা। দেহবিহীন। এটাই তোমাদের পরিচয়। যদি তোমরা অন্য কোন গ্রহে যেয়ে মানুষের দেহ ধারণ কর তাহলে মানুষ হবে। অথবা অন্য কিছু, যা তোমার মন চাইবে। রুম্পা সাথে সাথে বললো, ‘আমি পৃথিবীতে গেলে ডলফিন হব আর সারাদিন জলের ভেতর খেলা করবো।’ শুনে ডি-১১  বললো, ‘জানো আমি তিনজন্ম আগে ডলফিন ছিলাম। তারপর ঘাস ফড়িং তারপর খরগোশ। সবগুলোই পৃথিবীর থ্রি-ডি স্পেসে।’   

টনির ইচ্ছে হচ্ছে একটু পৃথিবী থেকে ঘুরে আসতে। সাথে রুম্পাও প্রস্তুত। যেই ভাবা সেই কাজ। প্রথমেই হাজির হলো ওদের প্রিয় ট্রি-হাউজে। মনে হল যেন বহুদিন এখানে কেউ আসেনি। খেলনাগুলো ধুলোর পুরু আস্তরণে ঢাকা। জানালার পাশ দিয়ে চিড়িয়াখানাটা আর নেই। ওখানে হাউজিং সোসাইটির বিশাল অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিং গড়ে উঠেছে। সেই সকালেই না ওরা বেরুলো ওই ঝর্ণা দেখতে আর তারই মাঝে এত্ত পরিবর্তন। তর সইলো না ওদের বাবা মাকে দেখার। বাড়ির ভেতর প্রবেশ করতেই দেখলো লিভিং রুমে বসে রয়েছে একজন বৃদ্ধ আর একজন বৃদ্ধা। নিশ্চুপ তারা। কারা এরা? 

রুম্পা টনি কাছে যেয়ে দাঁড়ালেও টের পেলেন না তারা। ওরা চিনতে পেরেছে। ওনারা তাদেরই বাবা মা। সত্যিই সময়  বয়ে গেছে দুই যুগ। তাদের বার্ধক্যের ছাপ এবার তারই নিশ্চিত প্রমাণ। কাছে যেয়ে তাদের ডাকলেও তারা শুনতে পেলেন না। দেখতেও পেলেন না। কি করা যায় ভাবছে টনি। আর তখনই নীরবতা ভেঙে বৃদ্ধা তার স্বামীকে বললেন,

--আজ যেন ছেলেমেয়ে দুটোর কথা খুব বেশী বেশী মনে পড়ছে। মনে হচ্ছে ওরা যেন আমার খুব কাছেই আছে। 

রুম্পা টনি তো হেসেই সারা। ওরা তো ওদের মায়ের সামনেই দাঁড়ানো। কেন যে মা দেখতে পাচ্ছে না। আসলে ডাইমেনশান পরিবর্তনের এই এক ঝামেলা। একবার যদি পরিবর্তন ঘটে তাহলেই তাকে বলা হয় অন্তর্ধান। রুম্পা টনিরও এখন এই ডাইমেনশান থেকে অন্তর্ধান ঘটেছে। তাই তারা দৃষ্টিগোচর হচ্ছে না। যতই কাছ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকুক আর মা কে জড়িয়ে বসে থাকুকনা কেন কিছুই তাদের দৃষ্টিগোচর হবে না। 

বৃদ্ধা আবারো বলে উঠলেন, ‘জানো, বাচ্চা দুটো যেন আমার খুব আছে এসে বসেছে।’ বৃদ্ধ ভদ্রলোক এবার ধীর গলায় বললেন, ‘একটা অদ্ভুত ব্যপার কি জানো, তুমি যখন এমনটি ভাবছিলে, আমার মনেও ঠিক এমন চিন্তা এসেছে। আমরা যেন একই সময়ে একই কথা ভেবে চলছি নিজেদেরই অজান্তে।’ 

টনি একটু হতাশ। কিছুতেই বোঝাতে পারছে না যে সে তাদের বড্ড কাছে। রুম্পা এবার টনিকে সান্ত্বনা দিয়ে বললো, ‘আমরা অন্য জগতে, অন্য মাত্রায় আছি তো কি হয়েছে, আমাদের দেখতে না পেলেই বা কি।  দেখা বা শোনা তো চোখ আর কানের কাজ। তারা তো ঠিকই আমাদের অস্তিত্ব টের পেয়েছেন। পাননি?’ 

টনি মাথা নেড়ে সায় দিলেও চোখে তার প্রশ্ন, কিন্তু কিভাবে? 

অনুভবে। 

রুম্পার ছোট্ট একটি উত্তর যেন এবার নতুন বোধের জন্ম দিল।

অনুভবে। 

ঠিক তাই। 

অনুভবে। 

সত্তার অনুভবে।

সত্তা সবসময় অপরিবর্তনশীল  – তা যে কোন অবস্থায় হোক বা যে কোন মাত্রায়। 

তাই বাস্তব বিবর্জিত বলে মানব মস্তিষ্ক যখন প্রাকৃতিক ঘটনাবলীকে তুচ্ছ বিবেচনা করে, মানব মন তখনও তার সত্তার মাঝে সে সত্যকে অনুভব করে।          

Sunday, September 5, 2010

চিহ্ন

১

ব্রায়ান বেশ কিছুদিন ধরেই অনুসরন করছে জেমীকে। কারণ তেমন কিছুই না। অনেকদিন পর বাল্যবন্ধুকে ফিরে পাওয়ার আনন্দ। সেই ছেলেবেলায় জেমীর সাথে তার কতনা মজার দিনগুলো কেটেছে। সময় যদি হিসেব করে, তাহলে এখন হতে ৮০০০ পরের কথা। ক্যালেন্ডার অনুযায়ী সালটা হবে ১০,০১০. ব্রায়ান আর জেমী তখন অ্যান্ড্রামিডা গ্যালাক্সীতে হেসে খেলে কাটিয়ে দিচ্ছে তাদের ছেলেবেলা। ড্রইং খাতায় আঁকাআঁকি করছে অসংখ্য সব জ্যামিতিক চিত্র। কখনো চতুর্ভুজ, কখনো বৃত্ত অলংকৃত জটিল জ্যামিতিক নকশা। আর এখন? ছেলেবেলা অনেক পেছনে। কর্মক্ষেত্রে ছিটকে পড়েছে যে যার দিকে। এখন ব্রায়ান একজন গ্যালাক্সী রোমার। একজন টাইম ট্র্যাভেলার। জেমী একজন বিজ্ঞানী। তাই গ্যালাক্সী ভ্রমণের ফাঁকে ফাঁকে হঠাতই ব্রায়ানের মিল্কিওয়ের সন্ধান পাওয়া। তারই ধার ঘেঁষে যাবার সময় সৌরজগতের নীলসবুজে ছাওয়া পৃথিবী নামক গ্রহকে এক ঝলকে ভাল লেগে যাওয়া।

তারপর?

বর্তমান ১০০১০ সাল থেকে ৮০০০ বছর পেছনে এসে ২০১০ সালের টাইম পোর্টাল দিয়ে এই টাইম স্পেসে আগমন। পৃথিবীর থ্রিডি স্পেসের বৈশিষ্ট্যমন্ডিত জীবজগত দেখে ব্রায়ান মুগ্ধ। অবস্থাগত দিক দিয়ে সে আংশিক পদার্থ এবং আংশিক শক্তিরূপে থাকতে বেশী স্বাচ্ছ্যন্দ বোধ করে, যা কিনা একটু অন্যরকম হলেও পৃথিবীতে তার ভালই লাগছে। তবুও সে কি জানতো তার জন্য অপেক্ষা করছে কি অসম্ভব এক চমক? পৃথিবী ভ্রমণে হঠাতই তার ফ্রিকোয়েন্সি ডিটেকটর সনাক্ত করে ফেললো তার ছেলেবেলার অ্যান্ড্রামিডান বন্ধু জেমীকে।

জেমী এখানে? এই থ্রি-ডি স্পেসে? এই সময়ে?

ব্রায়ানের উপস্থিতি কি সে টের পাবে? দুঃসাধ্য ব্যপার হবে ওর জন্য । প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে এ সময়কার সবকিছু এত পেছানো যে তার মাঝে জেমীর বাস্তবতা তার ৮০০০ বছর পরের স্মৃতিকে ধারণ করতে পারবে বলে মনে হয়না। জেমী বড়জোর তার বোধ বা অন্তর্দৃষ্টির দিক দিয়ে অন্যদের তুলনায় অনেক বেশী আগানো থাকতে পারে, যার নাগাল হয়তোবা কেউই পায় না এপৃথিবীতে। শুধু ব্রায়ান বা তাদের মতো অতি আধুনিক মানুষগুলোই তা টের পায়। তাই জেমীকে জেমীকে চিনতে পেরেছে সে এক নিমেষে। মনে পড়ে গেছে তার ছেলেবেলাকে।

এই তিন মাত্রা হতে আরো ৩০ মাত্রা বেশী এমন এক জগত থেকে ব্রায়ান এসেছে বলে তার পক্ষে এত নিম্ন মাত্রার বৈশিষ্ট্য ধারণ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। পার্থিব রূপ যে এত কঠিন জানা ছিল না ব্রায়ানের! তবুও ব্রায়ান জানাতে চায় তার উপস্থিতি জেমীকে।

