Tuesday, March 15, 2016

সময়ের ফাঁদে

মিনার আজ একটু সকাল সকাল বের হয়েছে বাড়ী থেকে। টার্ম পরীক্ষা শুরু। বাড়ি থেকে প্রায় আট কিলোমিটার দূরে যেতে হবে। কলেজ যেতে বেশ খানিকটা পথ পেরুতে হয় গ্রানের সরু রাস্তা ধরে ঐ বনের মাঝ দিয়ে। তারপর একটা ছোট্ট জলাশয়। পার  হলেই বড় রাস্তা। রাস্তা ধরে কিছুদূর এগুলেই কলেজ প্রাঙ্গণ। পরীক্ষার দিন বলেই প্রতিদিনের বাঁধা সময় থেকে একটু সময় বেশীই তাহে রেখে আজ বের হয়েছে। সিকালে পিঠা,গুড় মুড়ির নাস্তা।মায়ের হাতের তৈরী নাস্তার স্বাদ যেন আলাদা। খেয়ে কিছু সঙ্গে নেবে কিনা জিজ্ঞেস করাতে মাকে বলল, আজ নয়। কিন্তু আজ যে পরীক্ষার দিন। মা জোর করেই একটু নাস্তা তার টিফিন বক্সে দিয়ে দিল।৮টায় ক্লাশ শুরু হলে সাড়ে সাতটার দিকে মিনার বেরিয়ে পরে অন্য দিনগুলোতে।আজ আরেকটু আগেই বের হলো। সকাল সাতটা তখন।শীতের সকাল। মেঘের আড়াল হতে সূর্য উঁকি দিতে আলসেমি করছে।চারিদিকে পাখির কিচির মিচির। কুয়াশাচ্ছন্ন মেঠোপথ ধরে মিনার হাঁটতে থাকে। পিছনে মা দাঁড়িয়ে আছে সদর দরোজার চৌকাঠে।পিছনে ফিরে তাকালো মিনার।প্রতিদিনই তো পিছনে ফিরে মাকে দেখে।কিন্তু আজ যেন কেমন একটু লাগলো।বুঝাতে পারবে না। এ যেন কেমন এক অনুভূতি,। মাকে যেন আর দেখতে পাবে না এমনিই কিছু একটা মনে হলো।আর তা ভাবতেই বুকটা ধ্ক করে উঠলো।

নাহ্। কি সব ভাবছে। পরীক্ষার চিন্তায় শুধু উল্টাপাল্টা কথা মনে আসছে। এসব ভাবার কি কোন মানে হয়? তাই হাত নেড়ে হাসিমুখে সামনে রওনা দিল।সরুপঠটা চলে গেছে গাছপালা ভরা ঐ জংগলের দিকে। জঙ্গল পেরুলেই ছোট্ট একটি খালা। আর তার ঐ পাড়েই তো কলেজ।ছোটবেলায় একা আসেনি। বাবা থাকতো তার পথচলার সাথে। একঝন কলেজে উঠে সে একাই পারে এটুকু পথ পাড়ি দিতে। আর পারবেই না কেন।তার আজন্ম বেড়ে উঠা এখানে। এ গ্রামের পথে ধরে চলাফেরা নতুন কিছু তো নয়। গাছ গাছালীতে ভরা জংগলের এই জায়গাটা বেশ মজার।অনেক পাখির কল কাকলি।পাতার ফাঁক দিয়ে সূর্যের উঁকি। আজ যদিও বা বড্ড কুয়াশা। তার উপর একটুই  আধাঁরচ্ছন্ন।

মিনার হাঁটছে,। বেশ কিছুদূর এসে গেছে।মিনিট দশের পথ । তা পেরুলেই জংগল শেষ। এগুতে এগুতে বেশ ক্লান্ত বোধ হচ্ছে হঠাৎই। সারারাত পরীক্ষার প্রস্তুতিতে ভোরের দিকে যা একটু ঘুমিয়েছে।ভাল ঘুমও হয়নি তার। এখন যেন রাজ্যের ক্লান্তি। কিন্তু এ পথ এখনো শেষ হচ্ছে না কেন?