ঘড়ির সময় অনুসারে এখন রাত ১২ টা ।

তারিখ ০৮.০৮.২০১০

টরন্টোর রাস্তায় জেমী তার সাদা গাড়ীটা নিয়ে এদিক সেদিক ঘুরে বেড়াচ্ছে। ব্রায়ানের বড্ড ইচ্ছে করছে ওর কাছে যেতে। অনুসরণ শুরু করলো একটা কালো গাড়ী নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ। মিনিট দশেক তো হবেই। সাবধানী দূরত্ব বজাই রাখছে সতত। কিন্তু জেমী কি টের পেয়েছে তাকে এ অনুসরণের? হঠাত আচমকা জেমী ডান দিকে মোড় নিল। নিরুদ্দেশ হয়ে গেল সাথে সাথে। জেমীর এই সূক্ষ্ম ‘হঠাত’ এর হিসেব ব্রায়ান ধরতে পারেনি। তাই হারিয়ে ফেলল জেমীকে। পরাজয়ের আনন্দ মেনে নিল ব্রায়ান আজ রাতের জন্য। কিন্তু কাল সকালে ও আবারো জেমীকে অনুসরণ করবে। ওকে জানানোর জন্য আরো কিছু করবে। মন চাইছে ছেলেবেলার ছবিগুলো এঁকে ওর সামনে হাজির করতে। পারবে কি জেমী ওসব ছবির কথা মনে করতে। নিশ্চয়ই না। কিন্তু ব্রায়ান রেখে যাবে ওর আঁকা চিহ্ন ওর বন্ধুর জন্য এ পৃথিবীর বুকে। পরদিন সকাল পেরিয়ে বিকেল। ব্রায়ান লক্ষ্য করলো জেমীর গাড়ি পার্ক করা আছে ড্যানফোর্থ এভিনিউর গ্রোসারী স্টোরের সামনে। কাছে গেল। কিছু একটা লিখে দেবে কি? কিন্তু ওর লেখা অক্ষরগুলো কি জেমী চিনতে পারবে? আজ হতে ৮০০০ বছর পর জেমী যে ভাষায় কথা বলে ভাব বিনিময় করতো তা এখন ভাবাও যে জেমীর কাছে কল্পনাতীত কল্পনা। ব্রায়ান গাড়ীর কাছে যেয়ে তার উইন্ডশীল্ডে আঁকলো ছোট্ট একটা আয়তক্ষেত্র। আর ঐ জায়গাটুকুকে প্রকট করার জন্য বসিয়ে দিল ধূলোর পুরু আস্তর। ঠিক মাপ মতন ধূলোর প্রলেপ একটি নিখুঁত আয়তাকার অঞ্চল জুড়ে জেমীর দৃষ্টি এড়ায় নি। ছোট্ট আয়তাকার ধূলোর ছাপ দেখে সে বেশ অবাকই হয়েছে। সারা গাড়ীতে কোথাও যেখানে ধূলোর উপস্থিতি নেই যেখানে সেখানে মাপ মতন নিখুঁত ধূলোর আস্তর এলো কিভাবে? জেমী জানতেও পারলো না এ যে তারই ভবিষ্যতের ছেলেবেলার বন্ধুর রেখে যাওয়া চিহ্ন।

২

আজ সময় ২৯শে জুলাই, ২০১০

জাপানী তেল বহনকারী জাহাজ ‘এম স্টার’ আরব আমীরাতের ফুজাইরাহ বন্দরে নোঙর করেছে। মাত্র সকাল এখন। ব্রায়ান বেশ কিছুক্ষণ ধরে লক্ষ্য করছে জাহাজটিকে। ইচ্ছে করছে জাহাজে একটা আঁচড় কেটে দিতে। বেশী গভীরে প্রোথিত এমন নয় তাহলে জাহাজের ফাটলে ওদের ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। তাই হালকা একটা কিছু । না হয় জ্যামিতিক কোন চিহ্ন। ব্রায়ান জাহাজের পেছনে নীচের দিকে এঁকে ফেললো বিশাল এক চতুর্ভুজ। দেখে মনে হচ্ছে যেন জাহাজের উপরিতল কোন চারকোনা কঠিন বস্তুর আঘাতে বা চাপে টোপ খেয়ে বেশ ভেতর ঢুকে আছে।


এ যেন এক দক্ষ কারিগরের হাতে তৈরী খুব হিসেবী কায়দায় আঁকা সুণিপুন একটি চতুর্ভুজ সম ভেতর বসে যাওয়া অঞ্চল বিশেষ, যার ধাক্কায় জাহাজের ভেতরের দেয়ালের সকল জিনিসপত্র ছিটকে এদিক সেদিকে পড়ে গেছে সমস্ত ঘরময়। সকল আসবাবপত্রকে স্থানচ্যুত হয়েছে এক নিমেষে। এই শব্দহীন সংঘর্ষের কারণ যদিও অজানা, কখন বা কিভাবে এমন হলো তারও প্রমাণ নেই, তাই জাহাজ কর্তৃপক্ষ সঠিক কোন বিশ্লেষণ দিতে অপারগতা প্রকাশ করলেন মিডিয়ার সামনে। খবরটি ইয়াহু'র প্রথম খবর হয়েছে আজ। ব্রায়ান হাসছে আর ভাবছে জেমী দেখবে জাহাজের গায়ে প্রোথিত জ্যামিতিক চিত্রটি কিন্তু মেলাতে কি পারবে এবারের আঁকা এই চতুর্ভুজটিকে তার গাড়ীর উইন্ডশিল্ডের ওপরে আঁকা ছোট্ট সেই চতুর্ভুজের সাথে? এই বিশালাকৃতিটির সাথে সেটার তুলনা চলে না। কিন্তু এ যে ব্রায়ানেরই আঁকা আরেকটি জ্যামিতিক ছবি, তার এঁকে রাখা চিহ্ন।

৩

তখন সময় ১লা জুন ২০১০

গুয়েতেমালা শহরের কেন্দ্রে ৬৬ ফুট ব্যাসার্ধের একটি বৃত্ত আঁকলো ব্রায়ান। প্রায় ১০০ ফুট গভীর করে সুনিপুণ হাতে তার কম্পাস দিয়ে এঁকে ফেললো এই গোলাকার চিত্র। মাটি ক্ষয়ে সৃষ্টি হলো সিঙ্ক হোলের। পৃথিবীর বাসিন্দারা অবাক হয়ে দেখলো প্রকৃতির খাম খেয়ালীপনা, যা তাদের বোধগম্যেরও উর্ধ্বে। তবুও বিশ্লেষকরা মতামত দিলেন এই বলে, যে মৌসুমী ঝড় আগাথা-র নিয়ে আসা অঝোর বৃষ্টিই শহরের মাটি ধুয়ে এই সিংক হোলে সৃষ্টি করেছে।

কারন হিসেবে তারা যে ব্যাখ্যাই দেকনা কেন ব্রায়ান বেশ আনন্দিত। ভাবলো তার ছেলেবেলার বন্ধুকে দেখাবার জন্য আরও ছবি আঁকবে সে এ পৃথিবীর বুকে। তৈরী করবে অনবদ্য ক্রপ সার্কেল ডিজাইন। তাই যেই ভাবা সেই কাজ। চলে গেল সময়ের ২০০৯ সালের জুলাই মাসে। ও সময়ের গ্রীষ্মকালের আবহাওয়া ব্রায়ানের এই ছবিটা আঁকবার জন্য খুব উপযোগী বলেই এ সময়টা বেছে নিয়েছে।

স্থান ইংল্যান্ডের উইল্টশায়ার আর অক্সফোর্ডশায়ার। ক্রপ সার্কেলের জন্য জায়গা দুটির বেশ সুনাম হলেও খামার চাষীদের জন্য মাথায় বাড়ি। প্রকৃতির খামখেয়ালী চিত্রে চিত্রিত হয়ে কার জমির কতটুকু অংশ এ গ্রীষ্মে বিনষ্ট হবে তা আগভাগে কেউই যে আঁচ করতে পারেনা। আর অংকিত চিত্র ফুটে ওঠে রাতের গভীরে মিনিট খানেকের মাঝে। এ যে অদৃশ্য এক চিত্রশিল্পীর অপ্রতিরোধ্য খেয়ালের তাড়নায় সৃষ্ট কিছু চিত্রকর্ম। আজ ই শুধু নয়, বহু বছর ধরেই তো এমন হয়ে আসছে। কিন্তু কে সেই অদৃশ্য চিত্রকর? কার আঁকা এত সুনিপুণ চিত্রকর্ম? এবারের আঁকিয়ে ব্রায়ান। কিন্তু তারা কি তা জানে? আজ অক্সফোর্ডশায়ার সে এঁকেছে ৬০০ ফুট লম্বা একটি জেলিফিশ। ইয়েটসব্যারি, উইল্টশায়ারের শস্যক্ষেত্রে এঁকেছে ১৫০ ফুট দীর্ঘ ড্রাগন ফ্লাই। এবারের চিত্রিত ক্রপ সার্কেলগুলো সবার কাছে ভিন্ন মাত্রার আঙ্গিক সৃষ্টি করেছে। কারণ, বরাবরের মতো এ যে সাদামাটা গোল বা সরল রেখা বা চারকোনা ডিজাইন নয়। এ যেন জ্যামিতিক আকারের বিচিত্র জটিল সজ্জা, গাণিতিক মাপে মাপে যার নিখুঁত বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু আবারো সকলের মনে সেই একই প্রশ্ন কে এই অদৃশ্য আঁকিয়ে।

 

অ্যান্ড্রমিডা থেকে আসা ব্রায়ানকে তারা কেউ চিনবে না। খেলার ছলে তার কত না চিহ্ন সারা পৃথিবীর বুক জুড়ে সে রেখে

যাবে।

এখন তো ব্রায়ান প্রৌঢ়ত্বের দ্বারপ্রান্তে। সময় চলে গেছে অনেক। বাল্যবন্ধু জেমী চলে এসেছে ৮০০০ পেছনের ত্রিমাত্রিক জগতে। ব্রায়ান রয়ে গেছে তার অশরীরীয় ৩৩-মাত্রার জগতে। জেমীর কল্পনার উর্ধ্বে এসব উর্ধ্বমাত্রার জগত। কিন্তু জেমী যে তার ভবিষ্যতের সেই জগত থেকেই আসা, যেখানে আলোর একটু ঝলকানির মতো ঘটে উর্ধমাত্রার প্রাণীদের নিছিক কোন খেয়ালী কর্মকান্ড। পৃথিবীবাসী মানুষগুলো ব্যাখ্যাতীত এসব ঘটনায় অভিভূত হয়ে যায়। ওদের অনুভূতি যে একেবারেই ভোতা নয় তার প্রমাণ ব্রায়ান পেয়ে যায় বেশ জোরেসোরেই। যে কোন অতিপ্রাকৃত ঘটনায় তাদের মাঝে হৈচৈ পড়ে যায়। ব্রায়ান খুব পুলকিত হয়। কিন্তু তবুও জেমী যে তার ধরা ছোঁয়ার বহুদূরে। জেমীকে তার সময়ের কাঠামোতে আবার ফিরে পেতে হয়তোবা আরো অপেক্ষার প্রয়োজন হতে পারে ব্রায়ানের, যখন জেমী এ সময়ের খেলা সাঙ্গ করে আবারো মিলিত হবে ব্রায়ানের টাইম-স্পেসে কোন এক অদূর ভবিষ্যতে।

০৬/০৯/২০১০

Monday, August 16, 2010

নিকষ কালো


১

মারফির ঘুমটা ভেঙে গেল প্রচন্ড এক বিস্ফোরণের শব্দে। টেবিল ক্লকে সময়টা দেখবার চেষ্টা করলো। রাত ১ টা বেজে ৪৫ মিনিট। জানালার পর্দা সরিয়ে বাইরে চোখ রাখলো। ইচ্ছে করছে বাইরে যাবার, কিন্তু সে উপায়ও নেই। ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহ। প্রচন্ড শীতে আবৃত হয়ে আছে টরন্টোর কাছে মিসিসাগা শহরটি। কিন্তু বাইরে কি হলো ভেবে আর ইচ্ছে করছে না ঘরে বসে থাকতে। বাইরে বেরুতেই হবে। শীতের জ্যাকেটটা গায়ে দিয়ে মারফি বেরিয়ে এলো ওর অ্যাপার্টমেন্ট থেকে। দূরের নিকষ কালো আকাশে রক্তিম আভা। দু’ব্লক পরেই রয়েছে একটা নির্মানাধীন বাড়ি। সেখানেই কি কিছু হলো? এই শীতে তুষার পাড়িয়ে মারফি হাজির হলো ৪১০ নম্বর ব্র্যাম্পটন হাইওয়ের কাছে। বিধ্বস্ত হয়েছে পুরো বাড়ীটা। নির্মানাধীন বলে লোকজন কেউই ছিল না এতরাতে। তাই হতাহতের সংখ্যা শূন্য। কিন্তু ১ মিলিয়ন ডলারের ক্ষয়ক্ষতির কারণ নির্ধারণে যদি পুলিশরা সফল না হয়  তাহলে এরকম অগ্নিকান্ডের শঙ্কা দিন দিন বৃদ্ধিই পাবে।

তারিখ ২২শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৯

একটি ডকুমান্ট ওপেন করলেন সার্জেন্ট ক্রিস হ্যারি।সময় রাত ২ টা বেজে ৩৫ মিনিট। ফাইলটির প্রথম লাইনে লিখলেন দুটি শব্দ।

‘সন্দেহজনক অগ্নিকান্ড’

দ্বিতীয় লাইনে, ‘স্থান ৪১০ নম্বর ব্র্যাম্পটন’

তৃতীয় লাইনে কিছুই পেলেন না লেখার মত। কারণ কোন তথ্যই তার দল উদ্ধার করতে পারেনি এ যাবত। কিছুক্ষণ ভেবে উইন্ডোজ বন্ধ করতে গিয়ে দেখলেন আরেকটি ফোল্ডার।  নাম ‘উইপিপেগ।’ এ ফোল্ডারটিও শূন্য। কোন তথ্যই এ পর্যন্ত জোগাড় হয়নি। উইনিপেগের ১৪০০ বাসিন্দা ২০০৯ এর গোড়ার দিকে তাদের রাতের আকাশে সিগার আকৃতির শব্দবিহীন একটি স্পেসক্রাফট উড়ে যেতে দেখেছিল। শুধু মানুষের চোখে নয়, র্যা ডারেও এর অস্তিত্ব ধরা পড়েছিল। কিন্তু তদন্তের ফলাফল শূন্য। খানিকটা আনমনা হয়েই সার্জেন্ট হ্যারি উইন্ডোটি বন্ধ করে দিলেন। পাশে রাখা ব্রিফকেসটি তুলে নিয়ে কাঁচের দরোজা ঠেলে বেরিয়ে এলেন অফিস থেকে। আজ আন্ডার গ্রাউন্ড ট্রেনে বাড়ি ফিরবেন। গাড়ীতে ড্রাইভ করে বাড়ি ফিরতে সময় লাগে দু’ঘন্টা আর ট্রেনে যেতে বিশ মিনিট। 

শহরের শেষ প্রান্তে তার বাড়ী। এই মিনিট বিশেক দূরন্ত ট্রেনে বসে থাকতে গিয়ে মাঝে মাঝে হাঁপিয়ে উঠেন তিনি। তখন পত্রিকা বা বই হয় তার সঙ্গী। কিন্তু আজ কিছুতেই মন বসছে না বইতে। একটার পর একটা আনসলভড মিস্ট্রি আর ভাল লাগছে না। মাথায় হাত রেখে জানালার কাছে হেলান দিয়ে বসে এসব কথা  ভাবতে ভাবতে হঠাতই জানালার কাঁচ দিয়ে বাইরে তাকালেন। মাটির নীচের সুড়ঙ্গ ধরে নিকষ কালো অন্ধকারে পাতাল রেল ছুটে চলছে এক অসম্ভব গতিতে। আজ যেন ট্রেনের গতিটা একটু বেশি মাত্রায় অস্বাভাবিক ঠেকছে।

ট্রেন চালক জন স্টুয়ার্ট স্থির মনোনিবেশে ট্রেনের গতি নিয়ন্ত্রণ করছেন। নাইট শিফটে তিনি এ কাজের সাথে যুক্ত আছে দীর্ঘ ২১ বছর ধরে। প্রতিদিন একই রুটিন । শহরের একপ্রান্ত থেকে যাত্রী অপর প্রান্তে পৌঁছে দেয়া। ঘড়িতে সময় দেখলেন রাত ২ টা বেজে ২০ মিনিট। সামনে তাকালেন আবার। কিন্তু কেমন যেন মনে হল, যেন সামনের অন্ধকারটুকু আর তার কাছে প্রতীয়মান হচ্ছে না। এ যেন আরো অনেক বেশী কালোয় ছেয়ে যাওয়া এক অচেনা অন্ধকার।  এত নিকষ কালো আধাঁর তিনি আগে কখনো দেখেন নি। সুড়ঙ্গ পথের বাতিগুলো কি সব নিভে গেল নাকি? কিন্তু কেন তা হবে? পাওয়ার ফেইলিওর এর তো প্রশ্নই আসেনা। তাহলে তো ট্রেন চলাই থেমে যেত। জানালা খুলে আশপাশ বুঝার চেষ্টা করলেন। খুব হালকা মনে হচ্ছে নিজেকে। অনেকটা যেন ওজনহীন। চলার পথে লোহার পাতের সাথে চাকার সংঘর্ষে যে বিকট শব্দ সৃষ্টি হয় তাও যেন শোনা যাচ্ছে না। অথচ ট্রেন তো  চলছে অবিরাম গতিতে। আর মাত্র তিন মিনিট। তারপরই যাত্রী নামিয়ে ফিরতি পথে রওনা হবেন জন। আর বাড়ির পথে পা বাড়াবেন সার্জেন্ট হ্যারি। এত রাতে উনি ছাড়া কোন যাত্রীও নেই এই ট্রেনে। 

কর্মক্লান্ত বেলা পেরিয়ে এই বাড়ি ফেরার মুহূর্তটি ভীষণ ভাবে উপভোগ করেন সার্জেন্ট। মাত্র তো আর তিনটি মিনিট। আবারো ঘড়ি দেখলেন তিনি। সময়টা পেরুতে চাইছে না কেন? এমন মনে হচ্ছে কেন, যেন সময় আজ মান করে তার চলা থামিয়ে ঠাঁয় বসে আছে। আজ যেন সে কিছুতেই এগুবে না। ঘড়ির দিকে আবারো চাইলেন তিনি। কাঁটা যেন হঠতাই থেমে গেছে। বেশ খানিক্ষণ আগে দেখলেন রাত ২ টা বেজে ২০ মিনিট। এখনও তাই? ভুল দেখেননি তো? কিন্তু তা কি করে হয়? বিশ মিনিটেই বাড়ি পৌঁছে যান তিনি। আর সে সময় তো এতক্ষণে পারও হয়ে গেছে। তাহলে ঘড়ি কি সময়ের হিসেব আর করতে পারছে না, নাকি তার হিসেবে ভুল হচ্ছে? বড্ড যেন দীর্ঘ মনে হচ্ছে আজকের এ যাত্রা। কোন ভাবেই যেন পথ আর শেষ হতে চাইছে না। নিজেকে অসম্ভব হালকা ঠেকছে নিজের কাছে। জানালার কাঁচ দিয়ে বাইরে তাকালেন আবার। ট্রেনটা যেন উন্মত্ত গতিতে ছুটে চলছে। কিন্তু কোথায়, কোন গন্তব্যে? তার বাড়ীর স্টপেজই তো শেষ স্টপেজ। এই স্টপেজ ছাড়িয়ে ট্রেন তো আর এগুবে না। ফেরত আসবে মিসিসাগা শহরে। বিরামহীন এ ছুটে চলা তাহলে কেন?  কোন উদ্দেশে ? এমারজেন্সী বাটনে চাপ দিলেন ট্রেন থামানোর সংকেত দিয়ে। সময় আরো কিছুক্ষণ পার হলো কিন্তু থামার নাম নেই। সংকেত দেখে গতি কমানোর চেষ্টা করলেন ট্রেন চালক। সামনে তাকালেন। নিকষ কালো আধাঁরে অসংখ্য ঘন কালো বুদবুদ ভেসে বেড়াচ্ছে তার চারিদিকে। অদৃশ্য এক শক্তি যেন টেনে নিয়ে যাচ্ছে মোহনীয় আকর্ষণে আরো গহীনে তার নিজের ভেতরে সীমাহীন ঘন অন্ধকারে। যতই সামনে এগুচ্ছে ততই যেন ট্রেনের গতি বেড়ে চলছে। অথচ পথ যে শেষ হচ্ছে না। চালক জন স্টুয়ার্ট  চমকে উঠলেন ব্যপারটা খেয়াল করে। তিনি তার ট্রেন সহ কি মিশে গেছেন অন্য কোন জগতে নাকি প্রবেশ করেছেন ব্ল্যাকহোলের অজানা সুড়ঙ্গপথে? এর কেন্দ্রের সীমাহীন আকর্ষণে এ যাত্রার গতিরোধ তো তাহলে অসম্ভব ব্যপার। কিন্তু কি ভাবে এমন হল?  কার ইশারায়? হায় ইশ্বর!