মিনার হাঁটছে তো অনেকক্ষণ।       

সময়ের হিসাব রাখেনি। রাখলে বোধহয় দেখত আধাঘন্টার বেশী হয়ে গেছে। সে এগিয়ে চলছে কিন্তু পথের যেন শেষ মিলছে না। ক্লান্তিতে শরির অবসন্ন।ঘুমে জড়িয়ে আসছে চোখদুটো। হেলান দিয়ে বসে পড়লো ছাতিম গাছের তলে।

তারপর?

আর খেয়াল নেই একদম যেন ঘুমের রাজ্যে –গভীর ঘুমে।

এদিকে সকাল গড়িয়ে দুপুর।কুয়াশা কেটে গেছে।চারিদিকে ঝলমলে দিন।সূর্যের হাসি খেলা পাতার ফাঁকে ফাঁকে।হঠাৎ কোথা হতে কর্কশ কন্ঠে পেঁচা ডেকে উঠতেই মিনারর ঘুমটা ভেঙে গেল।

অনেক দেরী হয়ে গেল না তো? চারিদিকে তাকিয়ে মিনার তো হতভম্ব। সকাল শেষে এখন দুপুরও শেষ প্রায়।পরীক্ষা তো এতক্ষণে শেষ হয়ে যাবার কথা। তাহলে তো ও পৌঁছাতে দেরী করে ফেলল, ভাবতে ভাবতে মিনার উঠে দাঁড়ালো। হাতের ব্যাগটা নিয়ে খুব দ্রুত গতিতে হাঁটা দিল।একটু পরেই জংগলের শেষ প্রান্তে সেই খালের ধারে এসে দাঁড়াল। বছরের এই সময়ে তেমন গভীর জল থাকে না।কিন্তু এখন তো দেখল এক ফোঁটা জল জমার মত তেমন কোন গভীরতাই নেই ।খালটা কেমন যেন একটা সমতল ভূমিতে পরিণত হয়েছে। এই কয়েক ঘন্টায় এত পরিবর্তন। গতকালও তো এতটা মসৃণ সমতল চোখে পড়েনি।

মিনার পা বাড়ালো। একটু এগুতেই বড় রাস্তা। রাস্তাটাকে বেশ যেন চওড়া আর মসৃণ দেখাচ্ছে। মনে হচ্ছে অনেকটা বিদেশ বিদেশ। রাস্তাটা আধুনিক প্রযুক্তিতেই নির্মিত ছিল কিন্তু আজ যেন মনে হচ্ছে অত্যাধুনিক এক মহাসড়ক।  

রাস্তা পার হয়ে কলেজ ক্যাম্পাসের সামনে এসে দাঁড়াতে দেখল বিশাল বড় নামে কলেজ গেইট যেন নতুন সাজে সজ্জিত।আজ যদিও টার্ম পরীক্ষার দিন, কিন্তু এর পাশাপাশি আরো কোন অনুষ্ঠান আছে কিনা কে জানে? তাই কলেজ গেইট এতো সুন্দর করে সাজান? ভিতর প্রবেশের পথে দারোয়ান বাধা দিল। সে যথারীতি পরিচয়পত্র বের করে দেখালো। 

তারিখ ১৫ই মার্চ ২০১৬.

দারোয়ান তার দিকে চমকে তাকালো।মিনার বুঝতে পারছে না কিছুই।আজ তার পরীক্ষা। কোথায় না তাড়াহুড়ো  করে ভেতরে ঢুকিয়ে দেবে তা না, দারোয়ান তার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে কি দেখছে? নতুন দারোয়ান বোধহয়। ওর কাছেও উনি অচেনা। তাই পুরোনো ছাত্র চিনতে পারছে না। ঢুকতে গেলে দারোয়ান বাধাঁ দিয়ে এমন একটা অবাককর প্রশ্ন করে বসলো যার জন্য মিনার কখনোই প্রস্তুত ছিল না। 

: আপনি এই প্রবেশ পত্র পেলেন কোথায়?

মিনার হেসে ফেললো।বললো, ‘আজ আমার টার্ম পরীক্ষা। আজকের জন্য এ প্রবেশপত্র আমি তো দু’দিন আগে সঙ্গগ্রহ করেছি।’     

দারোয়ান বেশ অবাক হয়ে তাকিয়ে থেকে তারিখটা দেখাল মিনারকে। বললো,, ‘আপনার প্রবেশ পত্রের তারিখ তাহলে ভুল আছে।’

: কিন্তু কি সেই ভুল?