মোবাইলে কল করলেন একমাত্র যাত্রী সার্জেন্ট হ্যারিকে। কিন্তু কি আশ্চর্য, বৈদ্যুতিক তরঙ্গগুলো যেন তাদের অবস্থান থেকে নড়তে চাইছে না। ফোনটা বাজছে না। অথচ ট্রেন থামাবার সংকেত তো ঠিকই জ্বলে উঠেছে। উপায় না দেখে জন পেছনের দরজা দিয়ে যাত্রী কক্ষে প্রবেশ করলেন। কক্ষটি বেশ প্রশস্ত হওয়া সত্ত্বেও আজ কেন জানি একে আকারে লম্বাটে আর সরু দেখাচ্ছে। সার্জেন্টকে দেখে একটু অবাকই হলেন তিনি। আজ তাকে এতটাই লম্বা দেখাচ্ছে যেন মনে হচ্ছে তার দীর্ঘ অবয়ব ট্রেনের ছাদ ছুঁয়ে ফেলবে। ব্ল্যাকহোলের তীব্র মহাকর্ষীয় বলের চাপে বস্তু তার আকৃতিও হারাবে এমন কথা তিনি কোথায় যেন পড়েছিলেন। শুধু আকৃতি হারানোই নয়, বস্তু প্রচন্ড চাপে পিষ্ট অবশেষে বিলীন হয়ে যাবে অসীমতায়। কিন্তু এগুলো তো বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব যা শুধু বইয়ের মাঝে গাণিতিক সমীকরণে সীমাবদ্ধ থাকে। বাস্তবে কি হয়? বস্তু আসলেই কি আকার পরিবর্তন করতে করতে চিপসে যেতে পারে? এ প্রশ্ন ট্রেনের একমাত্র যাত্রী সার্জেন্ট হ্যারির মনেও উদয় হল ঠিক একই সময় যখন কিনা ট্রেন চালক জন স্টুয়ার্ট তা সামনে এসে দাঁড়ালেন। এই মাঝারী গড়নের গোলগাল  লোকটি কেমন যেন চিপসেটে হয়ে তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু এমন মনে হবেই বা কেন। নির্ঘাত দৃষ্টিভ্রম। দুজনেরই দৃষ্টিভ্রমে দেখতে পাওয়া দুজনের প্রায় বিলীন অবস্থা আজ বাস্তব হয়ে যে তাদের সামনে ঠাঁয় দাঁড়িয়েছে তা তারা ভাববার দুঃসাহসও করলেন না। অথচ দুজনের অস্তিত্ব , অনুভূতি এখনই যে হারাবার দ্বারপ্রান্তে। এ উপলব্ধির আগেই কৃষ্ণগহবরে নিপতিত তাদের ট্রেনটি পাতলা কাগজের মতন এক সমতল বস্তুতে পরিণত হলো এবং আরো সংকুচিত হয়ে কুঁকড়ে বিন্দুসম আকৃতি ধারণ করে কৃষ্ণগহবরের রাহুগ্রাসে নিপতিত হলো। শহরের সকলে পরেরদিন আরেকটি খবরে বিস্মিত হলো। আর তা হলো-গতকালের রহস্যময় অগ্নিকান্ডের পর তদন্তকারী পুলশ অফিসার নিরুদ্দেশ । শুধু তাই নয়। নাইট শিফটের ট্রেন চালক জন স্টুয়ার্ট ও তার  যাত্রীগামী পাতাল রেলেরও হদিস পাওয়া যাচ্ছে না।

২

সকালের খবর পড়ে মারফির মন কিছুটা খারাপ হয়ে গেল। ৪১০ নম্বর ব্র্যাম্পটনের অগ্নিকান্ডের সূত্রপাত নির্ণয় অসম্ভব হতে পারেনা। জানার সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে কিন্তু কারণ নিশ্চয়ই আছে। আর সেই পুলিশ অফিসারের নিরেদ্দেশ হয়ে যাওয়া তদন্তের ঠিক পরপরেই-এ যেন আবছা একটা যোগসূত্র তৈরী করে ফেলেছে। যারাই অগ্নিকান্ড ঘটাক না কেন তারাই চায় না এর তদন্ত হোক। তাই পাতাল রাস্তা ধরে ছুটে চলা ট্রেনটিকে উধাও করে দিয়েই তারা যান সর্বান্তকরণে নিশ্চিত হয়েছে এ তদন্তের সীমারেখা টেনে দিতে। আর সেই পাতাল রেলের  সুড়ঙ্গপথে প্রবেশের এক অদম্য ইচ্ছা এখন মারফিকে পেয়ে বসেছে। যাবে সে ওখানে যেভাবেই হোক। না হয় প্রয়োজন হলে রেল ইঞ্জিনিয়ারের ছদ্মবেশ ধরেই প্রবেশ করবে ওই প্রবেশ নিষেধ এলাকায়। এসব আকাশ পাতাল চিন্তা করতে করতেই মারফি তার গাড়ীটার স্টার্ট অন্‌ করলো। 

গাড়ীটা স্টার্ট নিতে গিয়েই থেমে গেল। আবারো চেষ্টা করলো। সবই ঠিক ঠাক কিন্তু তারপরও গাড়ী যেন কিছুতেই স্টার্ট নিচ্ছে না। যেন আজ তার মন চাইছে না মারফিকে নিয়ে অজানা গন্তব্যের উদ্দেশ্যে যাত্রা করতে। বেশ কিছুক্ষণ চেষ্টা করে মারফি সিদ্ধান্ত নিল পায়ে হেঁটেই যাবে ঐ স্পটে যেখানে পাতাল সুড়ঙ্গ পথের সূচনা হয়েছে। গাড়ীর দরজাটা লক্‌ করে ঘুরে দাঁড়াতেই হোঁচট খেল কিসের যেন একটা হ্যাচকা টানে। ওর কোটের আস্তিনটা দরজার ভেতরে আটকে আছে। এমন কেন হচ্ছে? যেন তার প্রিয় মন্টিকার্লো- ২০০৩  তাকে আটকে রেখে আজ বারণ করছে কোথাও যেতে। মারফি হেসে ফেলল নিজ মনে। গাড়ী কি মানুষ নাকি যে বাধা দেবে, নিষেধ করবে, বারণ  না শুনলে জামার আস্তিন ধরে আটকানোর চেষ্টা করবে। নিশ্চয়ই নয় । অথচ প্রাণহীন জড় মন্টিকার্লোর দেহের অভ্যন্তরস্থ পরমাণুগুলো তো স্পন্দনহীণ নয়। সে স্পন্দনে অনুরণন আছে। সেই অনুরণনে যদি তৈরী হয় অনুভূতিসম্পন্ন বোধ তার প্রভাব কি অনস্বীকার্য? আর এ বোধ  যদি পরিচালিত হয় প্রকৃতির নির্দেশে তাহলে নির্দেশ গ্রহণ ও পালন করবার মতো ক্ষমতাও প্রতিটি বস্তুকণার রয়েছে তা সে জড়ই হোক আর জীবই হোক। তাই বুঝি মন্টিকার্লো তার অনুভূতি দিয়ে আজ ঠিকই আঁচ করতে পেরেছে কিছু একটা ঘটবার। মারফির যাত্রাপথকে রোহিত করছে তাই বারবার, বেশ কয়েকভাবেই। কিন্তু মারফি কি সেই সংকেত অনুধাবন করতে পেরেছে, যাতে ছিল মারফিকে বলা অনেকগুলো কথা । যেখানে বলা হয়েছে পাতাল রেলপথের অস্বাভাবিকতার কথা, যা কিনা সেই সুড়ঙ্গকে ঠেলে ক্ষণিকের জন্য হলেও যুক্ত করে ফেলে ছায়াপথের কেন্দ্র বরাবর ঠিকানাবিহীন অন্য কোন ডাইমেনশানে, যে কিনা নিমেষে শুষে নেয় সবকিছুর অস্তিত্ব, হরণ করে সকল অনুভব । যেখানে অচকিতে স্থানান্তর ঘটে যায় অন্য কোন জগতের সাথে, যেখানে আজই  প্রবেশ করেছেন সার্জেন্ট ক্রিস হ্যারি তার কাজের রহস্য কিনারা না করতে পেরেই। যেখানে প্রবেশ করেছেন ট্রেন চালক জন স্টুয়ার্ট কিছু না জেনেই। যে জগতে নেই আলো, শুধুই অন্ধকার। যে জগত নিকষ কালো, জীবনের ওপার। যেখান থেকে আর ফেরা যাবে না। কিন্তু তারা জানবেও না তাদের এ যাত্রা অন্তহীন, সময়ের উর্ধ্বে। আজ মারফিও যাবে সেখানে । প্রবেশ করবে সেই জগতে। প্রকৃতি বোধহয় তা চাইছে না, তাই বাধা দিয়েছে বারবার । কিন্তু মারফির তীব্র কৌতুহল তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে সেই অজানা উদ্দেশে তারই অজান্তে।

   শেষ।


Friday, June 11, 2010

মোহনা

 

১

জুলাই ৭, ২০০৬

আজ সকালেই এরিক এসে পৌঁছেছে। তার আগমন ২২ লক্ষ আলোকবর্ষ দূর থেকে। দৈহিক গঠণের দিক দিয়ে এই পৃথিবী নামক গ্রহের হোমো স্যাপিয়েন্স নামক প্রজাতির সাথে মিল রেখেই সে এখানে পদচারণা করবে। এতে সবার সাথে মিশে যেতেও সুবিধা হবে। এ সবের তার প্রয়োজন ছিলনা। তার মিশন সাক্সেসফুল করার জন্য কিছুরই প্রয়োজন ছিলনা। তারপরও ভাবলো... মন্দ কি! যদি কিছুক্ষণ এদের মতন হয়ে থাকা যায় , নাহয় থাকলামই। আর মোহনাও তেমন ভয় পাবেনা। আতঙ্কিত হবে না। মোহনার সাথে কথাবার্তা বলার জন্যও অন্তত এই অবয়বেরর প্রয়োজন আছে। তাই এত আয়োজন।

মোহনা বেশ কিছুদিন ধরেই অসুস্থ। ওর শরীরের রক্তকণিকাগুলো ভেঙে ভেঙে একাকার হয়ে যাচ্ছে। বুঝি তার শেষ সময় উপস্থিত। খুব বাঁচতে ইচ্ছে ছিল তার। কিন্তু অসুখটা এত দেরীতে ধরা পড়েছে যে আর কোন চিকিতসাই সম্ভব নয়। তারপরও দু’ দু’বার কেমোথেরাপি দেয়া হয়েছে। আরো বাকী চারটি। ছয়টি কেমোথেরাপির ধকল সইতে পারবে বলে অন্তত সে মনে করে না। পরিবারের সকলেই এখন বলছে  দেশের বাইরে  কোথাও নিয়ে যেতে। কিন্তু অসুস্থতা বাড়ার সাথে সাথে শরীরটা বেশ দুর্বল হয়ে পড়েছে। ভাল মত বসে থাকারও শক্তি যেন দিন দিন লোপ পাচ্ছে। ওর ইচ্ছে করে না আর চোখ মেলে তাকাতে, তার চির চেনা পরিচিত আশপাশ দেখতে। খুব যেন ক্লান্তি। সারা রাজ্যের ক্লান্তি যেন এক হয়ে জড়ো হয়েছে আজ। 

জুলাইয়ের ৭ তারিখ আজ। তারিখটা বেশ মজার। সাত সাত। সালটাও ২০০৭ হলে আরো ভাল হতো। কিন্তু ২০০৭ এর সাত সাতের সমারোহ মোহনার আর বুঝি  দেখা হবে না। সামনের বছরের এইদিন তো দূরে থাক সামনের মাসের ৭ তারিখ, ও পার করতে পারবে কিনা সন্দেহ। তারপরও সংখ্যার খেলা তাকে পুলকিত করে। এত ক্লান্ত শরীরে চিন্তার যেন কোন কমতি নেই। মনটা যেন ছুটে বেড়ায় দেশ থেকে দেশান্তরে। আপন মনের ভাবনাগুলো খুব দ্রুত গতিতে এগোয় কিন্তু শরীরটা আর মানছে না। ধীর পদক্ষেপে যে ক্ষয়ের শুরু হয়েছে আজ হতে পাঁচ বছর আগে তার পরিণতি শুধুমাত্র শেষ হয়ে যাওয়া। হায়রে জীবন! মোহনা তন্দ্রার ঘোরেই যেন হেসে ফেলে।

-মোহনা।

কে ডাকে? চোখ খুলবার সাধ্যি নেই।

খুব কষ্ট করে চোখ মেলে চাইলো। সুন্দর সুপুরুষ একজন ডক্টর সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। আগে তাকে কখনো দেখেনি। আজ নতুন এলো কি? খুব কষ্ট  করে অস্ফুট স্বরে শুধু একটি শব্দই উচ্চারণ করতে পারলো,

-জ্বী?

কন্ঠস্বর অপরিচিত। ব্যক্তিটিও অপরিচিত। কে উনি? মোহনা জানে না । হাসপাতালে কত ডক্টরই তো আছেন। তাদের একজন কেউ হবে। সাদা অ্যাপ্রনে ভীষণ সুন্দর দেখাচ্ছে ওনাকে। যেন সাক্ষাত দেবদূত। কি সুন্দর চেহারা, স্নেহ মাখানো কন্ঠস্বর। চোখ দুটো অসম্ভব নীল, ভীষণ স্বচ্ছ। কি তীক্ষ্ণ সে চোখের দৃষ্টি। ডক্টর মাথা ঝুঁকিয়ে বললেন, 

-কেমন আছো তুমি? আজ কেমন আছো? 

মোহনার বড্ড ক্লান্তি। শব্দ দিয়ে কথা তৈরী করতে পারলেও তা বোঝাবার মতো শক্তি কোথায়? শুধু একটা শব্দই খুব অস্পষ্ট করে বলে ফেললো, 

-কষ্ট। খুব কষ্ট।

আবারো সেই স্নেহ মাখানো কন্ঠ। 

-আমি এরিক। এরিক স্টিফেনসন। আজই এসেছি। আজ জুলাইয়ের ৭ তারিখ। তোমায় সুস্থ করে দিতে। তুমি সুস্থ হয়ে যাবে খুব শিগগিরি।

কথাগুলো শুনে মোহনা হেসে ফেললো কিঞ্চিত। এত চেষ্টার পরও চিকিতসা যখন সফল হচ্ছে না তখন এসকল কথার কোন অর্থ হয় না। কিছু বলতে ইচ্ছে করলো না। কিছু ভাবতেও ইচ্ছে করলো না এ বিষয়ে। কিন্তু আবারো সেই কন্ঠস্বর।

-মোহনা, একবার তাকাও। দেখ আমাকে। আমি এরিক। তোমাদের পৃথিবীর  সময়কাল অনুযায়ী আজ ভোর পাঁচটায় আমি এসেছি। সাল ২০০৬, তারিখ ৭ই জুলাই। তোমায় সুস্থ করবার জন্যই আমার আগমন। এখন বাজে সকাল ১১ টা।এই পাঁচ ঘন্টার গল্প শুনবে? কত কাজই যে করলাম।

মোহনার কেমন জানি লাগছে। কেউ কথা বললে বা পাশে এসে দাঁড়ালে তার খুব ভাল লাগে কিন্তু সে যে আর আগের মতো প্রানোচ্ছ্বল হয়ে কথা বলে উঠতে পারেনা, হাসতে পারে না, অবাকও হতে পারেনা। বেশির ভাগ সময়ই কেটে যায় শরীরের সকল সঞ্চিত শক্তি একসাথ করতে। তারপরও কথা আসে না মুখে। মনে যে কতকিছু জমে আছে বলার জন্য। ডক্টর আবারো বলে উঠলেন,

-জানো  মোহনা, আজ সকালে তোমাদের সময় ভোর পাঁচটায় আমি আসলাম, তোমাদের মতন হলাম। তোমার ইউনিটে আসবার জন্য চলে যেতে হলো ৩০ বছর পিছনে, যখন  এই হাসপাতালে চিকিতসক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেয়া হচ্ছিল। সে সময় তো আর আমি এখানে ছিলাম না যে তখন নিয়োগপ্রাপ্ত হয়ে ত্রিশ বছর চাকুরী জীবন অতিবাহিত করে এই পদে অধিষ্ঠিত হবো এবং তোমার তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্ব পালন করবো। তাই এই ঘন্টা পাঁচেকের মধ্যেই সবকিছু সেরে ফেলতে হলো। যেমন ধরো, সেই ত্রিশ বছর আগের সময় প্রবাহে প্রবেশ করা, চিকিতসক হিসেবে যোগদান ও নিয়োগপত্র পাওয়া এবং এই হাসপাতালের সাথে  যুক্ত হওয়া। কাজটা শেষ হতেই সময়কে আমি ২০০৬-এ এগিয়ে নিয়ে এসেছি। সবাই এখন জানে আমি এ হাসপাতালের একজন বর্ষীয়ান চিকিতসক। আমি যেন গত ত্রিশ বছর ধরেই ওদের সাথে আছি। অথচ এই ত্রিশ বছরের ঘটনা প্রবাহে আমার নিজেকে অন্তর্ভুক্ত করতে সময় লেগেছে মাত্র পাঁচ ঘন্টা আগে, সময়ের মেট্রিক্সকে সংকুচিত করেই কাজটি করতে হয়েছে। কিন্তু যে কাউকে জিজ্ঞেস করো, হাসপাতালের সবাই বলবে আমি এখানকার সবচেয়ে পুরানা ডক্টর। ঐ যে দেখ, নার্সরা আসছেন। ওনারা তোমায় কেমোথেরাপি দিবেন। এবার আমি তাদেরে আজ একটু বাধা দেব। বলবো আমায় একটু সময় দিতে। কেমোথেরাপি চললে চলুক। কিন্তু তোমায় বিশেষভাবে পর্যবেক্ষনের জন্য আমি আজ এখানেই উপস্থিত থাকবো। তোমায় সুস্থ করতে আমার জন্য কিছুক্ষণ সময়ই যথেষ্ট।