: ২০১৬ সাল লেখাটায় ভুল। মনে হয় ছাপার ভুল হবে। এমন প্রবেশ পত্র তো কখনো দেখিই নি। আর কাগজগটা খুব পুরনো।

মিনারের এবার হেসে ফেলতে কোন বাধা নেই। জিজ্ঞেস করলো, ‘তা কত সাল হওয়া উচিৎ?’

দারোয়ান বলল, ‘এখন তো ২২১৬’ আপনি যেন ২০০ বছর আগের সময় হতে এসেছেন।

মিনার চারিদিকে তাকালো। সামনের মাঠে চোখ পড়ে গেল। সেই টিনের চালে ঘেরা শ্রেণী কক্ষগুলো গেল কোথায়? এতো অত্যাধুনিক সব বিল্ডিং এখন। মূল ভবন, ক্যান্টিন, ছাত্র হস্টেল সব যেন সুউচ্চ ভবনে এক জায়গায় সীমাবদ্ধ করে ফেলা হয়েছে।

নিজের দিকে তাকিয়েও বেশ অবাক লাগছে। এত মলিন কেন ওর ইউনিফর্ম?আই.ডি. কার্ড বের করবে বলে কাঁধের ব্যাগটা নামাল। ব্যাগ খুলতেই মায়ের দেয়া টিফিন চোখে পড়লো। একি অবস্থা খাবারের? সব খাবার শুকিয়ে যেন ধুলোর মতো গুড়ো হয়ে গিয়েছে।   

মিনার থতমত খেয়ে পরীক্ষার হলের দিকে রওনা দিল। কিন্তু কলেজ ভবন যে বড্ড অচেনা। চারপাশের ছেলে মেয়েগুলো এমন কেন?যেন অন্য কোন গ্রহ থেকে এসেছে। অদ্ভুত এক অচেনা পরিবেশ। কাউকে চিনতে পারছে না। স্যারদের দেখা মিলছে না। হেড স্যারের কক্ষ বের করতে বেশ অসুবিধা হলো। না চেনে এই কলেজের করিডোর না চেনে হল-ওয়ে।

অবশেষে দেখা মিললো, কিন্তু স্যারের সাথে কথা বলতেই হোঁচট খেতে হল।আজ কোন টার্ম পরীক্ষা নেই। আর মিনার যে সব কথা বলছে, হেড স্যার কোন ভাবেই মিলাতে পারছেন না। মিনারের পোশাক, কথার ধরণ, বিশেষ করে প্রবেশ পত্রটা। এত প্রাচীন পুরনো ধাঁচের ছাপা অক্ষরের কাগজ হাতে করে এই ছাত্রটি কোথা হতে এসেছে বুঝে উঠতে বড্ড কষ্ট হচ্ছে স্যারের। আজকাল কাগজের ব্যবহার নেই। প্রবেশ পত্র ছাপানোর প্রযুক্তি তো উঠে গেছে সেই কবে। আরো অদ্ভুত হলো এই প্রবেশ পত্রের তারিখ। আজ একই দিনে ২০০ বছর আগের তারিখ নিয়ে ছেলেটি এসেছে। সে এলো কোথা থেকে?

পরীক্ষা হবে না জেনে মিনার চলে এলো বাইরে।বাসায় ফিরতে হবে। বিকেল প্রায় শেষ। রাস্তা পেরুলেই সেই জংগল। যেতে যেতে প্রায় আধা ঘন্টা। মিনার টিফিনের খাবারটুকু ফেলে দিল।এই কয়েকঘন্টায় তার শুকনো খাবার কিভাবে পাউডার হয়ে গেল ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না।সামনে এগিয়ে বাড়ির পথ।মেঠো পথ ধরে আগাতে গিয়ে লক্ষ্য করলো চারপাশের ধানী জমিগুলো উধাও হয়ে গেছে। 

এত কলকারখানা এলো কোথা থেকে? 