নার্সরা ঘরে এতক্ষণে প্রবেশ করেছেন। সম্ভাষণ জানালেন ডক্টর স্টিফেনসনকে। আজ এ রোগীর তৃতীয় দফা কেমোথেরাপি প্রয়োগের দিন। গত কয়েকদিন ধরেই মোহনাকে নিয়ে সবাই একটু বেশ চিন্তিত। মেয়েটির ১৫/১৬ বছর বয়স হবে। এত তাড়াতাড়ি একটা জীবন প্রদীপ যে চোখের সামনে নিভে যাবে ভাবতে খারাপ লাগে সবারই। কিন্তু অপারগ এই চিকিতসা বিজ্ঞান। ক্যান্সারের শেষ পর্যায়ে মেয়েটি উপস্থিত। চিকিতসা বিজ্ঞান ওর ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ব্যর্থ। ওকে বাঁচানোর সাধ্যি কারোরই নেই। কোথাও নেই। মোহনার  শরীরের রক্ত কণিকাগুলো ভেঙে ভেঙে শেষ হয়ে যাচ্ছে।ও দিন দিন মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আজ তাই ডক্টর সাহেব এসেছেন মোহনাকে দেখতে। কিছু করার যদিও নেই ওনার। ছুটিতে যাবার আগে সকল রোগীদের সাথে সাক্ষাত করবার ইচ্ছে হয়েছে বলেই হয়তো বা মোহনার কাছে তার আগমন।

২

জুলাই, ৮, ২০০৬,

সময় সকাল ১১ টা  ৩০ মিনিট। সকালটা আজ যেন খুব সুন্দর। ঝলমলে রোদ বাইরে।

মোহনা চোখ  মেলেছে। খুব স্পষ্ট না হলেও এতটুকু মনে করতে পারছে যে গতকাল যেন এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা হয়েছে তার। আর তখন  থেকেই বেশ ভাল বোধ করছে সে। সমস্ত ক্লান্তি যেন এক নিমেষে উধাও। 

কেন এত ভাল লাগছে আজ, এতদিন পরে? সে জানে না। গতকাল নার্সরা চলে যাওয়ার পর ওখানকার উপস্থিত ডক্টর তকে বলছিলেন অনেক কিছু। মোহনা শুধু শুনে গিয়েছে। ২২ লক্ষ আলোকবর্ষ দূরের এক গ্রহ থেকে আগত তিনি এই পৃথিবীতে একজন টাইম  ট্র্যাভেলার। সময়ের দিক থেকে, প্রযুক্তির দিক থেকে পৃথিবীর চেয়ে তারা তিন হাজার বছর এগুনো। তাই ক্যন্সারের মত ভয়ানক অসুখও সারাতে তাদের বেশ একটা বেগ পেতে হয়না। তিনি জেনেছেন মোহনার কথা বহু দূর থেকে । এও জেনেছেন মোহনার এখন এই পৃথিবী ছেড়ে যাবার সময় হয়নি। ছুটে এসেছেন তাই মোহনাকে বাঁচাবার জন্য এই পৃথিবীতে।

মোহনার এইটুকু মনে আছে যে ওনার হাত থেকে তখন সাদা দীপ্তময় আভা বেরুচ্ছিল যখন উনি তার হাতখানি বেশ কিছুক্ষণ রেখেছিলেন মোহনার কপালে। তারপর থেকে যেন ওর অসুখটা  উধাও হয়ে গেছে। উঠে বসতে ইচ্ছে করছে। হাঁটতে ইচ্ছে করছে। স্বপ্ন নয় তো? ডক্টরকে জিজ্ঞেস করবে সুযোগ পেলেই।

কিন্তু মোহনাকে যে মেডিকেল টিম সার্বক্ষণিক দেখছে তারার  ব্লাড রিপোর্ট নিয়ে বেশ খানিকটা বিভ্রান্ত আজ। এ যেন অবিশ্বাস্য! মোহনার রিপোর্টে ক্যান্সারের চিহ্নমাত্র নেই। কিন্তু কিভাবে তা সম্ভব? আর তাই যদি হয় তাহলে এতদিন ধরে কিসের ভিত্তিতে তারা ক্যন্সারের চিকিতসা চালালেন? নাহ্‌ এ হতে পারে না। পূর্বের রিপোর্টগুলো আবার দেখতে হবে। মোহনার ফাইলটি নিয়ে একে একে সবগুলো  পাতা উল্টালেন টিমের সকলেই। রক্ত কণিকা গুলো ভেঙে যাবার লক্ষণ এতে সুস্পষ্ট। তাহলে সবকিছু   হঠাতই পালটে গেল কিভাবে? মোহনার যে আর কোন চিকিতসারই প্রয়োজন নেই। ও যে অসুস্থ ছিল তার কোন ছাপই নেই তার রিপোর্টে।  এ সত্যিই  ব্যাখ্যাতীত। ডক্টর স্টিফেনসনকে দেখাতে হবে।  কিন্তু উনি তো গতকালই চলে গেছেন ছুটিতে। 

মোহনা চলে যাবে কাল সকালে, কিন্তু যাবার আগে ডক্টরের সাথে দেখা করতে মন চাইছে ওর। ভবিষ্যতের সময় থেকে আগত ওই দূর নক্ষত্রের বাসিন্দা বলে যে কল্প কাহিনীর বর্ণনা করেছিলেন আর মোহনার কপালে হাত রেখে সারা ঘরময় তীব্র সাদা আলোর বিকিরণে নিমিষেই যিনি সকল রোগ থেকে তাকে মুক্ত করে দিইয়েছিলেন তা কি স্বপ্ন ছিল নাকি সত্যি ছিল?  

৩

জুলাই ১০, ২০০৬

সকাল হতেই টিপ টিপ বৃষ্টি পড়ছে।  কাল হাসপাতাল থেকে চলে আসার সময় থেকেই দিনটা মেঘলা। চারদিকে কেমন যেন গুমোট ভাব। প্রকৃতি যেন কারো চলে যাওয়ার বেদনায় ভারাক্রান্ত। একটু ঢালু পথ পেরিয়ে হাসপাতাল চত্বর থেকে মিনিট দশেক হেঁটে গেলাই ডক্টরস বাংলো। মোহনা এসে দাঁড়িয়েছে বাংলোর সামনে। গেইটের দারোয়ান সদর দরজা খুলে দিলে মোহনা বললো, ডক্টর এরিক স্টিফেন্সনের সাথে দেখা করতে চায় সে।  দারোয়ান নিস্পলক, ভাবলেশহীন, নিরুত্তর। মোহনা ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। এতগুলো কথা বলার পরও লোকটি যেন তার জায়গা থেকে নড়ছে না। কিন্তু সঠিক ভাবে উত্তরও দিচ্ছে না যে ডাক্তার সাহেবের সাথে দেখা করা যাবে কি না। ধৈর্য্যহারা মোহনা দারোয়ানকে পাশ কাটিয়ে ভিতরে প্রবেশ করলো। উঠোন পেরিয়ে টানা বারান্দা। কিছু চেয়ার পাতা ওখানে। চারিদিকে কি প্রচন্ড নীরবতা। বাড়িতে কি আর কেউ নেই? মোহনা জিজ্ঞেস করতেই পেছন থেকে দারোয়ানের কন্ঠস্বর শুনতে পেল। চকিতে ফিরে তাকালো। এ, কি শুনছে সে? গতকাল থেকে ডাক্তার সাহেবের ছুটিতে যাবার কথা। তার আগের রাতে ডিউটি সেরে যথারীতি রাত দশটায় বাড়ী ফিরবেন বলে ফোনে জানালেও ডক্টর  স্টিফেনসন এখন অবধি বাড়ি ফিরেন নি। কেউ জানে না ওনার কেন এই হঠাত নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়া।       

................

Friday, December 25, 2009

পথচারী


ম্যাথ ক্লাব থেকে বের হতে হতে রাত প্রায় সাড়ে আট টা। শীতের সময় সন্ধ্যা নামে বিকেল চারটায়। মন্ট্রিয়লের জনাকীর্ণ রাস্তা  শশ্মান হয়ে যায় সন্ধ্যা সাতটার মাঝেই। ক্লাব থেকে রাস্তা পেরিয়ে কিছুদূর হাঁটলেই নিগারের বাসা। রাতে রাস্তার সোডিয়াম বাতিগুলো হলুদ আভা ছড়িয়ে সারা অন্ধকারকে যেন হলদেটে করে রাখে। নিগার ছন্দে ছন্দে পা ফেলে যখন এগুতে থাকে, বাতাসের ঝাপটায় তার জ্যাকেটের হুড টুপ্ করে খুলে যায়। চিলিং কোল্ড। সহনীয় নয়। আবার কাঁধের ব্যাগটা সরিয়ে জ্যাকেটের হুডটা দিয়ে মাথাটা ঢেকে ফেলে সে। মাঝে মাঝে দ্রুত হাঁটে , মাঝে মাঝে ধীরে। বাড়ী পৌঁছাতে হয়তোবা মিনিট দশেক। ঘড়িতে দেখে নিল সময়টা ভাল করে। রাত সাড়ে আট টা। ও যাচ্ছে সেইন্ট কেভিন সড়ক ধরে পূর্বদিকের ইসাবেলা রাস্তায়। এটাই তার বাড়ী ফেরার রুটিন। কারণ তথ্যটা এভাবেই নির্ধারিত করা। অর্থাৎ নিগার সেইন্ট কেভিন রাস্তা ধরে এগুবে ইসাবেলা সড়ক অভিমুখে রাত আট টা তিরিশে । জনমানবহীন রাস্তায় নিগার প্রতি পদক্ষেপ রেখে চলবে মিনিট দশেক তার গন্তব্যে পৌঁছাবার জন্যে। রাস্তার দু ধারের দৃশ্যটাও এমনি। হলদেটে আভায় জনমানবহীন পথ। নিগার হেঁটে যাবে ওর বাসার দিকে। সেসময় নিগার ছাড়া আর অন্য কিছুরই উপস্থিতি থাকবে না ও পথে।