আরেকটু এগুতেই বাড়ির উঠোন। কিন্তু কিছুই যে মিলছে না।কোথায় তার বাড়ি? এখানে যে বহুতল বিশিষ্ট সুউচ্চ ভবন। মিনার এবার বিদ্ধ্বস্ত। চারিদিকে তাকিয়ে কোন মানুষের চিহ্ন পেল না। তাহলে এত সুউচ্চ ভবনগুলোতে কারা বাস করে? কারা এরা? এরা এলো কোথা থেকে আর কেনই বা এরকম প্রত্যন্ত গ্রামে এমন স্বপ্পপুরী বানিয়ে বসবাস শুরু করেছে?

মিনার সামনে এগুলো। তন্ন তন্ন করে খুঁজছে তার ঘরের দুয়ার। ঘরে মা যে অপেক্ষা করে আছে তার জন্য।

কিন্তু আর কত অপেক্ষা? বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা এখন।সেই সাত সকালে বেরিয়ে এখনো ফিরেনি মিনার।চিন্তায় অস্থির হয়ে মা লোক পাঠালেন কলেজে খবর নিতে। সন্ধ্যার দিকে খবর পেলেন মিনার আজ কলেজে আসেই নাই। মিনারকে কেউ রাস্তা দিয়ে হেঁটেও যেতে দেখেনি।হতবিহ্বল মা শরীরের সমস্ত শক্তি ছেড়ে দিয়ে বসে পড়লেন বারান্দায়। কিছু ভাবতে পারছেন না। কোথায় যেতে পারে তার ছেলে, আর তো কোন জায়গায়ও নেই এই অজ পাড়াগাঁয়ের আশপাশে।গাঁয়ের সকলে জড়ো হয়েছে মিনারের বাড়িতে। সকলেই খুঁজছে মিনারকে। কোথাও তার হদিস মেলেনি। অথচ মিনার দাঁড়িয়ে আছে ঠিকই তাদের সকলের মাঝে।সে দেখতে পাচ্ছে না বাড়ির উঠোন, গাঁয়ের সমস্ত লোকজন। দেখছে সুউচ্চ এক ভবন। সকলের মাঝে দাঁড়িয়েও সে যেন নেই। দিনটি মার্চের ১৫ তারিখ।স্থানটিও এক। শুধু সময়ের ভেলায় চড়ে মিনার  দুইশত বছর পার হয়ে এসেছে কোন এক ভাবে।

  ……।।

১৫/০৩/২০১৬ 


4 comments:

  1. ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:৫৪১

    স্বপ্নের শঙ্খচিল বলেছেন: 'দিনটি মার্চের ১৫ তারিখ।স্থানটিও এক। শুধু সময়ের ভেলায় চড়ে মিনার দুইশত বছর পার হয়ে এসেছে কোন এক ভাবে।'
    .......................................................................................
    টাইম ট্রাভেল !
    মিনার কোন এক কারনে ভবিষ্যৎ পোর্টালে ঢুকে পড়েছিলো
    সে এখন আর পিছনে ফিরে যেতে পারছে না ।

    ReplyDelete
    Replies
    1. ১২ ই জুন, ২০২৬ রাত ১২:১০০
      আমার মন্তব্যঃ একদম ঠিক! মিনারের খুব কঠিন একটা অবস্থা।

      Delete
  2. ১২ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:২৩০
    শায়মা বলেছেন: ব্যাক টু দ্য ফিউচার!!!

    ReplyDelete
    Replies
    1. ১২ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৩১০
      আমার মন্তব্যঃ আমি একবার ফিউচারে যেতে চেয়ে পাস্টে চলে গিয়েছিলাম। কি একটা অবস্থা।
      ইউরোপে তখনো বিদ্যুৎ আসেনি। মহিলারা সব কালি মাখানো বড় বড় গাউন পরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আর কুপি বাতি জ্বালিয়ে কাজ করছে। আমি তো বুঝেই পাই না, এমন কেন?
      পরে অনেক সময় লেগেছে বুঝতে যে আমি পাস্টে চলে গিয়েছি।

      Delete

দীপার প্রেম

 তারিখঃ ৪ঠা এপ্রিল ২০০২ স্থানঃ লেকচার হল, দ্বিতীয়তলা  ডিউটি করবে দীপা আর সুমন  সময়ঃ রাত আটটা থেকে ১২টা পর্যন্ত  অর্থাৎ এই চার ঘন্টায় লেকচ...