কিন্তু কার কাছে রয়েছে এ সকল তথ্য? তার কাছে যে হয়তো বা ঘটাবে এ ঘটনাটি। তা না হলে নিগার বাড়ী ফিরবেই বা কি করে? ওর নাম ভি-ওয়ান। সকলের বাড়ী ফিরবার ঘটনা ও-ই তৈরী করে থাকে  যেমন কিনা মি. পার্কার, যিনি বাড়ী ফিরেন তার ডেলিভারি অর্ডার শেষ করে শীতের রাতে টরন্টোর নির্জন রাস্তা ধরে । তার এই মিনি ভ্যানটা চালাচ্ছেন আজ প্রায় ত্রিশ বছর। এই দীর্ঘ সময় ধরে রাস্তায় চালক হিসেবে তার রিপোর্ট একদম ক্লিন। কোন অ্যাকসিডেন্টের ঘটনা নেই, স্পিডিং এর ইতিহাস নেই। ট্র্যাফিক পুলিশের নজরদারীতেও পড়েন নি। একজন পাকা ড্রাইভার হিসেবে নিজে খুবই আত্মবিশ্বাসী। চারিদিক খেয়াল করে দায়িত্বের  সাথে গাড়ি চালনার অভিজ্ঞতা আর দক্ষতা অর্জন করেছেন দীর্ঘ দিনের চেষ্টার ফলে। এই গুণাবলী মি. পার্কারের সেই ছোটবেলা থেকেই। হাইস্কুল শেষে ডেলিভারি ম্যানের কাজটা যখন নিলেন তখন তার বয়স সবে আঠার। তারুণ্যের উদ্দীপনা থাকলেও তা তিনি গাড়ি চালনার ক্ষেত্রে প্রকাশ করেন নি কখনো। আর দেখতে দেখতে এখন ত্রিশটি বছর পার হয়ে গেছে। টরোন্টো শহর জনবহুল হয়েছে। ব্যবসা বাণিজ্য কেন্দ্র হিসাবে প্রসার লাভ করেছে। জীবন যাত্রার পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু কাজ শেষে তার বাড়ী ফিরবার পথটা সেই একই রকম আছে। কারণ ভি-ওয়ান এর কোন পরিবর্তন ঘটায় নি। তাই মি. পার্কার নিশ্চিন্ত মনেই বাড়ী ফিরেন প্রতি রাতে তার কাজ শেষে। নিয়ন আলোয় রাস্তাটা হাল্কা ধোয়াটে দেখায়। এই রাস্তার দুটি ক্রসিং পেরুলেই তার বাড়ী ব্র্যাডফোর্ড প্লেইসে। এখানে সব মিলিয়ে আগে ছিল পাঁচটি পরিবার। তারপর প্রতিবেশীরা এ জায়গা ছেড়ে বিস্তৃত টরোন্টোর ব্যাপৃত বাণিজ্য কেন্দ্রে  ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছেন ধীরে ধীরে। এখন ব্র্যাডফোর্ড প্লেইসে মি. পার্কার একাই বাস করেন। মাসের শেষ সপ্তাহে ভাইঝি আসে তার সাথে দেখা করতে। ও থাকে মন্ট্রিয়লে। হাইস্কুলে সবে মাত্র উঠেছে। নাম নিগার। ম্যাথে খুব ভাল। ম্যাথ ক্লাবের মেম্বারও। ব্যস্ত থাকে ভীষণ। তারপরও মাসের শেষ সপ্তাহান্তে তার এখানে আসা চাই। সাত ঘন্টার বাস জার্নি। গ্রে-হাউন্ডের বাস জার্নি যদিও খুব ভাল তবুও ক্লান্তি নেই মেয়েটার। প্রভিন্স দুটোর দূরত্ব ৩১৩ মাইলের কিছু বেশী। শনিবার দুপুরে পৌঁছাবে আবার রবিবার দুপুরে রওনা দেবে কিন্তু প্রাণপ্রিয় পার্কার আঙ্কেলকে না দেখলে তার চলবে না। আর মি. পার্কারও মনের অজান্তে যেন অপেক্ষা করে থাকেন ভাইঝির জন্য। মাসের শেষের উইকেন্ডটা তাই তার কাছে খুব আকাঙ্খিত। 

ভি-ওয়ান খুব সাবধানী একজন প্রোগ্রামার। যদিও জটিল কোন দায়িত্বে সে নিয়োজিত নয়। শুধু পৃথিবীর মানুষগুলো কিভাবে বাড়ী ফিরবে সে কাজটুকুই দেখাশুনা করে। পৃথিবীতে মানুষগুলো স্পেস-টাইম ডাইমেনশানে আবদ্ধ। তাদের দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, উচ্চতা বিশিষ্ট শরীর আছে, যা থ্রি ডাইমেনশানাল স্পেসে যথার্থ ভাবে খাপ খায়। তাই তাদের এই শরীরগুলোকে কর্মক্ষম রাখার জন্য আর স্বচ্ছন্দ্যে চলাফেরার জন্য সারা পৃথিবীতে থ্রি-ডি স্পেসের জাল বুনে দেয়া হয়েছে। ভি-ওয়ানের গুরু ট্রিসটিন এই ধারণার প্রবর্তক। তার মতে পৃথিবীর এই থ্রি -ডি স্পেসে সেই থাকতে পারবে যে তার শরীর ও আত্মার সমন্বয়ে পৃথিবীতে অবস্থান করতে পারবে। এই ধরণের অবস্থাকে পৃথিবীতে  ‘বেঁচে থাকা’ বলে। শরীর ও আত্মার সমন্বয় ঘটায় যে প্রাণশক্তি তার কিন্তু এতকিছুর প্রয়োজন হয় না। সে সময় এবং স্থানের উর্ধ্বে। কিছুতেই তার পরিবর্তন নেই। আবার ভি-ওয়ান, ট্রিসটিন এবং আরো অনেকে রয়েছে যাদের বৈশিষ্ট্য হল ওরা সর্বোচ্চ ৩৩ ডাইমেনশান পর্যন্ত বিচরণ করতে পারে অর্থাৎ  সর্বোচ্চ ৩৩ ডাইমেনশানে আবদ্ধ। পৃথিবীর মানুষরা ডাইমেনশানের দিক দিয়ে থ্রি ডাইমেনশানের বেশী নয় তাই ট্রিসটিনদের দেখতে পায়না। তাদের অস্তিত্বও অনুভব করতে পারেনা। অথচ এসকল মানুষদের ভাগ্য নির্ধারক হিসেবে ভি-ওয়ান কত খাটুনিই না করে। মাঝে মাঝে ওর ইচ্ছে করে মানুষদের সামনে এসে দাঁড়াতে । শরীর তো নেই তাই শরীরের আকার ধারণ করে কালো ছায়া হয়ে দৃশ্যমান হতে চেষ্টা করে সে,যাকে বলা যায় একদম শ্যাডো ম্যানের রূপে!ছায়া মানব। তর্ক বিতর্ক করেও পৃথিবীর মানুষগুলো তখন ওদেরকে দেখে ছায়া মানবের সংগা নির্ধারণ করতে পারে না। হায়রে মানুষগুলো, জানার স্তর ওদের কত কম! ভি-ওয়ান , ট্রিসটিন এসব কান্ড দেখে মিটিমিটি হাসে। ওরা আজ এসেছে পৃথিবী ভ্রমণে। বেশ দূর হতেই খেয়াল করছে নিগারকে। নিগার বাড়ী ফিরছে তার চিরচেনা পথ ধরে। ওদিকে মি. পার্কারও বাড়ি ফিরছেন। সারাদিনের কাজ শেষে আজ তিনি ভীষণ ক্লান্ত। আর চারদিন পরেই মাসের শেষ উইকএন্ড। তখন চাচা ভাতিজির দেখা হবে টরোন্টোতে। ভি-ওয়ান হঠাৎই ভাবলো, এমন করলে কেমন হয় যদি নিগারের কো-অর্ডিনেট টা হালকা টোকায় মি. পার্কারের কাছে নিয়ে আসা যায়! দুজনের মাঝে এখন ৩১৩ মাইল দূরত্ব। কাছাকাছি ওদের কো-অর্ডিনেট দুটো এনে ফেললে মি. পার্কার বাড়ি ফেরার পথে দেখতে পাবেন যে নিগারও ফুটপাথ ধরে হেঁটে বাড়ি ফিরছে। অথচ এখন টরোন্টোতে নিগার আসবেই বা কোথা থেকে , ও তো থাকে মন্ট্রিয়লে। চোখের ভুল মনে করে আপন মনে হয়তো বা তিনি হাসবেন। কিন্তু জানবেনও না যে তার দেখাটা আসলে ভুল ছিল না। 
নিগারও দেখবে তার আংকেল পার্কারের সাদা ভ্যান গাড়িটির মত হুবুহু একটি গাড়ি তার ফুটপাথের পাশ দিয়ে চলে গেল। মনে মনে হাসবে নিগার। ভাববে তারও বুঝি চোখের ভুল। হয়তোবা তার একমাত্র প্রিয় আংকেলের কথা খুব মনে পড়ে বলেই যেখানে সেখানে আজকাল আংকেলের গাড়িটাও দেখতে শুরু করেছে।
প্ল্যানটা ভি-ওয়ান , ট্রিসটিনকে বললো। শুনে ট্রিসটিন বললো,
-চমৎকার আইডিয়া। কাজটা আমিই করবো। দুজনের কো-অর্ডিনেট একটু কাছাকাছি আনা, এই-ই তো?
-হ্যা, কিন্তু সাবধানে।
-এতে আবার কি সাবধানতা?
-দুজনকে কিন্তু পাশাপাশি রাখতে হবে। একজন যদি আরেকজনের কো-অর্ডিনেটের ওপর এসে পড়ে তাহলে কিন্তু সংঘর্ষ অনিবার্য।
-তেমন তো হয়েই থাকে। পথে যেতে যেতে কত মানুষ একে অপরের সাথে ধাক্কা খায়, না?
-সে তো ভীড় থাকলে।
-ভীড় হয় কখন? অনেকগুলো কো-অর্ডিনেট কাছাকাছি চলে এলেই তো?
- কিন্তু এখানে ব্যাপারটা জটিল।
-কেমন জটিল?
-যেমন ধর, দুজনেই তো হাঁটছে না। নিগার যাচ্ছে ফুটপাথ দিয়ে। আর মি. পার্কার যাচ্ছেন ভ্যান চালিয়ে। সামান্য ভুলে কিন্তু সংঘর্ষ বাঁধবে। আর তা থেকে কি হবে বুঝতে পারছো তো? অ্যাকসিডেন্ট।
-তা হবে না। আমি ওদের কো-অর্ডিনেট দুটো একটু কাছাকাছি করবো এই যা। এখনি করি না কেন?
-এখন কেন? পরেও করা যাবে। এখন চল ঘুরে বেড়াই। দেখি এই পৃথিবীর ছোট্ট ছোট্ট মানুষগুলো কে কোথায় কি করছে। ঢাকায় একট জায়গা আছে নাম শনির আখড়া। প্রায়ই বাস ট্রাক আর মিনিবাসে অ্যাকসিডেন্ট হয়। চলো ঘুরে আসি।
যে কথা সে কাজ। ওরা চলে এলো ঢাকায় । লক্ষ্য করলো জায়গাটার পরিবর্তন। একটা ডিভাইডার দেয়া হয়েছে অ্যাকসিডেন্ট প্রতিরোধের জন্য। কিন্তু ট্রিসটিনের প্রশ্ন
-এতে কি কাজ হবে? অ্যাকসিডেন্ট কি প্রতিহত হবে? ওরা  কি মূল কারণটা জানে না?
-না জানে না। আর জানলেও ওদের কিছু করার নেই।
-কেন বলতো?
- প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে মানব প্রজাতি এখনো বেশ পিছনে পড়ে আছে। গাণিতিক সমীকরণগুলোও সবসময় সমাধানে পারদর্শী নয়। মাত্র তারা ভাবতে শুরু করেছে তাদের জগত ছাড়া অন্য জগতের অস্তিত্ব থাকতে পারে। অথচ পুরো বিশ্লেষণ এখনো করতে পারেনি। তাই এখনো জানে না যে শনির আখড়া জায়গাটা সেই জায়গা যেখানে অন্য একটি সাত-ডাইমেনশান জগতের সংমিশ্রণ ঘটে গেছে। তাই যে কোন গতিশীল বস্তুই যখন এ পথ দিয়ে ধাবিত হয় তখন ঐ সেভেন-ডি জগতের সাথে ধাক্কা খায়, আর সাথে সাথে হয়ে পড়ে নিয়ন্ত্রণহীন । সুতরাং ওখানে অ্যাকসিডেন্ট ঘটবার মাত্রা এত বেশী। তাছাড়া মানুষ প্রজাতি থ্রি-ডির বেশী ডাইমেনশান  দেখতেও পায় না , অনুভবও করতে পারেনা। তাই এসব ব্যাপারে ওদের ধারণা ও জ্ঞান খুব সীমিত।
-তাহলে? এর কি কোন সমাধান নেই?
-আছে।
-কি সেটা?
-সমাধান দুটো। একটি আমাদের হাতে । আমরা সেভেন-ডি কে একটু সরিয়ে দিলেই দুজগতের ছেদবিন্দু হিসেবে পরিচিত ঐ শনির আখড়া শনি মুক্ত হবে। আরেকটা  উপায় হলো আরো ৫০ বছর অপেক্ষা করা। অর্থাৎ ২০৬০ সালের দিকে পৃথিবীর মানুষগুলো গাণিতিক হিসাব নিকাষে আরেকটু এগিয়ে যাবে। প্রকৌশল বিদ্যায় ও উন্নতি লাভ করবে। নিজেদের ডাইমেনশান নিজেরাই নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। ওদের আশপাশের জগতগুলোর সাথে কোন সংঘাত ছাড়াই সহ অবস্থানে সক্ষম হবে। উদ্দেশ্য ভাল রেখে এগুলে পৃথিবী থেকে বেশীরভাগ দুর্ঘটনা প্রতিহত করতে পারবে। আমাদেরকে আর রাত দিন খাটা খাটনি করতে হবে না তাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি ক্ষণ নির্ধারিত করে দেয়ার জন্য। ওদের ভাগ্য নিয়ন্ত্রক ওরা নিজেরাই হতে পারবে।

কথাগুলো শুনতে শুনতে অন্যমনস্ক হয়ে ট্রিসটিন এক টোকায় নিগারের কো-অর্ডিনেট টা মি. পার্কেরের খুব কাছে এনে ফেললো। কিন্তু ওর জানা ছিল না যে নিগারের পথচলা মি. পার্কারের গতিপথের সমন্তরাল নয়। ও জানবেই বা কিভাবে। এসব কাজ তো আসলে ভি-ওয়ানের । ভি-ওয়ান উপস্থিত থাকলে এ ভুলটা হয়তো বা হতো না। কিন্তুই যা হবার তা তো হয়েই গেল। নিগার ম্যাথ ক্লাব থেকে বাড়ি ফিরবার পথ ঠিকই ধরেছিল। রাস্তা পেরুতে যাবে যখন এমন সময় দেখে চোখের সামনে বিশাল ভ্যান গাড়ি। কোন সাড়া নেই শব্দ নেই, হঠাৎই যেন গাড়িটার উদয়। কোথা হতে এলো, কেনই বা এলো। এই নির্জন রাস্তা ধরে কোথায় যাবে সে? কোন শব্দই তো পেল না। বিশাল গাড়িটার স্টিয়ারিং হুইলে বসা চালকের চোখ দুটোও বিস্ফারিত। একি! এমন খালি একটা রাস্তায় ছোট্ট একটা মেয়ে এলো কোথা হতে? ব্র্যাডফোর্ড প্লেইসে তো সে ছাড়া আজকাল আর কেউই থাকে না। প্রতিবেশীরাও নেই যে তাদের ছেলেমেয়েদের আনাগোনা থাকবে। তাহলে এই মেয়েটি কে যে কিনা এত নিশ্চিন্ত মনে রাস্তা পার হচ্ছে দিক বিদিক খেয়াল না করেই। রাস্তার লাল বাতিটাও তো খেয়াল করছে না। না কি ও দেখতেই পায় নি। হঠাৎই তাই জোরে ব্রেক কষে ভ্যান থামানোর চেষ্টা করলেন মি. পার্কার। ভ্যানের ধাক্কায় পথচারী মেয়েটি ছিটকে পড়েছে একটু দূরে। মি. পার্কার ড্রাইভিং সিট থেকে নামলেন। ভয়ে কাঁপছে তার শরীর। ত্রিশ বছরের চালক হিসেবে একটি ভুলও করেন নি তিনি একবারের জন্য। কিন্তু আজ কি হলো? কিভাবে হলো এ ভুল? তার পারদর্শীতার সকল গর্ব এক নিমেষেই যেন শেষ হয়ে গেল। পুলিশও চলে এসেছে এর মাঝে। মি. পার্কার এগিয়ে গেলেন শায়িত পথচারীর নিথর দেহটির কাছে। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছেন না। এ যে দেখতে হুবুহু তার ভাতিঝি নিগারের মত। নাকি নিগারকেই দেখছেন। কিন্তু ও এখানে আসবে কি করে? ও থাকে সুদূর মন্ট্রিয়লে। মাসের শেষের উইকেন্ডের আরো দিন চারেক বাকী। তারপর ও আসবে। তাহলে এ নিশ্চয়ই চোখের ভুল। আসলে নিগারকে খুব বেশী ভালবাসেন বলেই হয়তো বা সবার মাঝেই মি. পার্কার তাকে  খুঁজে পান। আতঙ্কে বুঝি তাই পথচারী মেয়েটিকেও তার একমাত্র ভাইঝি ভেবে ভুল হচ্ছে। প্রচন্ড শকে তিনি নির্বাক। কিছুই ভাবতে পারছেন না। মাথাটা বড্ড ঘুরছে। দাঁড়াতেও পারছেন না। আশপাশের শব্দগুলো খুব ক্ষীণ হয়ে আসছে। পুলিশের লোকগুলো বলছে ওনাকে ধরো। অজ্ঞান হয়ে গেছে। নিয়ে চল ঐ কাছের ক্লিনিকে।

অনাকাংখিত এই ঘটনায় মি. পার্কার এর পর হতে দীর্ঘকাল যাবত মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত। কথা বলেন না। নির্বাক চেয়ে থাকেন। ডাক্তার তাকে দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা দিয়েছেন।  বহুদিনের সহকর্মীরা আসেন ওনাকে দেখতে। সবার মাঝে উনি তার প্রিয় মুখটিকে খুঁজে বেড়ান। অপেক্ষা করেন তার আদরের ভাইঝি আসবে বলে। কিন্তু নিগার তো আসে না। তার প্রাণপ্রিয় ভাইঝি তো তাকে আসে না দেখতে । নিশ্চয়ই মাসের শেষের উইকেন্ডের এখনো কিছু দেরী। আর কিছুদিন পরেই হয়তো বা নিগার আসবে।
...........

দীপার প্রেম

 তারিখঃ ৪ঠা এপ্রিল ২০০২ স্থানঃ লেকচার হল, দ্বিতীয়তলা  ডিউটি করবে দীপা আর সুমন  সময়ঃ রাত আটটা থেকে ১২টা পর্যন্ত  অর্থাৎ এই চার ঘন্টায় লেকচ...